7.1 C
Drøbak
শুক্রবার, মে ২৭, ২০২২
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যগল্প: লুটের রাজত্ব

গল্প: লুটের রাজত্ব

চামড়ার হাল্কা ব্যাগ ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে বাঁ-হাতে ধরা। অন্য হাতে সাদা প্লাস্টিক মোড়া ছোট্ট প্যাকেট। বাজারের ভারি ব্যাগটা নিয়ে পেছন পেছন আসছে ড্রাইভার। ব্যালকনি থেকে দেখতে পেলাম। এবার দরজা খুলতে হবে আমাকে।
ব্যালকনি থেকে লাঠি ঠুকে ঠুকে ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকলাম। আজকাল বেশী হাঁটাচলা করতে পারিনা। ঘরেই থাকি। মাঝে মাঝে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হয়। কোমরে পুরনো বাত। সাথে যোগ হয়েছে হাঁটুর ব্যাথা। বাইরে যাবার ক্ষমতা নেই। মেয়ে থাকে বিদেশে। তাই বাজার করা, ব্যাঙ্ক, বাড়ির অন্য কাজ একা হাতে আমার স্ত্রী সরমাকেই সামাল দিতে হয়।
দরজা ঘণ্টির সুইচ টিপলেন উনি। টুং টাং আওয়াজ কানে বাজতেই সোফায় বসে বললাম, ‘দরজা খোলা আছে।’
দরজার পাল্লা ঠেলে ঘরে ঢুকে গদি আঁটা চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসলেন উনি। ড্রাইভার ভারী ব্যাগটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে বেরিয়ে গেল। হাতে ধরা বাহারি গোল প্যাকেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল সরমা। কোন ট্রফি জিতে এসেছেন যেন। এক মুখ হাসি ছড়িয়ে বললেন, ‘দারুণ জিনিষ পেলাম।’
-কী জিনিষ? আমি সামনে ঝুঁকে জানতে চাইলাম।
-হাতে নিয়েই দেখ না!’ বেশ খুশী মনেই বললেন সহধর্মিণী।
হাতে নিয়ে দেখলাম। শপিং মলের বাহারি প্যাকেট। সাদা কাগজের গায়ে সাঁটানো দামী স্টিকার। জিনিষটার দাম, ওজন, লাইসেন্স নম্বর, কত তাপমাত্রায় রাখা বিধেয় ইত্যাদি সমস্ত তথ্য সুন্দর ভাবে লেখা। ওজন আধা কিলো, দাম তিনশ টাকা।
-কী এটা? উৎসাহী হয়ে জানতে চাইলাম।
-দারুণ জিনিষ, বুঝলে! বাজার তো করো না।
বাজার করতে পারি না। শারীরের কাহিল অবস্থা। কথা তো শুনতেই হবে। খানিক চুপ থেকে স্বর নরম করে আবার জানতে চাইলাম, ‘বাজার থেকে কী আনলে ওটা?
-বাজার নয়। শপিং মল।
-ওই হল। কী আনলে?
-ক্যাবেজ, ক্যাবেজ। ভালো করে দেখ।
-ক্যাবেজ? মানে বাঁধা কপি।
হ্যাঁ। এসময় পাওয়া যায় না। দাম বোধ হয় একটু বেশী।
-তা বলে ছ’শ টাকা কিলো? আমার মুখ ফস্কে কথাটা বেরিয়ে গেল।
-হবে না? শীত পরে নি। দুর্গা পূজোর আগেই ক্যাবেজ খাবে। দাম দিতে হবে তো!
আমার মুখে কথা নেই। ছ’শ টাকা কিলো বাঁধাকপি? স্ত্রীর সাথে তর্ক করতে পারি না। নিজের চাকরি সামলে বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম উনিই করেন। আমি অথর্ব লোক। কী বলবো বুঝতে পারছি না। গৃহ শান্তি বজায় রাখতে অনেক অপ্রিয় কথা, মিথ্যে অভিযোগ মেনে নিতে হয়। আমি মুখ বন্ধ করে সোফায় কাত হয়ে বসে রইলাম।
-কথা বলছ না কেন?
কথা না বললেও মুশকিল। আমি একটু হেসে ঢোঁক গিলে বললাম, ‘খুব ভালো। খুব ভালো করেছো’। তারপর আগের মতই চুপ। একই ভঙ্গিমায় বসে রইলাম।
স্ত্রী চেয়ার থেকে উঠে অন্য ঘরে গেলেন। কাজের মাসী আসবে। এখানে কাজের মাসীকে ‘বাই’ বলে ডাকা হয়। তরকারি কেটে দেবে বাই। সরমা রান্না করবে। আর আমি বসে থাকবো চুপ করে। ভাবতে থাকবো দরকারি অদরকারি অনেক কিছু।
বিষয়ের কি অভাব আছে। আজকেও ভাবনা চলছে। আর ঘুরে ফিরে মাথার চারদিকে একটা মাছি ভোঁ ভোঁ করে চক্কর কাটছে। তাড়িয়ে দিলেও ফিরে ফিরে আসছে মাছিটা। একটাই সওয়াল। ক্যাবেজ। ছশ টাকা কিলো?
-চা খাবে নাকি’? কিচেন থেকে আওয়াজ ভেসে এল।
-কষ্ট না হলে দাও।
-কষ্টের কি আছে? অন্য দিন যেন দিই না।
আমি নিরুত্তর। মাথার ভিতর ঘুরছে পোকাটা। ফরফর আওয়াজ। ক্যাবেজ ছশ টাকা কিলো। সরমার হাতের কপিটা হাঁফ কিলো। মানে তিনশ টাকা!
মাথায় প্রশ্ন উঠছে, ডুবছে। শপিং মল বাঁধাকপি বিক্রি করছে। কিলো প্রতি ছ’শ টাকা! এ’তো ইউরোপকে হারিয়ে দেবে। কয়েক বছর আগে কৃষি দফতরের বিজ্ঞানি হিসাবে একটা বক্তৃতা দিতে জার্মানি গেছিলাম। নিউরেনবার্গ শহরে দেখলাম দুটো কলার দাম এক ইউরো। মানে সত্তর টাকা।
আর এখানে বাঁধাকপি ছ’শ টাকা কিলো! আশ্চর্য! কত দামে কিনেছে এরা? উত্তর প্রদেশ লাগোয়া দিল্লীর এই দিকটাতে ছোটখাট বাজার নেই। যা আছে সবই বড় বড় শপিং মল। মাছ থেকে মোবাইল, কপি থেকে কম্পিউটার সবই পাওয়া যায়। দাম বেশী সবাই জানে। তাবোলে এতটা?
বাঁধাকপির দাম শুনে অস্থির লাগছে বড়। দশ-বিশ কিলোমিটার দূরে গ্রামে গিয়ে একটু খোঁজ নেবো, তারও ক্ষমতা নেই। শরীর অচল। চলাফেরা করতে না পারলে মনকেও গ্রাস করে নেয় বিষণ্ণতা। সেই কষ্ট একাকী সহ্য করতে হয়। আজ বিষণ্ণতার পর্দা ঠেলে মনের মধ্যে খোঁচা মারছে অন্য ভাবনা।
চাষিদের কাছ থেকে কত দামে কিনেছে এরা? প্রশ্নটা চক্কর কাটছে মাথায়। অবসর নেবার পর আরেকটা বড় রোগ ধরেছে। মনের রোগ। কোন একটা খিঁচ মাথায় ঢুকে গেলে সহজে নিস্তার নেই। ওটা কখনও মাছি, কখনও ভিমরুল হয়ে কেবলই গুনগুন করতে থাকে। শেষ না দেখে নিস্তার নেই। আসল দামটা জানতে হবে। গুগুলে খুঁজলাম। বলছে তিনশ টাকায় এক কিলো।
বলে কি রে! দু’বছর আগে তখন সদ্য অবসর নিয়েছি। বর্ধমান সদরে দেখছি একটা বড় বাঁধাকপি বিকোচ্ছে পাঁচ টাকায়। আমার সঙ্গে ছিল ভাগ্নে। বলল, ‘মামা গাঁয়ের দিকে আরও সস্তা’।
ভাগ্নে খোকন এখন স্কুলের মাষ্টার। যখন তখন ফোন করলে ধরে না। তবু ফোন করলাম। পেয়ে গেলাম একবারেই। বলল, আজ ওর ছুটি। প্রশ্নটা করতে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল খোকন। এত কথা থাকতে কপির দাম শুধোচ্ছে মামা! কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার এখান থেকে কপি কিনে দিল্লীতে বিক্রি করবে নাকি? খোকনের প্রশ্নের জবাব দিয়ে আবার জানতে চাইলাম। ও বলল, ‘এখন অল্প অল্প উঠছে বাজারে। দাম একটু বেশী’?
-কত দাম বলো না তুমি?
একটু থেমে কাউকে জিজ্ঞেস করে ও বলল, ‘চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা কিলো’।
-ঠিক আছে খোকন। তুমি কাজ কর। পরে কথা বলবো’। আমি ফোন রেখে দিলাম।
হঠাৎ ভুরভুরি কেটে মাথায় ভেসে উঠল রতনের মুখটা। প্রবাসী বাঙালি বনে গেলেও বঙ্গের অনেকের সাথেই যোগাযোগ আছে। মালদার বন্ধু রতনের সাথে প্রায়ই কথা বলি। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপেও সংবাদ চালাচালি হয়। গোলাপট্টি পাঠশালায় এক সাথে পড়েছি আমরা। শরীর স্বাস্থ্য ভালো রতনের। এদিক-সেদিক বেড়াতে যায় এখনও।
সকাল দশটায় আমার ফোন পেয়ে মালদাইয়া রতন হাসতে হাসতে বলল, ‘কি বে, এত সকালে ফোন করছিস?
-শোন্‌ না দরকার আছে।
-বল বন্ধু।
-ওখানে বাঁধাকপি উঠছে?
-ব্যবসা করবি নাকি?
-দামটা বল না! বাজার টাজার করিস না নাকি?
-করি, করি। রোজ করি। কাল চিত্তরঞ্জন মার্কেটে দেখলাম খুব চড়া দাম।
-কত দাম বল না!
-আশি টাকা কিলো। তবে গ্রামের দিকে সস্তা। হবিবপুর, মঙ্গলবাড়ির হাটে পঞ্চাশ টাকা। চাষিদের ক্ষেতে গিয়ে কিনলে পনের-কুড়ি টাকা।
‘ঠিক আছে রতন’। ফোন রেখে দিতেই মুলচাঁদের কথা মনে পড়ল। হাতড়াসে বাড়ি। আমার সহকর্মী ছিল। অবসরের পরে চাষবাস নিয়েই থাকে।
হিন্দিতে প্রশ্ন করলাম, ‘মুলচাঁদজী, ওখানে বাঁধাকপি উঠছে? কী দাম’?
-দাদা, দাম বহুত জ্যাদা।
-কত?
-সত্তর আশি রুপেয়া পার কিলো’। উত্তর শুনে দু-একটা কথা বলে ফোন রেখে দিলাম। আরও কথা বলবার ইচ্ছে ছিল। পুরনো সহকর্মী। কথা কি আর শেষ হয়। কিন্তু চা হাতে নিয়ে সামনে দন্ডায়মান সহধর্মিণী। ফর্সা ভরাট মুখটায় লেপটে আছে বিরক্তির কালচে পোঁচ। গলা উচিয়ে বলল, ‘চা খেয়ে উদ্ধার কর। কাজ নেই তো খই ভাজ্‌। হঠাৎ বাঁধাকপি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন’!
একটু থেমে আবার। ‘আমার বাপের বাড়িতে তো একটু ফোন করতে পারো। মা’র শরীরটা ভালো নেই। একটু খবর নিতে পারো না?’
-নেবো, নেবো’। চায়ে চুমুক দিয়ে আমি বললাম। একটু পরে ফোন করলাম হেমন্তকে। অবসরের পর চলে গেছে নিজের বাড়ি, আসামের মঙ্গলদই। ওর ফোন বাজতে বাজতে কেটে গেল। একটু পরে ও নিজেই ফোন করল। আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হেমন্ত, তোমার ওখানে বাঁধাকপির কি দাম’?
‘অনেক দাম দাদা। আমি তো কিনি না। দাম পড়ুক, তারপর কিনবো।
-আমাকে দামটা বল না ভাই।
তখনই বলল না ও। খানিক পরে সম্ভবত বাজার থেকে ঘুরে এসে বলল, ‘এখানে সত্তর টাকা, একটা বড় বাঁধাকপি।’
-ঠিক আছে, পরে ফোন করবো।’ আমি মোবাইল সেটটা টেবিলে নামিয়ে রাখলাম।
সরমা গজগজ করছে। ‘সকাল থেকে বাঁধাকপি নিয়ে পড়লে। আমি ঠকেছি বেশ করেছি। নিজের টাকায় খুশি মত একটু কেনা কাটা করতে পারবো না?’
পারবে পারবে, আমি মনে মনে বললাম। সরমা এখানকার লেডিস সার্কেলের সভাপতি। স্থানীয় এক বেসরকারি কলেজে দর্শনের অধ্যাপিকা। জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছে সরমা। কলেজ ওকে ভালোই মাইনে দেয়। দু’হাতে কেনা কাটা করে সরমা। ওসব নিয়ে আমি কখনই কিছু বলিনা। মুখ খুললেই ফোঁস করে ওঠে।
আমি নিরুত্তর, তবু সরমা ফোঁস করে উঠল। গলায় ঝাঁজ নিয়ে আগের কথাটাই কেটে কেটে বলল, ‘ঠকেছি বেশ করেছি। তুমি কোন দিন ঠকোনি?’
-ঠকেছি। আমি বললাম, ‘পচা মাছ কিনে কতবার ফেলে দিতে হয়েছে।‘
-তবে! আর আমি ঠকলেই গবেষণা শুরু করে দাও!
কী বলবো ভাবছি। একটা বেফাঁস শব্দ বেরোলই কথার তিরে শুইয়ে দেবে ও। অনেক ভেবে শব্দ চয়ন করে আমি বাক্য গঠন করলাম। স্বরে মধু মাখিয়ে ধীরে ধীরে বললাম, ‘তুমি ঠকোনি। হাজার হাজার লোক যারা শপিং মল থেকে জিনিস কিনেছে, সবাই ঠকেছে।’
-আমি মানছি না’ সরমা ঝাঁজিয়ে উঠল। ‘পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটা জ্যাকেট কিনলে গত বছর। তখন তো আমি কিছু বলি নি।’
আমি রণে ভঙ্গ দিয়ে মুখ নামিয়ে বসে রইলাম। তিরিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে কখন কোথায় কতবার ঠকেছি তার ফিরিস্তি শুনে যাচ্ছি। নাগাড়ে আমার ঠকে যাওয়ার ইতিহাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়লাম। বাঁধাকপির দাম নিয়ে কি কুক্ষণে যে কথা বলেতে গেলাম! সরমার বিগড়ে যাওয়া মেজাজ স্বভাবিক হচ্ছে না। কেন যে ওর মাথা এতটা গরম হয়ে গেল!
সরমা বলে চলেছে, ‘কিনেছি, বেশ করেছি। সরকারি সিলমোহর লাগানো। প্যাকেটে ন্যায্য দাম লেখা। ঠকেছি, বেশ করেছি…।’
আরও কিছু বলতে চাইছিল সরমা। আমার মোবাইল ফোনটা বাজতেই সরমা মুখ বন্ধ করল। ফোনের ওপারে খোকনের কণ্ঠস্বর। ‘মামা এখানকার গ্রামে চাষিদের কাছ থেকে বাঁধাকপি কিনছে এক অল ইন্ডিয়া কোম্পানি। দাম দিচ্ছে কিলোতে পাঁচ টাকা’।
সরমা বোধহয় শুনতে পেয়েছে খোকনের কথা। খুব জোরে জোরে কথা বলে খোকন। আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে খোকনকে জিজ্ঞেস করল সরমা, ‘তোমাদের ওখানে কপির কত দাম বললে?’
আমি শুনতে পেলাম খোকনের স্বর, ‘মামী, আমাদের এখানে চাষিরা বিক্রি করছে চার-পাঁচ টাকা কিলো দরে’।
-চার-পাঁচ টাকা কিলো!’ সরমার স্বরে বিস্ময়।
-এক কিলো কপি ফলাতে খরচ কত? খানিক উত্তেজনা সরমার স্বরে।
‘সারের দাম লেবার কস্ট ধরলে, পাঁচ টাকার অনেক বেশী।’ খোকন একটু সময় নিয়ে বলল।
ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল সরমা। খানিক অন্যমনস্ক। চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেল। মুখের ভাব বদলে গেল ওর। ক্রোধ বিরক্তি সরে গিয়ে এখন বিস্ময়। কপালে ভাঁজ। চোখ বড় বড়। ঠোঁট কাঁপছে। খুব রেগে গেলে এরকম হয় ওর। নিজিকে একটু সামলে নিয়ে সরমা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তার মানে এখানে একশ গুণ বেশী দামে বিক্রি হচ্ছে’?
-একশ গুণ কেন, আরও বেশী।’ আমি ধীরে ধীরে বললাম।
-রাইট, রাইট? ঠিক বলছো তুমি’। সরমা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
হঠাৎ সরমার স্বর সপ্তমে উঠে গেল। ‘ডাকাতি চলছে, ডাকাতি’।
আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। ঘরে বাইরে দাপট সরমার। কথায় ঝাঁজ আছে। তবে সাধারণত চিৎকার চেঁচামেচি করে না ও। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বসে রইলাম।
বুক খালি করা একটা শ্বাস ফেলল সরমা। অনেকক্ষন টান টান হয়ে বসে থাকলো। লম্বা ড্রয়িং রুমের এধার থেকে ওধার কয়েক বার হাঁটল ও।
আমি একটু বোকা বোকা মুখ করে বললাম, ‘এত রাগছো কেন? আমি কিছু ভুল বললাম’?
উত্তর নেই সরমার। কী যেন ভাবছে ও। ঘরের স্বাভাবিক পরিবেশ হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। মনে মনে বললাম, ‘ওঃ, কেন যে দাম আর ঠকে যাওয়া নিয়ে বলতে গেলাম’।
সরমার রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কোন্‌ বাক্যবাণ ধেয়ে আসবে, ভাবছি। অনেকক্ষণ পর সরমা মুখ খুলল, ‘এটা তো লুট চলছে। আমি ঠকেছি, সেটা বড় ব্যাপার নয়।’
-বড় ব্যাপার কোনটা’? আমি অস্ফুটে বললাম।
-সরকারের লাইসেন্স নম্বর ছাপানো আছে প্যাকেটে। মানে ওদের কাজটা তো বৈধ।
-বৈধ। সরকারী আইন মতে বৈধ।’ আমি বললাম।
সরমার মুখে কথা নেই। অন্য দিন টেবিলে খাবার সাজিয়ে আমাকে আদেশের সুরে ডাক দেয়, ‘খাবার দিয়েছি। উঠে এসে চেয়ারে বস’।
আজ মধ্যান্ন ভোজনের কথা ভুলে গেছে ও। বেশ উত্তেজিত। বারবার বলছে, ‘এটাতো অন্যায়। লুট। চাষিরা ঠকছে, আমরাও। লেডিস সার্কেলে জানাতেই হবে…।’
আমি মিন মিন করে বললাম, ‘এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন?’
-তুমি বুঝবে না। কলেজে এথিক্স পড়াই তো। আমার কাছে ছেলে মেয়েরা নীতিশিক্ষার পাঠ নেয়।
আমি নিরুত্তর। সরমা বলে চলেছে, ‘কেনা দামের উপর কতটা লাভ রেখে বিক্রি করবে, তার তো নিয়ম আছে। নিয়ম না থাকলে তো বলবো লুটের রাজত্ব। ডেসপটিসম’।
একটু থেমে ক্লাশে লেকচার দেবার ভঙ্গীতে বলে চলেছে সরমা, ‘জাপানে দেখছি, ওদের স্টিকি রাইসের অনেক দাম। একদম বাজে খেতে। তবু বেশী দাম। কারণ? ভালো দাম না পেলে তো চাষিরা কাজ করবে না। চাষ না করলে ফিয়াট আর টয়েটা খেয়ে কি পেট ভরবে ওদের…?’
-এখানেও তো ভালো দামে শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে?’ ওর কথার মাঝখানে বলে বসলাম।
-হ্যাঁ হচ্ছে। লাভের গুড় খাচ্ছে ব্যবসায়ী ফোরে আর দালাল।
-অন্য দেশেও তো এরকম হয়।’ আমি একটু নড়েচড়ে বললাম।
-হয়। ইউরোপ আমেরিকাতেও চাষিরা আন্দোলন করে। ট্রাক্টর নিয়ে শহরের পথ অবরোধ করে’। সরমা উত্তেজিত স্বরে বলেই চলেছে।
আবেগ উত্তেজনা ভর করলে মানুষের কথার স্রোত থামে না। সরমা থামছে না। বলল, ‘নাঃ, এরকম লুট কোন স্বাধীন দেশে হয় না। কিছু একটা …।’
-কী করবে, আন্দোলন?’ আমি বললাম।
সরমা কি যেন ভাবছে। ওর ভাবিত মুখের দিকে পলক তাকিয়ে আমি আবার বললাম, ‘গত বছর আন্দোলন করতে গিয়ে দেড়শ চাষি মরেই গেল। খেয়াল আছে?’
সরমা গম্ভীর। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বড় একটা শ্বাস ফেলল। তারপর বিড়বিড় করল, ‘হার্টলেস গভরমেন্ট। আমাদের কিছু একটা করা উচিত’।
-কী করবে? সরকার আর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে?
-করাতো উচিত’। কথাটা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সরমা। খানিক পরে বড় একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কিছু তো একটা করবোই। দেখি সার্কেলের অন্য মেম্বাররা কী বলেন’!
-কী আর করবে তোমরা!’ আমি বললাম, ‘নিষ্ঠুর সরকার…একটুতেই গুলি চালিয়ে দেয়।’
সরমা টানটান হয়ে বলল, ‘কিছু না পারি, লুটের রাজত্ব চলছে এটা তো বলতে পারি।’
আমার মুখে কথা নেই। এবার অন্য একটা কথা মাথায় ঘুরতে লাগলো। ‘লুটের রাজত্ব’, মনে মনে বললাম, সরমা ঠিকই বলেছে। আমি মাথা নাড়িয়ে চুপ করে বসে রইলাম। -০-

ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী
ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী
ড.সৌমিত্র কুমার চৌধুরী, ভূতপূর্ব বিভাগীয় প্রধান ও এমেরিটাস মেডিক্যাল স্যায়েন্টিস্ট, চিত্তরঞ্জন জাতীয় কর্কট রোগ গবেষণা সংস্থাণ, কলকাতা-700 026. প্রকাশিত গ্রন্থ- বিজ্ঞানের জানা অজানা (কিশোর উপযোগী বিজ্ঞান), আমার বাগান (গল্পগ্রন্থ), এবং বিদেশী সংস্থায় গবেষণা গ্রন্থ: Anticancer Drugs-Nature synthesis and cell (Intech)। পুরষ্কার সমূহ: ‘যোগমায়া স্মৃতি পুরস্কার’ (২০১৫), জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকায় বছরের শ্রেষ্ঠ রচনার জন্য। ‘চৌরঙ্গী নাথ’ পুরস্কার (২০১৮), শৈব ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাসের জন্য। গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরষ্কার (2019), পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি দফতর থেকে), পঁচিশ বছরের অধিক কাল বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় বিজ্ঞান রচনার জন্য)।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।