14 C
Drøbak
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১
প্রথম পাতাসাম্প্রতিকইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা: চরম দুর্দশায় জেলে জীবন

ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা: চরম দুর্দশায় জেলে জীবন

গত কয়েক বছর অভয়াশ্রমে ইলিশ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বড় ইলিশ কিছু পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের জেলেদের ভাগ্য কি এতে বদলেছে কিছু? ২০১৫ থেকে চলমান এই নিষেধাজ্ঞা জেলেদের মধ্যে হতাশাই বাড়িয়েছে, অনেকেই চলে গেছেন পেশা ছেড়ে অন্য পেশায়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এতে করে সরকারি হিসেবে খাতায় নিবন্ধিত জেলে সংখ্যা কমেনি বরং ৪০ কেজির চাল পেতে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে। সেইসাথে বঞ্চিত হয়েছেন সত্যিকারের জেলেরা।

সরকারী হিসেবেই উপকূলীয় ২০ জেলায় ২,৮০,৯৬৩টি জেলে–পরিবার রয়েছে। ২০২০ সালে এই হিসেব অনুযায়ী প্রতি জেলে পরিবারকে ৪০ কেজির চাল সাহায্য দেয়ার কথাও শোনা গেছে।

২০২০ সময়ের ৩ মার্চে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান লিখেছেন – ‘অভয়াশ্রমগুলোতে জাটকা ধরা বন্ধ এবং নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ধরা বন্ধ করার কারণে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। ‘

দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা (১০ ইঞ্চির চেয়ে ছোট ইলিশ) ধরা, পরিবহন এবং বিক্রি নিষিদ্ধ থাকে। চলতি মৌসুমেও একইভাবে চলেছে নিষেধাজ্ঞা। তবে নিষেধাজ্ঞার দিনক্ষণ যেন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তো বাড়ছেই।

গত বছর দুমাসের নিষেধাজ্ঞায় ২৩শে জুলাই পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। চলতি বছর তা আরো ৫ দিন বৃদ্ধি পেয়ে ৬৫ দিন হয়েছে। কিন্তু এর আগেই জেলেরা এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

bb 1 ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা: চরম দুর্দশায় জেলে জীবন
ছবি: টিটু

তাদের অভিযোগ, গত বছর দুই মাসেরও বেশী সময় তারা সাগরে মাছ ধরতে পারেননি, কিন্তু সুযোগটি নিয়েছে ভারতীয় জেলেরা – তারা এ সময় বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে নির্বিঘ্নে মাছ ধরে নিয়ে গেছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় বরগুনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে নলিবাজার। বাজারের পার্শ্ববর্তী এলাকাটি জেলে অধ্যুষিত।

এখানকার বেশিরভাগ মানুষ মূলত সাগরের মৎস্য সম্পদের উপর নির্ভর। মাছ ধরার জন্য নৌকা নিয়ে সাগরে যেতে পারলে তাদের জীবিকা চলে, নতুবা জীবন থমকে যায়।
টানা ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় জেলেরা অলস সময় কাটান। কেউ হয়তো কৃষি করার চেষ্টা করেন, কেউ জোগালী দেন কিম্বা কাজের খোঁজে পারি দেন অন্য জেলায়। কেননা সরকারি সাহায্য সকলের ভাগ্যে জোটেনা।

একজন জেলের স্ত্রী বলছিলেন, সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সময়টাতে তাঁর সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। স্বামী সাগরে মাছ ধরতে যেতে না পারায় ঠিক মতো খাবার জোটেনা তাদের। সন্তানের জন্য তাই ঐ একটাই ভাবনা- নিয়তি। বড় হয়ে মাছ ধরা ছাড়া আর কি করবে সে? এই পরিবারটির মতোই হাজারো পরিবারের সংসার থমকে আছে ৬৫ দিনের জন্য।

সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার জেলেদের ৪০ কেজি করে চাল দেয়ার ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শুধু নিবন্ধিত জেলেরাই এই সহায়তা পায়।

অন্যদিকে, ৬৫ দিনের জন্য ৪০ কেজি চাল নিতান্তই কম বলে জানালেন জেলে আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আরো অভিযোগ করেন, বহু জেলে আছেন যারা সরকারের খাতায় নিজেদের নাম নিবন্ধন করাতে পারেননি। তাদের কথা কেউ কি ভাবে?

তিনি বলেন “আমি যখন মাছ ধরতে সাগরে গেছি, তখন কার্ড কইরা ওরা চইল্যা গেছে। এই রকম আমার মতো হাজার-হাজার জেলে আছে যারা কার্ড করতে পারে নাই। নিবন্ধনহীন এই হাজারো জেলের ভবিষ্যৎ কি? কি কইরা খাইবো তারা?

জেলা মৎস্য অফিসের হিসেব অনুযায়ী, শুধু বরগুনায় ৪৫ হাজার নিবন্ধিত জেলে আছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার জেলেকে ৪০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে।

এদিকে ভোলা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাওয়া ডেটাবেস অনুযায়ী, জেলায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৯৩ জন। দেড় বছর আগের ওই ডেটার সঙ্গে বেড়েছে ১০৯ জন। ফলে সংখ্যা হচ্ছে ৩ হাজার ৬০০।

আবার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম আজাহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলার মোট চালপ্রাপ্ত নিবন্ধিত জেলে পরিবারের মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭ হাজার ৬’শ ৫৬, দৌলতখানে ১৯ হাজার ৫০০, বোরহানউদ্দিনে ৭৭ হাজার ৪৪, লালমোহনে ১৫ হাজার, তজুমদ্দিনে ১৬ হাজার ৭’শ, চরফ্যাসনে ২৪ হাজার ও মনপুরায় ১০ হাজার ২’শ পরিবার রয়েছে। এছাড়া জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার। এদের মধ্যে চাল বিতরণের অনিয়ম প্রায়শ সংবাদ শিরোনাম হয়। কক্সবাজারে মহেশখালী, উখিয়া ও টেকনাফে ৪৮,৩৯৩ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লাহ জানান, ইলিশসহ সমুদ্রের ৪৭৫ প্রজাতির মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাগরে মাছ আহরণে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই সময়ে সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ থাকবে। তিনি আরও জানান, পটুয়াখালীতে মাছ শিকারী জেলের সংখ্যা অনেক থাকলেও নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা রয়েছে ৬৭ হাজার। এরা সবাই কি সহয়তা পায়?

মৎস্য আহরণের সাথে জড়িত এই মানুষেরা বলছেন, ভারতে যখন সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশেও নিষিদ্ধ থাকা উচিত। তা না হলে ওরা ধরবে আর আমরা চেয়ে চেয়ে আফসোস করবো। এক হিসেবে বলা যায় আমরা ওদেরকে সুবিধা দিচ্ছি এভাবে।

বরগুনা জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির মালিক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম দাবি তোলেন, ভারতের সাথে মিল রেখে এই ‘অবরোধ’ কার্যকর করা হোক। সরকারের কাছে এটা আমাদের জোর দাবী।
জানা গেছে, ভারতে বাংলা পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০শে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত মাছ ধরার উপরে নিষেধাজ্ঞা থাকে। তাই ঐ সময়টাতে আমাদের এখানেও নিষেধাজ্ঞা জারী হলেই সুবিধা বেশি বলে মনে করেন দক্ষিণাঞ্চলের জেলে সমাজ।

তাদের ভাষায়, বঙ্গোপসাগর তো একটাই। সাগরে তো আর কোন ওয়াল দেয়া নাই যে, ইলিশ মাছ ওপাশে যাবে না। তাইলে একই বঙ্গোপসাগরে দুই রকমের নিয়ম হয় কিভাবে? তবে বরগুনা জেলার মৎস্য অফিস বলছে, বিচার-বিশ্লেষণ করেই এ সময়টিতে সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জেলেদের অভিযোগ হচ্ছে, বাংলাদেশের সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ রাখার সুযোগ নিয়ে ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশ অংশে ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

গতবছ জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর সংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোবসাগরে ৩২টি ভারতীয় ট্রলারসহ ৫০০ জেলে আটক করা হয়েছিল। এ খবর প্রকাশিত হয়েছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
তাই জেলেদের দাবী একেবারে অযৌক্তিক নয়,

এ বিষয়ে সত্যতা স্বীকার করে বরগুনা জেলার মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ভারতীয় জেলেদের বাংলাদেশে এসে মাছ ধরার বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে । এক্ষেত্রে কোস্ট গার্ড এবং নৌবাহিনী সজাগ রয়েছে বলে তিনি জানান।

কর্মকর্তারা বলেন, সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখার বিষয়টি ২০১৫ সাল থেকে শুরু হলেও চলতি বছর সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এতে করে মাছও বেশি ধরা পরবে বলে তাদের বিশ্বাস। কেননা প্রথমদিকে এই নিষেধাজ্ঞা মোটামুটি ফল দিয়েছে। কিন্তু একমাস বা বিয়াল্লিশ দিনের বদলে ৬০/৬৫ দিন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারীর সাথে সাথে কমতে শুরু করেছে মাছের আবাদ।

সম্প্রতি বরিশালের এস এ টিভি প্রতিনিধি সালেহ টিটু একটি প্রতিবেদন বলছেন- ‘গত বছরের এই সময়ের তুলনায় চলতি বছর নদীতে ইলিশ ধরা পড়ছে একেবারে কম। আগের মতো ইলিশ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলে থেকে শুরু করে ইলিশ মোকাম হিসেবে পরিচিত নগরীর পোর্ট রোডের আড়তদাররা।’

হঠাৎ করে ইলিশের এমন ‘হারিয়ে যাওয়ায়’ বিস্মিত জেলেরা! এদিকে মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, ইলিশের এই ‘হারিয়ে যাওয়ার’ পেছনে কারণ মূলত আবহাওয়া। আবহাওয়ার পরিবর্তন হলেই মিলবে ইলিশ।

নদীতে ইলিশ শিকারে থাকা একাধিক জেলে বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে বিশেষ করে ইলিশের অভয়াশ্রমে জাল ফেললে তেমন ইলিশ মিলছে না। গত বছর জালে যে পরিমাণ ইলিশ উঠেছে, এ বছর তার অর্ধেকও উঠছে না।

গত মার্চের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ১৬ দিন কেটে গেলেও এ অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা। তবে দুই একদিন ব্যতিক্রম ছিল। বিশেষ করে ৯ ও ১০ মে মোটামুটি ইলিশ পেয়েছেন জেলেরা। এরপর কিছুটা নড়েচড়ে বসেছিলেন জেলে ও আড়তদাররা। কিন্তু ১১ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত জেলেদের জালে তেমন ইলিশ ওঠেনি। এরই মাঝে তাদের উপর এলো আবারো ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা।

যে সময় ইলিশ পাওয়ার কথা সে সময় যদি না পাওয়া যায় তাহলে জেলেদের অবস্থা কী হয়, আর আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা কেমন তা কি কেউ বুঝতে পারছেন?

বরিশালের পোর্টরোডের ব্যবসায়ীদের হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ মণ করে ইলিশ আসে তাদের মোকামে। তা এখন ৫০ ও ৬০ মনে নেমেছে। মাঝে দুটোদিন শুধু গত ৯ ও ১০ মে ইলিশ এসেছে ২শ’ থেকে আড়াইশ’ মণ করে। এ ধারা থাকলেও কোনও সমস্যা ছিল না।

জানা গেছে, মে মাসের ঐ সময় যা ইলিশ ধরা পড়ছে তা স্থানীয় নদী থেকে শিকার করা। ছোট ছোট ট্রলার ও নৌকার জেলেরা এ মাছ শিকার করছেন। তাদের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ ইলিশ আড়তে এসেছিল। তা না হলে একেবারেই ইলিশশূন্য থাকতে হতো।

চৌমাথা বাজারের খুচরা বিক্রেতা গাফফার সিকদার বলেন, ইলিশ কম থাকায় স্থানীয় বাজারগুলোতে তেমন একটা ইলিশ দেখা যায় না। একটি বাজারে যেখানে ৫ থেকে ৭ জন খুচরা বিক্রেতারা ইলিশ বিক্রি করতো, সেখানে মাত্র একজন ইলিশ বিক্রি করছেন। আর দাম বেশি হওয়ায় তার কাছে ক্রেতাও কম। বর্তমানে খুচরা বাজারে এক কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৭শ’ টাকা দামে। ৫শ’ গ্রাম ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকা কেজি দরে। ওই ইলিশ শুধু টাকাওয়ালারাই কিনছেন বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস জানান, এখন যে পরিমাণ ইলিশ মিলছে গত বছর প্রতিদিন এর চেয়ে ডাবলেরও বেশি ইলিশ এসেছে। তবে এ বছর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পানি বৃদ্ধি না পাওয়ায় নদীতে ইলিশ মিলছে না। বর্তমানে ইলিশ সমুদ্রে আশ্রয় নিয়েছে। বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ওই ইলিশ নদীমুখী হবে। তখন জালে ইলিশ উঠবে বলে আশা করছেন এ কর্মকর্তা। অথচ সমুদ্রে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে ২৩ জুলাই ২০২১। আর এই অবসরে পেশা ছেড়ে জীবিকার পথ বদলে দেবেন কতজন তা কে বলতে পারেন?

অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।