সোমবার, নভেম্বর ২৮, ২০২২

‘আমি তো মোহন কাওরা’ দ্বিতীয় পর্ব

প্রকাশিত:

দ্বিতীয় পর্ব

সনাতনের ছোট ছেলে মোহন গিয়েছিল গোবিন্দপুর। রায়চকের একটু আগে। গোবিন্দপুর কৃষি বিদ্যালয়ে সে পড়ে। ইলেভেন ক্লাসে। ওখান থেকে গঙ্গা খুব কাছে।‌‌ বাসে উঠলে কয়েকমিনিট লাগে। গঙ্গার কাছে মোহনের বন্ধু দীপঙ্কর থাকে। ওদের বাড়িতে সে অনেকবার গেছে। দীপঙ্করের মা শুনেছে,ওর মা নেই। সেজন্যে ওর প্রতি দীপঙ্করের মায়ের খুব মায়া পড়ে গেছে। এবারের বড়োপূজাতে দীপঙ্করের মা মোহনকে সুন্দর একটা জামা দিয়েছে। খুব পছন্দ হয়েছে, মোহনের। ওই জামাটাই এখন ওর শেষ সম্বল। সামনে পরীক্ষা। ঠিকমতো প্রাইভেট টিউশন নেই।
উচ্চমাধ্যমিকে ভাল তো করতেই হবে। তার আগে ইলেভেন ক্লাসের রেজাল্টা তো ভাল করতে হবে। কিন্তু মোহনের আজকাল পড়াশুনাতে মন বসে না। অভাবের কথা আগে সে তেমন বুঝত না। সবকিছুর প্রতি ভাল লাগা ও ভালবাসা ছিল। কতকিছু না পাওয়ার মধ্যেও গভীর সুখ ছিল। এই পাইকপল্লী ছিল,তার আনন্দমঠ। এখন সে নিরন্ন পাইকপাড়ার দিকে তাকিয়ে ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত হয়। একটা একটা করে ছেঁড়া ডায়েরির পাতায় সে কবিতা লেখে। কবিতার মধ্যে তাদের জীবনের জলছবি, সুখ-দুঃখ আঁকা হয়ে যায়। লেখার মধ্যে সে সান্ত্বনা খুঁজে পায়। সে নিজেকে নিজে বোঝানোর চেষ্টা করে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে লেখাপড়ার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে চায়। মনে মনে সে আলো এঁকে চলে। পাইকপাড়ার দুরবস্থা তাকে সবসময় ব্যথিত করে। সে বুঝতে পারে, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে,এই পাড়াতে, গাঁয়ে। পরিশ্রমের বিকল্প নেই, ঠিক কথা। কিন্তু পরিশ্রমের জন্যে সঠিক জায়গা নির্ধারণ করতে হবে। গাধার মতো খেটে যাওয়াটা লড়াই নয়, লড়াই তো তাকে বলে, যে লড়াইয়ের শেষে আলো দেখা যায়, জীবনের আকাশে সূর্য ওঠে। শুধু একমুঠো খেতে পাওয়ার জন্যে মুখ রগড়ে যাওয়া কোনও লড়াই নয়, টিকে থাকার চেষ্টা মাত্র।
মোহন শিরদাঁড়া সোজা রেখে হাঁটতে চায়, তাদের সমাজের অন্ধকার তাকে লাথি মেরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে চায়। সে যেন দৌড়ে পালাতে চায়। পালানোর কোনও রাস্তা সে পায় না। প্রায়দিন মায়ের কথা মনে পড়ে। মা ভাত বেড়ে ডাকছে। ডাল,আলু ভাতে ভাত। মাছের ডিম। গালে তুলে খাওয়াচ্ছে। মোহনের মায়ের মুখটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু মাকে স্বপ্নে সে স্পষ্ট দেখতে পায়। মায়ের সঙ্গে কথা বলে। মা যেন তার তক্তোপোষের মাথার ধারে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মোহন বলে ডাকে।
– খাবি আয়,বাবা। ভাত বেড়িচি। আয় বাবা। ক গাল খেয়ে যা।
দুধ দিতে পারিনি, সন্দেশ দিতে পারিনি। ভাত খে নে বাবা। বাছাধন।

সুপারি পাতার গাড়ি নিয়ে সে ব্যস্ত। মোহন বসে আছে। বৃন্দাবন ছন্দে ছন্দে টানছে। মোহন খিলখিল করে হাসছে। স্বপ্নের মধ্যে মায়ের ছেঁড়া কাপড়টাও সে দেখতে পায়। কষ্ট হয়। মাঝেমাঝে ঘরে চাল থাকে না।
মুড়ির টিনে মুড়ি থাকে না। তেলের কৌটোয় তেল থাকে না।
পাড়ার দোকানদার বলে, আগের টাকা না মেটালে বাকি আর দেবে না। বেলা গড়িয়ে যায়,সবাই না খেয়ে থাকে। অভাব একাই যেন রাজা হয়ে বসে আছে,তাদের ঘরকন্নার ভেতর।‌তাদের কাজকর্মের ভেতর।‌অভাবের মতো বড় আত্মীয় পাইকপাড়ায় আর কেউ নেই।মাধবের বউ মোহনের জন্যে একবাটি ছাগলের দুধ দিয়ে যায়। ওইটুকু খেয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর সন্ধ্যের আগে সনাতন চাল,আলু আনে। একমুঠো ফুটিয়ে দেয়। সবাই চেটেপুটে খায়। এরকম অগোছালো কত ছবি শিমুল তুলোর মতো ওর মাথার ভেতরে ভেসে বেড়ায়। ছবিগুলো সে মুঠো করে ধরতে চায়। পালিয়ে যায়। সেই ছবি মোহনের কবিতার ছেঁড়া ডায়েরির পাতায় এসে ধরা দেয়। মোহনের আশ্রয় হয়ে ওঠে,এই লেখালেখি।
মোহন লিখতে বসে বিছানায়,ঘরের ভেতর। বিছানার তলায় কটা মাটির মালসা। ইঁদুরে মাটি তুলে ঢিবি করে রেখেছে। চাল রাখার জালা,ঘরের ভেতরের একপাশে। ছেঁড়া কাঁথার বিছানা,চাদর নেই। দুটো কাঠের মতো শক্ত বালিস, ঘরের ভেতরটা অজস্র আরশোলার সংসার। দিনের বেলাতেও তাদের দাপাদাপি। একটু স্যাঁত স্যাঁতে ভাব, আঁশটে গন্ধ। বোঝা যায়, ঘরের ভেতরে দীর্ঘদিন মেয়েলি মনোযোগ পড়েনি। লক্ষ্মীর চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই, সে তো একা পেরে ওঠে না। মোহনের আরও ছটা বউদি,তারা যে যার মতো জেরবার। ওদের টালির চাল হলেও খানিকটা খড় চাপানো, এই ঘরটায় সনাতনের ঘর। একে একে ছেলেরা বিয়ে করে সনাতনের সংসার থেকে নেমে গেছে। উঠোন লাগোয়া ঘর তুলেছে। সনাতন এখন দাওয়ায় থাকে। বড় ভাইপোকে নিয়ে সে এই ঘরেই থাকে। মোহন এই ঘরের বিছানায় বসে সামনে তাকালে পাল্লা শূন্য জানালার বাইরে আকাশ দেখতে পায়। দূরের আহ্বান শুনতে পায়। মায়ের জন্যে মন কেমন করে। মাকে দেখার মতো তাদের ঘরে একটাও ছবি নেই। অভাবের সংসারে ছবি তোলার মতো বিলাসিতা তাদের ছিল না, আগামীদিনে সেই বিলাসিতা কখনও আসবে কিনা কোনও নিশ্চয়তা নেই। মোহনের কল্পনা বিলাসী মন নিজের মতো করে মাকে এঁকে যায়।‌মাকে সাজিয়ে সাজিয়ে দেখে। কী অপূর্ব তার মা। মুখে শান্তির সকাল লেগে আছে। সন্ধ্যার গান লেখা আছে। আরও কতকিছু তার চোখে আলোর মতো পাক খায়। দখিনের বাদার দিকে সবেদা বাগানের ছায়া তার বড় ভাল লাগে। সময় পেলে সে বাগানে চলে যায়। এই বাগানের ছায়ার ভেতর সে মাকে খুঁজে পায়।
ঘরের ভেতর ছড়িয়ে আছে
মায়ের পায়ের ধুলো
সেইধুলোতে জড়িয়ে আছে
সুখের সেদিন গুলো ….
একদিন খুব খিদে পেয়েছে, মোহনের। বড় বউদি বাগানের দিকে জ্বালানি আনতে গেছে। কলসিতে হাত ঢুকিয়ে দেখল, পাকা সবেদা একটাও নেই। তারকদের গাছের সবেদা, ওকে দিয়েছিল। কলসিতে রাখলে দু-এক দিন থাকলে পেকে যায়। গাছ থেকে পড়ে ফেটে গেলে পচে যায়। ও বুঝতে পারল, ভাইপো খেয়েছে। দু একটা সবেদা অন্য ভাইয়ের ছেলেমেয়েরাও খেতে পারে। বড় বউদি তো যতক্ষণ থাকে,দিয়ে যায়। বাড়িতে অনেক লোক কে কখন হাত ঢুকিয়ে খাবে,বলাও যায় না। তার জন্যে একটাও নেই দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবল, খেলতে চলে যাই , খিদের কথা মনে থাকবে না।
সে খেলতেই চলে গেল,মাঠের দিকে। তখন আষাঢ় মাসের বৃষ্টিতে মাঠে জল জমে গেছে। লোহার তার দিয়ে আঁকশির মতো করে অনেকে দক্ষিণের মাঠে কাঁকড়া ধরছে। মাছও ধরছে। মোহন পাইকপাড়ার ছেলে হলেও এসব তার ভাল লাগে না। সবেদা গাছের ডালে পা দুলিয়ে সে দেখছে, তার দাদা বৃন্দাবন মাছ ধরছে। পাড়ার ছেলেরাও মাছ-কাঁকড়া ধরছে। পুঁটে,কালো, ভূতো, লালু, লাটাই, বীরু, পলাশ অনেকেই আছে। জল ঘাঁটছে। লাফাচ্ছে, জলের ওপর শুয়ে পড়ছে। বর্ষার নতুন জল থই থই করছে। দক্ষিণের মাঠ যেন টলটলে গঙ্গা। সবেদা গাছের ডালে বসে সে মনে মনে নৌকা চালাতে লেগে গেল। সে দেখতে পেল, চারপাঁচটা জমির পর জগাদের জমি। শালুক ফুলে ভরে আছে। সে খুব আশ্চর্য হল,এই তো ক’দিন আগে এখানে শামুক-বুড়ি খেলা হল। এর মধ্যে শালুক ফুল ফুটে গেল। সবেদা গাছের ডাল থেকে সে লাফিয়ে নামল। দৌড়ে গেল, শালুক ফুটে থাকা সেই জমিতে।
– কী সুন্দর। ছবির মতো। তোদের খিদে পায় না। স্কুলে যেতে হয় না।
মন খারাপ করে না। সুন্দর ঝলমলে চোখে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা।
এরকম কত কথা সে মনে মনে বলল। তারপর মাঠ থেকে কটা শালুক ফুলের ডাঁটা ছিঁড়ে সে হাতে নিয়ে চিবোতে লাগল।

মোহনের ওপরে সাত দাদা। যুগলকিশোর চাষবাস করে। অনেকে বলে খুব ভাল কোদালি। যুগলের নীচে বীরেন। সেই ষোল বছর বয়স থেকে গলায় তুলসীর মালা। হরিনামের দলে হারমোনিয়াম বাজায়। কীর্তন করে। বীরেনের পরের দুই ভাই বৃন্দাবন আর শম্ভুনাথ। দুজনেই চুপড়ি-ঝোড়া বোনে। ঢাক বাজায়। কেওড়া বাজনা বাজায়। অবরে সবরে আবার, লোকের বাড়ি জন খাটতেও যায়।তবে বাজনা বাজানো এদের হকের পেশা। কাজের প্রয়োজনে এদের অনেকেই অনেক কিছু করে। কিন্তু সবাই বাঁশ-কঞ্চির জিনিসপত্র বুনতে জানে। এটা এদের রক্তে আছে। সহজাত। মাছ ধরার ছিপ থেকে শুরু করে ঘুনি,মুগরি,আটল,বাঁকি সবই ওরা বুনতে পারে। সনাতন ভাল জাল বুনতেও জানে। মেজোটা তো পুরো বাবার গুন পেয়েছে। গান-বাজনার ঝোঁক সনাতনের ছেলেবেলা থেকে।তরজা শোনা,গাজন শোনা তো ছিলই। তারসঙ্গে মাঠে মাঠে যাত্রাগান শোনা সনাতনের অল্পবয়সের বিলাসিতা ছিল। খাওয়া হোক না হোক, গানবাজনা পেলে সব ভুলে যেত। অসাধারণ হারমোনিয়াম বাজাত।‌ এখন আর ওসবে হাত দেয় না। এসব সে শিখেছিল,পাড়ার চৌকিদারের বাবার কাছ থেকে। এখন আর তার নাম সনাতন মনে করতে পারে না। মেজো ছেলেটা তো গান-বাজনা করেই পেট চালায়। সংসার চালায়। সনাতন জাহাজের মতো সংসারটা চালাত বেশ কষ্ট করে। পাইকদের বাবাকেলে কাজবাজ তো ছিলই, তারসঙ্গে তামাকের ঠেসের তামাক ব্যবসায়ীদের গাড়িতে ড্রাইভারী করত। গাড়ির ব্যাটারীতে সনাতন একবার কিভাবে পুড়ে গিয়েছিল। অনেকেই বলে গায়ে অ্যাসিড জল লেগে পুড়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে অনেকদিন সে অসুস্থ ছিল। কোমড়ের নীচের দিকে বিচ্ছিরি ভাবে পুড়ে গিয়েছিল। তারপর আর কাজে যাওয়া হয়নি। ওরা ডাকলে হয়তো চেষ্টা করত, আর ডাকেনি। বাড়িতেই বসে আছে, কতদিন হয়ে গেল। পাঁচ সাত বছর তো হবেই। তার হাতে কোনও টাকাপয়সা নেই। বয়স তো হয়েছে। ওই বয়সে অনেকেই চনমনে আছে। কিন্তু কাজ হারিয়ে সে যেন আরও বুড়ো হয়ে গেছে। পাইক বংশের ছেলে হয়েও সে ড্রাইভার হয়েছে বলে গর্ব ছিল, সেই গর্বের দিন এখন শেষ। ছেলেগুলো বড় হয়েছে। না খেতে পেয়ে মরেনি। মানুষ করতে পারল না বলে, সনাতনের চাপা দুঃখ আছে। মানুষ বলতে কেউ একটা চাকরিবাকরি করার উপযুক্ত হয়নি। বাইরের সমাজে ঘুরে ঘুরে সে দেখছে চাকরিবাকরি করার মজা। কত পয়সা। যা ইচ্ছে করা যায়, জাহাজের মতো ঘরবাড়ি করা যায়। কেউ পারল না। চুপড়ি-ঝোড়ার বাঁশ-কঞ্চি নিয়ে কেটে গেল। এটা তাদের পরম্পরা হলেও বদল তো চায়। সনাতন এখন আর সেসব আশা করে না। ছোট ছেলেটা পড়াশুনায় ভাল, ওই একমাত্র ভরসা।
শম্ভুনাথের পিঠোপিঠি আরও তিনটে ভাই। শশধর, ভূষণ আর নীলু।
তিনজনেই চাষবাস নিয়ে থাকে। ভোরবেলা জাল টানে। বিভিন্ন গ্রামে ভোরবেলা পুকুরে জাল দেওয়া হয়।এদের ডাকলে তো আগের দিন রাত থেকে ছইয়ের ফেলে পুকুর পাড়ে থাকে। ভোর ভোর জাল দেওয়া হলে মজুরি পায়। গামছার ভেতরে একটা আধটা মাছ কায়দা করে ঢুকিয়ে বেঁধে রাখতে পারলে মাছের ঝোলটা হয়ে যায়। বিক্রি করলে গাঁজার পয়সাটা তো হবেই। তারপর খোড়োকালের ধান চাষে শশধর মাঠে মাঠে দমকলে জল দেওয়ার কাজ করে। ওর নিজস্ব দমকল নেই। ও ডিউটি করে টাকা পায়। ধান জমিতে বিষ দেয়। ধান‌ ঝাড়াই-মাড়াই করে। ধান ঝাড়া আগোর হোক, আর মেশিন হোক, কোনো কিছুতেই তার অসুবিধা নেই।
ভূষণ,নীলু হাঁড়িতে করে মাছ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরে। ওরা সারাবছর ফুরসত পেলেই পুকুর চাষের মাছ বিক্রি করে। কেউ মাছের বায়না দিলেও পৌঁছে দেয়। ওরা কথা ফেল করে না। বাড়ির বউগুলো কখনও মিল , কখনও অমিল, যে যার মতো থাকে। সময় বের করে বিড়ির সুতোতে পাক দেয়। সংসারের টুকিটাকি খরচা চলে যায়। সকলের হাঁড়ি আলাদা। এই বাড়িতে সনাতনের সম্মান আছে। ঝগড়া-অশান্তি হলেও তার মুখের ওপর বড় বড় কথা কেউ কখনও বলেনি। সে নিজেই ছোট ছোট করে কথা বলে। বউমাদের মা ছাড়া কথা বলে না। নাতিপুতিরাও সনাতনকে পছন্দ করে। ভালবাসে। মেনেও চলে। মোহনের এখনও বিয়ে হয়নি। সে বড় বউদি লক্ষ্মীর কাছে থাকে।লক্ষ্মীর নিজের দুটো ছেলে থাকলেও মোহনকে সে নিজের বড়ো ছেলে মনে করে।
মোহনের মা লক্ষ্মীর হাতে ধরে বলে গেছে, ‘মোহন আমার দুধের বাচ্চা। ওকে দেকিস রে লক্ষ্মী। তুই ছাড়া ওর দেকার কেউ নি।’
ঘরের দাওয়ায় মানুষটা অসুস্থ অবস্থায় অনেকদিন কাটিয়েছে। যেদিন দাওয়া থেকে একেবারের মতো নেমে চলে গেল,লক্ষ্মীর বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল। সনাতনের গিন্নি লক্ষ্মীকে বড়ো মেয়ের চোখে দেখত। তার তো কোনো মেয়ে ছিল না। লক্ষ্মীও কথা রেখেছে।‌ মোহনকে আগলে রেখেছে। অভাবের আগুনে পুড়তে পুড়তে নিজের ছেলেকে কাজে পাঠিয়েছে। কিন্তু ছোট দেওরকে সে স্কুলে পাঠিয়েছে। এই বাড়িতে স্কুলে যাওয়াটা বিলাসিতা হলেও মোহনের স্কুলে যাওয়া কেউ আটকে দেয়নি। না খেয়ে না দেয়ে লক্ষ্মী দেওরকে খাইয়েছে। মোহন সেসব কথা মনে রাখবে কিনা, বড়ো হয়ে মানবে কিনা, কোনকিছুই সে ভাবেনি। আগলে রেখে রেখে মোহন ক্লাশ ইলেভেনের ছাত্র। বড় বউদি স্বপ্ন দেখে,মোহনটা বড়ো হয়ে সুন্দর একটা ছাদ ফেলা ঘর করবে। ঘরের ভেতরে তখন আর জল পড়বে না। বৃষ্টির রাতে আর হাঁড়ি বসিয়ে রাখতে হবে না। আরও অনেক স্বপ্ন সে দেখে। সে ছাড়া এই বাড়িতে উন্নতি করবার মতো তো কেউ নেই। সেই একমাত্র মোটা মোটা বই পড়ে। বড় বড় খাতায় লেখে। কত ছবি আঁকে। মাটির দাওয়ায় ঝ্যাঁতলা পেতে সে যখন পড়তে বসে,গোটা বাড়ি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। অনেক কাজের মধ্যেও এই বিস্ময় মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। লেখাপড়া করার কি স্বাদ এবাড়ির কেউ তো জানে না। কিন্তু মোহনের লেখাপড়া শেখার প্রতি সকলের ভাল লাগা আছে। পাড়ার লোকেরও ভাল লাগা আছে। কারও কিছু দরকার হলে তার কাছে সবাই জানতে আসে। সে-ই সবাইকে কাগজপত্র পড়ে দেয়। তার ব্যবহার নিয়ে কেউ কখনও কোনও অভিযোগ করেনি। বরং এই পাড়াতে সে ক্রমশ প্রদীপের আলোর মতো জ্বলে উঠছে। তার সামান্য সামর্থ্য দিয়ে সে গোটা গ্রামকে আলো দেখানোর চেষ্টা করছে। সে কতটুকু পারবে,আদৌ পারবে কিনা, এখনও তার ধ্বনি ওঠেনি, শুধু একটু আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গৌতম, নবীন দা, মাধব দার মতো উৎসাহী কিছু মানুষ নিয়ে সে একটা স্কুল গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে। যেখানে দুবেলা ছোটদের পড়ানো হবে। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের এক মহারাজ এসেছিলেন,এই এলাকায়। মোহনকে খুব উৎসাহ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে পাইকপাড়ায় যে খাস জায়গাটা আছে, সেখানে মাটি ফেলে উঁচু করা হয়েছে। বাঁশ কেটে চালা তৈরি হয়ে গেছে। খড় চাপানো চলছে।‌ এরপর কঞ্চি দিয়ে বাতা মেরে ছিটেবেড়ার দেওয়াল বানিয়ে কাদা ধরানো হবে। এখানেই মোহন পাড়ার ছেলেদের দুবেলা পড়াবে। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ থেকে কিছু সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছে।
ঘরটা বানাতে খরচ কিছু হয়নি,সব তো ঘরের। ভান্ডু কাকা ঘরামির কাজ করে। ক’দিন ভোর বিনা রোজে কাজ করে দিয়েছে,পাড়ার ছেলেরা লেখাপড়া শিখবে,দুবেলা পড়বে। তার খুব আনন্দ। দড়ি,পেরেক যা লেগেছে নবীন দা এনে দিয়েছে। নবীন দা সবসময় পাড়ার ছেলেদের উৎসাহ দেয়, যদি দুটো-একটা গলে গালে মানুষ হয়ে যায়, লেখাপড়া শিখে কিছু করতে পারে,তখন সকলের গর্ব হবে। পাইকপাড়ার ছেলেরা এই নতুন গড়ে্ ওঠা চালাঘরে ক’দিন ভোর হইচই করছে। কাছেই তো স্কুল আছে,সেখানে যাওয়ার আগ্রহ কেন থাকবে না। কারণ সেখানে মাস্টারমশাই,দিদিমণি আছে। না পারলে বেত মারবে।‌সকলের সামনে বকাবকি করবে। আর এখানে মোহন দা পড়াবে। অনেক বড়লোকের ছেলেপুলে আছে,যারা ঘরে ভাত খেতে চায় না। কিন্তু কোথাও বনভোজন হলে চেটেপুটে খায়। পাইকপাড়ার ছেলেপুলেদের গড়ে ওঠা চালাঘর ঘিরে যে আগ্রহ তা অনেকটা বনভোজনের মতো হুজুগের আনন্দ। শাসন শূন্য পাঠশালা। মোহন দার পাঠশালা। এখনও শুরু হয়নি, আগে থেকেই হুল্লোড় পড়ে গেছে।

চলবে…

আমি তো মোহন কাওরা- পর্ব এক

অবশেষ দাস
অবশেষ দাস
জন্ম: দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা। বাবা গৌরবরণ দাস এবং মা নমিতা দেবী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দুটোতেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এছাড়া মাসকমিউনিকেশন নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিদ্যানগর কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক। প্রথম লেখা প্রকাশ 'দীপশিখা' পত্রিকার শারদ সংখ্যায়। তাঁর কয়েকটি কবিতার বই: মাটির ঘরের গল্প ( ২০০৪), কিশোরবেলা সোনার খাঁচায় (২০১৪), হাওয়ার নূপুর (২০২০) সহ অজস্র সংকলন ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কবিতা চর্চার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের চর্চা সমানভাবে করে চলেছেন। কবি দুই দশকের বেশি কাল ধরে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সংকলনে। বেশকিছুদিন সম্পাদনা করেছেন ছোটদের 'একতারা' সাহিত্য পত্রিকা। এছাড়া আমন্ত্রণমূলক সম্পাদনা করেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক দুটি অন্যধারার প্রতিষ্ঠান 'বাংলার মুখ' ও মেনকাবালা দেবী স্মৃতি সংস্কৃতি আকাদেমি।' তাঁর গবেষণার বিষয় 'সুন্দরবনের জনজীবন ও বাংলা কথাসাহিত্য।' পাশাপাশি দলিত সমাজ ও সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। ফুলের সৌরভ নয়, জীবনের সৌরভ খুঁজে যাওয়া কবির সারা জীবনের সাধনা। সবুজ গাছপালাকে তিনি সন্তানের মতো ভালবাসেন। সুন্দরবন তাঁর কাছে আরাধ্য দেবী। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার ও সম্মান: সুধারানী রায় স্মৃতি পুরস্কার (২০০৪), বাসুদেব সরকার স্মৃতি পদক (২০০৬), রোটারি লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ১০০ ডায়মণ্ড গণসংবর্ধনা (২০০৮), পাঞ্চজন্য সাহিত্য পুরস্কার (২০১০), শতবার্ষিকী সাহিত্য সম্মাননা (২০১১), এশিয়ান কালচারাল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), ডঃ রাধাকৃষ্ণন সম্মাননা (২০১৫), ডি.পি.এস.সি. সাহিত্য সম্মাননা (২০১৮), আত্মজন সম্মাননা (২০১৯), বিবেকানন্দ পুরস্কার (২০১৯), দীপালিকা সম্মাননা (২০১৯), সংহতি সম্মাননা (২০২০), সুকুমার রায় পুরস্কার (২০২০)।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৯

রাত এগারোটা নাগাদ মোহন বাড়ি ফিরছে, ফতেপুর থেকে। সাহিত্য...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৮

মোহনের পরীক্ষা আর দিন সাতেক বাকি। লাস্ট মিনিট সাজেশন...

প্রবহমান: পর্ব – আট

পূবিতে সূয্যি ওঠে পশ্চিমিতে চানঘরে আমার মানিক জ্বলে আসেন...

‘আমি তো মোহন কাওরা’ পর্ব ৭

মোহন বাসের জন্যে অপেক্ষা করছে, খোর্দশাসন মোড়ে। রায়চক বাস...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।