14.1 C
Drøbak
শুক্রবার, মে ২৭, ২০২২
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যকবি আতোয়ার রহমানের হাফ ডজন কবিতা

কবি আতোয়ার রহমানের হাফ ডজন কবিতা

ভালবাসি

বৈশাখের কৈ মাছ যেমন মেঘের ডাক ভালবাসে
আমি তোমাকে তেমনি ভালবাসি
জৈষ্ঠের রোদে পোড়া মাটি যেমন প্রথম বৃষ্টির
ফোঁটাকে ভালবাসে, আমি তোমাকে তেমনি ভালবাসি।
গ্রামের স্কুল মাঠ যেমন দূর্বাদল পছন্দ করে,
শালিক যেমন শিমুলের ডাল পছন্দ করে,
আমি তোমাকে তেমনি পছন্দ করি,
তাইতো বার বার তোমার কাছেই ফিরে আসি,
পাখি যেমন নীড়ে ফিরে সন্ধ্যে হলে।

রাতের জ্যোৎস্না যেমন নদীকে,
নদী যেমন ঢেউকে ভালবাসে
আমিও তোমাকে তেমন ভালবাসি,
আমার বুকেও তেমন প্রেমতৃষ্ণার ঢেউ।
রাতের চাঁদ যেমন ঢেউয়ের হাতে
হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটে,
তোমার হাতদুটোতেও তেমন ভরসার হাত রেখে
হেঁটে হেঁটে যাব ভালোবাসার নিরালা নীড়ের পথে,
ভেসে যাব তোমার ভালবাসার ঝর্ণার জলে
সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকব তোমার শরীরে
আইসক্রিম যেমন লেগে থাকে শিশুদের ঠোঁটে আর গালে।
সূর্য যেমন পৃথিবীকে ভালবাসে,
অক্ষর যেমন কবিতাকে ভালবাসে,
শব্দ যেমন ঝরে বর্ণমালাকোষের থেকে
আমি তোমাকে তেমনি ভালবাসি।
ক্লান্ত প্রাণ যেমন ঘুম ভালবাসে,
আমি তোমাকে তেমনি ভালবাসি।
শিশু যেমন পিতার স্নেহময় হাতকে ভালবাসে
খুব ভোরে মায়ের আদরের চুম্বনকে যেমন ভালবাসে
আমি তোমাকে তেমনি ভালবাসি।
আমি তোমার চোখের দীঘিতে ডুবে মরি,
যেমন বারমুডা ট্রায়াঙ্গুলে জাহাজ ডোবে,
আটলান্টিকের গভীর নীলে টাইটানিক ডোবে।
ভালবাসা চমৎকার, ভালবাসা ভয়ংকর
কাচের মত ভালবাসাও ভাংবেই- তা জেনেও
আমি তোমাকে ভালবাসি।
তুমি আমার কাছ থেকে চুরি হওয়ার আগেই
হাতমোজার মতো তোমাকে সহজে হারানোর আগেই
তোমার ভালবাসার বকুলের মধুর খোশবু নিতে
তোমার সামনে আমার ভালবাসার পেখম মেলে ধরতে
আমি বসে আছি একলা হয়ে উতলা,
এক গুচ্ছ গোলাপের পাপড়িতে মুড়ে আমার ভালবাসার
পয়গাম পাঠাবো তোমায় ও আমার প্রিয়তমা।

কাছে এলেই

সমুদ্রের কাছে এলেই আমি ভুলে যাই
সব দুঃখ পুরনো স্মৃতি
আমার স্মৃতিবেদনাগুলো সীগালের মতো
মেঘের উপর সর্পিল হয়ে হারিয়ে যায়
সাগরের জোয়ার-ভাটার রঙে মিশে একাকার
আমার জীবনের চড়াই-উতরাই
নদীর ধারে গেলে কেমন আমার মনের মধ্যে
জমে থাকা মেঘগুলো ফিকে হয়ে গলে জল হয়ে যায়
পাহাড়ের কাছে এলেই কমতে থাকে রক্তচাপ
মুত্রে চিনি আর নিদ্রাহীন রাত্রির প্রহর
জঙ্গলে এলেই আমার মানসিক চাপ দূর হয়ে যায়,
মেজাজ ভালো হয়ে যায়, নিজে পুনরিজ্জীবিত হই
প্রিয়তমা, তোমার কাছে এলেই আমি সুস্থ্ হয়ে যাই,
জীবনের মুল্য বুঝতে শিখি।

নীরবতা

নীরবতা মানে বিড়ালের পায়ের শব্দ
পালিশ করা টালির মেঝের উপরে
নীরবতা মানে ব্যস্ত সড়কের শব্দ
বরফে ঢাকা পড়ার পরে।
নীরবতা মানে গাছের মধ্যে
মৃদুমন্দ পশ্চিমা বায়ুর প্রবাহ।
নীরবতা হল পার্কের নিঃসঙ্গ চেয়ারে
পাশাপাশি বসা বৃদ্ধ দম্পতির শব্দ।

নীরবতা হল চাপাতির আক্রমণের
ভয়ে লেখকের বিষণ্ণ মুখ
নীরবতা হল গুনী শিক্ষকের ক্লাশরুম
নীরবতা হল রাতের মৃত গ্রাম
নীরবতা হল নদীর বাঁকে নির্জন শ্মসান।
নীরবতা হল শান্ত সমুদ্রের ঢেউ,
গভীর বিশ্রামে যাওয়া একটি শিশু,
পাহাড়ি ঝর্ণার গোপন ক্রন্দন।

নীরবতা হল সেই শব্দ যা আমি শুনতে পাই
যখন থেকে তুমি আমার জীবন থেকে
ফুল হয়ে ঝ’রে গেলে।

ইলিশ

ভালোবেসে উদ্বাস্তের জীবন
খুঁটা ও বেহুন্দি জালের চোরাগোপ্তা
ফাঁদের ইশারা ভেদ করে
সাগরসুন্দরী ডিম পাড়তে আসে ঝাকে ঝাকে
জপমালারমতো ছড়িয়ে থাকা নদীর দেশে,
ভরা পদ্মা মেঘনায় সুখের সমুদ্রে সাঁতরায়
জলের গুণেই চকচকে রুপালি গায়ে
তার সবুজের আভা, চোখ লাল
রজতকান্তি মৎস্যরাজ রূপে ও গুণে মন ভোলায়।
স্বাদ ও সৌন্দর্যের অপূর্ব মেলবন্ধন
চাঁদও কখনো কখনো ফিকে হয়ে যায়
ইলিশের ঝলমল সৌন্দর্যের কাছে।
ঘুরে বেড়ায় বংশ বিস্তারের আশায়, কিন্তু হায়
আশ্চর্যজনক দানব তার পিছু নেয়
ভোজন বিলাসী জিভ ভিজে উঠে এক টুকরো নোনা স্বাদে।

খুঁজেছি আমি

তোমাকে খুঁজেছি আমি বাউলের ছোট্ট খড়ের ঘরে
যেখানে উঠোনে বসে আছে মোহ মায়া ত্যাগী হাতে হাত ধরে
তোমাকে খুঁজেছি যমুনার ধারে পৌষ মেলার পথে
হাটে বাজারে গঞ্জে শহরে নগরে হাজার বছর ধরে
একাই খুঁজেছি পায়ে হেঁটে পৃথিবীর শেষ নদীর কিনারে
খুঁজেছি তোমায় পৃথিবীর শেষ রাস্তার ধারে
খুঁজেছি আমাজনের গহীনে প্রাচীন গাছের অন্ধকার কোটরে
কারাকোরাম সিচুয়ান রকি পর্বতের দুর্গমতায় খুঁজেছি
ধূসর সাহারা কালাহারি গোবিতে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি
আলাস্কা এন্টার্কটিকার হিমাবহের নীরবতায় খুঁজেছি
সবচেয়ে শক্তিশালী বিনোকুলার দিয়ে,
লোহিত সাগর কৃষ্ণ সাগর মরা সাগরের তলদেশে
খুঁজেছি তোমাকে ডুবসাঁতার দিয়ে
কোথাও তোমাকে পাইনি আমি

তোমাকে পেলাম অবশেষে আঁকাবাঁকা ছোট্ট নদীর পাশে
‘মোনালিসার’-মতো রহস্যময় হাসি হেসে মৃদুমন্দ বাতাসে
শিহরিত হয়ে ওঠা ঢেউ খেলানো ধানের ক্ষেতে,
গ্রীস্মের দাবদাহ, বর্ষার অবিরাম ধারাপতন আর শরতের
সোনার আলোয় ঝলমল করে ওঠা ধরাতলে,
যেখানে দুই তীরে কাশফুলের শ্বেতশুভ্র হাসিতে
চঞ্চলা স্রোতস্বিনী থমকে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে,
আকাশের গাড় নীল আর ক্ষেতের সবুজ মেখে
বাতাস হয় দিকভোলা।

সারি সারি সুপারির বন মাথা দোলায়
শীতের শিশিরে ভিজে যায় কচি ঘাসের ডগা মাটি
মাথার সিঁথির মতো সরু রাস্তা নেমে যায় সবুজ মাঠের ভেতরে…
পথের ধুলোয় মিশে থাকে জীবনের গান
মুক্ত ষড়ঋতুর এ বাংলাদেশে।

বিষণ্ণ গাছ

শিকারি ম্যামথের কাঁধে কুঠারের আস্ফালন
দেখেই ভয়ে আমি থর থর
চেরাইকলের করাতে বুক চেরার যন্ত্রণায়
শোকে তাপে আমি জরজর
আতঙ্কে কুন্ডলী পাকিয়ে বসে থাকি নিজের ভেতর।
কর্পোরেট লোভে আর উন্নয়নের কোপে
একে একে গেছে আমার পাতা শুকনো ডাল শিকড়
উন্নয়ন-সন্ত্রাসীর লেলিহান ক্ষুধার আগুনে
পুড়ে ছাই হয়েছে মাটি, পাহাড় জঙ্গল নদী
রোদবৃষ্টি ঋতুচক্র বাতাসের সবুজ ঝর্নার কলধ্বনি
সভ্যতার আঁচতাপের আগুনে পুড়েছে আমার কপাল
কালো মেঘ তরুছায়া পাখির বাসা শিশিরের সকাল
ফুলের বাগান ফল মধু আর পশুর মাংস
করেছে আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত ধ্বংস।
চেয়ে থাকি চেরাইকলের দিকে যাওয়া গাছ বোঝাই ট্রাকে
আমার শরীর শতচ্ছিদ্র বিজ্ঞাপন এর পেরেকে
সাইনবোর্ড ব্যানারে ঢেকে দিয়েছো আমার মুখ
ভেবে পাই না এতে তোমাদের কিসের এতো সুখ?
ভেবে পাই না কী আমার অপরাধ?
লোভী দৈত্যের ক্রুরতা নৃশংসতায় আমি নির্বাক
আমি আর শ্বাস নিতে পারি না
আমার দরকার জরুরী অস্ত্রোপচার।

সৃষ্টির সুরক্ষার অর্পিত কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে
আমাদের জন্য পৃথিবী ছেড়ে দিতে হবে
আমাদেরকে এ পৃথিবীর দখল নিতে হবে
তখন তোমাদের বংশের বাতি জ্বলানোর কেউ থাকবে না।

আতোয়ার রহমান
আতোয়ার রহমান
কবি ও গল্পকার। জন্ম ১৫ জুলাই, রংপুরে। বর্তমানে বসবাস করছেন কানাডার টরন্টো শহরে। ১৯৯১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। সাংবাদিকতা ও পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। ছোটগল্প ও কবিতা লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে। গল্পগ্রন্থ “যাপিত জীবন” বিভাস থেকে বেরিয়েছিল ২০১৫ সালে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।