শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

তৈমুর খানের নির্বাচিত ছয়টি কবিতা

প্রকাশিত:

আস্ফালন

একা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছি নিরক্ষর
সব অক্ষরগুলি মার্জিত নিবেদনে প্রজাপতি
ঘুমিয়ে পড়েছে কৌতূহলের নিবৃত্তি পেয়ে
একাকী স্বমেহনে চাঁদ পার করে রাত
দৈবহীন দুয়ারে কেবল আমার নীরব আস্ফালন

জলতল থেকে ওঠে কুমুদের ডাক
নিঃসঙ্গ শালুক শুধু খায় ঠাণ্ডা পাঁক

আজ কোনও বাক্যের ব্যত্যয় নেই, মৌন কৃপাণে
অস্তিত্ব খণ্ড হয় নিষিক্ত নির্বাসনে
যারা যারা ফুটিয়ে রাখে ফুলের সংরাগ
সেখানে প্রজন্ম ঢালুক সৃষ্টির পরাগ
বাঁকা চোখ, অনর্গল বিভ্রম দৃষ্টি হানে চতুর্দিক
আস্ফালন সেরে নিয়ে অশরীরী আমিও
মায়ার শরিক

অযথা বারান্দা ঘিরে আছি

আজ একটা নতুন চশমার কাচে
দূরকে নিকটে ডাকা হল
তার সন্নিধানে চলো উৎসর্গ করি সব আলো

নশ্বর চৌকিতে সব বদল হচ্ছে ঘর
লোকে লোকে বেড়ে উঠছে
অলৌকিক কন্যা ও বর

ডানাকাটা জ্যোৎস্নার দ্বীপে শুয়ে শুয়ে
রাত যায়
সন্ধানের বিহর্গিত আলোয় দৈবাৎ পীড়িত হয়

মেঘভাষা জানি নাকো কলরোল সার
নৈবেদ্যের অসীম প্রান্ত ছুঁয়ে বাঁশি বাজে
তার

যা জেনেছি দূরের সান্নিধ্য তটে চশমার গান
ভাঙা বিদ্যার ডাঙায় হৃদয়ের কারু সন্ধান

কিছু নেই, পৃথিবীর আরোগ্য খুঁজে
বুঝে যাই অসত্য প্রলাপ
দাউ দাউ আগুনের কোপে পুড়ে যায়
লাল যোনি
সমূহ বিলাপ

তারতম্য

সব মুশকিলগুলি এসেছে আমার ঘরে
আজ ওদের বসতে দাও, আপ্যায়ন
ত্রুটিহীন চাই

আর
যে নামে নামুক জলে, নিজে খাই বিষফল
অযোগ্য যদিও আজ, যোগ্যতা কোথা পাই?
নীল মাধুর্যের খাটে বশংবদ পাখি
ওর মাংসে রুচি আছে? বলে দ্যাখো দেখি!
সূর্যহীন দিনকাল, প্রত্যয়হীন পাড়া
ব্যাকরণ না বুঝেই পড়ে যায় ওরা

তাদের গান্ধর্বজলে কী ছায়া ফোটে?
ছায়ায় মাধুর্যময় বৈরাগ্য কাটে
অহংয়ের নবলিপি প্রাচুর্যের পাঠে
জলীয় কষ্টের মতো অন্তহীন ছোটে
আজ সব শিকল বাজুক, শিকলহীন ঘরে
উন্মীলিত হোক সাধু, মাসতুতো যেমন চোরে চোরে

সান্ধ্য আহ্নিক

দু একটি দাঁড়কাক নির্ভেদের কালে
চৈতন্যে মগ্নতা পায় গার্হস্থ্য বিকেলে
ঐশ্বর্যের সন্নিকট পারম্পর্য দাবি
ক্ষয়ের মুলুকে খুঁজি অক্ষয়ের চাবি
দারুণ নিহিত চোখ, পর্ব ভাঙা হাসি
নিমিত্তের নৌকায় পার হয়ে আসি
হে নতুন দিব্য জ্বর, অকথিত ভাষা
চর্যাপদ থেকে এই সান্ধ্যলোকে আসা
তারপর শিকড়ে শিকড়ে রস গল্পে কাঙাল
তীব্র লোনা ঢেউ থেকে সমুদ্র কল্লোল
ভিজে যায় শ্রদ্ধা ম্যাডাম, একসা হৃৎপিণ্ড
এ বর্ষায় করুণা নাবি, রুদ্ধ জড়পিণ্ড
কে বোঝে আলোক সাম্য, অলকের দীপ্তি
নির্ভেদ জাগাক দণ্ড, ভাঙুক সুসুপ্তি…

দুঃখ মোচন

ভালোবাসার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি
বয়সের তীরভূমি ভেঙে পড়েছে প্রবল প্রবাহে
তাড়িত আকাশ থেকে বিদ্যুৎ ঝলকানি

কখনও প্রসন্ন এসে দরজায় দাঁড়ায়নি
মেঘলা দুপুরে বিষণ্ণ বর্ষা ফুঁফিয়ে কেঁদে গেছে
কাদামাখা রাস্তায় কোনও কুশল আসেনি
আজ ফুটো হয়ে যাওয়া হৃদয় সেলাই করে
শারদীয়া কুড়োতে এসেছি পৃথিবীতে

শিশির ধোয়া একটি জবার কাছে
বলতে এসেছি আমার আমি কেমন আছে

দুর্গারা সব পুজো পেয়ে ফিরে যাক বাড়ি
আমিই শুধু নির্বাসনে দুঃখ মোচন করি

উপস্থিতি

তোমার ডাকে আর উচ্ছ্বাস নেই
তোমার দৃষ্টিতে আর আকুতি নেই
তুমি সমস্ত মেঘ পাঠিয়ে দিয়েছ কোথায়
আমার জন্য ধুধু আকাশ, বারুদ মেশানো পাহাড়

কোথায় দাঁড়াব? নিদাঘের পোড়া রুটি
নিরন্ন বাতাসে বুলবুলি নেমেছে রাস্তায়
এক চিলতে ছায়া নেই, বিক্রি হয়ে গেছে
সব স্নেহের গাছতলা

মরুভূমি চেটে চেটে তবুও এসেছি এখানে
উটের সারি গুনে গুনে রাস্তা পেরিয়েছি
কত দীর্ঘ পথ, মৃত্যুর করাতে চিরে গেছে
যুদ্ধ করে বারবার বিশ্রাম চেয়েছি

এখন তোমার সম্মুখে এই উপস্থিতি
বলো, কী আদেশ বাকি আছে আর
এতদিন যা পালন করিনি?

তৈমুর খান
তৈমুর খান
তৈমুর খান জন্ম ২৮ জানুয়ারি ১৯৬৭, বীরভূম জেলার রামপুরহাট ব্লকের পানিসাইল গ্রামে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে পি এইচ ডি প্রাপ্তি। পেশায় উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহ শিক্ষক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: কোথায় পা রাখি (১৯৯৪), বৃষ্টিতরু (১৯৯৯), খা শূন্য আমাকে খা (২০০৩), আয়নার ভেতর তু যন্ত্রণা (২০০৪), বিষাদের লেখা কবিতা (২০০৪), একটা সাপ আর কুয়াশার সংলাপ (২০০৭), জ্বরের তাঁবুর নীচে বসন্তের ডাকঘর (২০০৮), প্রত্নচরিত (২০১১), নির্বাচিত কবিতা (২০১৬), জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা (২০১৭) ইত্যাদি। কবিরুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার ও দৌড় সাহিত্য সম্মান, নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার, আলোক সরকার স্মারক পুরস্কার সহ অনেক পুরুস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

শম্পা ঘোষের ছয়টি কবিতা

প্রেম ভাসান নিষ্কলঙ্ক জৌলসে প্লাবিত হয় আবেগ,উপেক্ষিত ভাবনারা আজ ছন্নছাড়া...

তৈমুর খানের ছ’টি কবিতা

একটি মৃত্যু শুধু কাজল পরোনিওই চোখে মেঘলা বিশ্বাস আমি আত্মহত্যাকারীসব সিঁড়ি...

জয়িতা ভট্টাচার্যের নির্বাচিত ছয়টি কবিতা

আবহমান যখনই উল বুনিঘর ভুল হয়ে যায়।দুটো কাঠি বলাবলি করে...

আবু আশরাফী’র ছয়টি নির্বাচিত কবিতা

নিস্তব্ধ সান্তনা মাছে মাছ খাবেতুমি কেন খাবে? আসমানে আছে লক্ষ কোটি...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।