মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২

‘আমি তো মোহন কাওরা’ তৃতীয় পর্ব

প্রকাশিত:

তৃতীয় পর্ব

পাইকপল্লীর সবচেয়ে বড় পরিবার,এই সনাতন পাইকের। মোহনের আর ছটা বউদি, তারাও ভালমন্দ হলে ছোট দেওরকে একটু একটু দেয়, সবাইকে দেওয়া সম্ভব হয় না। লোকজন অনেক,সকলের আলাদা‌‌ সংসার, কিছু দেওয়ার থাকলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেয়। খুব ছোট যারা তারা সকলের কোলে পিঠে আদরে-অনাদরে বড় হয়ে যায়। শশধরের যমজ ছেলেমেয়ে। ওরা বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ছোট। নীলুর ছেলেটা তো বেশ ফুটফুটে হয়েছিল। জলে ডুবে মারা গেল। খুঁজে খুঁজে যখন পুকুর থেকে তুলেছিল,কেমন সাদা হয়ে গিয়েছিল।‌ বাড়ির সবাই খুব কেঁদেছিল। এই কান্না দেখে বোঝা গিয়েছিল, অভাবের মধ্যে থেকেও এরা একে অপরের সঙ্গে বেঁধে বেঁধে আছে। এত বড় পরিবার,এত অভাব,কে কার পাশে দাঁড়াবে। আর কি দিয়েই বা দাঁড়াবে। টেনেটুনে যে যার মতো চলবার চেষ্টা করে। বাঁচবার চেষ্টা করে। টিকে থাকবার চেষ্টা করে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান নিয়েই গোটা পাইক পাড়া জেরবার, তাজপুর দিশেহারা। লেখাপড়ার চাহিদা এদের নেই। না হলে শোকে পড়ে যাবে, গ্লানিতে ভরে যাবে, সেরকম কোনও ব্যাপার এদের নেই। কিন্তু সচেতন মানুষ এ পাড়ার দিকে এলে বুঝতে পারবে কতকিছু না পেয়েও এদের জীবন অনর্গল নদীর মতো বয়ে চলেছে। এরা আসলে বঞ্চিত, স্বাধীন ভারতবর্ষের মানুষ হলেও স্বাধীনতার পতাকা এদের ঘরে পৌঁছায়নি। মান-মর্যাদা পৌঁছাবে কোন্ পথে,কোন্ দিক দিয়ে,সে প্রশ্ন তোলার মতো মানুষ এই পল্লীতে এখনও নেই। শুধু মোহনের বুকে একটু একটু করে জেগে ওঠে। সে বুঝতে পারে,তার ঘরের সমাজ আর তার বাইরের সমাজ এক্কেবারে আলাদা। সে ভয় পেয়েও যায়, মাঝেমধ্যে। কেননা, সে বুঝতে পারে, খুব কঠিন যুদ্ধ। জয়ের চেয়ে পরাজয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবু লড়াই করার জন্যে সে চোয়াল শক্ত করে থাকে। নিজের জন্যে লড়াই। পাইকদের জন্যে লড়াই। গোটা গ্রামের জন্যে লড়াই। লড়াইয়ের ময়দানে কেউ নেই। মাধব দা ,নবীন দা আর বন্ধু গৌতম তার সবচেয়ে কাছের। গোপালটাও তার হাতের পাঁচ। সবসময় পাশে থাকে। গোপালের বাবা নেই। বিধবা মা, পাশের গ্রামে ঘরদোর মোছার কাজ করে। ওর দুতিনটে ভাই। অনেকগুলো পেট।ওরা হাঁস- মুরগি পোষে। ডিম বিক্রি করে সংসার চালায়। রেশনের চাল দুতিন দিনে শেষ হয়ে যায়। কেউ কেউ একটু বেশি মাল পায়। অবস্থা একই হলেও সকলের রেশন কার্ড,এক নয়। যাদের দামি রেশন কার্ড আছে,তারা অনেক মাল পায়। প্রায় গোটা মাস তাদের চলে যায়। কিন্তু সেরকম কার্ড তো পাড়ার সকলের নেই। যাদের আছে,তাদের বুক আঁটা থাকে। দু-চার কিলো আলু,কাঠখোলায় ভাজা লঙ্কা হলে তাদের চলে যায়। ভুবন ভ্যান নিয়ে সকাল হলেই বেরিয়ে যায়, যেকটা পয়সা আয় করে সব নেশা করে উড়িয়ে দেয়। গজেন,বেচু, পোসেন ওদের তো লোকের গাছে ডাব-নারকেল চুরি করে কেটে যায়। গ্রামের শেষপ্রান্তে শ্মশান আছে, সেখানে দুবেলা গাঁজা পিটছে। তেরো-চোদ্দ বছরের ছেলেরাও ওইসব করে বেড়াচ্ছে। আগানে-বাগানে চোখ লাল করে বসে আছে। দিনরাত অশান্তি,ঘরে ভাত না থাকলেও অশান্তি থাকবেই। একমুঠো চাল আনতে না পারুক,নেশা করে পাড়াতে অনেকে আগুন লাগিয়ে দিতে চায়। থামানো যায় না। মারপিট, গালিগালাজ ,খিস্তি-খেউরের পৌষমাস এই পাইকপাড়া। তার ভেতর থেকে মোহনের স্বপ্ন দেখা। সে নেশা করতে পারে না। খিস্তি দিতে পারে না। রাজুদের মতো জুয়া খেলতে পারে না। অন্ধকারে বসে সে স্বপ্ন দেখে। কবিতা লেখার চেষ্টা করে। হাসিঠাট্টা অনেকেই করেছে। অনেকে বাহবা দিয়েছে। সেসব কিছুই মানিয়ে নিয়েছে।
নতুন দিনের জন্যে অপেক্ষা করেছে।
রতনের বউটা গায়ে আগুন লাগিয়ে পুড়ে মরল। মোহনের দূর সম্পর্কের দাদা। পুলিশ এসে রতনকে ধরে নিয়ে গেছে। তিনমাস হয়ে গেল। রতনের আলোচনা তিন মাসে অনেক কমে গেছে। কাঠের ঘাটে বাসন মাজতে এলে ওর মা ছেলেটার জন্যে কাঁদে। ওদের উকিল ধরার ক্ষমতা নেই। মেয়ের বাবা শেষ দেখে তবে ছাড়বে বলেছে। পয়সার জোর তেমন নেই। কিন্তু আইন তো মেয়েদের দিকে বেশি ঝুঁকে। তাই রতনের ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা কম। দুপুরবেলা দল বেঁধে পাড়ার মেয়েরা কাজে থেকে খেতে আসে। ফতেপুরে পেনের কাজে যায়।সুবলের মা- মেয়ে দুজনে কাজে যায়। সুবল কোলকাতায় রিক্সা চালায়। দুপুর দুপুর এসে একমুঠো বসিয়ে দেয়, তাড়াহুড়ো করে খেয়ে আবার দৌড় দেয়। অনেকে পান্তা নিয়ে কাজে যায়। দুপুরবেলা হেঁটে এসে খেয়ে যেতে তাদের ইচ্ছে হয় না। পান্তা খেয়ে কাটায়। রাতে একমুঠো গরম ভাত খায়,যা হোক দিয়ে। বেশি করে ভাত করে। সকালে জল ঢেলে ওই ভাত নিয়ে যায়। আধখানা পেঁয়াজ হলে ভাল লাগে। না থাকলে নুন দিয়ে খেয়ে নেয়। খিদের সময় ওই অমৃত মনে হয়।
নতুন কাপড় পরা বউ এপাড়ায় চোখে তেমন পড়ে না। একটা দুটো কাপড়,দুবেলা কতকাজ। পরিষ্কার রাখা মুস্কিল। অল্পদিনের মধ্যেই কাপড়গুলো কেমন হয়ে যায়। এপাড়ার নতুন বউ এলেও নতুন কাপড়ের মতো অল্প দিনে ম্যাড় ম্যাড়ে হয়ে যায়। বউ হয়ে আসার আনন্দটাও তাদের কোথায় যেন হারিয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে, কঠিন জোয়াল চেপে গেছে, বেরিয়ে যাবার রাস্তা নেই। যাদের আকাঙ্ক্ষা বেশি, সংসার তাদের হয় না। সংসার তাদের ধরে রাখতে চাইলেও তারা সংসার ছেড়ে চলে যায়। প্রথম প্রথম খুব বলাবলি হয়, তারপর তেল শূন্য প্রদীপের মতো ঝিমিয়ে যায়। পাইকপল্লীর এইসব পরিচিত গল্পের বাইরে দাঁড়িয়ে মোহন নতুন কোনও গল্পের পাখি হয়ে উঠতে চায়।‌ বাবার কাছে সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল খুব ভাল করবে। স্কুলের ফিজিক্সের স্যার তাকে নিয়ে খুব চিন্তা করে।
তিনি বলেন, ‘ওইভাবে চললে ফলাফল ভাল হবে না,মোহন। আমি অনেক দেখেছি। পড়াশুনা অনিয়মিত হলে হয় না। তোমার ইচ্ছা শক্তি আছে। স্বপ্ন আছে। কিন্তু তা পূরণ করতে যে শৃঙ্খলা দরকার তা তোমার মধ্যে দেখছি না।
তুমি বড়ো অন্যমনস্ক। ভাল বাংলা জানলে ভাল প্রবন্ধ লিখতে পারবে। বিষয়বস্তু জানা থাকলে। প্রবন্ধ বাঁধার কৌশল জানা থাকলে। কিন্তু ফিজিক্স,বায়োলজি, কেমিস্ট্রি এসব তো অনুশীলন করতে হয়। নিয়মিত চর্চা না করলে ফেল করে যাবে।’
মোহনের মনটা খারাপ হয়ে গেলেও স্যারের কথায় উত্তর দেয় না। বরং সে বুঝতে পারে তার চলবার মধ্যে অনেক ভুল থেকে যাচ্ছে। অনর্গল স্কুল কামাই হচ্ছে। বিনা বেতনে পড়ালেও গাড়ি ভাড়া থাকে না। ফটোকপি করার পয়সা থাকে না। পড়া কামাই হয়ে যায়। পড়া কামাই করে ঘরে বসে সে স্বপ্ন দেখে। তার স্বপ্ন অপরাধ বোধ আর দ্বিধায় দুর্বল হয়ে যায়। তারপরেও সে খোঁড়া শালিকের মতো লেংচে লেংচে দৌড়তে চায়, স্বপ্নকে ধরতে চায়।

মোহনের জন্ম হয়েছিল, খুব শুভ মুহূর্তে। সেদিন সরস্বতী পূজা,শ্রীপঞ্চমী তিথি। স্নান সেরে ঠাকুরের পায়ে সবে একটা জবা ফুল দিয়েছে। শরীরটা সনাতনের বউয়ের কেমন কেমন হচ্ছিল। এর আগে সাত সাত বার সে মা হয়েছে, যথেষ্ট অভিজ্ঞ। বড় বউ লক্ষ্মীকে ডেকে বলল, ধাই মাকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয়। লক্ষ্মী তখন সবে এবাড়ির বউ হয়ে এসেছে, ধাই মা কোন্ বাড়িতে থাকে,জানত না। পথে বের হতেই গোপালের মা এদিকে আসছিল, ভূষণকে ডাকতে। গাছে থেকে কটা নারকেল পেরে দিতে হবে। লক্ষ্মীর মুখে শুনেই সে দৌড়ে গিয়ে ধাই মাকে ডেকে আনল।এই হলো মোহনের জন্মদিন। ১৯৮২ সাল, কনকনে শীতের দিনে মোহনের জন্ম। পূজার পরিবেশে। পাইকপাড়ার কোথাও সরস্বতী পূজা হয় না। গ্রামের স্কুলের পূজা সবাই দেখে। ছোটদের সঙ্গে অনেক বড়োরাও খিচুড়ি খায়। সারাবেলা স্কুলে থাকে। হাতে হাতে সহযোগিতা করে। মোহনের বড়ো বউদি বলে, ‘মোহন হবার দিনে স্কুলে থেকে আনা খিচুড়ি তার শাশুড়ি পেট ভরে খেয়েছিল। সেজন্যেই সে লেখাপড়ায় ভালো। অমন মনোযোগী।’

মোহন আনমনা ছেলে। বড্ড মিশুকে। ছোটবেলা থেকে সে অনেক কষ্ট হজম করেছে। শুধু ঘরভর্তি তার মায়ের স্মৃতিগুলো সে হজম করতে পারেনি। কতদিন বড়দের মতো সেও না খেয়ে থেকেছে। খিদে নিয়ে অপেক্ষা করেছে,কখন যা হোক,মুখে দেবে। কোনও কোনও দিন একমুঠো ভাতে গামলা ভর্তি ফ্যান খেয়েছে। অল্প চালে বেশি জল দিলে হাঁড়ি ভর্তি ফ্যান হয়ে যায়,সেই ভাত আর শাক ভাজা খেয়েছে। গোটা ডিম কোনোদিন সে ভয় ভাগে পায়নি। সবার মতো তাকেও একটা ডিম কখনও দুভাগ, কখনও চার ভাগ করেও খেতে হয়েছে। না খেয়ে থাকার অভ্যাসও তার আছে। শুধু সনাতন পাইকের বাড়ি কেন, আষাঢ় শ্রাবণ মাসের পর থেকে এ পাড়ার অনেকের ঘরে চাল থাকে না। ভাত থাকে না। মোহনের খুড়তুতো কাকা সুধন্য একবার চাল আনতে গিয়ে বিকেল গড়িয়ে গেল, এলো না। ওর বউ হাঁড়িতে জল বসিয়ে সারাবেলা অপেক্ষা করছে। জল ফুটে ফুটে হাঁড়িতে শুকিয়ে গেছে,সুধন্য আর আসেনি। বাচ্চা দুটো খিদে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু সুধন্য কেন, পাইকপাড়ার বুকের ভেতর যারা কান পেতেছে,তারা নিশ্চয়ই এদের দুর্দশা ও অভাবের কথা জানতে পেরেছে। শুধু ঝ্যাঁতলাতে শুয়ে শুয়ে কত জীবন ফতুর হয়ে গেছে। একটা তক্তোপোষ জোটেনি। এসব নিয়ে এদের কোনও অভিযোগ নেই। এরা জানেও না, কিভাবে এই কঠিন জীবন থেকে এরা মুক্ত হবে। হাতের কাছে মেন রোডে উঠলে বামদিকে দোস্তিপুর বাজার, ডানদিকে ফতেপুর বাজার। হাঁটাপথে কুঁড়ি-পঁচিশ মিনিট লাগে। এই বাজারে তারাও যাতায়াত করে। মানুষের শৌখিন ও গুছিয়ে চলা জীবন যাপন দেখে। তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে, কিন্তু নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে এদের কোনও মাথা ব্যথা নেই। কারও প্রতি দোষারোপ নেই। গোটা পাইকপাড়া মুখ বুজে সহ্য করে আসছে, বহুকাল থেকে। মোহন তাদের মধ্যে থেকেও একটু নতুন ভাবে বাঁচবার স্বপ্ন দেখে। কোথাও যাবার থাকলে সে যেন পিছিয়ে যায়, ভদ্রসমাজে যাবার মতো জামা-কাপড় তার নেই। কত বড় হবার পর তবে একটা জুতো কিনে দিয়েছে, সনাতন। এখন তার একটাই জুতো, স্কুলে অন্য ছেলেরা বুট পরে যায়, সে তাকিয়ে থাকে। কাউকে বুঝতে দেয় না। ভাল জামা-কাপড় পরার ইচ্ছে তারও হয়। কিন্তু বাবার ওই অবস্থা, দাদাদের সংসারে সবসময় টানাটানি। তার এই ইচ্ছেগুলো তার নিজের কাছেই বিলাসিতা মনে হয়। নতুন কোনও বন্ধুবান্ধব হলে নিজের বাড়ির কথা সে সব বলে, কোনও কিছুই আড়াল করে না। অনেকে সহানুভূতি দেখায়, তার ভাল লাগে। আবার, মাঝে মাঝে অন্যের দেখানো সহানুভূতি তাকে বিব্রত করে।‌ নিজের অবস্থার কথা কাউকে বলতে যেন দ্বিধাবোধ করে। একে একে সে বুঝেছে, সহানুভূতি আর ভালবাসা এক জিনিস নয়। দয়া কুড়িয়ে বেড়ানো,আর মর্যাদা আদায় করে নেওয়া আলাদা বিষয়।

মোহন তখন দুধের বাচ্চা। বছর সাতেক বয়স,ওর মা চলে গেল। বাসা ভর্তি পাখি ছানা রেখে পাখি মা যদি চলে যায়,ছানাদের যেমন হয়, মোহনের তেমন হয়েছিল। বড়‌ বউদি হয়তো কিছু বুঝতে দেয়নি। আগলে রেখেছিল। কিন্তু বউদির ভালবাসাটুকুর সঙ্গে আরও কতটুকু ভালবাসা যোগ হলে মায়ের ভালবাসার সমান হবে, একটি সাত বছরের শিশুর তেমন গাণিতিক হিসেব জানা ছিল না। শূন্যতা মাপা না গেলেও ‌মাতৃ অদর্শন কতখানি বেদনার, সেটা মোহনের মতো আর কজন বুঝেছে, কে জানে! মোহনের মাঝেমাঝে মাকে খুব প্রণাম করতে ইচ্ছে হয়। বিশেষ করে জন্মদিনে। বাবাকে , বড়দাকে সবসময় প্রণাম করে। জন্মদিনে মেজ দাকেও সে বাদ দেয় না। মায়ের কথা খুব মনে হয়,জন্মদিন এলে। মা বেঁচে থাকলে একটা প্রণাম তো করতে পারত। তার জন্মদিনে এমনিতে কিছু হয় না। স্কুলে গিয়ে সরস্বতী পূজার খিচুড়ি খাওয়া হয়। সবাইকে বলতে ইচ্ছে করে, আজ তার জন্মদিন। অনেকেই বলে, তুই তো খুব ভাল দিনে জন্মেছিস মোহন। তুই তো ভাল কবিতা লিখিস। খবরের কাগজ দেখে পত্রপত্রিকায় কবিতা পাঠিয়ে দে।‌দেখবি, ছাপবে। তুই একদিন নামকরা কবি হয়ে যাবি। এসব শুনে মোহন খুব পুলকিত হয়। মনে জোর পায়, মাঝেমাঝে মনটা রাজহাঁসের মতো কোথায় না কোথায় তার ভেসে যায়। সে তার বাস্তব জীবনের কথা ভুলে যায়। ভাবনার মধ্যে সে যা করে তাতেই সফল হয়। স্বীকৃতি পায়। এইভাবে জীবনের নিষ্ঠুরতা ভুলে থাকবার অভ্যাস সে করতে চায়। কিন্তু সবসময় সেটা পারে না,তখন নিজেকে খুব অগোছালো মনে করে। একটা অস্থিরতা তাকে ঝড়ের দিকে ঠেলে দেয়। সে অজস্র প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
ক্লাশ ফোরে পড়ার সময় স্কুলের মাস্টারমশাই তাদের পড়িয়েছিলেন,কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘বাংলাদেশ’ কবিতা। মোহনের বন্ধুদের মনে আছে কিনা বলা যায় না। কিন্তু মোহনের পুরোটাই মনে আছে। বলা যায়, তার মনে ছবির মতো আঁকা আছে।সেই কবিতার ভেতরে দুটো লাইন তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়িয়েছিলেন।তিনি বলেছিলেন, কবিতার মূল বক্তব্য ও বিষয় ভাবনা। মাতৃহারা মোহন সেদিনই বুঝেছিল, বাবা-মায়ের চরণের ছাপ ঘরের উঠোনে, দাওয়াতে চারপাশে ছড়িয়ে থাকে। তাদের অনুপস্থিতিতে মাটিতে হাত দিলেই তাদের পায়ে হাত দেওয়া হয়ে যায়। তাদের প্রণাম পাওয়া যায়। আশীর্বাদ চেয়ে নেওয়া যায়। সেই থেকে আজও সে মাকে এইভাবে প্রণাম করে আসছে।

সনাতনের মেজো বউমা অষ্টমী, পাটের দুর্বল বস্তাগুলো কেটে ধান দেওয়ার অনেকগুলো চাটি বানিয়েছে।এগুলো কতরকম কাজে লাগে। আজ সে উঠোনে ধান শুকোতে দিয়েছে। ধানের একপাশে ধারের দিকে বৃন্দাবন আর শম্ভুনাথ ঢাক দুটো রোদে দিয়েছে। ক’দিন বাদেই বড়পূজা। ঢাকের দড়িতে টান দিয়ে রাখতে হবে। ওদের ভাবনা, বেশকিছু চুপড়ি-ঝোড়াও বুনে নিতে হবে।শাকসবজির আমদানি শীতের আগে থেকে বেড়ে যায়। ধান চাল করার জন্যে ঝোড়ার ভেতরে একটু জামা-কাপড় ছেঁড়া, পলিথিন বা বস্তা ছেঁড়া দিয়ে কাজ চালিয়ে দেওয়া যায়। বেতের খোড়া এখন অনেক দামি। ওসব বাদ দিয়ে ঝোড়ার বাজার চড়েছে। বিক্রি বাটা ঠিক মতো করতে পারলে ছেলেপুলেরা নতুন জামা কাপড় পাবে। সবার না হলেও ছোটদের তো হবে। ঘরের দাওয়ায় শুধু মুরগি ছানা টিকটিক করে না। বাচ্চারাও থই থই করে। কাদামাটি মাখা হলেও শালুকের মতো সুন্দর। আট ভাইয়ের সাত ভাই বিবাহিত। সবমিলিয়ে এগারো বারোটা
নাতি -নাতনি সনাতনের। শম্ভুনাথ কাটারি নিয়ে জোরে জোরে হাত চালায়,কেটে আনা বাঁশের গায়ে।‌ আশ্বিনের চকচকে রোদে‌ সনাতন আগের চেয়ে অনেক সুস্থ হয়ে উঠেছে। বেশি বকবক করার শক্তি তার শরীরে না থাকলেও নাতি নাতনিদের অনেক ধরণের গল্প বলে সে বসিয়ে রাখবার ক্ষমতা রাখে।‌ মোহনের ওপরের ভাই নীলু খালে ঘুনি-আটল বসিয়েছিল। অনেকগুলো চিংড়ি পড়েছে। কটা মাছও পড়েছে। বোগো, চাঁদা, বেলে কতরকম সব মাছ। মাধবদের বাড়ির দিকে সনাতন তো প্রথা যায়। দাওয়ায় গিয়ে পা মুড়ে বসে থাকে। দুনিয়ার গল্প করে। আজ ফেরার সময় হাতে করে একটা কুমড়ো এনেছে। মাধবের বউ দিয়েছে।
সনাতন বলল, বড় বউমা নীলু তো চিংড়ি ধরেচে। চাল থেকে একটু পুঁই শাক কাটো দিগিনি। কুমড়ো-পুঁইয়ের চচ্চরি একটু খাব,ভাত দিয়ে। এই নীলু বড় বউমাকে দুটো চিংড়ি দে তো।
নীলু তো আগেই শুনতে পেয়েছে,তার বাবার কথা। সে ঘুনি-আটল ঝেড়ে বাটিতে করে অনেকগুলো চিংড়ি দিয়ে গেল, সনাতনের পায়ের ধারে। বড় বউদিকে হেঁকে বলল, বড়্ বউদি চিংড়ি দিলুম গো।কেটে নও।
সনাতন বলল, নীলু তক্তার তোলায় থেকে তেঁতুল নে যা, খানিকটা
চাঁদা মাছের টক কর দিগিনি। একটু দিস। মুকটা ভাল হবে। তেঁতুল খুব ভাল জিনিস। আজকাল তো চাঁদা মাছ দেকা যায় না। কোতায় ছিল। অনেকদিন পর ওদের মুক দেখলুম।
সনাতন এইভাবে বলে না,খাওয়ার কথা। খাওয়া তো একদম কমে গেছে।
ঠিক মতো আদর-যত্ন পায় না। ওর পরনের লুঙ্গিটা একদম ময়লা ধরা। কি রঙের লুঙ্গি বোঝায় উপায় নেই। শরীর ভেঙে গেছে, একেবারে। আগের চেয়ে একটু ভাল আছে। শুয়ে বসে থাকে।‌ মাঝে মাঝে একটু বের হয়। সকালবেলা ফাঁকের দিকে যেতে হয়, ফেরার পথে দাঁতন ঘষতে ঘষতে মাধবের বাড়ি ঢুকে পড়ে। শঙ্কর পাইকের বাড়িতেও ঢোকে। আর কোথাও যায় না। যুগলকিশোর বাবাকে এখনও দেবতার চোখে দেখে সংসারে সে এই একটা মানুষের কাছে কখনও টুঁ করে না। বিনাপ্রশ্নে বাবার সব কথা শোনে। শশধর একবার বাবার সঙ্গে তর্ক করেছিল। যুগলকিশোর ঠান্ডা মাথার লোক। সনাতনের দেখতে দেখতে সত্তর বাহাত্তর বছর হয়ে গেল। যুগলকিশোরের প্রায় পঞ্চাশ হবে‌। চারটে চড়ে তর্ক ঘুচিয়ে দিয়েছিল। মারের ঠেলায় শশধর দৌড়ে পালিয়েছিল,মাঠের দিকে। ভূযণকেও সে ছেড়ে কথা বলে না। বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে। মনে করলে এখনও ভাইদের শাসন করবার সামর্থ্য রাখে। মোহনের কখনও সে বকাঝকা করেনি। বরং সে লেখাপড়া শিখছে বলে তার সামনে সে মেপে কথা বলার চেষ্টা করে। ছোট হলেও তাকে সমীহ করে। মা মরা ছেলে তার প্রতি সকলের মায়া কাজ করে। বেলা দুটোর দিকে বৃন্দাবন ঢাক দুটো দাওয়ায় তুলে নেয়।
একটা একটা করে দুটোতেই টান দেয়। নীলু জলের মগ নিয়ে ভাত খেয়ে উঠে কুলকুচি করছে পথে দিকে,আর বৃন্দাবনের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে।‌ যে যার টুমটুমে ঘরের ভেতরে খায়। দাওয়ার একপাশে উনুন খোলা আছে। ওখানে রান্নাবান্না হয়। আলাদা রান্নাঘর কারও নেই।
শুধু বড় বউ লক্ষ্মীর রান্নাঘর আছে। সেটা দাওয়ার নীচে। বর্ষাকালে পলিথিন চাপা দেওয়া থাকলেও নষ্ট হয়ে যায়। নতুন করে উনুন করতে হয়। গোটা বর্ষাকাল তাকেও দাওয়ায় রান্না করতে হয়েছে। খোড়োকালে উঠোনে উনুন করে নিতে পারলে অনেকটা খোলামেলা লাগে। ধান চাল করতে অসুবিধা হয় না। খেজুর পাতা কেটে একটু চালা মতো না করলে আবার রোদ লাগে। এরা চটপট চালা করে নিতে পারে। নীলু মুখ ধুয়ে বৃন্দাবনের সঙ্গে এসে যোগ দেয়। দুই ভাইয়ে মিলে ঢাকের পিঠে আগমনীর কাঠি দেয়। গোটা পাইকপাড়া বেজে ওঠে। দক্ষিণের মাঠ,পুবের আকাশ পূজার গন্ধে ম ম করে। বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে পুকুরের দিকে একটা মাছরাঙা উড়ে আসে,মনে হয় পার্বণের আনন্দের মতো কোনও এক অজানা আনন্দে সেও বেরিয়ে পড়েছে। উড়ে বেড়াচ্ছে,শরতের পিঠের ওপর। পাইকপাড়ার বুকের ওপর।

চলবে…

আমি তো মোহন কাওরা- দ্বিতীয় পর্ব

অবশেষ দাস
অবশেষ দাস
জন্ম: দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা। বাবা গৌরবরণ দাস এবং মা নমিতা দেবী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দুটোতেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এছাড়া মাসকমিউনিকেশন নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিদ্যানগর কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক। প্রথম লেখা প্রকাশ 'দীপশিখা' পত্রিকার শারদ সংখ্যায়। তাঁর কয়েকটি কবিতার বই: মাটির ঘরের গল্প ( ২০০৪), কিশোরবেলা সোনার খাঁচায় (২০১৪), হাওয়ার নূপুর (২০২০) সহ অজস্র সংকলন ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কবিতা চর্চার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের চর্চা সমানভাবে করে চলেছেন। কবি দুই দশকের বেশি কাল ধরে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সংকলনে। বেশকিছুদিন সম্পাদনা করেছেন ছোটদের 'একতারা' সাহিত্য পত্রিকা। এছাড়া আমন্ত্রণমূলক সম্পাদনা করেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক দুটি অন্যধারার প্রতিষ্ঠান 'বাংলার মুখ' ও মেনকাবালা দেবী স্মৃতি সংস্কৃতি আকাদেমি।' তাঁর গবেষণার বিষয় 'সুন্দরবনের জনজীবন ও বাংলা কথাসাহিত্য।' পাশাপাশি দলিত সমাজ ও সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। ফুলের সৌরভ নয়, জীবনের সৌরভ খুঁজে যাওয়া কবির সারা জীবনের সাধনা। সবুজ গাছপালাকে তিনি সন্তানের মতো ভালবাসেন। সুন্দরবন তাঁর কাছে আরাধ্য দেবী। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার ও সম্মান: সুধারানী রায় স্মৃতি পুরস্কার (২০০৪), বাসুদেব সরকার স্মৃতি পদক (২০০৬), রোটারি লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ১০০ ডায়মণ্ড গণসংবর্ধনা (২০০৮), পাঞ্চজন্য সাহিত্য পুরস্কার (২০১০), শতবার্ষিকী সাহিত্য সম্মাননা (২০১১), এশিয়ান কালচারাল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), ডঃ রাধাকৃষ্ণন সম্মাননা (২০১৫), ডি.পি.এস.সি. সাহিত্য সম্মাননা (২০১৮), আত্মজন সম্মাননা (২০১৯), বিবেকানন্দ পুরস্কার (২০১৯), দীপালিকা সম্মাননা (২০১৯), সংহতি সম্মাননা (২০২০), সুকুমার রায় পুরস্কার (২০২০)।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ১১

হাওয়াই মিঠাই, হাওয়াই মিঠাই আছে।‌ঠং ঠং ঠং ঠং করে...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ১০

"তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ" কবিতাটা খুব কঠিন কবিতা। বুঝলি...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৯

রাত এগারোটা নাগাদ মোহন বাড়ি ফিরছে, ফতেপুর থেকে। সাহিত্য...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৮

মোহনের পরীক্ষা আর দিন সাতেক বাকি। লাস্ট মিনিট সাজেশন...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।