14 C
Drøbak
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যসিদ্ধার্থ সিংহের হাফ ডজন অণুগল্প

সিদ্ধার্থ সিংহের হাফ ডজন অণুগল্প

নার্সিংহোম

নার্সিংহোম থেকে ফোনে যা বলল, সেটা শুনে তাপসের দিদি পাথর হয়ে গেল।

এই তো বেলা দশটা নাগাদ তার ভাই ফোন করেছিল। বলেছিল, দিদি যে ভাবে পারিস তুই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা। আমাকে বাঁচা। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
ভিডিও কলে ভাইয়ের এই আকুতি শুনে চমকে উঠেছিল দিদি। সামান্য মাথা যন্ত্রণা করছিল। মেডিক্লেম করা আছে। কার্ডের মেয়াদও ফুরিয়ে যেতে আর বেশি দিন বাকি নেই। তাই ভর্তি হয়েছিল শহরের দ্বিতীয় নামজাদা হাসপাতালে।
ভর্তির দু’দিন পরেই হাসপাতাল থেকে দিদিকে জানানো হলো, ওর করোনা হয়েছে। করোনা! তা হলে কি নার্সিংহোম থেকেই সংক্রমিত হল! নাকি মাথা যন্ত্রণাটা ছিল প্রাথমিক উপসর্গ! প্রাথমিক উপসর্গই যদি হয়ে থাকে, তা হলে এই তিন দিনে ওরা কী চিকিৎসা করল!
তবু সাহস জোগানোর জন্য ভাইকে বলেছিল, ভয় পাস না। প্রথম স্টেজে ধরা পড়লে করোনা ঠিক সেরে যায়…
— আমার করোনা হয়নি রে, এখানে যারা ভর্তি হয়েছে তাদের কারওরই করোনা হয়নি। কিন্তু যারা ভর্তি হচ্ছে, দু-একদিন পরেই তাদের করোনা হয়েছে বলে একটা আলাদা ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
দিদি অবাক হয়ে বলল, এতে ওদের লাভ কী?
— লাভ নেই মানে? মাথা যন্ত্রণা, হাঁটুতে ব্যথা বা অন্য যে কোনও রোগের চিকিৎসার যে খরচ, তার থেকে অনেক অনেক বেশি গুণ খরচ করোনার চিকিৎসায়। তাই ওরা সবাইকেই করোনা হয়েছে বলে প্রচুর প্রচুর টাকার বিল ধরিয়ে দিচ্ছে। আমার তো মেডিক্লেম আড়াই লাখ টাকা ছিল, এই তিন দিনেই কি সব শেষ হয়ে গেল?
— হ্যাঁ, ওরা তো আমাকে ফোন করেছিল। বলল, এ ক’দিনে বিল হয়েছে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। মেডিক্লেম থেকে পাওয়া যাবে আড়াই লাখ টাকা। আপনারা বিকেল চারটের মধ্যে ব্যালেন্স এক লাখ আর অ্যাডভান্স আরও পাঁচ লক্ষ টাকা হসপিটালে জমা করে দিন।
— তোকে পাঁচ লাখ টাকা বলেছে? কাউকে কাউকে তো আট-দশ লাখ টাকা বলছে। বলছে, না হলে রোগীকে নিয়ে যান। কিন্তু কেউ নিতে আসার আগেই ওরা রোগীকে মেরে দিচ্ছে।
— কেন তাদের লাভ কী?
— লাভ একটাই। এখান থেকে বেরিয়ে কেউ যদি অন্য জায়গায় করোনা টেস্ট করায়, তা হলে তো এরা ধরা পড়ে যাবে, তাই…
তাপসের দিদির গলা থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল— ভাইয়ের কথাই সত্যি হল!

মজলিশ

লকডাউনের জেরে কত লোকের যে চাকরি গেছে কোনও ঠিক নেই। যাঁদের চাকরি আছে, তাঁদের মাইনেও অর্ধেক হয়ে গেছে। যাঁরা এই দুর্দশায় পড়েছেন, তাঁদের সংসার চলবে কী করে? এ নিয়ে গোটা দেশ জুড়ে যখন‌ আন্দোলন মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন এক নিউজ চ্যানেল প্রতিদিনকার মতো সরকার পক্ষ, বিরোধী পক্ষ এবং একজন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে সান্ধ্য মজলিস বসিয়েছে।
তা হলে গরিব লোকের সংসার চলবে কী করে? সঞ্চালিকা প্রশ্ন করতেই হাসি হাসি মুখ করে সরকার পক্ষ বললেন— আরে বাবা, পৃথিবীর কোনও মানুষই সংসার চালানোর জন্য চাকরি করে না।
— তা হলে কিসের জন্য করে?
— করে, প্রেমিকাদের গিফট কিনে দেওয়ার জন্য।
— তা হলে তাদের সংসার চলে কী করে?
বিরোধী পক্ষ বললেন, কেন, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে।
— আরে বাবা, তাদের ব্যাঙ্কে টাকাটা আসবে কোত্থেকে?
তিনি বললেন, শুনুন, লোক যতই গরিব হোক, তার সেভিংস একাউন্টে দু’-চার কোটি টাকাও নেই এটা আমি বিশ্বাসই করি না।
সঞ্চালিকা অবাক, মানে?
তখন বুদ্ধিজীবী বললেন, আরে বাবা, এই চাকরি চলে যাওয়াটাকে ছুটি হিসেবে ভোগ করুন না… বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে দল বেঁধে চলে যান ব্যাংকক কিংবা গোয়ায়। সেখানে গিয়ে ফুর্তি করুন। আনন্দে কাটান।
— সেটা করতেও তো টাকা লাগে।
তখন‌ তিন জনই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসি হাসি মুখে বললেন, হাসাবেন না। জেনে রাখুন, ভাল কাজের জন্য কখনও টাকার অভাব হয় না।

আবাহন

খুব ভয়ে ভয়ে আছে আবাহন। কখন কী হয় কিচ্ছু বলা যায় না। কাগজ খুললেই মৃত্যু। টিভি খুললেই মৃত্যু। ফেসবুক খুললেই মৃত্যু।
হয় গলা ব্যথা, মাথা যন্ত্রণা, জ্বর। নয় মুখে স্বাদ নেই। নাকে গন্ধ নেই। এগুলো হলেই ব্যস, হয়ে গেল।
এক বন্ধু বলেছিল, তুই এত মদ খাস, এ রোগ তোকে ছুঁতেও পারবে না। কিন্তু তবুও… বাজার থেকে ফিরেই সোজা স্নানঘরে ঢোকে। জামাকাপড় ছাড়ে। সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করে। শেষে ডেটল জলে। ঘরে ঢোকার আগে খুব ভাল করে হাতে-পায়ে সেনিটাইজার স্প্রে করে।
কিন্তু যেই মুহূর্তে রাজ্য সরকার লকডাউন ঘোষণা করল, না, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নয়, এটিএম থেকে কুড়ি হাজার টাকা তুলে তড়িঘড়ি ছুটল মদের দোকানে।
সে যে কী ভিড় কহতব্য নয়। বিশাল লাইন। একশো চুয়ান্ন জনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে, ধাক্কাধাক্কি করে যখন সে মদের বোতল হাতে পেল তখন সূর্য ঢলে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত এতগুলো বোতল আনতে পারার আনন্দে সে যখন জামাকাপড় ছাড়া, হাত পা ধোয়া, সেনিটাইজার দেওয়া বেমালুম ভুলে গিয়ে সেলিব্রেশনের মুডে তড়িঘড়ি বোতল সাজিয়ে বসল। প্রথম চুমুক দিতেই সে চমকে উঠল। এ কী! না আছে কোনও গন্ধ। না আছে কোনও স্বাদ।

সর্বদলীয় বৈঠক

এই অতিমারির কবল থেকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে কী ভাবে রক্ষা করা যায়, কী ভাবে ওই সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, বিদেশ থেকে যে সব ত্রাণ এসে গোডাউনে পচছে, সেগুলোর উপরে কত পারসেন্ট জিএসটি বসানো যায়, নাকি পুরোটাই মুকুব করা যায়, সে নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে পরামর্শ চাইতেই বিরোধী দলের এক প্রতিনিধি বললেন, লাইভ সেভিং ড্রাগ থেকে কিন্তু জিএসটি তুলে দিতে হবে।
তাঁর কথা শেষ হতেই, প্রধানমন্ত্রী যে দল থেকে জিতে এসেছেন, সেই দলেরই অন্য রাজ্যের এক প্রতিনিধি বললেন, অক্সিজেন সিলিন্ডারের উপরেও জিএসটি আরোপ করা ঠিক হবে না।
সেটা শুনে ও পাশ থেকে মিলিজুলি সরকারের এক নেতা বললেন, দেশের সর্বত্রই একদম বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দেওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী তো একেবারে থ’। ভ্রু কুঁচকে বললেন, তা হলে দেশটা চলবে কী করে? টাকাটা আসবে কোত্থেকে? এ দেশে বিপুল ভাবে বিক্রি হচ্ছে এমন কি আর কিছু আছে, যার উপরে জিএসটি বসালে এ বছরের মতো সামলে নেওয়া যাবে?
ওই তিন জনই এ ওঁর মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে বললেন, কেন? শ্মশানের চিতা কাঠ আছে না!

অনাহার

লকডাউনের বাজারে অনেকেরই খাবার জুটছে না। তাই বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এসেছে।
বেলা বারোটা নাগাদ পি জি হাসপাতালের সামনে বড় গাড়িটা এসে দাঁড়াতেই শুনশান রাস্তায় কোথা থেকে যে ঝটপট করে এত লোক লাইন দিয়ে ফেলল!
দেখলাম, গাড়ি থেকে বড় বড় গামলা বের করে খাবার বিতরণ করার তোড়জোড় শুরু হচ্ছে। ভাত, ডাল, আলুর তরকারি, এক পিস করে মাছ আর একটি করে রসগোল্লা।
খাবার দেওয়ার আগেই সবার হাতে দেওয়া হচ্ছে দু’-চার ফোঁটা করে স্যানিটাইজার। খাবার নিয়ে তারা এদিকে ওদিকে বসে পড়লেন। কেউ কেউ দাঁড়িয়েই খেতে লাগলেন।
আধ ঘণ্টা পরে আর একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল গুরুদুয়ারা সন্ত কুশিয়ার সামনে। তারা পর সর অনেকগুলো গামলা নামিয়ে খাবার দেওয়া শুরু করল।
কী করে যেন মুহূর্তের মধ্যে মুখে মুখে রটে গেল ওরা শুধু ডাল, ভাত, তরকারি, মাছ, রসগোল্লাই দিচ্ছে না, দু’পিস করে ইয়া বড় বড় মাংসের টুকরো আর একটি করে কলাও দিচ্ছে।
যে লম্বা লাইনে এতক্ষণ ধরে সবাই অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই লাইন থেকে ঝপঝপ করে বেরিয়ে নতুন লাইনে গিয়ে দাঁড়ালেন অনেকেই।
কোনও সামাজিক দূরত্ব না মেনেই ধাক্কাধাক্কি করে শুরু হল‌ সুগন্ধি সেনিটাইজার নেওয়া এবং যথারীতি ভাত, ডাল, তরকারি, মাংস, রসগোল্লা এবং কলা।
আগের বিতরণকারীদের লাইনটি ফাঁকা হয়ে যেতেই, তারা তো আর এই ঘাটা খাবার নিয়ে ফেরত যেতে পারবে না। তাই শুধুমাত্র মাছ আর ভাতগুলো কোনও রকমে মেখে রাস্তার আশপাশে যত কুকুর ছিল, তাদেরকে খাওয়াতে শুরু করল। ওদিকে খাচ্ছে মানুষ। এদিকে কুকুর।
খানিকক্ষণ পর দেখা গেল যারা মাংস দিয়ে খাবার পরিবেশন করছিল, তাদের সব খাবারই ফুরিয়ে গেল।
ফলে যাঁরা আগের লাইন থেকে বেরিয়ে ওই লাইনে গিয়েছিলেন, তাঁরা একদম মুখের সামনে গিয়ে খাবার না পেয়ে অনেকেই ফিরে গেলেন পুরনো লাইনে।
ততক্ষণে তাদের ভাত-মাছ যা ছিল, সবই কুকুরদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বোঝা গেল, দল বেঁধে বেঁধে যত লোকই এই ভাবে খাবার বিতরণ করুক না কেন, যাঁদের খালি পেটে, অনাহারে থাকার কথা, তাঁদের কোনও না কোনও ভাবে অনাহারেই থাকতে হবে।

পরিযায়ী

বউ আর ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দলছুট এক পরিযায়ী শ্রমিক‌ হাঁটতে হাঁটতে রাজ্যের সীমানার কাছে আসতেই, হইহই করে তেড়ে এল জনাকতক পুলিশ— এই, দাঁড়া দাঁড়া দাঁড়া, যাচ্ছিস কোথায়?
শ্রমিকটি বলল, গ্রামে যাব বাবু।
— কত দূরে?
— এই তো সামনেই, আর সত্তর-বাহাত্তর মাইল হবে…
— স… ত্ত… র… বা… হা… ত্ত… র… মা… ই… ল!
— হ্যাঁ, একশো তিরিশ মাইলের মতো তো হেঁটে এলাম…
— জানিস না, এখন লকডাউন চলছে?
পাশ থেকে অন্য এক পুলিশ বলে উঠল, ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, দেখছিস না কোলে বাচ্চা আছে! হয়তো খিদে পেয়েছে…
শ্রমিকটি বলল, না বাবু, না। ওর খিদে পায়নি। ও তো খিদের জ্বালায় অনেকক্ষণ আগেই মরে গেছে।

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।