শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

প্রকাশিত:

ঢাকা শহরের প্রান্তে একটা আবাসন প্রকল্পের প্রবেশ মুখেই কাঠা পাঁচেক করে জমির উপর প্রায় একই আকারের দুটি ভবন। ভবন দুটির নামেরও মিল আছে! একটা হক মঞ্জিল! আর একটা হাজী মঞ্জিল! নতুন প্রকল্প, তাই অধিকাংশ প্লটই খালি পড়ে আছে। প্রকল্প শুরুর আগে যাদের নিজস্ব জমি ছিল তাদের কেউ কেউ বাড়ি করেছেন। এই দুইটা ভবনে ১৯টা করে মোট ৩৮টি ইউনিট। কিন্তু লোক থাকেন মাত্র ১২টা ইউনিটে। সম্প্রতি হক মঞ্জিলে উঠেছেন এক কলেজ শিক্ষক এবং তার সাংবাদিক বন্ধু। ব্যাচেলর হওয়া সত্বেও কোনরকম শর্ত ছাড়াই যে বাড়িওয়ালা তাদেরকে বাসা ভাড়া দিয়েছে তাতেই এক ধরনের ভাললাগা এবং বাড়িওয়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়েই তারা এই বাসায় উঠেছেন। আরও একটা বিষয় দুই বাড়িওয়ালার প্রতিই শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছে। সেটা হল তারা যেদিন বাসা খুঁজতে আসেন সন্ধ্যার ঠিক পূর্ব মুহুর্ত তখন, দুই বাড়ির মালিকই ভবনের সামনের রাস্তায় ছিলেন। কথা হয় দুজনের সাথেই। ভাবখানা এমন, বাড়ি দুটোই আমাদের। যে কোনোটাতেই উঠতে পারেন। বাসার সামনে দিয়ে ঢাকা থেকে বেরিয়ে অন্য একটা উপজেলায় যাবার রাস্তা। শোনা যায় রাস্তাটি আরো প্রশস্ত হবে। তাই হয়ত সামনের জমির মালিকেরা কোন ভবন তৈরি করছেন না। বাসার সামনে দক্ষিণে রাস্তাসহ পাঁচ/সাতশ ফিটের মধ্যে কোন স্থাপনা নেই। ঢাকা শহরের প্রান্তে এমন একটা বাসা পেয়ে দুই বন্ধুই খুব খুশি। সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করে বাসায় ফিরে আরামের ঘুম ঘুমান। ঘুম শেষে আবার কর্মস্থলে যান। কিন্তু শিক্ষক বেচারার দুপুরের পর কলেজ থেকে ফিরে বড় একা লাগে। তাই তিনি প্রায় প্রতিদিনই বিকালে একা একা বেরিয়ে পড়েন, আবাসন এলাকার মধ্যে একটা চক্কর দিতে।

সপ্তাহ খানেকও পার হয় নাই। শিক্ষক বন্ধুটি বুঝতে পারলেন আবাসিক এলাকার কোনো বাসায় খালি নাই। শুধু হক এবং হাজি মঞ্জিল ছাড়া এবং তার পর্যবেক্ষণে তিনি বুঝতে পারেন, অন্য যেকোনো বাসার তুলনায় হক এবং হাজী মঞ্জিলের পজিশন, ভবনের আউটলুক বেশ ভাল। বিষয়টা তার মধ্যে একটা খটকা তৈরী করে। কিন্তু তিনি সেটা সাংবাদিক বন্ধুর সাথে শেয়ার করার আগে আরো কিছুদিন সময় নিতে চান। এর মধ্যে মাস গড়িয়ে গেছে। দুই বাসায়ই টু-লেট ঝুলানো। পরের মাসের প্রথম শুক্রবার। বিকালে দুই বন্ধু বাসার ব্যালকনিতে বসে বসে খেয়াল করলেন, অনেকেই বাসা খুঁজতে আসছেন। শিক্ষক বন্ধুর ধারনা এ মাসেই অনেকগুলি, হয়তোবা সবগুলি ইউনিট ফিলআপ হয়ে যাবে। ঠিক সন্ধ্যার আগে দু-বন্ধু চা খাবার জন্য নিচে নেমে দেখলেন, দুই বাড়িওয়ালা বাড়ি খুঁজতে আসা দুইটা মেয়ে এবং একটা ফ্যামিলির সাথে কথা বলছেন। শিক্ষক বন্ধু একটু মনোযোগের সাথে এই ফ্যামিলি এবং মেয়ে দুটোকে খেয়াল করলেন। মাসের মাঝামাঝি এক শুক্রবারে তিনি দেখলেন, সেই ফ্যামিলিটি হাজী মঞ্জিলে তাদের মালামাল উঠাচ্ছেন। শিক্ষক মহোদয়ের মনে হল, আন্ডা বাচ্চা সহ অনেকগুলি ফ্যামিলি উঠলে ভবন দুইটাতে হয়ত এমন একা একা লাগবে না। কিন্তু প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতেই থাকে। এতদিন কেন এই বাসা ফাঁকা পড়ে আছে। দ্বিতীয় মাস গড়িয়ে তৃতীয় মাসের শুরু। কিন্তু দেখা যায় সেই একটা ফ্যামিলি ছাড়া কেউই বাসায় ওঠে নাই। সেদিন রাতে সাংবাদিক বন্ধু একটা ফুলের তোড়া নিয়ে বাসায় ফেরেন।

কিরে হঠাৎ ফুল নিয়ে আসলি?

না ভাবলাম, আজ মাসের প্রথম দিন। সেই মেয়ে দুইটি নিশ্চয়ই আজ বাসায় উঠেছে। তারা তো উঠেই নাই, সেই ফ্যামিলি ছাড়া কোন ইউনিটেই এ মাসেও কোন লোক উঠে নাই। সাংবাদিক বন্ধু খেয়াল করেন, তার বন্ধুটির মুখটা কেমন অস্থির লাগছে। তিনি সেই মেয়ে দুটির প্রসঙ্গ টেনে পরিবেশটাকে একটু হালকা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বন্ধুর মুখ আরো গম্ভীর হয়।

পরের দিন সাংবাদিক বন্ধুর ছুটি। তিনি আর কথা বাড়ান না। তখন রাত ১১টা। শুধু এটুকু জিজ্ঞেস করেন, কাল কলেজে না গেলে কিংবা একটু দেরীতে গেলে কোন সমস্যা হবে? শিক্ষক বন্ধু মাথা দুলিয়ে জানান, না। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে সাংবাদিক তার বন্ধুকে নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরান। শিক্ষক বন্ধুর আবার ওই অভ্যাস নাই।

বল, কি সমস্যা?

সমস্যা তেমন কিছুই না। কিন্তু তোমাকে শেয়ার করা দরকার। তুমি সিগারেটটা শেষ কর।

দুজনেই বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ। সাংবাদিক বন্ধুর মনে হয় সমস্যা গুরুতর। সিগারেট শেষ হতেই শিক্ষক বন্ধু বলেন, চল ভেতরে যাই। দুজনে ভেতরে এসে সাংবাদিক বন্ধুর রুমেই বসেন। শিক্ষক বন্ধু কথা শুরু করার আগে ব্যালকনিতে যাবার দরজা বন্ধ করে আসেন। রাত প্রায় ১টা।

তুমি কি এই বাসা, বাসার মালিক, বাসার বাসিন্দা এই এলাকার কোন খোঁজখবর রাখ?

না… আমার রাখার সময়ই বা কই? পেশায় সাংবাদিক হলেও এক্ষেত্রে তো আমার একমাত্র তথ্যসূত্র হলে তুমি।

তোমাকে বলা দরকার, দুই ভবন মিলিয়ে এখানে ইউনিট আছে ৩৮টি। তুমি কি জানো এ মাসের ভাড়াটিয়াসহ কয়টি ইউনিটে লোক থাকে?

না… কয়টি?

মাত্র ১৩টি, অথচ এই এলাকায় এর চেয়ে অনেক খারাপ বাসায়ও তুমি টু-লেট ঝুলানো দেখতে পাবে না। হুম, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। তুমি জান এই দুই বাসার দারোয়ানরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারেন না?

না তো, তা কেন হবে?

মালিকেরা তো বলেন।

তুমি কি জান এই দুই ভবনের মালিকেরা এলাকার মানুষের সাথে নম্রভাবে সালাম-আদাব বিনিময় ছাড়া মন খুলে কথাবার্তা বলেন না?

তাই নাকি? তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রতি আমার সব সময়ই একটা রকমের আস্থা আছে। কিন্তু এগুলো থেকে কি তুমি কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছ?

না, তবে আমার মনে হয়, এগুলির মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে এবং আমরা চাইলেই সেটা খুঁজে বের করতে পারি।

ওকে… তুমি কি কোনো রাস্তার কথা ভেবেছ?

না… কিন্তু আমার বিশ্বাস এটা আমাদের জন্য কোন কঠিন কাজ হবে না।

ওকে…. তাহলে তোমার প্রশ্নগুলো নিয়ে আমাকেও একটু ভাবতে দাও। দুজনেই কিছুক্ষন চুপচাপ থেকে শিক্ষক বন্ধু তার রুমে চলে যান। সাংবাদিক ব্যালকনিতে বসে আরেকটা সিগারেট ধরাবার জন্য যেই না দরজা খুলেছেন এমনি নিচ থেকে দুইটা কুকুরের প্রবল জোরে কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। প্রথমে একটু চমকে গেলেও সিগারেট শেষ হবার পর সাংবাদিক নিজের মনেই বললেন, সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। কোন কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়।

আজ যদিও ছুটির দিন না কিন্তু বিকালের দিকে অনেকেই বাসা খুঁজতে আসেন। দুই বন্ধু ব্যালকনিতে বসে আছেন। শিক্ষক বন্ধু বেশ রিলাক্সড। কিন্তু সাংবাদিকের নজর নিচের দিকে। তিনজনকে খেয়াল করলেন। প্রথম জন হাজী মঞ্জিলের টু-লেট দেখেও কেন জানি হক মঞ্জিলের দারোয়ানের সাথে কথা বললেন। বাসার ভিতরে ঢুকলেন এবং মিনিট দশেক পর বের হলেন। বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছু সময় দারোয়ানের সাথে কথা বলে বিদায় নিলেন। সাংবাদিক খেয়াল করলেন ভদ্রলোক রাস্তা পর্যন্ত পৌছানোর আগেই হক মঞ্জিলের দারোয়ান বেশ দ্রুতপদে রাস্তার দিকে এগোলেন এবং বেশ কিছুক্ষন পর ফিরে এলেন। এরপর এলো একটা ফ্যামিলি। তারা হাজী মঞ্জিলের দারোয়ানের সাথে কথা বললেন, বাসার ভেতরে ঢুকলেন এবং বেরিয়ে গেলেন। তারাও মুল রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই হক মঞ্জিলের দারোয়ান একটু এদিক-ওদিক তাকিলে মুল রাস্তার দিকে এগোলেন এবং বেশ কিছুক্ষণ পর ঝালমুড়ি খেতে খেতে ফিরে এলেন। সন্ধ্যার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে এক ভদ্রলোক এলেন বাসা খুঁজতে এবং দুই বন্ধু দেখলেন শুধুমাত্র সেই ভদ্রলোকই পরের মাসে তাদের ভবনে অর্থাৎ হক মঞ্জিলে উঠেছেন। সেই মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বন্ধু নানান রকমের খাবার নিয়ে বাসায় ফিরলেন। শিক্ষক বন্ধুর কাছে বিষয়টা একটু অস্বাভাবিক লাগল। কিন্তু স্বাভাবিকই গলায়ই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

আজ হঠাৎ এত খাবার দাবার?

রাতে বাসায় অতিথি আসবেন।

কিন্তু এখন রাত ১১টার পর তো তুমি ব্যতীত এই বাসায় কারো ঢুকবার অনুমতি নাই।

যিনি আসবেন তিনি ঢুকবেন না। তিনি এই বাসাতেই থাকেন।

বুঝলাম না,….

উতলা হয়ো না। সময় হলেই দেখতে পাবে।

সাধারণত ছুটির দিনগুলির আগের রাতে ব্যাচেলরদের বাসায় একটু আড্ডা হয়। তবে সাংবাদিকের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য নয়। তবুও বন্ধুর জন্য সাংবাদিক বেচারা বৃহস্পতিবার রাতে একটু দেরীতেই ঘুমাতে যান। আজ দুই বন্ধুর আড্ডা হচ্ছে শিক্ষকের রুমে। শিক্ষকের মনে কিন্তু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কে সেই মধ্যরাতের অতিথি! ঠিক সাড়ে বারোটায় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বেশ উত্তেজনা নিয়েই দরজা খুললেন শিক্ষক বন্ধু। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন হক মঞ্জিলের দারোয়ান। সাংবাদিক বন্ধু দারোয়ানকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে গেলেন এবং প্লেটে খাবার সাজাতে শুরু করলেন। শিক্ষক বেচারা মনে নানা প্রশ্ন নিয়েই বন্ধুকে অনুসরণ করলেন। দারোয়ান লোকটাকে নিচে যতদিন দেখেছে এবং অন্য যে কোনো দিনের তুলনায় স্বাভাবিক মনে হল। লোকটা সবগুলি আইটেমই বেশ আয়েশ করে খেল। কিন্তু কথা হল কম। বাইরে কুকুরের চিৎকার শুনে ঘন্টা খানেক পর সে নিচে নেম গেল। কেন জানিনা সেদিন রাতে দুই বন্ধুর আর কথা হল না। দুজন-দুজনার রুমে চলে গেলেন।

আজ শুক্রবার সাংবাদিক বন্ধুর অফিস দ্বিতীয়ার্ধে মানে দুপুরের খাবারটা আজ একসাথে হবে। খাবার টেবিলেই রাতের প্রসঙ্গ পাড়া যাবে। দুজনেই বিছানা ছাড়েন এক সাথে ফ্রেশ হয়ে চায়ের মগ নিয়ে ব্যালকনিতে বসেন। নিচে আজও অনেকেই বাসা খুঁজতে আসছেন। শিক্ষক বন্ধু খেয়াল করলেন। কিন্তু সাংবাদিকের আজ আর সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নাই।

সাংবাদিক হঠাৎ বলে উঠলেন, তোমাকে মিনিমাম নেক্সট বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মানে কি? না, মানে তোমার প্রশ্নের জট খোলার কথা বলছি।

প্রশ্নের জট খোলার প্রসঙ্গ তখনই আসে, যখন প্রশ্নগুলি জটিল হয়। আমার কাছে কিন্তু নিজের মনে উঁকি দেওয়া প্রশ্নগুলিকে জটিল মনে হয়নি।

জটিল না হলেও তোমার প্রশ্নের আড়ালে একটা রহস্য আছে নিশ্চয়ই।

হুম আমি বিকালে হাঁটতে বেরিয়ে দু-একজনের সাথে কথাচ্ছলে জানবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ সুদুত্তর দিতে পারে নাই। তবে আরও একটা বিষয় জেনেছি এই দুই বাসার দারোয়ান দুইজন পারত পক্ষে বাইরের কোন লোকের সাথে কথা বলেন না এবং স্থানীয় কোন দোকানে তাদেরকে কখনও দেখা যায় না। নরমালি তো দারোয়ানরা দিনের বেলা মালিকের ফাই ফরমাশ খাটে।

সাংবাদিক বন্ধু বলেন ভাল লাগছে তুমি বিষয়টা নিয়ে নিজেও সেদিনের মত আর উদ্বিগ্ন নও। আজকে কিন্তু ব্যালকনিতে বসেই তুমি আলাপ শুরু করেছ। শিক্ষক বন্ধু একটু তটস্থ হন। ভয় পেয়োনা। সবকিছুই ঠিক আছে। তোমাকে শুধু এটুকু বলি রহস্য তোমার সামনেই উন্মোচিত হবে। তুমি শুধু সহায়কের ভূমিকা পালন করবা। মূল নায়ক অন্যরা। তবে ক্লু কিন্তু তুমিই দিয়েছ।

রাত ছাড়া দুই বন্ধুর এক সাথে সময় কাটে কম। কারন দুজনের সাপ্তাহিক ছুটি খুব কমই একসাথে হয়। পরবর্তী বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিক আবারও নানা রকম খাবার নিয়ে বাসায় ফেরেন। শিক্ষক বন্ধু জানতে চান, আজ আবার কোন অতিথি?

অপেক্ষা কর দেখতে পাবে।

রাত তখন ১০টা। সাংবাদিক বন্ধু ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খান এবং ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরান। শিক্ষক বন্ধু তাকে অনুসরণ করেন। দুজনে পাশাপাশি বসে আছেন। শিক্ষক বন্ধুর মধ্যে কৌতুহল আছে কিন্তু উৎকন্ঠা নেই। সাংবাদিক নির্লিপ্ত। ভাবখানা এমন যে অতিথির আসা নিশ্চিত, খাবার প্রস্তুত কি আলাপ হবে সেটাও তার জানা।

রাত ঘড়ির কাটায় ১টা, দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। দরজা খোলেন সাংবাদিক দরজার সামনের সিঁড়ির আলো অফ করা। ভেতরে না আসা পর্যন্ত শিক্ষক বন্ধু নিশ্চিত হতে পারলেন না আজকের অতিথি কারা। সাংবাদিক বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন সবকিছু ঠিকঠাক? প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন আসেন। ভেতরে আসেন। শিক্ষক দেখলেন। হক এবং হাজী মঞ্জিলের দুই দারোয়ান।

আজও সেদিনের মত সরাসরি খাবার টেবিলে এবং শিক্ষক বন্ধুর সেদিনের মত তাদেরকে অনুসরণ। যথারীতি হাজী মঞ্জিলের দারোয়ান আয়েশ করে খাওয়া শুরু করলেন কিন্তু হক মঞ্জিলের দারোয়ান কিছুটা দ্বিধান্বিত। সাংবাদিক তাকে এমনভাবে খাবার জন্য তাগাদা দিলেন যেন এ বাসায় দারোয়ান লোকটার নিয়মিত যাতায়াত আছে। শিক্ষক বন্ধু চুপচাপ। তার মুখে কোন কথা নেই। রহস্য উদঘাটনের চেয়ে লোক দুজনের সাথে বন্ধুর সম্পর্কই এখন তার কাছে রহস্য। হক মঞ্জিলের দারোয়ান উঠে একবার ব্যালকনিতে গিয়ে দেখে এলেন।

খাওয়া শেষ। মিনিট খানেক সবাই চুপচাপ। সাংবাদিক বললেন- তাহলে শুরু করা যাক। শুরু করেন হক মঞ্জিলের দারোয়ান। সাহবেগো বাবায় আছিলেন মস্তবড় মহাজন। সকালে বারাইতেন। ফিরতেন হ্যায় রাতে। তখন তো বাসা এইহানে আছিল না, দুই পোলারেই স্কুলে দিছিলেন। কিন্তু তাগো পড়াশুনায় কোনো মন আছিল না। ক্লাস ফাইভের পর বড় সাহেবরে দিলেন মাদ্রাসায়। আর ছোটটারে কই যেন কই পাঠাইলেন। হ্যাগো মায়ের সেকি কান্না।

সংক্ষেপ করেন।

তারপর আর কি ল্যাহাপাড়া শিখ্যা একজন আলেম হইচ্ছে। আরেকজন নাকি প্যারাইভেট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। কিন্তু দুই ভাই কেউ কাউরে দেখতে পারে না।

কিন্তু হ্যাগো বাপ হজ কইরা আইসা হ্যাগোরো কয় শোন, আমার নামে এলাকায় নানা কানা ঘুষা আছে। আমি নিজেও জানি আমার সব টাকা হালাল না। তয় তোমরা এমনভাবে চলবা যাতে তোমাগো দেইখা মানুষ আমার কথা ভুইল্যা যায়। ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ রাখবা না।

সাংবাদিক বুঝতে পারেন শিক্ষক বন্ধু শুনছেন কিন্তু বিরক্ত হচ্ছেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সাংবাদিক তাগিদ দেন মূল কথায় আসেন। বাইরে হঠাৎ কুকুরের চিৎকার শুনে হাজী মঞ্জিলের দারোয়ান নিচে নেমে যান। এবার শিক্ষক বন্ধুর মুখে বিরক্তির ছাপ। অব্যক্ত ভাষায় যেন বলছে এপিসোড আজও শেষ হবে না।

ব্যাপের কথা মাইন্যা চলে বটে। কিন্তু মন হ্যাগো হিংসায় পরিপুর্ণ। এই দুই বাড়ি শুরু হবার পর কে কোনডা নিব হেইডা নিয়া বিরোধ ছিল কিন্তু বাপের কথা অমান্য করে নাই। বড় ভাই নিছে হক মঞ্জিল আর ছোট ভাইডারে দিছে হাজী মঞ্জিল। বাসায় উঠার দু মাসের মধ্যে হ্যাগো বাপ ইন্তেকাল করছেন। আমি আছিলাম হ্যাগো দোকানের ম্যানেজার কাম ফাই ফরমাশ খাটা লোক। তো বাপের মৃত্যুর পর বড় জনায় কয় চাচা আপনি আছিলেন বাবার বিশ্বাসী লোক আপনিই আমার বাড়ী দেখাশুনা করবেন। ছোটজনেরও দাবী না আপ্নে আমার বাড়ী দেখাশুনা করবেন। আবার ঝামেলা। হ্যাগো মা ডাইকা কইলো তোমার সাত দিনের ছুটি। দ্যাশে যাও তোমার একটা বিশ্বাসী লোক নিয়া তবে ফিরবা। আমি দ্যাশে যাই এবং আমার খালাত ভাইরে নিয়া আসি। আমার ভাইরে পাইয়া ছোট সাহেব নিমরাজি হইয়া ঝামেলা থেকে সইরা দাড়ান। তয় আমি ফেরত আসনের ৭ দিনের মাথায় এক জুম্মাবার নামাজ পইড়া ফিরছি সাহেব আমারে ডাইকা পাঠান তার রুমে। তখনও বাড়ির সব কাজ সম্পন্ন হয় নাই। তয় টুলেট ঝুলানোই ভাড়াটিয়া আসে বাড়ি খুঁজতে। সাহেব বইসা আছেন সোফায়। আমারে কন পাশে বসতে। আমি কখনও হ্যাগো বাপের সামনে চেয়ারে বসি নাই। অস্বস্তি লাগে। কিন্তু বড় সাহেব আদেশের সুরে কয় চাচা আপ্নের দুইটা কাজ। আজ জুম্মাবার দুইডা প্রতিজ্ঞা করবেন। কাজ দুইডার একটা আপ্নে করবেন না আর একটা করবেন। আর প্রতিজ্ঞা হইল এটা যেন কাক পক্ষীতেইও জানতে না পারে। আজ থেইক্যা আপ্নে আপনার ভাইয়ের লগে কথা কইতে পারবেন না। আমি তো ….। কিন্তু কেন জিজ্ঞেস করার আগেই বড় সাহেব বলেন, আর দ্বিতীয়টা হইল ঐ বাসায় কোন লোক বাড়িভাড়ার জন্য এলে খেয়াল রাখবেন এবং ফলো করবেন। দুরে গিয়া কিংবা যেমনে পারেন গিয়া কইবেন ঐ বাসার পানির হাউজে কুকুর পড়ছিল। সেই কুকুর আর উঠানো হয় নাই। মালিকের নিজে সরাসরি মিনি ডিপ টিউবলের পানি খান। শিক্ষক সাংবাদি দুজনেই অবাক হন, আশ্চর্য হন।

তারপর?

আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি আবার ওয়াদা ভঙ্গ করছি। রাত নিঝুম হলে দুই ভাই কথা কই। বড় সাহেবের কুবুদ্ধির কথা ওরে কইছি। ও একদিন ছোট সাহেবরে এই কথা কইছে। ছোট সাহেব চ্যাতে নাই। ওরে শুধু কইছে আপ্নেও এখন থেইক্যা একই কাজ করবেন।

বাইরে কুকুরের করুণ চিৎকার। তিনজনেই নীরব। হঠাৎ লোকটা বলে জানেন স্যার আমাগো সবার মধ্যে একটা কুকুর বাস করে বোধ হয়। কারও ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা যায় কারোটা যায় না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
অপূর্ব দাস
অপূর্ব দাস
তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা যশোর জেলায়। লেখাপড়া সম্পন্ন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। মানবাধিকার, নারীর মানবাধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমির অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথেও। কর্মসূত্রে বর্তমানে বসবাস করছেন ঢাকাতে!

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

কাঁটাতারে লাঠির সাঁকো

হেমতাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে টোটো চলছিল পকেট রুটের রাস্তা ধরে।...

তিমির অবগুণ্ঠনে/পৃথিবীর মাহসা আমিনিরা – ১ 

আমাদের স্কুলে মেয়েদেরকে উড়না এবং মাথায় ঘোমটা প’রে আসতে...

একবার কোরবানির ঈদে

দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন। সেবারের কোরবানির ঈদে...

পথের গল্প : ১

এবারের গ্রীষ্মের ছুটি চলাকালীন একদিন আমার পার্শ্ববর্তী শহরে একটি...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।