শনিবার, নভেম্বর ২৬, ২০২২

গল্প: গর্ভ মা

প্রকাশিত:

কিগো, শান্তি আইজ এত্ত সক্কালে ছান কইরা নতুন শাড়ি পড়ছ, যাইবা কমনে?
হা আমার পোড়া কপাল, আইজ তো মহাষ্টমী, তিন বচ্ছর ধইরাই তো সন্ধিপূজায় এক্কেরে শাড়ি, শাঁখা-সিন্দুর দিয়া, উপাস থাইকা আমার সমুর নামে পূজা দেই।
হ্যাও কি ভুইল্যা বইয়া আছ?
সন্ধিপূজা তো অনেক রাইতের দিকে…
তোমার দেহি টাকা টাকা কইরাই মাথাখান গেছে গা, সন্ধিপূজা পঞ্জিকায় যেইবার যেমন ল্যাখা থাকে, সেই টাইম ধইরাই হয়। এই বছরে বেলা দুইটায় টাইম, একটা তো বাইজাই গেছে গা, তাই তোড়জোড় করতাছি। এর লেগেই সমুরে পাঠাইছি, ও আরম্ভ হওনের আগেই আমারে কইতে আইবে। মোটা মাথায় ঢোকছে এহনে?
হ বুঝছি, কিন্তুক তোমার লগে একখান জরুরি কথা কওনের আছিল… যা কইবা কইয়া ফালাও, ধানাই-পানাই করতাছ কেন?
কাইল রাইতে দোকান বন্ধ করনের টাইমে বিনোদ ডাক্তারের এসিসট্যান সুবল আইয়া কয়, ডাক্তারবাবু তোরে এহনই ডাকতাছে।
সে ডাক্তারবাবু এরোম কইরা আমার হাত দুখান ধইরা কইল, সুনীল এইবারকার মতোন আমারে বাঁচা। লণ্ডনের পাটি, ম্যালা টাকা দেবার চায় , তয় তাগো তোমার প্যাটই চাই। নাইলি বিনোদ ডাক্তারের লগে তাগো কুনো কাম নাই…
এর লাইগাই এতখন ধইরা ধানাইপানাই? মোর এসব বেপারে সব কথা তো তিন বচ্ছর আগেই শ্যাষ হইয়া গেছে গা।
না না, আজ এই মহাষ্টমীর দিনে, তোমার মুখ থেইকা এমন কথা আইল কেমনে, আমি তো ভাইবাই কুল পাইতাসি না?
কেন, মহাষ্টমীও তো অন্য দিনের লাখানই একখান দিন, হেই দিন কোন কথা কইবার বারণ আছে নাকি? আমার কথাখান একটু ভাইবা দেখ…
আমি তো তোমারে বারবারই কইয়া রাখছি, এইডাই শ্যাষ, আর সারা জনমেও ঐ কামের নামই করবা না।
দেখ সমুর বাপ, একদিন আমি অবস্থার ফেরে পইরা ডাক্তারদাদার দিদিমনির কথায় রাজি হইয়াই এই কামে লামছিলাম। তোমার লগে দুই বছরের শিশু সমুরে থুইয়া কত কষ্টে ছয়ডা মাস কইরা কাটাইয়া আইছি।
হ যেহানেই যাই না কেন , হেরা আমারে এত সুখে রাখছে, ভালমন্দ খাওইছে, ফেরত পাঠাইবার টাইমে এক কাঁড়ি টাকা, জামাকাপড় সব দিছে। আগেই তো চুক্তি কইরাই হাফ টাকা তোমার হাতে গুঁইজা দিয়া গেছে। কিন্তু বাচ্চাডারে তিনমাস বুকের দুধ খাওইয়া ছাইড়া আইতে খুবই কষটো পাইছি।
তয় এহনে তার ফলও তো ভোগ করতাছি। কুঁড়ে ঘরের তন আজ কোঠা বাড়ি হইছে। ঘর সাজানের যতরকম জিনিস আছিল, আমাগো ঘরে কোন জিনিসটার অভাব নাই, তোমাগো চেনাজানা মানষের ঘরে যা নাই, আমাগো ঘরে তা আছে।
তোমার বড় দোকান হইছে, কামের মানুষ থুইয়া গদিতে বইয়া খালি টাকারই হিসাব করতাছ। বাড়িতেও কামের মানুষ রাখছি, এত পাইয়াও তোমার সেই আগের লাখান চাহিদার অন্ত নাই। অতি লোভেই তাঁতী মরে জানবা।
ও শান্তি তুমি রাগ হও কেন, তোমার তো শরিল-গতিক সব ঠিকই আছে, কুনো রোগ বালাই নাই, সবে তো পাঁচ তিরিশ হইছে, দ্যাখলে এহনও আমার নিজেরই লোভ হয়…
তোমার মুখে আগুন, দ্যাখতে দ্যাখতে তোমার বয়সখান তো পঞ্চাশ হইয়া পড়ল, তবুও ছোঁকছোঁকানি গেল না?
আমি কি কিছু করছি তোমারে, এখন তো আমাগো ঘরও আলাদা, এমনিই কইতাছিলাম। শান্তি, আমি তোমার সব কথাই তো মানতাছি, তুমিই একার চেষ্টায় কঠিন ব্যামোর তন আমারে ভালো ডাক্তার দেখাইয়া নার্সিংহোমের অত্ত খরচ মিটাইয়া বাড়ি লইয়া আইছ, কইতে গেলে আমারে নতুন জনম দিছ। সব শখ আহ্লাদ মেটাইয়া ঘর-বাড়ির তন জিনিসপত্তর, আবার সমুরে ভালো ইস্কুলে পড়নের সব খরচ দিতাছ…
তবু এই শ্যাষ আবদারটা আমার যদি রাখতা…
আবার কিয়ের আবদার তোমার? মানষের চাহিদা সারা জনমেও মিটে না… যাই কও আমি আর কিছুতেই পারুম না। সেই তিন বছর আগে কাম সাইরা এক্কেরে গঙ্গায় ডুব দিয়া মা গঙ্গারে মনেমনে কইয়া আইছি, মাগো অপরাধ যদি কিছু কইরাই থাকি, সে তো সোয়ামী পুত্রের লাইগাই করছি। আজ পণ করতাছি আর কহনোই অমন কাম করুম না, তুমি আমার সক্কলেরে ভালো রাইখো।
আর এই পূজার সময় সন্ধিপূজার উপাস থাওনও সোমসারের মঙ্গল কামনার লাইগাই…
আরে, সমু তো এহন সেবেনে পড়তাছে, ভোবিষ্যতে ওর লাইগা কত কত টাকার দরকার, হেইডা তো ভাববা নাক?
কেন, সমুর লাইগা যে ব্যাঙ্কে পাঁচ লাখ রাখছিলাম ফিক্স কইরা, তা বাদেও তো তোমার আমার জয়েন বইতেও টাকা রাখছি, আমার সমুরে আমি ভালো কইরা মানুষ করবোই…
কাম সারছে, চললা কই? এতোগুলান কথা তো কইলা, তয় ব্যাঙ্কের বইগুলানও দেইখা যাও…
শান্তিরও মনে মনে কয়দিন ধইরা ইচ্ছা হইছে বইগুলান দেখনের। বই যহন করছে অ আ জানতাম না, টিপছাপ দিছি, মিনসে তো জানেই না আমি এহনে মিনাদিদির থেইকা দ্বিতীয় ভাগও পড়ছি, যোগ-বিয়োগ অঙ্কও শিখছি। নিজের নামও লেখতে পারি…
এই লও, দেহ ব্যাঙ্কের বই… (মনেমনে ভাবছে কত মুরোদ, অ আ জ্ঞান নাই)
শান্তির কথায় চমকে উঠল সুনীল…
এডা কি হইছে সমুর গার্জেনের জাগায় তোমার নাম লেখছ আর এডা তো ফিক্স হওনের কথাই আছিল, তুমি তো ফি মাসেই টাকা তুইলা পেরায় শ্যাষ কইরা আনছ, ভাগ্যি আজ দেখতে লইছিলাম… আমাগো জয়েন একাউন্টে তো পাঁচ লাখের মদ্যি মাত্তর পঁচিশ হাজার পইড়া আ।।।
কি সব বলতাছ শান্তি, তুমি তো পড়তেই…
পারত না, মা এখন ইংরাজীর ফার্ষ্টবুকও প্রায় শেষ করে ফেলেছে, বাংলার দ্বিতীয় ভাগ, দশের ঘরের নামতা পর্যন্ত সব মুখস্থ। তুমি সব টাকা তুলে নিয়ে আমাদের ফকির করে দেবে ভেবেছিলে, মা ইচ্ছে করলে তোমাকে পুলিসে দিয়ে জেলের ঘানি টানাতে পারে, তা জান?
তবে মা অত নীচমনা নয়, তাই বেঁচে গেলে।
মা, আর মিনিট দশেকের মধ্যেই সন্ধিপূজা আরম্ভ হবে, চল আমরা এগোই…
বাবা, তুই ডালাটা লইয়া আগোয়ে যা, আমি হাতমুখ ধুইয়া আইতাছি।
সমু চোখের আড়াল হইবা মাত্তরই শান্তি, তোমার সব কথাই আমার কানে আইছে অনেক আগেই, ছুতা খোঁজতে আছিলাম পাশবইগুলান দেখনের লগে, আইজ সুযোগ পাইয়াই, তোমার কিত্তির প্রমাণও পাইয়া গেলাম।
আধ ঘন্টা টাইম দিতাছি, তোমার জিনিসপত্তর লইয়া কাইটা পড়বা আমার বাড়ি ছাইরা, তয় দোকানডা আমি নিমু না, ওইডা তোমারে দেলাম। যদিও জানি দোকানে মালপত্তর কিস্যুই নাই। এহন নিজের মাগরে লইয়া যত্ত খুশি ফুত্তি কর, তার প্যাট ভাড়া খাটাইয়া আবার পয়সা কামাও… আমার সুমুখে আর কহনো যেন না দেখতে পাই…
ব্যাঙ্কের বইগুলো নিজের ঘরে রেখে তালা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল শান্তি, ঠাকুরতলায়।
সাঁজেরবেলা সমু ঠাকুর তলায় বাইর হইয়া গেলে পর সব তালা মাইরা নিজেই গেলাম বিনোদ ডাক্তারের লগে কথা কইতে।
নমস্কার দিয়াই বললাম, ডাক্তারদাদা এই আমি শ্যাষবারের মতোন আপনের কামডা করতে রাজি, তয় দুইখান কথা রাখতে হইব আমার।
হ্যাঁ শান্তি, বল তোমার কথা, নিশ্চয় রাখব।
সুনীল আর এর মইদ্যে মাথা গলাইতে পারবেনা, আমার লগেই পাটির কথাবার্তা আপনের সুমুখেই হইব, আর কয় মাস পরেই তো নোতুন বচ্ছরের পড়া শুরু হইবে। আগেই আপনের লগে কথা হইছিলো সমুরে কার্সিয়াং এর বোর্ডিং ইস্কুলে ভত্তির বেওস্থা কইরা দিবেন, এবার অরে ভত্তি করন লাগব।
সমু বড় হইছে অর সুমুখে প্যাটে লইতে পারুম না, আর টাকা সব আমার আর সমুর নোতুন জয়েন একাউন্টে জমা করন লাগব…
এই কথাগুলান যদি আপনে রাখবার পারেন, তয় আমি আপনের এবারের কামডা লইতে রাজি।
বুঝেছি, সুনীলের নামে আমার কানেও অনেক কথা এসেছে, আলপো টাকা পেয়ে ব্যবসাপত্র লাটে তুলে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে।
ঠিক আছে তুমি নিশ্চিন্ত থাক, এদিকে সব ঠিকঠাক করে তোমার সঙ্গে আমি নিজে গিয়ে ডিসেম্বরে সৌমেনকে বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে আসব। টাকাপয়সা যা লাগবে এখন আমিই দিয়ে দেব, পরে তুমি আমায় শোধ দিও।
মনডা এতক্ষণে ঠাণ্ডা হইল, আমি আইতাছি দাদা, ঠিক সময়েই আপনের কাম হইয়া যাইব, আইর চিন্তা নাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
মন্দিরা মিশ্র
মন্দিরা মিশ্র
তিনি একজন গল্পকার ও উপন্যাসিক। এ পর্যন্ত তার তিনটি সম্পূর্ণ উপন্যাস পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

কাঁটাতারে লাঠির সাঁকো

হেমতাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে টোটো চলছিল পকেট রুটের রাস্তা ধরে।...

তিমির অবগুণ্ঠনে/পৃথিবীর মাহসা আমিনিরা – ১ 

আমাদের স্কুলে মেয়েদেরকে উড়না এবং মাথায় ঘোমটা প’রে আসতে...

একবার কোরবানির ঈদে

দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন। সেবারের কোরবানির ঈদে...

পথের গল্প : ১

এবারের গ্রীষ্মের ছুটি চলাকালীন একদিন আমার পার্শ্ববর্তী শহরে একটি...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।