রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৭

প্রকাশিত:

মোহন বাসের জন্যে অপেক্ষা করছে, খোর্দশাসন মোড়ে। রায়চক বাস এখানে দাঁড়ায় না। অটো বা ট্রেকার ধরে সরিষা চলে যাবে। ওখান থেকে বাস ধরে গোবিন্দপুর মোড়। তারপর পায়ে হেঁটে কয়েক মিনিট হাঁটা পথ মাড়ালেই গোবিন্দপুর স্কুল। হঠাৎ রিনার সঙ্গে দেখা। ক্লাশ‌ সেভেন-এইট একসঙ্গে পড়েছিল, দোস্তিপুরের কোচিং সেন্টারে। তখন থেকে রিনার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব। দেরি করে পড়তে গেলে ওর থেকে খাতা চেয়ে লিখে নেওয়া। নিজের অঙ্কের খাতা দেখে ওকে লিখতে দেওয়া। ব্যাঙ এঁকে দেওয়া। সাঁইবাবলা ফল, খেজুর, পুকুরের খোলের জামরুল পেলে ওকে আগে দেওয়া তার বেশ ভাল লাগার বিষয়। নিজে না খেলেও আসা-যাওয়ার পথে টুক করে রিনার ব্যাগে সে দেয়। রিনা তাকে একবার বড়দিনের কেক দিয়েছিল, পাঁচ টাকা দাম। কেক খেয়ে সে অত আনন্দ পায়নি, তার আনন্দ রিনা তাকে কেক দিয়েছে। মোহন তাকে একটা কুকুর ছানা উপহার দিয়েছিল। জন্মদিনে। রিনা কুকুর ছানা খুব ভালবাসে, মোহন জানত। অনেক বাছাবাছি করে একটা কুকুর ছানা সে রিনাকে দিয়েছিল, ওই ছানাটির কপালে জন্ম থেকে টিপ পড়ানো। চোখে কেমন কাজল পরানো। রিনার খুব পছন্দ হয়েছিল।
রিনাদের ঘরবাড়ি ভাল। ওর বাবা চাকরি করে। যতবার ওদের বাড়ির সামনে সে ভয় ভয় করে গিয়েছে, বাড়ির পাঁচিলের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলে এসেছে। কথা বলতে ইতিহাসের সাজেশান, বাংলা রচনা একটি নির্জন দুপুর, বাংলার উৎসব। কখনও সে চেয়ে এনেছে। কখনও সে দিয়ে এসেছে। রিনার আগ্রহ তেমন প্রকাশ না পেলে মোহন প্রয়োজন বানিয়ে তোলে, তাদের দরজায় যায়। গৌতমটা সঙ্গে থাকে। আছিলা বলা যাবে না,কতকটা ওইরকম। রিনা তো ছোট। ডাকতে সাহস পায় না। ইচ্ছে থাকলেও মোহনের যাওয়া হয়নি,ওদের বাড়ি। হাসিখুশি পত্রিকার একটা কপি ওকে দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল, দেওয়া হয়নি। কেমন সে বেখেয়াল হয়ে গিয়েছিল। আজ দেখা হয়ে ভালোই হল। একটা হাসিখুশি দেওয়া যাবে। সবসময় তার বইয়ের ব্যাগে হাসিখুশি রাখা থাকে। গুরুত্ব বুঝে পত্রিকা দিতে হয়। সবাই তো এসব পাওয়ার উপযুক্ত নয়। রিনা সম্পাদক ব্যাপারটা বোঝে কিনা কে জানে! ওর কাছে নিজেকে জাহির করার ইচ্ছে মোহনের নেই। কিন্তু গুরুত্ব পাওয়ার সাধ আছে। ওর কবিতা রিনার ভাল লাগবে, মোহনের বিশ্বাস। আগে যখন সে শুনেছিল, মোহন কবিতা লেখে তখন একটু অবাক হয়েছিল। রহস্যময় হাসি দেখেছিল, রিনার চোখে মুখে। সেই হাসি প্রশংসার নাকি তাচ্ছিল্যের বোঝা যায় নি। তবে মোহনের সেটা তাচ্ছিল্য মনে হয়েছিল। পত্রিকাটা হাতে পেলে সেই তাচ্ছিল্য লেজ গুটিয়ে পালাবে, প্রশংসার দিকে দৌড় দেবে। যদিও সেটা কয়েকবছর হয়ে গেছে। এই কবছরে রিনার সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়েনি, কমেও যায়নি। মুখোমুখি দেখা হলে দু-চারটে বাক্য বিনিময় হয়। একেবারে কেউ কাউকে এড়িয়ে যায় না। রিনার সঙ্গে দেখা হতে ও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। গতরাতের ঘটনা পাড়ায় কানাকানি হয়েছে। পারমিতা হয়তো শুনে থাকবে। সে তো মোহনকে আইকনের আসনে বসিয়েছে।সে যখন শুনবে মোহন অকৃতকার্য হয়েছে, কেমন ভাবে নেবে,এটা ভেবেও শরীরে অস্বস্তি হয়। রিনার বাড়ি দূরে এসব কথা তার কাছে পৌঁছবে না, হাটে বাজারে এলে তবে দেখা হয়। রিনার কথা সে কেমন ভুলে ছিল। কবিতা, চিঠিপত্র, লেখালেখি,একল বিদ্যালয় সবকিছু নিয়ে তার ব্যস্ততা তো কম নয়। বলবার মতো কিছু সে করে না। কিন্তু ভাবলে বোঝা যাবে,সে অনেককিছুই করে। এই কবছরে রিনাদের বাড়ির দিকে সে প্রায় এসেছে। কোনও দরকার ছাড়া। যদি একবার দেখা হয়ে যায়। প্রায় কৈশোর পেরিয়ে যাওয়ার মুখে মোহন বুঝেছে, রিনার প্রতি তার একটা টান আছে। হয়তো একতরফা। কখনও কখনও মনে হয়েছে, রিনাও তাকে খুব পছন্দ করে,ভালবাসে। কিন্তু দূরত্ব মোছে না। গৌতম, গোপাল যতটা কাছের। রিনা ততটা নয়, হয়তো সে গরীব বলে। রিনা গরীব- বড়লোক বিচার করে না হয়তো। আসলে সে তো একটা মেয়ে। আগে আগে ওদের অভাবের সংসারের পাতায় পাতায় যখন জর্জরিত হত, বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগত, মায়ের কথা মনে পড়ত। আর রিনার জন্যে ওর মন কেমন করত। ভাবত, তাদের বাড়ি ওর ভাল বন্ধু কখনও আসবে না। এলেই বা সে বসবে কোথায়। এখন আর রিনার জন্যে বুকের ভেতর কেমন কেমন হয় না। কিন্তু সেই টানটা তার থেকে গেছে। ভেতরে ভেতরে। রিনার হাত থেকে একবার একটা বই নিতে গিয়ে হাতে হাত ঠেকেছিল, কি ভাল তার লেগেছিল। বোঝানো যায় না। অনেকবার সে একবারের ছুঁয়ে যাওয়াকে সে অনুভব করেছিল। তখন ক্লাস নাইন হবে। তারপর কোচিং- এ যাওয়ার দিন ফুরিয়েছে। দুজনের পথ বদলেছে। রিনা দোস্তিপুর হাইস্কুলে পড়ে। সে যায় গোবিন্দপুর। সেইভাবে দেখা হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে ঠিক মনে পড়ে। পাড়ায় নতুন কুকুর ছানা দেখলে মোহনের বুকটা উথলে ওঠে। বন্ধুকে সে কিছু দিতে পারেনি, একটা কুকুর ছানা দিয়েছে,এটা ভাবলে এখন সে লজ্জা পায়। আবার,ভালও লাগে।
রিনাদের বাড়িটা মেনরোডের ধারে। পাটকেলঘাটা লাগোয়া। মোহন তো থাকে সেই নড়বড়ে তাজপুরে। পাইকপল্লীতে। তাদের পাড়ার খবর এলাকার সবাই জানে। ভাত নেই। চালচুলোহীন পাড়া। রিনাদের সঙ্গে তাদের কোনোকিছু মেলে না। তবু রিনার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব করতে সাধ হয়। এখন আগের মতো পাগলামি তার নেই। তবু রিনাকে দেখে সে ছন্দে ফিরতে চায়, বুকের ভেতর নেতিয়ে যাওয়া ভাবটা দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। বাস ধরার ছাউনির ভেতর সে স্বাচ্ছন্দ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।

রিনা বলল, ‘মোহন কেমন আছিস? তুই তো ডুমুরের ফুল হয়ে গেছিস?
তোর দেওয়া কুকুর ছানা এখন বাড়ির মস্তবড় পাহাড়াদার হয়েছে। মায়ের সঙ্গে খুব ভাব হয়েছে।’
মোহন বলল, স্কুলে যাচ্ছি রে। একটু দরকার আছে। ডুমুরের ফুল কেন?
ফুলন দেবী থাকতে। দেখা হয়নি বলে কি দেখা হয় না? দেখা তো মনে করলেই হয়। দেখা করতে হলে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে। দেখা বললেই কি দেখা হবে। যোগ্য কারণ থাকলে তো দেখা হবেই। আগের মতো পলাশীর যুদ্ধের জেরক্স নিয়ে তো যেতে পারি না। তুই ডাকলেই যাব। তোদের বাড়ির সবাই ভাল তো? মাসিমা,বোন সবাই ভাল?
রিনা বলল,খুব ভাল কথা বলতে শিখেছিস তো। আগে তো কথা থাকত না। শুধু হেসে যেতিস। এখন খই ফুটছে, দেখছি। সবাই ভাল আছেন।
মোহন বলল, ‘রিনা গাড়ি আসছে। চললাম রে। সাবধানে যাস। আর হ্যাঁ,এটা আমাদের কবিতার পত্রিকা। ভাল লাগলে জানাস।’
গাড়ি এসে দাঁড়াল। মোহন উঠে পড়ে। রিনা তাকিয়ে থাকে, বাসের পাদানির দিকে। বাস কাঁচা পেট্রোলের গন্ধ ছেড়ে দৌড়ে চলে যায়।

রিনা বাড়ির দিকে যাবে। সে গিয়েছিল, ডাক্তারখানায়। মোহনের নিঃস্ব ভাব, কেমন ফকিরি আবরণ,তার বেশ লাগে। মোহনের জীবনে ছন্দ না থাকলেও তার হাতের আঙুলের ছন্দ অসাধারণ, তার আভাস সে আগে থেকেই পেয়েছে। হাসিখুশি তার নতুন প্রতিফলন।
রিনা দেখল, মোহনের কোনও পরিবর্তন হয়নি। আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমন আছে। তাকে দেখে রিনার কেমন মায়া হল। পায়ের জুতোটা সামনের দিকে সেলাই করা। কাঁধের ব্যাগটা চেন কাটা, গায়ের জামা শামা ধরা। মাথার চুল পেকে ধবধবে সাদা হয়ে আছে। হঠাৎ সাক্ষাৎ হলে মনে হবে, বয়স্ক লোক। বয়স তার ওইটুকু, ক্লাস টুয়েলভ। মেরেকেটে আঠারো বছর হবে। তারপর মোহন বেশ বেঁটে। নাক বসা, চাপা রঙ। একটুও রোমান্টিক ভাব নেই। অতিসাধারণ চেহারা। গোবেচারা ভাব। রিনা দীর্ঘদিন মোহনের এইভাবে দেখে এসেছে, চিনে এসেছে। তারপরেও মোহনের প্রতি তার একটা টান আছে। সে জানে, সংসারে বাইরের দিকটা দেখলে হবে না। দেখতে হবে, ভেতরের দিকে। মোহনের জন্যে তার একটা শুভকামনা আছে, অতটা আবেগ নেই। তাকে সে ছোটবেলা থেকে দেখছে, ভদ্র বিনয়ী স্বভাবের। অন্য ছেলেদের মতো হ্যাংলা সে নয়, বিশ্বাস করা যায়। তবু শেষপর্যন্ত কাছের বন্ধু হওয়া যায় না। মোহনের জীবনে সব আছে, কিন্তু সেই আকর্ষণটা নেই। স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকার মতো ভাল লাগা নেই। তাকে দেখলে মনে হয় না, সে নিজের দায়িত্ব নিতে পারবে, আরও অনেকের দায়িত্ব সে নিতে পারবে, এটা মনে হয় না। বরং অসহায়ের মতো তার হাবভাব, পোড়া দোচালা যেমন হয় । তাই ছোটবেলার বন্ধুত্ব বড়বেলায় এসে থমকে দাঁড়াতে চায়। ফুরিয়ে যায় না, কোমায় চলে যাওয়া ভাব তৈরি হয়। রিনা ও মোহন একটা নদীর এপার ওপার হয়ে থাকে। মাঝে স্রোত বয়ে যায়। দুটো পার কখনও এক হতে পারে না।

শ্মশানের ধারে বেশ কটা তালগাছে ভাঁড় বেঁধেছে,পালান আর গজেন। দুজনের সব আলাদা। এক মাঠে গাছ কাটে তাই দুজন মিলে একটা কুঁড়ে বানায়। হাঁড়ি হাঁড়ি তারি নামায়। তারির নেশা এ পাড়ার কার নেই। ধনঞ্জয় সাদাসিধে হলেও তারির নেশা তার সাদাসিধে নয়। পেটভর্তি করে তারি খেলে ভেলকি দেখায়। নায়ক হয়ে এক লাথিতে উনুন ভাঙে। ঝন্টুর বিয়ের পর থেকে সে ভালোই ছিল।আক্ষিণের মেলা চলে গেছে। পৌষ সংক্রান্তি চলে গেছে। কিন্তু পাইকপল্লীর হাঁড়ি খাওয়া আরও বেশকিছু দিন চলবে। খেজুর বাগানের গাছ কাটে ভোলা। খেজুর গুড়ের জাঁকিয়ে ব্যবসা। বাগানটা তো ওর নয়,বৈদ্যদের। ওদের টাকা দিতে হয়।গুড় দিতে হয়। মাঝে মাঝে খেজুর রস তো খাওয়ার জন্যে দিতেই হয়। শীত এলে খেজুর গুড়, আর তাদের গুড় আউটানোর গন্ধ নাকে আলাদা মাদকতা আনে। গুড় জ্বাল দেওয়ার গন্ধ তো চমৎকার। খাওয়ার চেয়ে গন্ধ পাওয়ার মজা আলাদা। শীত এখনও বেশ কিছুদিন থাকবে। তাহলেও আকাশের দিকে তাকালে গ্রীষ্ম যে ঘরের কাছে এসে গেছে,তার আভাস পাওয়া যায়। রোদের রঙ একটু একটু করে বদলাচ্ছে। পালানের বউ দস্যি পালানের সঙ্গে সমানে কাজ করে। মোহনের বাড়ির সামনে দিয়ে সে মাঠে যায়। নতুন ছাপা শাড়ি, তাকে বেশ লাগছে। যাওয়ার পথে লক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা। দুজনে কত গল্প।
দস্যি লক্ষ্মীকে বলে, ‘ঝন্টুর বউ ঘাটের ধারে কাঁদে কেন? আমার দেকতে পে চোক মুচে নিলো। ঝন্টু মা বাকুলের ভেত্ রে থেকে চেল্লাচ্চে।’
লক্ষ্মী বলল, ‘ও খুপ ভাল মে। দেকি কি হল। ঝন্টু তো ঝোগড়া করবে নে। বুইদে পাচ্চিনি। তুই যা। মেটার দেকে আসি।’

লক্ষ্মী তো দৌড়ে আসে, ঝন্টুদের বাড়ি। বাইরে ধনঞ্জয়ের চিৎকার কানে আসছে। উঠোনো গিয়ে সে দাঁড়াতেই পারমিতা দৌড়ে এলো। চোখের জল আঁচল দিয়ে মুছে বাঁশের মোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– ‘দিদি, মোড়াতে বসো। তোমার জন্যে একটু জল নিয়ে আসি।’
– ‘বসবুনি রে বোন। বোসবুনি। কাচবাচ ফেলে তোর কাচে এলুম।’
– ‘একটু বোসো দিদি, আমি এই বাড়িতে আসার পর এই প্রথম এলে।’
– কি হয়চে বোন? কাঁদিস কেন? ঘরের লক্ষ্মী তুই।‌ কি হয়চে?
ঝন্টুর মা বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, ‘কি আবার হবে? ঝন্টুর বাপ পেট ভর্তি কোরে তারি গিলেচে। ঘরে এসে বিচনায় জল ঢেলে দিল! কি আক্কেল বল্ তো! একটা বউ তো চলে গেচে। ওদের জ্বালায়। এদের তাড়গে তবে থামবে। উনুনটাও ভেঁয়ে দিল। গিলবি বলে এত গিলবি? ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! মন্টু-ঝন্টু আসুক না। কত চোটপুট্টি হয়চে। দেকবো।
মাজে মাজে মনে হয়, আমার কেন মরণ হয়নে। ভগমান কেন আমার তুলে নেয়নে।’
পারমিতা বলে, ‘মা তুমি থামো, মা। চুপ করো। লোক জানিয়ে কি হবে, দিদি?’
– অশান্তি একদম ভাল লাগেনে। যেতায় হোক, চলে যাব। চোক যেদিক যায়, সেদিক চলে যাব।
লক্ষ্মী বলল,কাকা কোতায়?
– কোতায় আর যাবে, গোইলের সামনে চাড্ডি বমি করে রেকেচে, ওনার বাবার চাকর আচে, আমার কাড়তে হবে। একফোঁটা হুঁশ নি। গোইলের ভেতর শুয়ে পড়ে আচে।

এসব লক্ষ্মীদের পাড়াতে নতুন কিছু নয়,চেনা ছবি। পারমিতা তো অন্যরকম, খুব খারাপ লাগছে, ওর শাশুড়ির। লক্ষ্মীর তো খারাপ লাগছে,পারমিতার জন্যে। গণশার দুটো ছেলে সে পাড়ার একবারে শেষে থাকে, পলিথিন ঘেরা বাড়ি। তাদের হালচাল লিখে বলা যায়না। মানুষগুলো কিভাবে যে বেঁচে আছে। দেখলে বুক টনটন করে। গণশার কোনো হেলদোল নেই। কাক-কোকিলে গু খাবে না, তার আগে সে এক বোতল দেশি টেনে দেয়। ধনঞ্জয় ওরকম নয়, অনেকদিন পর সে ফাউল করে ফেলল। জ্ঞান ফিরলে ও বউয়ের হাতে পায়ে ধরবে, হয়তো।
পারমিতা সংসারে নতুন। এই প্রথমবার সে এই কীর্তি দেখল। ওর কাছে কি বলবে তার ঠিক নেই। তবে নির্ঘাত বলবে, গজেন বেশি করে খাইয়ে দিল। এরকম হবে জানলে সে খেত না।
ধনঞ্জয়ের বউ পারমিতাকে জনতা স্টোভে একমুঠো রান্না বসিয়ে দিতে বলে। তেমন হলে ভাতে ভাত করতে বলে। এদের বাড়িতে অনেক বেলা হলে খাওয়া হয়। সে বিছানা তুলে রোদে দেয়, উঠোনের টাঙানো দড়িতে। তারপর পুকুরের খোলে নেমে নতুন উনুনের কাদা তুলতে চলে যায়। লক্ষ্মী পারমিতাকে বলে, ‘আমাদের উনুনের পাশে খাটখড় ঢিবি কোরা আচে, চল্। দুজনে ধোরে নে যাই।’
– না গো এখানেই করে নিচ্ছি। তোমাদের বাড়ি কত লোক সবাই জিজ্ঞাসা করবে। তাকিয়ে থাকবে।
– তা যা বলিচিস। যাই রে বোন। কাঁদিস নি।

লক্ষ্মী ঝন্টুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে তাকালে অনেকটা দূর দেখা যায়। পূবের মাঠ, নির্ঝঞ্ঝাট তালবাগান, প্রাথমিক স্কুল। পুরানো বাবলা গাছের ডালে বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে। সে দেখে কাঁধে চাদর ফেলে যুগলকিশোর ফিরছে। সিকদার পাড়ায় লোকের বাড়ি কাজে গিয়েছিল। খুব ভোরবেলা বেরিয়েছিল। ছেলে দুটোর খিদে পেয়ে গেছে। মোহন পরীক্ষার পড়া নিয়ে খুব ব্যস্ত। তাকেও খেতে দিতে হবে। শ্বশুরমশাই তো আজ মাধবদের বাড়িতে খাবে। নেমতন্ন। ওদের পুকুর ছেঁচে অনেক মাছ ধরেছে। তবু সে দাঁড়িয়ে থাকে। দুটো মিনিটের জন্যে। মানুষটা তো এসেই গেছে। একটু দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভাল লাগছে। এইভাবে কবে সে অপেক্ষা করেছে,মনে নেই। সংসারের জোয়ালে মেরুদন্ড সবারই বেঁকে গেছে। তারপরেও ভালবাসা ঠিক বেঁচে আছে। যুগলকিশোর বলে, ‘কিগো দাঁড়গে রইলে?’
লক্ষ্মী বলে, এমনি,তোমার জন্যে। দেকতে পেলুম। কেন, দাঁড়াতে নি?
– ‘চলো। খুব খিদে প্যায়চে। খেতে দেবে চলো।’
এই পাড়াতে বউদের স্বামীরা সবাই তুই বলে। কিন্তু যুগলকিশোর লক্ষ্মীকে কখনও তুই বলেনি। সে স্কুল ফাইনাল পাশ তো। তার একটা নমুনা বলা যেতে পারে। ঝন্টু পারমিতাকে তুই বলে না। এরকম দু-চারটে ছাড়া সবাই বউকে তুই করে কথা বলে।

দুপুরবেলা খেতে বসে যুগলকিশোর মোহনের পড়াশুনার খোঁজ নেয়। রাত জেগে সে দিনরাত পড়ছে,তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। সারাবছর পড়লে পরীক্ষার সময় এত চাপ নিতে হয় না। না পড়লে পরীক্ষার সময় পাগল হতে হয়। যুগলকিশোর বলে, হ্যাঁরে‌ মোহন। তোদের অ্যাডমিট কবে দেবে?
– পরীক্ষার দশদিন আগে। স্কুলে গেলে দিয়ে দেবে। সই করে নিতে হবে।
– তোর পরীক্ষায় বোসার আর কোনো অসুবিধা নি তো?
– না দাদা। ওরা চিঠি তো পরের দিন, জমা করে নিয়েছে। সবাইকে ছেড়ে দিয়েছে।
– যাইহোক, রেজালটা ভাল কর। দেকবি সপ ঠিক আচে।
মোহনের ছোটভাইপো লক্ষ্মীকে বলে, একটু আলু ভাতে দেবে মা?
লক্ষ্মী তার ভাগের থেকে একটুখানি রেখে বাকি আলুমাখাটুকু ছোটটার পাতে তুলে দেয়।
যুগলকিশোর সবার আগে উঠে যায়। তার তালপাতার চেটাইয়ে কটা মাছি ভনভন করে।
লক্ষ্মী মোহনকে ঝন্টুদের বাড়ির কথা তোলে। মোহন সবকথা শুনে বলল, বড় বউদি আমাদের আর পরিবর্তন হল না। প্রথা বিশ‌‌বছর হতে যায়, দেখছি এই পাড়াটা। অভাব বদলায় না। এদের স্বভাবও বদলায় না। মোহনের সঙ্গে ছেলে দুটোও উঠে যায়। লক্ষ্মী এবার নিজের জন্যেও একমুঠো বেড়ে নেয়। মোহনের আর সাতটা দাদার বাড়িতে খাইদাই হয়ে গেছে। মেজো বউদি কাঠের ঘাট থেকে বাসন মেজে চলে এলো। এবার বিড়ি বাঁধতে বসবে। না সানো বউদি উনুনে তাল ঘেরো, নারকেল গেলো আর ঘুঁটের উঁতো দিচ্ছে।
সানো বউদির ঘরের দরজার পাশে এখনও এক বোঝা নাড়া ঢিবি করা আছে। মেজদার ক’দিন গান নেই, ছিটেবেড়ার জানলা বাতিল লুঙ্গি দিয়ে পর্দা করা আছে। ভেতরে পশ্চিমের রোদ ঢুকছে। তাই পর্দা টানা আছে। পাশে রেডিও বসানো আছে। ছমছাপ শীতের দুপুরে গান বাজছে, ‘দীপ ছিল, শিখা ছিল, শুধু তুমি ছিলে না‌ বলে আলো জ্বলল না…’

চলবে…

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৬

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
অবশেষ দাস
অবশেষ দাস
জন্ম: দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা। বাবা গৌরবরণ দাস এবং মা নমিতা দেবী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দুটোতেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এছাড়া মাসকমিউনিকেশন নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিদ্যানগর কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক। প্রথম লেখা প্রকাশ 'দীপশিখা' পত্রিকার শারদ সংখ্যায়। তাঁর কয়েকটি কবিতার বই: মাটির ঘরের গল্প ( ২০০৪), কিশোরবেলা সোনার খাঁচায় (২০১৪), হাওয়ার নূপুর (২০২০) সহ অজস্র সংকলন ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কবিতা চর্চার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের চর্চা সমানভাবে করে চলেছেন। কবি দুই দশকের বেশি কাল ধরে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সংকলনে। বেশকিছুদিন সম্পাদনা করেছেন ছোটদের 'একতারা' সাহিত্য পত্রিকা। এছাড়া আমন্ত্রণমূলক সম্পাদনা করেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক দুটি অন্যধারার প্রতিষ্ঠান 'বাংলার মুখ' ও মেনকাবালা দেবী স্মৃতি সংস্কৃতি আকাদেমি।' তাঁর গবেষণার বিষয় 'সুন্দরবনের জনজীবন ও বাংলা কথাসাহিত্য।' পাশাপাশি দলিত সমাজ ও সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। ফুলের সৌরভ নয়, জীবনের সৌরভ খুঁজে যাওয়া কবির সারা জীবনের সাধনা। সবুজ গাছপালাকে তিনি সন্তানের মতো ভালবাসেন। সুন্দরবন তাঁর কাছে আরাধ্য দেবী। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার ও সম্মান: সুধারানী রায় স্মৃতি পুরস্কার (২০০৪), বাসুদেব সরকার স্মৃতি পদক (২০০৬), রোটারি লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ১০০ ডায়মণ্ড গণসংবর্ধনা (২০০৮), পাঞ্চজন্য সাহিত্য পুরস্কার (২০১০), শতবার্ষিকী সাহিত্য সম্মাননা (২০১১), এশিয়ান কালচারাল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), ডঃ রাধাকৃষ্ণন সম্মাননা (২০১৫), ডি.পি.এস.সি. সাহিত্য সম্মাননা (২০১৮), আত্মজন সম্মাননা (২০১৯), বিবেকানন্দ পুরস্কার (২০১৯), দীপালিকা সম্মাননা (২০১৯), সংহতি সম্মাননা (২০২০), সুকুমার রায় পুরস্কার (২০২০)।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৯

রাত এগারোটা নাগাদ মোহন বাড়ি ফিরছে, ফতেপুর থেকে। সাহিত্য...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৮

মোহনের পরীক্ষা আর দিন সাতেক বাকি। লাস্ট মিনিট সাজেশন...

প্রবহমান: পর্ব – আট

পূবিতে সূয্যি ওঠে পশ্চিমিতে চানঘরে আমার মানিক জ্বলে আসেন...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৬

উচ্চমাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। মোহন স্কুলে গিয়ে দীপঙ্করকে...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।