বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২

কবি মেশকাতুন নাহার এর ছ’টি কবিতা

প্রকাশিত:

সেই মেয়েটির গল্প

সেই মেয়েটির গল্প বলবো এসো শুনবে যদি,
শ্যামল গাঁয়ে থাকতো যেথায় বয়ে চলতো নদী।
মেঠো পথে আলতা পায়ে হাঁটতো সবুজ ঘাসে,
কিশোরী মন বাদলা দিনে ভিজতো শ্রাবণ মাসে।

এলো চুলে গাছের ডালে কদম ফুল সে তুলে,
কৃষ্ণচূড়ায় মালা গেঁথে সময় যেতো ভুলে।
অবুঝ বয়স জানেনা সে জীবন কাকে বলে?
খেলাধূলা লেখাপড়ায় আপন মনে চলে।

হাসিখুশি রঙিন স্বপ্নে বিভোর থাকে মেয়ে,
বাবা মায়ের আদর যত্ন ভালোবাসা পেয়ে।
বিছানায় সে শুয়ে ভাবছে কেন হলাম বড়ো?
দুঃখ গুলো চারপাশ থেকে করছে আমায় জড়ো।

আগের মতো স্বাধীনতা পায় কি আর সে খুঁজে?
চোখরাঙানি গর্হিত বাক্য হাসি দিয়ে গুঁজে।
মানুষ তাঁকে খেতাব দিলো মহীয়সী কন্যা,
অন্তরালে ভিন্ন পন্থায় তাঁর বক্ষে যে বন্যা।

জরাগ্রস্ত হয়ে মেয়ে নিরবে যায় ক্ষয়ে,
নির্যাতনের শিকার হয়ে মুখ খুলে না ভয়ে।
বুঝেনি তো সে তো হায় জীবন পাতা ভিন্ন,
যেমন করে ঘূর্ণিবায়ু করে দেয় সব ছিন্ন।

বিচারপতি কোথায় তুমি? বলে চিৎকার করে,
আর কতকাল ভেদাভেদ যে থাকবে ঘরে ঘরে?
নারীর প্রতি অবিচার কী চলবে জনম ধরে?
বাবা মায়ের সেই মেয়েটির নয়নে জল ঝরে।

পথশিশু!

পথের শিশু বলো যাদের
কষ্টে কাটে জীবন তাদের
পায় না একটু প্রীতি,
কেন ডাকো পথের ছেলে?
হতে পারে শচীন পেলে
গড়লে সঠিক রীতি।

রেলস্টেশন আর ফুটপাত জুড়ে
পথের ধারে ক্লেশে ঘুরে
অবজ্ঞায় দিন কাটে,
কেউবা হয় যে বিদেশ পাচার
ধর্ষিত হয় ব্যাধের খাঁচার
লুট হয় রাস্তা ঘাটে।

জন্মটা তাঁর যেখানেই হোক
যত্নে হবে আদর্শ লোক
যোগ্য আবাস দাবি,
দারিদ্রতার গ্রাসে শিকার
সুষ্ঠু বিকাশ চাই অধিকার
তাঁরাই দেশের চাবি।

মৌলিক অভাব না হয় পূরণ
ভিক্ষা,ছিনতাই করবে গ্রহণ
বিদ্যা শিক্ষা জ্বালো,
শিশু হলো জাতির ধারক
উন্নয়নের মূল তদারক
দেশকে করবে আলো।

সময়ের জবাব

কারো বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে ভাবছো
নিজেকে সর্দার?
অট্টহাসিতে উল্লাসে মেতেছো জয়ের!
কুচক্রী হাসবে না একদম, খবরদার!
সেদিন খুব দূরে নয় পাবে জবাব
নিশ্চিত সময়ের।

কারো সাফল্যে করছো ঈর্ষা
কৌশলে লাগছো পিছনে!
সূক্ষ্ম পন্থায় কার্যসম্পাদন করছো তুমি রেফারি,
ভুলছো কেন অপক্ক বাদ্যকর
ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা রয়েছে চালু
ধরতে তোমার কেলেঙ্কারি।

কারো লক্ষ্যে পৌঁছাতে করছো ব্যাঘাত
কোমর বেঁধে খেলছো কাবাডি,
প্রতিরোধ করতে আছে তো এন্টিবডি?
সমুচিত জবাব পাবে একদিন
আছো তো তুমি রেডি?

কারো উদারতার সুযোগ নিয়ে
মারছো বক্ষে ছুরি,
ভিত্তিহীন উপায়ে করে চলেছো শুধুই বাহাদুরি।
রত্ন চিনতে ভুল তুমি ও করতে পারো জহুরি,
শঠতার আস্বাদন গ্রহণ করবে তুমি ও একদিন জুয়াড়ি।

প্রযুক্তির দাস

যান্ত্রিক এই শহরে নেই কোন অনুভূতি
সময়ের টানে ছুটে চলে ব্যক্তি দ্রুতগতি
স্নেহ প্রীতি যে নিষ্ঠুরতায় দিলো আত্মাহুতি
সতেজ প্রাণ কৃত্রিমতায় গিলছে প্রযুক্তি।

নির্দয় বাস্তবতার স্রোতে অস্তিত্ব বিলীন
অন্তঃসারশূন্য ভূমণ্ডল আবেগ বিহীন
এভাবেই যাচ্ছে চলে যায় বর্ষ মাস দিন
ক্যালকুলেটরে থেমে মন সম্বেদনহীন।

একাকীত্বের চাদরে ঢেকে মানব রোবট
সুখের খুঁজে স্বভাব করে বড়োই উদ্ভট
বিত্ত,প্রতিপত্তি নেই কোন অর্থের সংকট
কোথায় সুখ কোথায় সুখ গর্জন বিকট।

প্রযুক্তির দাসত্বে আচ্ছন্ন বিষাদী আঁধারে
একই কক্ষে বসে সবাই ফেবু ম্যাসেঞ্জারে
আত্মঘাতী রূপে ধ্বংসিত সে মানস বিকারে
কিশোর যুবক ডুবে যায় রন্ধ্রের শিকারে।

মরিচীকা ধরে মর্মদেশে যন্ত্র করে বাস
রিমোট টিপে চলছে যেন যান্ত্রিক শ্বাস
ইট পাথরে নির্মাণ করে স্বপ্নিল আবাস
জীবিকার টানে হয়ে যায় ব্যস্ততার দাস।

শব্দহীন আর্তনাদ

আমি তো হারিয়ে যেতে চাই – তাদেরই মাঝে
পথেই যাদের জন্ম হয় – পথে নামে কাজে
রোদ বৃষ্টিতে রাস্তার মোড়ে -ভোর থেকে সাঁঝে।
আবর্জনায় খাবার খুঁজে -জঠরের ভাঁজে।

ছন্নছাড়া জীবন তাদের – পথই ঠিকানা
স্বপ্ন কিভাবে দেখতে হবে – আদৌ নেই জানা
সমাজ সভ্যতা শিক্ষা দীক্ষা – পায় নাহি তাঁরা
নির্মম পরিহাসে জীবন – হয় দিশাহারা।

আমি তো হারিয়ে যেতে চাই – তাদেরই পাশে
অবহেলা অনাদরে শেষে – বৃদ্ধাশ্রমে আসে
সারা জীবন যাঁরা নিঃস্বার্থে – খাটে পরিবারে
শেষকালে সন্তানের চোটে – কাঁদে বারেবারে।

শত কষ্ট ক্লেশে যাদেরকে – রাখে পেটে বুকে
বিবেকহীন সন্তান দেয় – দূরে ঠেলে দুখে
বিশাল বাড়ি তবু মেলেনা – বাবা মা’র ঠাঁই
অসুখ হলেও চিকিৎসার – ব্যবস্থা যে নাই।

আমার মনটা দুখে কাঁদে – তাদেরই তরে
উৎপীড়নের শিকার হয়ে – দগ্ধে পুড়ে জ্বরে
নিষ্পাপ মুখটা অন্ধকারে -আড়ালে ঢাকে
স্বপ্ন দেখিয়ে আলোর পথে -নিতে চাই তাঁকে।

কত স্বপ্ন কত আশা ছিল – কিশোরীর মনে
হিংস্রতা বাহুবলে অস্তিত্ব – মৃত্যু সন্ধিক্ষণে
পাশবিক আত্মার নৃশংস – নাঙ্গা কুলাঙ্গার
কলুষিত করে সমাজটা – করে কদাকার।

আমার নয়নে অশ্রু ঝরে – তাদেরই জন্য
আর্তনাদে ভগ্নচিত্ত খুব – লাগে যে নগণ্য
ক্ষত হয়ে অন্তর প্রদেশ – করে হাহাকার,
সমাজচ্যুত করে সবাই – জানাও ধিক্কার।

রঙিন আভা

প্রাতঃকালে কিরণ এসে
ঘুম ভাঙালো আজ
বহির্দেশে চেয়ে দেখি
প্রকৃতির নব সাজ।

শিশির কণা ঘাসের মাঝে
বিন্দু বিন্দু পড়ে
সোনালি রোদ আবেশ মেখে
আসে মনের ঘরে।

বাগ বাগিচায় ফুটে পুষ্প
গাইছে গান পাখি
অপরূপ এই দৃশ্য দেখে
জুড়িয়ে যায় আঁখি।

গাছে গাছে কেয়া কদম
ঝিলে শাপলা ফুল
ঝিঙেফুল আর কলমী লতায়
মনটা করে আকুল।

আকাশ জুড়ে শুভ্র মেঘে
ঝিকিমিকি ভাসে
দুখ ভুলানো পবন এসে
সুখের জোয়ার হাসে।

হঠাৎ দেখি আকাশ পানে
রংধনু যায় দেখা
প্রাণচঞ্চল হয় তনু মনে
মর্মে আঁকে রেখা।

আভা ফুটে উঠে অন্তর
খুশির দ্যুতি ভরে
মনের আকাশ জুড়ে অনেক
রঙিন স্বপ্ন গড়ে।

মেশকাতুন নাহার
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক সমাজকর্ম। কচুয়া বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ, কচুয়া, চাঁদপুর। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ২০২০ সালে তার একক কাব্যগ্রন্থ 'দীপ্ত আবির্ভাব' প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ৪টি যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

তৈমুর খানের নির্বাচিত ছয়টি কবিতা

আস্ফালন একা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছি নিরক্ষরসব অক্ষরগুলি মার্জিত নিবেদনে...

জয়িতা ভট্টাচার্যের নির্বাচিত ছয়টি কবিতা

আবহমান যখনই উল বুনিঘর ভুল হয়ে যায়।দুটো কাঠি বলাবলি করে...

আবু আশরাফী’র ছয়টি নির্বাচিত কবিতা

নিস্তব্ধ সান্তনা মাছে মাছ খাবেতুমি কেন খাবে? আসমানে আছে লক্ষ কোটি...

মাজরুল ইসলাম এর ছয়টি কবিতা

জেগে থাকো উৎসর্গ: প্রয়াত কবি নাসিম এ আলম মৃত্যুর খবর...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।