মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২

প্রবহমান: পর্ব – সাত

প্রকাশিত:

আষাড়ের ঢল। ভাতুরিয়া পানি থই থই। এ অঞ্চলে বন্যার পানি আসে শ্রাবণের শেষে। পুরো আষাঢ় আর শ্রাবণে যত বৃষ্টি হয় তার সাথে সিথানের পাহাড়ি ঢল মিশে নদীগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠে বাংলার আনাচে-কানাচে পৌঁছাতে আষাঢ় পেরোয়ে শ্রাবণ ফুরায়। বাংলার উত্তরের তুলনায় দক্ষিণের বন্যা এ কারণেই নামী। কিন্তু এ বছর আষাঢ়ের মাঝামাঝি টানা সাত দিনের বৃষ্টির সাথে নদীর প্রবাহে কিসের কী পানি এসে হঠাৎ এমন কুলপ্লাবী হয়ে উঠলো যে মধুমতির বুক উথলানো জলধারা মাত্র দেড় দিনে ছয় মাইল পথ পেরিয়ে রমিজ মিঞার গোয়াল ঘরে উঁকি দিতে শুরু করলো। চাষাদের খেত ভরা আউশের জলি ধান। ধান তো নয়, যেন ফোঁটা ফোঁটা ঘন দুধ। দুধ জমে শক্ত হতে মাসখানেক সময় নেয়। শ্রাবণের মাঝামাঝি এসব ধান কাটার উপযোগী হয়। আষাঢ়ী ঢল কিংবা মাঝারি বান এসব ধান অনায়াসে সয়ে নেয়। কিন্তু বন্যা খুব বেশি হলে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে বাড়তে এরা বড় কাহিল হয়ে পড়ে। বানের পানি নেমে গেলে লুটায়ে থাকা তৃণদের খুঁজে পাওয়া গেলেও তাতে আর ফসলের দেখা মেলে না। মাথায় ফুটো মাথাল আর কোমরে ছেঁড়া গামছা বাঁধা কৃষকের তখন মাথায় হাত, পেটে পাথর।

এবারের বন্যা রমিজ মিঞার সংসারে যেকোন আকস্মিক দুর্যোগের চেয়ে ভয়াবহ হয়ে দেখা দিল। শরাফতের বৌ গর্ভবতী। সাতমাস। আকিমনের বহু মুখ ঝামটা, দোয়া-দুরুদ আর রওজান বিবির সাধ্য-অসাধ্য সব মানতের ফসল এই গর্ভ। মা যা সব মানত করে রাখছে তাতে সন্তান হলে পর পালানের একটা জমিই না বেচে দিতে হয়! রমিজ মিঞা বসে বসে ভাবে। এদিকে সাত মাসের পোয়াতীরে সাধ খাওয়ানোর নিয়ম আছে। পয়লা পোয়াতী বলে কথা। বন্যা বা আকালের ওজরে তার সাধ-আহ্লাদ কি ময়-মুরুব্বীর পুরনো শাস্তর এর নিয়ম তো আর হেলা করা যায় না। কাজেই সাধ্যমত সাধ এর আয়োজন হয়। তিন-তিনখান গয়নার নাও ভরে হিরণের বাপের বাড়ির কুটুম্বরা সব হাজির। কুটুম্বরা একবেলার মেহমান। সেই এক বেলাতেই রমিজ মিঞার আউড়ির আমন বীজধান সব উড়ে গেল আর সাথে গেল বড় সাধ করে পালা জোড়া খাসী। এই আকালের মুখে এ বড় কম ক্ষতি নয়। দুর্দিনে যে গিরস্থ বীজধান সাবাড় করে আর হালের বলদ বেচে, আল্লাহ হাতে ধরে টেনে না তুললে সে আর কোনদিন কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। লক্ষণ যা দেখা যাচ্ছে তাতে শেষে রমিজ মিঞার হালের বলদ জোড়াই না হাটে তুলতে হয়। আর তাই যদি ঘটে তবে কোনকালে আল্লাহ মুখ তুলে চাইবে কিনা তার মতো নালায়েক বান্দা তার কী জানে!

সাধের খানাপিনা শেষে নয়া বৌয়ের মতন লম্বা ঘোমটা টেনে হিরনবালা উঠলো যেয়ে বাপের বাড়ির গয়নার নাওয়ে। চোখ তার ছলছল। নাইওর যাওয়ার কালে কোন বৌ কখনো কাঁদে না, কাঁদে নাইওর শেষে ফেরার কালে। কিন্তু হিরণবালা আজ কাঁদে। মনে তার ভয়, আবার কি সে ফিরবে এই গাঁয়ে এই বাড়িতে? নাকি তার পরিণতি হবে শলোকা বুজির মতন? সম্পর্কে হিরণের ননদ হতো শলোকা। এই তো গেল বছর ঠিক এই সময়েই তারে কত আমোদ করে পালকি করে আনা হলো সাধ খাইয়ে – দেড় মাস পর অসময়ে ব্যথা উঠে…। মাগো! তেমন যদি হয় হিরণের!

স্বামী! কোথায় গেলেন স্বামী! যাবার কালে একবার দেখা হলো না! এমন দিনে এমন সময়েই তারে যেতে হলো গত বছরের পাট বেচা টাকার তাগাদা করতে! সারা বছর তাগিদ করে যে টাকা মেলেনি তাই কিনা মিলবে আজ! স্বামীকে শেষবারের তরে দেখতে না পারার অভিমান, নাকি জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তার ডরে হিরণের বুক ভেঙ্গে কান্না উথলে ওঠে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে হিরণ যাত্রা করে তার বাপের দেশের দিকে।

তিন মাস পর সুখবর এসে পৌঁছায় – তিন দিন ধরে ব্যথায় বড় কষ্ট পেয়ে কাল বিশ্যুদবার রাঙাবড় – খালাস হইছে। ফুটফুটে এক মেয়ে হয়েছে শরাফতের। সে খবর শুনে আকিমন একটু ক্ষণের জন্য গুম হয়ে থাকে। বংশের পরথম বাচ্চা – ছাওয়ালই চায় সবাই। বংশে বাতি জ্বালার ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর হোক না মাইয়্যে যে কয়ডা খুশি। কিন্তু রওজান বিবি খুশিতে ডগমগ। যে কুটুম্ব খবর আনছে তার আপ্যায়নের চেষ্টায় সে তখনই বড় মোরগটা ধরার নির্দেশ দেয়। আদেশ পেয়ে লোকমান মোরগের পিছনে ছোটে। কিন্তু দিনের বেলায় মোরগ ধরা কি সোজা কম্ম! অগত্যা শরাফতও লেগে পড়ে। ওবাড়ির দুলাল মাঝির পো পথ সংক্ষেপ করতে এ বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে যাচ্ছিল। লোকমানদের ছুটোছুটি দেখে সেও তাতে যোগ দেয় নিমেষে। একটা দুর্দান্ত মোরগের পিছনে তিনজন জোয়ান মর্দের এই হুটোপুটি রমিজ মিঞা নির্নিমেষ চোখে দেখে। নানা উপলক্ষে এই যে খাসী, মোরগ, বীজধান সব সাবাড় হয়ে যাচ্ছে, এ ক্ষতি সে পুষায়ে নেবে কেমন করে? গেল হাটে চাল বিকোয়ছে চার আনা করে সের। একে যুদ্ধের বাজার, তাতে এই বন্যা। চারআনা সের দরে চাল কেনার সঙ্গতি এ এলাকায় বলতে গেলে কারোরই নেই। তবু কেউ কেউ কেনে। না কিনে উপায় কী, পেটে তো দুটো দিতে হবে? তাই যার হাড়িতে একবেলায় চাল দরকার তিন সের, সে দুই দিনের দরুণ চাল কিনেছে পাঁচ সের। চালের অভাব মানুষেরা কচু-ঘেঁচু দিয়ে পোষাতে চেষ্টা করছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে জলা-জঙ্গলের এ দেশে কচু-ঘেঁচুও বুঝি আর মিলবে না।

কুড়ি পাখি জমির মালিক রমিজ মিঞার ঘরে নিত্য ঘেঁচু-কচুর অম্বল খাওয়ার দিন এখনো আসেনি। বান-বন্যায় আউশ তলালেও একটু ডাঙ্গা জমি থেকে ধান যা পেয়েছে তাতে আমন পর্যন্ত চলা যাবে নিশ্চিত। আর পাটের ফলন এবার যা হয়েছে তাতে হিসেব করে চললে আসছে বছর পাট ওঠা তামাইৎ লবণ-কেরোসিনের ভাবনায় পড়তে হবে না। এবার শীতে হয়ত কাবলিঅলার দেনাটাও শোধ করা যেত। গেল বছর এক কাবলির কাছ থেকে হঠাৎ গজায় ওঠা শখের বশে নিজের জন্য একটা শাল কিনে ফেলেছিল রমিজ মিঞা। সেই কোন ছোটকালে বাপজান বেজায় আবদারে পড়ে বোড়লে আড়ংয়ের থে এক চাদর কিনে দিছিল তারে। তারপর এত বড় জীবনটায় সে কবেই বা শীতকাপড় কিনেছে? শীতকাপড় কেন, বছরভর হাটে-বাজারে কি কুটুম্ব বাড়ি যেতে দরকার যে পিরান, তাই বা সে সারাজীবনে কয়খান তৈয়ার করাইছে? তবু দেখ তার এই শখটারে শরাফতের মা সুনজরে না দেখে। শালটা গায়ে জড়ায়ে আকিমনরে দেখাতেই সে মুখ বিরস করে বলেছিল, শরাফতের জন্যি কিনলেন না, এই বয়সে হাউশ! রমিজ মিঞার মুখ থেকে লাজুক-লাজুক খুশি-খুশি ভাবটা পলকে উবে গেছিল।

কিন্তু শরাফতের মেয়ের সাটুরে নিয়ে মা যা সব ফর্দ করছে তাতে কাবলির দেনা শোধ হবে কি, ফের না তারে রাজাপুরের মুকুন্দ সাওয়ের খাজাঞ্চির দরবারে ঐ শালটাই বন্ধক রাখতে হয়! আর ঐ এক শালে কি হবে, গয়নাগাঁটি বন্ধক না রাখলে একটা খাসী, এক জোড়া শাড়ি, সোনার ভালি, রুপোর মল আর নাতনির মুখ দেখার একটা গোটা টাকা সে পায় কোথায়? এদিকে গয়না বলতে আকিমনের আছে নাকে বেশ বড় এক নাকছাবি আর কানে একজোড়া রুপোর মাকড়ি। শরাফতের বৌয়ের নাকে নথ দোলাতে আকিমন নিজের নাকের ‘আহ্লাদ’ খুলেছে সেই কবেই। সধবা মেয়েলোক – এখন তার কাছ থেকে তো ঐ নাকছাবি কেড়ে নেয়া চলে না। আর মাকড়ি জোড়াও পাওয়ার আশা দুরাশা। মুখ ঝামটা মেরে আকিমন ঠিক বলবে, মুরোদ থাহে তো সোনারের থে ফরমাশ করে নাতিনের জন্যি মুটুক গড়াও, আমার গরীব বাপের দেয়া জিনিসে হাত বাড়াও ক্যা? কাজেই অবশেষে মাই ভরসা। মায়ের কাছে যদি বহু কাল ধরে বহু আকালেও আগলে রাখা কোন গুপ্ত ধন থেকে থাকে….

শেষকালে তাই হয়। হাতড়ে-পাতড়ে, বহু গাট্টি-বোঁচকার অন্ধি-সন্ধি খুঁজে রওজান বিবি ঠিক বের করে একটা ছোট্ট সোনার ধানতাবিজ। আকারে ছোট হলেও বেশ ভারি আর জিনিসও খাঁটি বলে মনে হয়। রমিজ মিঞা তাজ্জব – মা পারেও বটে! সেই কোনকালে কোন সুদিনে নহাটার হাটে এক নাও ভরা মাসকলাই বেচে সেখানকারই এক স্যাকরার থে বাপজান গড়ায়ে আনছিল এই তাবিজ! সেই তাবিজে এখন শরাফতের মেয়ের শাঠুরের আয়োজন হবে! নিজেরে তার হঠাৎ অভাগা মনে হয়। বাপজানের আমলে এক মওসুমে মাসকলাই বেচে যা পাওয়া যেত এখন বছরভর চাষবাস করেও তার সিকিভাগ ঘরে না আসে। অথচ জিনিসপত্রের দাম দিন দিন আগুন হয়ে উঠছে। কোথায় কোন যুদ্ধ হচ্ছে কয় বছর ধরে। তার আঁচ পূববাংলার এই অজপাড়াগাঁয়ের গায়েও এসে লাগছে। এভাবে চলতে থাকলে শরাফতের দশা যে শেষে কী হয়!

চলবে …

হোসনে আরা মণি
হোসনে আরা মণি
হোসনে আরা মণি জন্ম - মাগুরা জেলার মহম্মদপুর থানার ওমেদপুর গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মতারিখ- প্রকৃত: ২৭ জুন ১৯৭৭, সনদীয়: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ পিতা- মোঃ আব্দুল গফ্ফার মোল্লা মাতা- সালেহা ইয়াসমিন সংসারসঙ্গী- মোঃ দেলোয়ার হোসেন (মাহমুদ) তিন কন্যা- আদৃতা, অঙ্কিতা ও দীপিতা বর্তমান অবস্থান: রাজশাহী। পেশা: সরকারী চাকরি [উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর, বিভাগীয় কার্যালয়, রাজশাহী] প্রকাশিত গ্রন্থঃ ৭টি (৬টি গল্পগ্রন্থ, ১টি উপন্যাস) প্রথম: অপরাজিতা (সময় প্রকাশন) দ্বিতীয়: জীবনের পেয়ালায় ছোট্ট চুমুক (ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ) তৃতীয়: নদীও নারীর মত কথা কয় (বটেশ্বর বর্ণন) চতুর্থ: মহাকালে প্রান্তরে (পরিবার পাবলিকেশন্স) পঞ্চম: লিলুয়া জীবনের নারীগণ (বটেশ্বর বর্ণন) ষষ্ঠ: বিবিক্তা (বটেশ্বর বর্ণন) – উপন্যাস সপ্তম: তামসী (বইঘর)

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ১১

হাওয়াই মিঠাই, হাওয়াই মিঠাই আছে।‌ঠং ঠং ঠং ঠং করে...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ১০

"তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ" কবিতাটা খুব কঠিন কবিতা। বুঝলি...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৯

রাত এগারোটা নাগাদ মোহন বাড়ি ফিরছে, ফতেপুর থেকে। সাহিত্য...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৮

মোহনের পরীক্ষা আর দিন সাতেক বাকি। লাস্ট মিনিট সাজেশন...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।