বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২

‘ঘোড়েল’ পর্ব – চার, মুসা আলি’র ধারাবাহিক উপন্যাস

প্রকাশিত:

পর্ব – চার

ভালো ঘুম হয় নি রাতে। সকালে উঠে চেয়ারে গুম হয়ে বসে ছিল। টানা দু’দিন খেলার মাঠের স্মৃতি জয়কে বার বার ধাক্কা মারছে। তিন জনের কাউকে ঠিকমতো চিনতে পারল না সে। সর্বক্ষণ নিজেই যে সুবিমলের ছায়াসঙ্গী হিসেবে এত বছর থেকেছে, তাঁকেই সবচেয়ে বেশি অচেনা লাগছে। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে গুরু কেমন যেন বেমানান আচরণ করলেন, পুরনো ছন্দে একবারও দেখতে পাওয়া গেল না। প্রদীপও সকলের সামনে হ্যাংলার মতো সুচরির সঙ্গে হ্যাণ্ডসেক করে বসল। এসবের দরকার ছিল কী? মেয়েটাও তা দিব্যি মেনে নিল। ভিতরের প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে খুব সহজে বিরোধিতা করতে পারত, অন্তত এড়িয়ে যেতে পারত। সেই পথে হাঁটল না। সুচরির বোঝা উচিত ছিল, এলাকায় নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুর পরেই রয়েছে সে। এতটুকু ভাবতে পারলে সবার সামনে হ্যাণ্ডসেক করে তার সম্ভ্রম নষ্ট করতে পারত না। মেয়েটির মাথায় কেন যে সেই বুদ্ধিটুকু এল না, তা ভেবে পেল না জয়। সুচরি জানে না, আজকাল অনেকেই গুরুর আগে তাকে ফোন করে মন পেতে চায়। মূল লক্ষ্য তাকে ধরে গুরুর কাছে পৌঁছে যাওয়া। বোধ হয় কলেজপড়ুয়া বলেই সুচরির পক্ষে এত কিছু জানা সম্ভব হয় নি। এখনও বুঝতে শেখে নি, রাজনীতির অঙ্ক কত জটিল হতে পারে। তা যে যোগ বিয়োগ গুণভাগের মতো সহজ সরল নয়, অনেক বেশি এঁকেবেঁকে চলে, বার বার বাঁক নেয়। সুচরির মতো বাচ্চা মেয়ে সেসব জানবে কী করে?
নিজস্ব অনুভূতির যোগফল নিয়ে জয় শেষ পর্যন্ত সুচরির উপর দুর্বল না হয়ে পারল না। প্রদীপের সঙ্গে হ্যাণ্ডসেক করার জন্যে আর রাগ করতে পারল না, বরং ভাবল, মেয়েটাকে সংগঠনে এনে শিখিয়ে পড়িয়ে ঠিকমতো গড়ে তোলার দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে।
মনের গভীরে কারুর প্রতি দুর্বলতা থাকলে সহজে যে রাগ করা যায় না, জয় সেদিন প্রথম তা বুঝতে পারল যদিও একটা বিশেষ ভয় তার বুকের গভীরে লুকোচুরি খেলে চলেছে। হারামির বাচ্চা একটানা লেগে রয়েছে মেয়েটার পিছনে। আজও বুঝতে শিখল না, তার গুরু কী ভীষণ লোক। একবার গুঁতুলে দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও পাবে না। সুবিমল রায়ের ভারিক্কি মুখটা দপ করে জ্বলে উঠল জয়ের দুচোখের সামনে। গুরু যে তার জন্যে যথেষ্ট চিন্তায় রয়েছেন, তা নিয়ে জয়ের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। এত করে ভেবেছেন বলেই বেশ জোরের সঙ্গে মন্তব্য করেছেন, প্রয়োজন হলে প্রদীপকে এলাকা ছাড়া করেই ছাড়বেন। বিশেষ অচেনা অনুভূতিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠল জয়। প্রদীপের অনুপস্থিতিতে ফাঁকা ময়দান পেলে সুচরির সঙ্গে যেমন খুশি খেলতে পারবে সে।
আর ভাবতে পারল না জয়। দুচোখ বুজিয়ে কাল্পনিক স্রেতে ভেসেই চলল। আবেগে দুলতে দুলতে অন্ধ মনে সরতে সরতে নিজের মানসিক নির্জন দ্বীপে পৌঁছে গেল। চারদিকে জল আর জল। মাঝে মাথা তুলে দাঁড়ানো দ্বীপে চোখধাঁধানো সবুজের সমারোহ। সুচরির সঙ্গে মনোলগে মেতে উঠল জয়। এ্যাই, এত দেরি করে এলে যে?
মায়ের হাতের কাজ সেরে তবেই বের হতে হয়েছে।
সন্ধে পর্যন্ত দুজনে এখানেই থাকব।
এত বেশি সময়?
গল্পে গল্পে পার হয়ে যাবে। বুঝতেই পারবে না।
এভাবে ভাবতে নেই জয়, মা অন্য কিছু ভাবতে পারে। পড়ন্ত বিকেলে ফিরে যাব, এতটা সময় একেবারে কম নয়।
এখন চুটিয়ে গল্প করি এস, পরে এ নিয়ে ভাবব।
শুধু গল্প? একটু হাসল সুচরি।
জয়ের মিষ্টি মন্তব্য, দুষ্টু কোথাকার।
সুচরি খিলখিল শব্দে হেসে উঠল।
তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছি জয়দা।
দুচোখ খুলে কঠোর বাস্তবে নামতে বাধ্য হল জয়। দরজা খুলে দিয়ে দেখল, প্রদীপ শুকনো মুখে উঠোনের মধ্যে দাঁড়িয়ে। বেশ অবাক হল জয়, ভিতরে অচেনা কৌতূহল, তবুও ভুলে গেল না যে সে সুবিমল রায়ের প্রিয় সাকরেদ। কঠোর বাস্তবে সে যে রাজনীতির লোক, তাও ভুলে গেল না। হাসি মুখে বলল, এত সকালে?
তোমার সঙ্গে জরুরি কথা ছিল।
বেশ তো, ভিতরে এস।
সেই ভালো, নিরিবিলি মনের কথা বলতে পারব।
চমকে উঠল জয়। তাহলে কী নতুন বোধোদয় ঘটেছে প্রদীপের মধ্যে? একরকম নিশ্চিত হয়ে গেল, গতকাল গুরুর গুঁতো খেয়ে ছেলেটা স্যারেণ্ডার করতে এসেছে বোধ হয়। অনেকটা দেরিতেই বুঝল। গুরু গুঁতুলে একটা সাধারণ ঘটনা কত বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে তা সে ভালোমতোই বোঝে। ইচ্ছা করলেই যা তা করে দিতে পারেন। নিজের নির্দেশ কী ভাবে কার্যকর করতে হয়, তা ভালো করেই জানেন। থানার ওসিকেও অনেকবার অনুসরণ করতে বাধ্য করেছেন। প্রদীপের মতো একটা বাচ্চা ছেলের ঘ্যাংরামি গুরু ইচ্ছা করলেই মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে যে কোনো সময়।
জয় ভিতরে ভিতরে যারপরনাই উৎফুল্ল হলেও প্রদীপের কাছে তা প্রকাশ করল না বরং বিশেষ আন্তরিকতা দেখিয়ে বলল, প্রথম এলে তোমাকে চা বিস্কুট খেতে দিতে পারলুম না।
বাড়িতে কেউ নেই নাকি?
একাই থাকি, গুরুর বাড়িতে খাই। এ বাড়ি আসলে পার্টি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আমি অফিস সেক্রেটারি। আমাকে হোল টাইমার হিসেবে ভাবতে পারো।
সেজন্যে সুবিমলবাবু তোমাকে এত বিশ্বাস করেন?
এসব জানলে কী করে?
খেলার মাঠে টানা দুদিন তোমার কথা ভেবে সুবিমলবাবু আমার উপর যা করলেন, তাতেই বুঝতে পেরেছি।
এত সহজে এসব টের পেয়ে গেল? রাজনীতির গুরু সুবিমলের উপর আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ল জয়। শরতের আকাশে সন্ধের আগে ভেসে যাওয়া মেঘের মতো সুচরিকে নিয়ে তার ভাবনা মনের অলিগলি বেয়ে এগিয়ে চলেছে। যে প্রদীপকে সে এতদিন মূল প্রতিপক্ষ ভেবে নিয়েছিল, তাকে এভাবে সামনে বসে থাকতে দেখে বেশ অস্বস্থিবোধ করতে লাগল জয়। মেঘ ডাকলে যেমন আকাশ কেঁপে ওঠে, জয়ের বুকটা সেভাবেই কেঁপে উঠল। ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দুটো দিন তাকে দেখে মাত্র একবার সুচরি সাদা দাঁত বের করে হেসেছিল। এভাবে বার বার হাসলে সে কতটা খুশি হতে পারে তা কল্পনা করে বেশ পুলকিত হল। সাদা দাঁতে ফর্সা মুখে মিষ্টি হাসিতে সুচরিকে সুচিত্রা সেন বলেই মনে হয়।
আবেগের পারদ দ্রুত বাড়তে থাকলেও জয় ভালো করেই জানত, সুচরিতা প্রদীপের উপর খুব বেশি দুর্বল। ক্লাসমেট বলে কথা, দুবেলা সামনাসামনি দেখা, করিডরে দাঁড়িয়ে গল্পে ডুবে থাকা, আসা যাওয়া এক সঙ্গেই, ফুচকা খাওয়ার সময় পাশাপাশি দাঁডিয়ে থাকা, পরস্পরের প্রয়োজনে উত্তরের খাতা দেওয়া-নেওয়া— টানা তিন বছরের পর্ব।
এত সব যুক্তিজালের পরে জয় ভাবতে বাধ্য হল যে থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হলে এসব ছাঁট ধাপে ধাপে সুচরির মন থেকে সরে যাবে। out of sight out of mind সূত্র মেনে নিয়ে বাস্তব প্রয়োজনে যে যার মতো চলতে বাধ্য হবে। গুরু আরেকটু জোর খাটালে তার পক্ষে সুচরির তুলতুলে মন দখল করে নেওয়া একেবারে অসম্ভব হবে না। নিজের উদ্দেশ্যে সফল হতে গেলে গুরুকে জাপটে ধরা ছাড়া যে উপায় নেই, জয় তা ভালো করেই জানে। টানা দুদিন খেলার মাঠে যেভাবে প্রদীপকে শাসনে রাখতে পেরেছেন, তার জন্যে অসীম কৃতজ্ঞতায় দুলল বেশ কিছু সময়। সুচরির সঙ্গে তার কানাকানি যত প্রকাশ পাবে, তত বেশি সুবিধা। প্রদীপ সেই কানাকানির মধ্যে ঢুকতে সাহস পাবে না, গুরুর সংহারক ছায়া তাকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরবে। মনে পড়ল কেমন করে দম্ভ ভরে তার গুরু প্রদীপকে হেতাঁল গাছের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কেমন করে বীরদর্পে গোড়ায় কোপ দেওয়ার কথা বলতে পেরেছেন। প্রবল রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকার ফলে যে এভাবে বলা সম্ভব, তা বেশ বুঝতে পারল জয়।
ভাবনাতুর প্রদীপ জয়ের মুখের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে। মানসিক দ্বিধা নিয়ে বলল, কেন এসেছি, তা তো জিজ্ঞেস করলে না?
হ্যাঁ বলো শুনি।
জয় তখনও আনমনে নিজের ভাবনায় ডুবে ছিল।
জয়দা—।
বললাম তো বলতে।
আনমনে কী ভাবছ?
আমার উপর যেভাবে জোর করে দোষ চাপিয়ে দিলে—
তাহলে কী সুবিমলবাবু তোমার কথা ভেবে আমার উপর এসব করেন নি? কেবল খেলার মাঠে আমাকে থামানোর জন্যেই….
ঠিক তাই।
প্রদীপ খুশি হল জয়ের মানসিক লুকোচুরি খেলায়। এখানে আসার আগে পর্যন্ত যাকে সে পথের কাঁটা হিসেবে ভেবেছিল, সেই জয়দা নিজের মুখে স্বীকার করল, সুচরিকে তার প্রয়োজন নেই। ভাবল, জয়ের কাছে মনের কথা বলতে আর কোনো বাধা থাকা ঠিক নয়।
—জানো জয়দা, থেমে গেল প্রদীপ।
এভাবে থামলে কেন?
না মানে সুচরির সঙ্গে….।
বললাম তো, আমি কোনো দুর্বলতা পোষণ করি না।
আমি অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে এসেছি।
নিঃসংকোচে বলতে পারো।
খারাপ কিছু ভাববে না তো?
পাগল ছেলে কোথাকার, এভাবে দ্বিধায় পড়ে থেকো না।
তবুও প্রদীপের মন থেকে কিন্তুর ছায়া দূর হল না।
আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না বুঝি?
ঠিক তা নয়, সুচরিকে আমি খুব ভালোবাসি জয়দা।
একইভাবে সুচরিও তোমাকে?
তা জানি না, শুধু চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এই বললে ভালোবাসি, আবার বলছ, চেষ্টা করে যাচ্ছি, তাহলে ঠিকমতো মনের লেনদেন এখনও গড়ে উঠে নি?
তা বলতে পারো।
তাহলে ভালোবাসার কথা বলছ কেন?
আমার ভালোবাসা অন্য রকম।
বুঝতে পারলুম না।
ভালোলাগায় উতরে যেতে পেরেছি বলেই ভালোবাসায় ডুবে যেতে চাচ্ছি। প্রথম পর্বে জিততে পারলে দ্বিতীয় পর্ব সহজে কাছে আসে। নিজের মনে ভালোলাগার যাদু তৈরি করতে পারলেই ভালোবাসার পূর্ণ যোগফলে পৌঁছানো যায়।
তাহলে কী শুধু নিজের ভালোলাগার পর্বে আটকে আছ?
ওই আর কী, দুটো পর্বের মাঝামাঝি।
এখনও ভালোবাসার সমুদ্রে ঢুকে পড়তে পারো নি?
এভাবে ভাবতে নেই জয়দা।
বললে তো সুচরির ভালোবাসার সম্মতি এখনও পাও নি।
প্রদীপ চুপ করে থাকল।
তবুও বলবে সুচরিকে ভালোবাসো?
জয়দা, এ অন্য ধরনের ভালোবাসা।
ফিক্ করে হেসে ফেলল জয়।
হাসলে কেন?
অন্য ধরনের বলছ তাই।
আমি ঠিক বলেছি।
ব্যাখ্যা করে বললে বুঝতে সুবিধা হত।
আমার ভালোবাসা আমার, অন্যে কী ভাবছে, তা জানার দরকার নেই।
এমন অদ্ভুত ভালোবাসার কথা আগে কখনো শুনি নি।
আমি অন্যরকম বলেই আমার ভালোবাসাও অন্যরকম। লং-জাম্পে সুচরিতার জিতে যাওয়ার মতো আমিও জিতে যেতে চাই।
জয় না হেসে পারল না। সরল মন্তব্য, ভালোবাসা নিয়ে এমন গাছে কাঁঠাল গোঁপে তেল অবস্থা আগে কোনো দিন শুনি নি প্রদীপ।
ভালোলাগা ভালোবাসা এভাবেই গড়ে ওঠে জয়দা। তোমাকে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করব?
একটা কেন, হাজার কথা বলতে পারো।
তুমি তো বললে, সুচরির তালে নেই, তাহলে সুবিমলবাবু এত কিছু করলেন কেন?
সেকথা গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
তোমার নিজের মতামত কী?
এ নিয়ে ভেবে দেখি নি।
সব বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব সম্বোধন করে, তুমি সেই সম্বোধনটাকে এভাবে—।
সুবিমলদা আমার রাজনৈতিক জীবনে একমাত্র গুরুদেব, আমাকে হাতে ধরে সবকিছু শিখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের বই পড়ে এসব শেখার সুযোগ পাই নি।
বেশ বললে জয়দা। —তোমার কাছে এসেছি সুচরিকে পাব বলেই।
আমাকে কী করতে হবে বলো?
রায়বাবু যাতে আমার পথে কাঁটা হয়ে না দাঁড়াতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করো।
তাতেই খুশি?
আর কোনো চাহিদা নেই।
তাহলে তো উদ্যোগ নিতেই হয়।
সুবিমলবাবুকেই আমার যত ভয়, রাজনীতির লোক, কখন কী করে বসেন, সেই ভাবনায় রাতদিন জবুথবু হয়ে থাকতে হচ্ছে।
নিজের মতো করে চললে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।
ভয় থাকলে নিজের মতো করে চলা যায় নাকি?
এত ভয় হচ্ছে কেন বুঝলুম না।
বাব্বা, লোকটা খেলার মাঠে যে ত্রাস তৈরি করেছিলেন।
সে পর্ব তো চুকে গেছে।
ভিতরের ভয় যে এখনো যায় নি। নিজের মতো চলা বোঝাতে কী বলতে চাচ্ছ, একটু বলবে?
তুমি থাকলে তোমার মতো, সুচরি থাকল সুচরির মতো।
এতে ভালোবাসার সংজ্ঞা ধরা পড়ে না জয়দা। ওকে পাব বলেই তোমার কাছে এসেছি। তোমার কথা কিছুতেই ফেলতে পারবেন না সুবিমলবাবু, একটু চেষ্টা নিলে চুপ করে যেতে পারেন।
আরও কিছু বলবে?
এটাই একমাত্র অনুরোধ।
আজ সন্ধেয় দেখা হবে, তোমার কথা বুঝিয়ে বলব।
জানব কী করে?
দু একদিন পরে এসে জেনে নিও।
তাহলে আসছি জয়দা। কিছু মনে করলে নাতো?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক মেহেবুব আলম ক্লাসে অনেকবার বলেছেন, রাজনীতি হল সবচেয়ে বড়ো সমাজসেবা, দেশকে টেনে তোলার শ্রেষ্ঠতম হাতিয়ার। তুমিও রাজনীতি করলে পারবে, সেই সূক্ষ্ম বোধ রয়েছে তোমার মধ্যে।
প্রদীপ ক্ষণিক পুলকে ভাসল, চাপা স্বরে বলল, সত্যি পারব?
রাজনীতি হল সম্ভাবনার শিল্প, মানুষের আন্তরিক চেষ্টায় তা সার্থক হয়ে ওঠে।
নিজেকে আবিষ্কারের নতুন দ্যুতি পেয়ে প্রদীপ একটু হাসল। দু’চোখের সামনে সুবিমলের ছবিটা একবার ভেসে উঠে নিভে গেল। ভাবনার নিবিড়তায় নিজেকে অনেকখানি উদ্বুদ্ধ করে তুলল। রায়বাবুকে নরম করতে পারলেই তার চলার পথে আর কোনও কাঁটা থাকবে না। ভেতরের বাড়তি খুশি ছবি হয়ে ভেসে থাকল মনের ইজেলে। জয়ের মনে সুচরি আদৌ নেই, এ ভাবনায় প্রদীপ আরেকবার দুলে উঠল অথচ খামাখা টানা দুদিন তাকে রায়বাবুর কাছে যথেষ্ট হেনস্থা হতে হয়েছে। হৃদয়ের গভীরে প্রশ্ন একটাই, রাজনীততে এত পোক্ত হয়েও সুবিমলবাবু সুচরির সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা ঠিকমতো বুঝতে পারলেন না কেন?
প্রদীপ চলে গেলেই জয়ের মধ্যে নতুন আক্রোশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। এভাবে জানাতে আসাকে সে স্পর্ধা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারল না। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে প্রদীপকে যে আর থামানো যাবে না, তাও ভাবল। দুপুরে খেতে গিয়ে গুরুকে উসকে দেওয়ার জন্যে মনে মনে প্রস্তুতি শুরু করল। এও ভাবল যে গুরুর কান ভাঙিয়ে প্রদীপকে এলাকা ছাড়া করতে না পারলে তার মনের গলিটা কিছুতেই রাজপথ হয়ে উঠতে পারবে না। প্রদীপ যে কাঁটা সরিয়ে সুচরিকে একান্তভাবে কাছে পেতে চাচ্ছে, সেই কাঁটা জয়ের শরীর মনে ভীষণ যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠল।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব জয়কে বেশ কয়েকবার নাড়া দিল, যে কোনো সূত্রে সুচরির মধ্যে রাজনীতি ঢুকিয়ে দিতে হবে। নেতৃত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা পেলে কিছুতেই না বলতে পারবে না। তখন বুঝবে, জয় কে, এলাকার আম-মানুষের উপর তার প্রভাব প্রতিপত্তি কতটা গভীর। স্থানীয় রাজনীতিতে সে যে সেকেণ্ড ইন কম্যাণ্ড, সেই সত্য বুঝতে পারলেই নরম হতে বাধ্য হবে।
দ্বিতীয় সরল সমাধান সূত্র জয়কে বার বার নাড়া দিতে থাকল। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, সেই পর্ব মিটে গেলে পরস্পর দেখা সাক্ষাতের সময় তলানিতে ঠেকে যাবে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গুরুর পরামর্শ মেনে রাজনীতিতে নামাতে পারলেই সুচরির সঙ্গ পাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যাই থাকবে না। পাশাপাশি অবস্থানের ফলে এতদিন প্রদীপ যে সুযোগ পাচ্ছিল, তা তার হাতে চলে আসবে। সুচরিতা বুঝতে বাধ্য হবে, রাজনীতির চাপ কী জিনিস, গুরুর কথা অমান্য করে চলা কত বেশি ঝুঁকির, দুপুরে খেতে গিয়ে কী কী বলে গুরুকে খেপিয়ে তোলা সম্ভব তারও একটা ছক কষে নিল। শুধু জানতে পারল না, স্বয়ং সুবিমল রায় স্ত্রীশূন্য জীবনে শরীরের পাশবিক কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে সুচরির প্রতি কতখানি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। রাজনীতির খেলা সরল অঙ্কের মতো হলেও পিছনে তা কখনো জটিল,কখনো জটিলতম।

চলবে…

পরবর্তী পর্ব

মুসা আলি
মুসা আলি
শিক্ষক জীবনের ৫৫ বছরে এসে সাহিত্যচর্চা শুরু। ইতিমধ্যে পঞ্চাশের বেশি উপন্যাসের মনসবদার। গল্প উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় কঠোর বিশ্বাসী। এখন বিদগ্ধ পাঠক শুধুমাত্র কাহিনি বা চরিত্র খোঁজেন না বরং তার ভিতরে লেখক এর নিজস্ব গভীর মনন আবিষ্কার করতে চান। ঔপন্যাসিক মুসা আলি দীর্ঘ জীবন পরিক্রমার জাদুতে তার নিজস্ব মনন দিয়ে বাঙালি পাঠককে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ করে তুলতে বদ্ধপরিকর।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ১০

"তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ" কবিতাটা খুব কঠিন কবিতা। বুঝলি...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৯

রাত এগারোটা নাগাদ মোহন বাড়ি ফিরছে, ফতেপুর থেকে। সাহিত্য...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৮

মোহনের পরীক্ষা আর দিন সাতেক বাকি। লাস্ট মিনিট সাজেশন...

প্রবহমান: পর্ব – আট

পূবিতে সূয্যি ওঠে পশ্চিমিতে চানঘরে আমার মানিক জ্বলে আসেন...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।