7.1 C
Drøbak
শুক্রবার, মে ২৭, ২০২২
প্রথম পাতাস্মরণরবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনা ও আধুনিকতা

রবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনা ও আধুনিকতা

রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সংগীত তথা বিশ্ব সংগীত সম্ভারের এক অনন্য সম্পদ। তাঁর গানে বাণীর উৎকর্ষ, এর দার্শনিকায়ন, সুরের অভিনবত্ব, বাণী ও সুরের সম্মিলন প্রভৃতি বিষয় যথেষ্ট আলোচিত। কিন্তু সংগীত বিষয়ে তাঁর ভাবনা নিয়ে আলোচনা তেমন একটা দেখা যায় না। সাধনার দীর্ঘ পরিক্রমায় তিনি সংগীতকে দেখতে চেয়েছেন আপন বৈশিষ্ট্যে, মুক্তি দিয়েছেন নিয়ম-শৃঙ্খলের নাগপাশ ছিঁড়ে। হিন্দুস্থানী সংগীতের বেড়াজাল অতিক্রম করে বাংলা গানের চারিত্র্য নির্ধারণে, সমসাময়িক চিন্তার বাইরে গিয়ে তিনি যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে, সময়ের চেয়ে তিনি কতটা এগিয়ে ছিলেন।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ছিল সংগীতচর্চার একটি পীঠস্থান। তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ ওস্তাদদের আনাগোনা ছিল এ বাড়ির প্রাঙ্গন। রাগ-রাগিণীর অবচেতন পাঠ নিতে নিতেই শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বাড়িতে নিয়মিত আসর, মেজদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে সুরের খেলা উপভোগ, ব্রাহ্ম উপাসনা সংগীত সৃষ্টি প্রভৃতির মাধ্যমে কবির সংগীতমানস পরিপুষ্ট হতে থাকে। কিন্তু প্রথাগতভাবে ওস্তাদের কাছে ’নাড়া’ বেঁধে শিক্ষাগ্রহণ করা তাঁর হয়ে ওঠেনি। তিনি নিজেই বলেছেন, ” সংগীতশিক্ষাটা আমার সংস্কারগত, ধরাবাঁধা রুটিন মাফিক নয়।” সংগীত চিন্তার ক্ষেত্রেও তাঁর প্রথাবিরুদ্ধতা লক্ষ্যণীয়। পূর্বজদের সৃষ্ট রাগ-রাগিণীর রূপরেখার মধ্যেই কেবল তিনি অবগাহন করেননি; কান পেতেছেন সংগীতের হৃদয়ে, ভেবেছেন নতুন আঙ্গিকে, বিদ্যমান কাঠামো ভেঙেচুড়ে একাকার করেছেন, সাজিয়েছেন নতুন বিন্যাসে, উন্মুক্ত করেছেন নতুন দিগন্ত।

রবীন্দ্রনাথ ভাবের প্রতিষ্ঠাকেই সংগীতের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে ভাবের বিভিন্নতা প্রকাশের জন্য স্বরের ওঠা-নামাসহ বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন করে। সংগীতের ক্ষেত্রেও ভাবের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সুরবিন্যাস আবশ্যক। তাঁর মতে, ভাবহীন কথা যেমন অর্থহীন; সুরের বেলায়ও তা যতই সুবিন্যস্ত, অলংকারপূর্ণ হোক, ভাব অনুপস্থিত থাকলে তা প্রাণহীন। এ বিষয়ে ’সংগীতচিন্তা’ গ্রন্থের ’সংগীত ও ভাব’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ”গায়কেরা সংগীতকে যে আসন দেন, আমি সংগীতকে তদপেক্ষা উচ্চ আসন দিই; তাহারা সংগীতকে কতগুলি জড় সুরের ওপর স্থাপন করেন, আমি তাহাদেরকে জীবন্ত অমর ভাবের উপর স্থাপন করি।’’ এ প্রসঙ্গে এগোতে গিয়ে তিনি কলাবিদ্যার দুই শাখা কবিতা ও সংগীতের তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, কবিতা ও সংগীত সহোদর হওয়া সত্ত্বেও কবিতা ভাবকে প্রাধান্য দেয় বলে উচ্চতর স্থানে অধিষ্ঠিত, আর সংগীতের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টো। ভাবের প্রতিষ্ঠার জন্যই স্বরবিন্যাসের এতো বৈচিত্র, এতো রাগ-রাগিনী। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ওস্তাদদের হাত বেয়ে রাগ-রাগিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে ওঠে। রাগ-রাগিণীর লালিত্য প্রকাশ, নিয়মতান্ত্রিকতার কঠোর অনুশাসনই গায়কদের কাছে মুখ্য হয়ে পড়ে। মূলভাবটি উপেক্ষিত থেকে যায়। একই প্রবন্ধে তিনি বলেন, ’’… সংগীতে কতকগুলা নাম ও নিয়মের মধ্যেই যেন বদ্ধ হইয়া না থাকি। কবিতারও যে স্বাধীনতা আছে সংগীতেরও সেই স্বাধীনতা হউক। …যেমন সন্ধ্যার বিষয়ে কবিতা রচনা করিতে গেলে কবি সন্ধ্যার ভাব কল্পনা করিতে থাকেন ও তাহার প্রতি কথায় সন্ধ্যা মূর্তিমতী হইয়া ওঠে, তেমনি সন্ধ্যার বিষয়ে গান রচনা করিতে গেলে রচয়িতা যেন চোখ কান বুজিয়া পূরবী না গাহিয়া যান– যেন সন্ধ্যার ভাব কল্পনা করেন–তাহা হইলে অবসানদিবসের ন্যায় তাঁহার সুরও আপনা-আপনি নামিয়া আসিবে, মুদিয়া আসিবে, ফুরাইয়া আসিবে। প্রত্যেক গীতিকবির রচনায় গানের নূতন রাজ্য আবিষ্কার হইতে থাকিবে। তাহা হইলে গানের বাল্মিকী গানের কালিদাস জন্মগ্রহণ করিবেন।”

হিন্দুস্থানী সঙ্গীত তার ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধি নিয়ে সগৌরবে বিরাজমান। এই গৌরবের নিমজ্জমান শিল্পী-গায়কদের মুখ্য হয়ে ওঠা কৌশল প্রদর্শনকে রবীন্দ্রনাথ সমর্থন করেননি। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে এক পত্রালাপে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ”Art is never an exhibition but revelation.” Exhibition এর গৌরব তার অপরিমিত বহুলত্বে, Revelation এর গৌরব পরিপূর্ণ ঐক্যে। সেই ঐক্যে থামা ব’লে একটা পদার্থ আছে, চলার চেয়ে তার মূল্য কম নয়।” বস্তুত পরিমিতিবোধ (Sense of Proportion) সংগীত তথা যেকোন কলার একটি অনিবার্য উপাদান। তাঁর মতে, কালোয়াতি প্রদর্শনের অতিরঞ্জন গায়কের পারদর্শিতা হয়তো প্রদর্শন করে, কিন্তু তাতে সংগীতের কোন উদ্দেশ্যসাধন হয় না। বরং তা সংগীতের মূলস্রোতটির টুঁটি চেপে ধরে। উপায় যখন উদ্দেশ্যের ওপর চেপে বসে, শিল্প তখন ঢাকা পড়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ নিস্প্রাণ নিয়মবিধির কঠোর অনুশাসনের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন, নতুন সৃষ্টির পক্ষে তাকে বাঁধা মনে করতেন। বস্তুত, তা তাঁর স্বভাববিরূদ্ধও বটে। রাগ-রাগিণীর বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে গিয়ে যারা গলদঘর্ম, তাদের উদ্দেশ্যে ’সংগীতের ও ভাব’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন, ’’জয়জয়ন্তীর কাছে আমরা এমন কী ঋণে বদ্ধ যে, তাহার নিকট অমনতরো অন্ধ দাস্যবৃত্তি করিতে হইবে? যদি স্থলবিশেষে মধ্যমের স্থলে পঞ্চম দিলে ভালো শুনায় কিম্বা মন্দ শুনায় না, তাহাতে বর্ণনীয় ভাবের সহায়তা করে, তবে জয়জয়ন্তী বাঁচুন না মরুন, আমি পঞ্চমকেই বহাল রাখিবনা কেন…?” ইমন রাগে সৃষ্ট ”দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে” গানটিতে ইমন রাগ বহির্ভূত কোমল নিষাদ স্বরটি ব্যবহৃত হয়েছে। ভৈরব রাগে সৃষ্ট ”শুভ্র আসনে বিরাজো অরুণছটা মাঝে’’ গানটিতে ভৈরব রাগ বহির্ভূত কোমল গান্ধার স্বরটি ব্যবহৃত হয়েছে। গানের ভাবটি সুচারুরূপে ফুটিয়ে তোলার জন্য রাগ বহির্ভূত স্বরের ব্যবহারের এমন অসংখ্য উদাহরণ মিলবে। এছাড়াও একই গানে একাধিক রাগের ব্যবহারের নজির রবীন্দ্রসংগীত অনেক পাওয়া যাবে। এছাড়াও প্রথাগত তালের বাইরে ঝম্পক, ষষ্ঠী, রূপকড়া, একাদশী, নবতাল ও নবপঞ্চ নামে ছয়টি তালও তিনি সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মতে, রাগ-রাগিণীর গুণী স্রষ্টাগণ ভারতীয় সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। এই সমৃদ্ধি হচ্ছে নতুন সৃষ্টির প্রেরণাস্থল। কিন্তু তাঁদের বাঁধা সুরের শুধু পূনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়না, বরং তাতে নতুন সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হয়, প্রতিভার নিঃশেষ হয়। সংগীতজ্ঞ দীলিপ কুমার রায়ের সাথে এক পত্রালাপে বলেন, ”শিল্পী নিজের পথ করে নেবে, প্রাচীন সংগীতের কন্ঠে ঝুলে থাকাটা তার সইবে কেন? পুরাতনকে বর্জন করতে বলিনে, কিন্তু নতুন সৃষ্টির পথে যদি তাতে কাঁটা তারের বেড়া দেখা দেয় তবে তা নৈব নৈব চ।” ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতই রবীন্দ্রসংগীতের ভিত্তি। কিন্তু শাস্ত্রের অশাস্ত্রীয় প্রভাব তাঁর গানের স্বকীয়তাকে মোটেই বিনষ্ট করতে পারেনি। তাঁর গানের সুর বাণীর আহবানকে ছাপিয়ে যায়নি, বরং তাঁর ভাবের বাহক হয়েছে। এটাই রবীন্দ্রসংগীতের স্বাতন্ত্র্য।

হিন্দুস্থানী গান মূলত সুরপ্রধান। অকিঞ্চিৎকর অথবা অর্থহীন বাণীকে নিয়ে বহুক্ষণ এর পরিবেশনা চলতে পারে বিস্তার, তান, বোলতান প্রভৃতি সহযোগে। এখানে সুরই প্রধান উপজীব্য। রবীন্দ্রনাথ হিন্দুস্থানী গানের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে বাংলা গানের স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণে প্রয়াসী হলেন। তিনি এ দুইয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত দিক থেকে এবং বিকাশলাভের ধারায়ও ভিন্নতা লক্ষ্য করেছেন। হিন্দুস্থানী গানের বিশিষ্টতা এর সুরবৈচিত্র্যে, সুরের অসীম বিন্যাসে। বাংলা গান এর বাণীর মর্মকে সন্ধান করে, কথা ও সুরের কাব্যিক সম্মিলনে এর বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। তখনকার যুগের তাবৎ শিল্পী-সংগীতজ্ঞের মতের বাইরে গিয়ে হিন্দুস্থানী সংগীতের অন্ধ অনুকরণ না করে তিনি বাংলা গানের স্বকীয় ধারা প্রবর্তনে ব্রতী ছিলেন। বাংলা সংগীতে রবীন্দ্রনাথের এ এক বিরাট অবদান। অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ তাঁর ’বাংলা গানের ইতিহাস’ গ্রন্থে ’রবীন্দ্রসংগীত’ প্রবন্ধে বলেছেন, ”বাংলা গানের মূলমন্ত্রটি– গানের বাণী এবং সুরের সঠিক অনুপাত রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাছাড়া, তিনি বেঁধে দিয়েছিলেন গানের কাঠামো।” বাংলা গানের চার তুকের কাঠামোর প্রবর্তকও তিনিই। বিদ্যাসাগর যেমন বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপ দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ তেমনি বাংলা সংগীতের স্বতন্ত্র রূপরেখা প্রদান করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন সংগীতের গন্ডি বৈঠকখানায় সীমাবদ্ধ না থাক, সংগীতের গায়ে বিশ্বজনীনতার হাওয়া লাগুক। তবেই গতি আসবে সংগীতে। গতিহীন কোন শিল্প যতই উঁচুস্তরের হোক, সে পথ হারাতে বাধ্য। সংস্কৃতির মত গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে নবজীবন লাভ করে সংগীত। হিন্দুস্থানী গানের কাছে বাংলা গানের যেমন অশেষ ঋণ, ইউরোপীয় সংগীতের থেকে দান গ্রহণ করলেও তার জাত খোয়াবার ভয় নেই। দীলিপকুমার রায়ের সাথে এক পত্রালাপে তিনি বলেন, ”প্রাণের একটা শক্তি হচ্ছে গ্রহণ করার শক্তি আর-একটা শক্তি হচ্ছে দান করার। যে মন গ্রহণ করতে জানে না সে ফসল ফলাতেও জানে না, সে তো মরুভূমি।” তিনি ইউরোপ থেকে গানের সুর ও আঙ্গিক গ্রহণ করেছেন দুহাতে, কিন্তু পরিবেশন করেছেন দেশীয় ঘরানায় অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে, অর্থাৎ বাংলা গানের স্বকীয়তা বজায় রেখে। তিনি বাউল গান ও কীর্তনকে বলেছেন এখানকার মাটির সুর। লোকজ সুরকে অবলম্বন করে তিনি সৃষ্টি করেছেন বহু গান যার মধ্যে বেশ কয়েকটি তাঁর শ্রেষ্ঠ গান হিসেবে অভিহিত। বস্তুত বাউল গান ও দর্শন রবীন্দ্রনাথের সংগীত সাধনাতেই প্রভাব শুধু ফেলেনি, তাঁর জীবনদর্শনেও গভীর প্রভাব ফেলে। সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ’বাংলার লোকসঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীত’ প্রবন্ধে বলেছেন–”রবীন্দ্রনাথের গানের নিজস্ব জগৎ যে লৌকিক, বিদেশী ও মার্গসংগীতের ত্রিবেণী সঙ্গমে গড়ে উঠেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই তিন প্রভাব মিলিয়ে আসলে তিনি তৈরি করলেন চতুর্থবস্তু নয়, একটা সমন্বিত নতুনত্ব।”

সাহিত্যের মত সংগীতের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের দর্শন সরল। তিনি বিশ্বাস করতেন, অলংকারবাহুল্য বা বাণীর দীর্ঘসূত্রিতা আর্টের মর্যাদা বৃদ্ধি করে না। বরং সহজ-সরল ভাষা ও সুর যদি শ্রোতাকে মূলভাবের কাছে নিয়ে যায়, সেটাই সংগীতের সার্থকতা। সংগীতজ্ঞ দীলিপকুমারের সাথে আলাপকালে বলেছেন–”আর্টে প্রগল্ভতার চেয়ে মিতভাষ, বাহুল্যের চেয়ে সারল্য শ্রেষ্ঠ।” রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সচেতনভাবেই তাঁর গানের ভাষার প্রাঞ্জলতা রক্ষা করেছেন এবং শব্দের বাহুল্য এড়িয়ে চলেছেন। একই সাথে তাঁর সুরে এড়িয়ে চলেছেন মার্গসংগীতের অলংকারবাহুল্য ও অপ্রয়োজনীয় কালোয়াতি। আর্টের চুড়ান্ত উদ্দেশ্য আনন্দ দান। অপরিমিত বাহুল্য বর্জন করে আনন্দ দান করা একজন ক্ল্যাসিক আর্টিস্টের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। তালের বিষয়েও তিনি অত্যন্ত আধুনিক ধারণা পোষণ করতেন। এ বিষয়ে ’সংগীতের ও ভাব’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ”আমাদের সংগীতে যে নিয়ম আছে যে যেমন-তেমন করিয়া ঠিক একই স্থানে সমে আসিয়া পড়িতেই হয়, সেটা উঠাইয়া দিলে ভালো হয়। তালের সমমাত্রা থাকিলেই যথেষ্ট, তাহার উপরে আরও করাক্কড় করা ভালো বোধ হয় না; তাহাতে স্বাভাবিকতার অতিরিক্ত হানি করা হয়।” তালের আয়োজনের প্রাবল্য গানটাকে দূর্বল করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ তালকে ভাবের অনুগামী হতে নির্দেশ করেছেন। অনেকটা ইউরোপীয় সংগীতের মত ভাবের লঘুমাত্রার স্থানে ধীরগতি এবং ক্লাইমেক্সে দ্রুতগতি হবার পরামর্শ দিয়েছেন। সংগীতে তবলাসহ যেকোন যন্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, যন্ত্রের শব্দ কন্ঠস্বরের অর্ধেকের বেশি হবে না।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিন্তাচেতনায় সময়ের তুলনায় অগ্রসর ছিলেন। বাংলা সংগীত তাঁর অবদান অসামান্য। হিন্দুস্থানী সংগীতের কাছ থেকে তাঁর গ্রহণ অনেক হলেও তিনি তার অপ্রয়োজনীয় কলাকৌশলকে বর্জন করে, ভাষার সরলতা সহযোগে আদর্শ রূপ দিয়েছেন বাংলা সংগীতকে। যুগ যুগ ধরে আপন ঘরে আবদ্ধ সংগীতকে দিয়েছেন বিশ্বজনীনতার স্পর্শ, মাটির গন্ধ, সর্বোপরি মুক্তির স্বাদ। তাঁর সংগীতদর্শন আধুনিকতায় ঋদ্ধ।#

তথ্যসূত্র:
সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ, ফাল্গুন ১৪১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০
রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি, আবুল আহসান চৌধুরী, অন্বেষা প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০১৪
বাংলা গানের ইতিহাস, গোলাম মুরশিদ, প্রথমা প্রকাশন, মার্চ ২০২২

সঞ্জয় কুমার হালদার
সঞ্জয় কুমার হালদার
সঞ্জয় কুমার হালদার, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি বরিশাল কলেজ, বরিশাল এবং ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে পন্ডিত অসিত দে’র অধীনে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিমরত।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।