1.1 C
Drøbak
সোমবার, অক্টোবর ১৮, ২০২১
প্রথম পাতাবাংলার বনেনাটোরে কদর বেড়েছে ডুমুরের!বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেই

নাটোরে কদর বেড়েছে ডুমুরের!
বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেই

একটা সময় ছিল যখন, নাটোরের গ্রাম-গঞ্জে প্রচুর পরিমান ডুমুর গাছের দেখা পাওয়া যেত। এই গাছ অযত্নে-অবহেলায় যেখানে সেখানে ব্যাপক সংখ্যায় গজিয়ে উঠত। তবে এখন উজার হয়েছে জঙ্গল, নির্মান হচ্ছে বসত বাড়ি। ডুমুরের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও গাছের সংখ্যা, আমাদের অবহেলার কারনে যাচ্ছে কমে।

ডুমুর ফল দেখতে যেমন সুন্দর তার আবরণ পুরো শক্ত হয়ে থাকে। কাঁচা থাকতে সবুজ রঙের হলেও পাকলে কোনোটি লাল, আবার কোনোটি হলুদ রং ধারণ করে। এই ডুমুর পাখিদের খাদ্য তবে এখন এই ডুমুর দিয়ে তরকারী রান্না করে খাওয়া হয়।আবার কেউ কেউ ভেষজ হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন।

ডুমুর মুসলমাদের কাছে কোন সাধারণ ফল নয়। এই ডুমুরের নামে আল কোরানের একটি সুরার নামকরণ করা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যাগযজ্ঞে ব্যবহার করা হয় ডুমুর। বাইবেলে ডুমুরের গাছের কথা উল্লেখ আছে , আর বৌদ্ধ ধর্মে এই গাছকে পবিত্র বলা হয়।

স্বাভাবিকভাবে কখনোই ডুমুরের ফুল দেখা যায় না।

কেউ বিরামহীন চেষ্টা করলেও তা দেখা অসম্ভব। ডুমুরের ফুল হয়, তবে ফলের ভেতরেই সবার অলক্ষ্যে গোপনে ফোটে ফুলটি। অন্য ফুলের মতো তাই তাকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাই ‘ডুমুরের ফুল’ প্রবাদ বাক্যটি বাংলা ব্যাকরণে স্থান করে নিয়েছে। কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর হঠাৎ সেই ব্যক্তি দৃশ্যমান হলে বাক্যটির ব্যবহারে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

ডুমুর নরম ও মিষ্টিজাতীয় ফল।ডুমুরের বৈজ্ঞানিক নাম Ficus racemosa। ইংরেজি নাম Ficus,Fig tree; এর আরবি নাম ‘তীন’; হিন্দি, উর্দু, ফার্সি ও মারাঠি ভাষায় একে ‘আঞ্জির’ বলা হয়। এই গাছ ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর আদি নিবাস মধ্যপ্রাচ্য। তবে ভারতের রাজস্থানের কালচে বেগুনী রঙের ডুমুর হয়।

ডুমুর মোরাসিয়ে গোত্রভূক্ত ৮৫০টিরও অধিক কাঠজাতীয় গাছের প্রজাতিবিশেষ। এ প্রজাতির গাছ, গুল্ম, লতা ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে ডুমুর গাছ বা ডুমুর নামে পরিচিত। ফলের আবরণ ভাগ খুবই পাতলা এবং এর অভ্যন্তরে অনেক ছোট ছোট বীজ রয়েছে। এর ফল শুকনো ও পাকা অবস্থায় ভক্ষণ করা যায়। উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে এ প্রজাতির গাছ জন্মে।

কখনো কখনো জ্যাম হিসেবে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়াও, স্ন্যাকজাতীয় খাবারেও ডুমুরের প্রয়োগ হয়। ডুমুরের ফুলের ইংরেজি নাম unseen flowers. যেফুল দেখা যায়না। ডুমুরগাছে বিনা ফুলেই ফল আসে।তবে অনেকে ডুমুরের ভিতরের অংশকে ফুল বলে বিবেচনা করে থাকেন।

ডুমুর বেশ কয়েক প্রজাতির হয়। এটি এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। পাখিরাই প্রধানত এই ডুমুর খেয়ে থাকে এবং পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে বীজের বিস্তার হয়ে থাকে। এই ডুমুরের পাতা শিরিশ কাগজের মত খসখসে।

এর ফল কান্ডের গায়ে থোকায় থোকায় জন্মে। মধ্যপ্রাচ্যে যে ডুমুর পাওয়া যায় তার ফল বড় আকারের; এটি জনপ্রিয় ফল হিসেবে খাওয়া হয়। বানিজ্যিকভাবে এর চাষ হয়ে থাকে আফগানিস্তান থেকে পর্তুগাল পর্যন্ত।

নাটোর পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের লালবাজার মহল্লার অ্যাড. চিন্ময় সরকার জানান, ছেলেবেলায় তিনি যখন তার গ্রামের বাড়ি যেতেন, তখন দেখেছিলেন গ্রামের আনাচে কানাচে বাড়িতে অনেক অযন্ত অবহেলায় পড়ে রয়েছে ডুমুর গাছ। তখন শুধু পাখিদের খাদ্যের যোগান হতো ডুমুর।

সবজি হিসাবে কদাচিৎ ব্যবহার হতো কিন্তু বর্তমানে মানুষের মধ্যে খাদ্যের পুষ্টিগুণ সম্বন্ধে সচেতনতা বেড়েছে। মানুষ তাদের খাদ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে এই অবহেলিত ভেষজ গুন সমৃদ্ধ ডুমুরকে। তাই অনেক পথসবজি বিক্রেতাকে দেখা যায় প্রোসেসিং করে ডুমুর বিক্রি করতে।তাই বাণিজ্যিকভাবে ডুমুর চাষ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

নাটোর সদর উপজেলার ৭নং দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের গাঙ্গইল গ্রামের মো. আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু জানান, ছোট বেলায় তার জ্বর হলে ডুমুরের ভাজি বা ভর্তা করে খেতে দেওয়া হতো। প্রায় ২০ বছর আগে ডুমুরের তরকারি তাদের গ্রামের মানুষ খেত না। ডুমুর ছিল পাখির খাদ্য। যেহেতু ডুমুরের বিবিধ ঔষধি গুন আছে সেহেতু মানুষের কাছে এখন চহিদা বেড়েছে ।

তখন গ্রামে প্রচুর আদার জঙ্গল ছিল। বিশাল মোটা মোটা প্রাচীন ডুমুর গাছ ছিল। এখন তাদের গ্রামে আর ডুমুর গাছ নেই।তিনি তার ইউনিয়নের কোথাও আর ডুমুর গাছ দেখতে পান না। পুরাতন গাছ গুলো বেশির ভাগ ভাঁটার আগুনে পোড়ানো হয়েছে।উজার হয়েছে জঙ্গল,নির্মান হচ্ছে বসত বাড়ি। ডুমুরের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও গাছের সংখ্যা আমাদের অবহেলার কারনে গেছে হারিয়ে।

শহরের নিচাবাজারের শাকসবজি বিক্রেতা তছলিমা বেগম জানান, তার বাড়ি সদর উপজেলার বড়হরিশপুর ইউনিয়নের শংকরভাগ গ্রামে।তার গ্রাম থেকে ডুমুর সংগ্রহ করে,বাজারে বিক্রি করেন। বর্তমানে ১ কেজি ডুমুরের দাম ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। তিান আরো জানান ইতিপূর্বে গ্রামের ডুমুর গাছ থেকে ডুমুর সংগ্রহ করলে গাছওয়ালা কিছু বলতেন না।

কিন্তু এখন গাছ থেকে ডুমুর পারলে গাছের মালিককে টাকা দিতে হয়। আর আগের মতন জঙ্গল এখন আর নেই। আগে জঙ্গলে অনেক ডুমুর গাছ ছিল। ডুমুর গাছের নিচে প্রচুর ডুমুর পড়ে থাকতো।পাখিরা খেত। দাম ছাড়া গ্রামের মানুষ অপরকে ডুমুর দান করতো। এখন সেই দিন আর নেই, জঙ্গলেও নেই ডুমুর। গাছের সংখ্যা গেছে অনেক কমে।

কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম অাব্দুর হাকিম জানান, পবিত্র কোরআনের ৯৫ নং সুরা হচ্ছে ‘ত্বীন’ (আঞ্জির) সেখানে এই ফলকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত বা অনুগ্রহরূপে ব্যক্ত করা হয়েছে। এই সুরার প্রথম আয়াতে আল্লাহ পাক এই ডুমুর আর জৈতুন নিয়ে শপথ করে বলেন-“শপথ, ডুমুর ও জলপাই এর”। আল্লাহ যেখানে ডুমুরের শপথ করেছেন তাই এই ডুমুর কোন মামুলী ফল হতে পারেনা।

আরব দেশে ডুমুর, খেজুর, রুটি,দুধ প্রধান খাদ্য তালিকায় আছে। আরব দেশে ডুমুর শুধু কাঁচা খাওয়া নয়, পাকা ডুমুর শুকিয়ে শুটকি করেও সারা বছর খাওয়া হয়। আমাদের দেশের হাজি সাহেবরা মক্কা থেকে শুকনা খেজুরের সাথে শুকনা তেঁতুল এবং এই ডুমুর নিয়ে আসেন। আরবের দোকানে শুকনো ডুমুর বিক্রি করা হয় বলে জানান তিনি।

কেন্দ্রীয় জয়কালিবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত নিধু চক্রবত্তী জানান, ডুমুর যাগযজ্ঞে ব্যবহার করা হয়। ‘চামুণ্ডা’নামে এক দেবীর আবাসস্থল শ্মশানভূমি বা ডুমুর গাছ এবং বৌদ্ধ ধর্মেও এই গাছ পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। গৌতম বুদ্ধ যে বোধি বৃক্ষতলে ধ্যন করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন তা ছিল অশ্বত্থ গাছ, যা একটা ডুমুর জাতীয় গাছ।

এছাড়া বাইবেলে ডুমুর গাছের উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ক্ষুধার্ত যীশুএকটি ডুমুর (আঞ্জির)গাছ দেখলেন কিন্তু সেই গাছে কোনো ফল ছিল না, তাই তিনি গাছকে অভিশাপ দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

নাটোর পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের উত্তরপটুয়াপাড়া মহল্লার কবিরাজ মো. শহিদুল ইসলাম জানান ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডুমুরের রস উপকারী। তিন থেকে পাঁচটি ডুমুর প্রতিদিন খেলে যৌনশক্তি বৃদ্ধি পায়। মেয়েদের মাসিকের সময় বেশি রক্তস্রাব হলে কচি ডুমুরের রসের সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে খেলে উপকার হয়। ডুমুর আমাশয় রোগ নিরাময়ের জন্য উপকারী।

এছাড়াও রক্তপিত্ত, রক্ত পড়া এবং রক্তহীনতা রোগে উপকারীতা আছে। জ্বরের পর ডুমুর রান্না করে খেলে এটি টনিকের কাজ করে। দুধ ও চিনির সঙ্গে ডুমুরের রস খেলেও অধিক ঋতুস্রাব বন্ধ হয়। আমাশয় হলে তিন দিন কচি ডুমুরের পাতা আতপ চালের সঙ্গে চিবিয়ে খেলে ভালো হয়।

সাদা ও রক্ত আমাশয় হলে ডুমুর গাছের ছালের দুই চামচ রস এবং মধু মিশিয়ে দুই বেলা খেলে উপকার হয়। মাথাঘোরা রোগে ডুমুর ভাজি করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। ডুমুর গাছের ছাল পানিসহ সিদ্ধ করে সেই পানি দ্বারা ত্বক ধুলে চর্মের বিবর্ণতা এবং ক্ষতরোগে উপকার হয়। দুধের সঙ্গে সিদ্ধ করে প্রলেপ দিলে ফোঁড়াপাকে বলে জানান তিনি।

সদর হাসপাতালেন সাবেক মেডিক্যাল অফিসার ডা.মো.আবুল কালাম আজাদ জানান ডুমুর ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য খুবই ভালো। দেহের ওজন কমানো, পেটের সমস্যা দূর করা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখাসহ নানা উপকার করে। ডুমুরে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ ও পুষ্টিগুণ রয়েছে বলে জানান তিনি।

গোল-ই-আফরোজ কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো.সাইফুল ইসলাম জানান, ডুমুর খুবই উপকারী,এর ফল শুকনো ও পাকা অবস্থায় খাওয়া যায়। ডুমুরের বাইরের অংশ রান্না করে খাওয়া যায়। নাটোরে যে ডুমুর পাওয়া যায় তাকে যজ্ঞডুমুর ,জগডুমুর বা যজ্ঞডুমুর নামে পরিচিত, যার বৈজ্ঞনিক নাম Ficus racemosa. জগডুমুরের বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে।

সবচেয়ে মূল্যবান ডুমুর, প্রজাতি মিশরীয় ডুমুর যাকে Egyptian Ficus বলা হয়।এটি খুব রসালো ফল ও অনেক বড় হয়। এটি দু’ভাবে খাওয়া যায়। কাঁচা সরাসরি খাওয়া যায়। অন্যটি রোদে শুকিয়ে কাঁচের কন্টেইনারে রেখে সারা বছর খাওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ফাইভস্টার হোটেলগুলোতে এর কদর সর্বোচ্চ।

এছাড়া অশ্বত্থ বা পিপল নামে আরেকটি ডুমুর জাতীয় গাছ আছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম Ficus religiosa। এটি বটগোত্রীয় বৃক্ষ, এর পাতার অগ্রভাগ সূচাল।উপরিউক্ত প্রজাতি ছাড়াও ডুমুরের আরো অনেক প্রজাতি রয়েছে।বিশ্বে ৬০০ প্রকারেরও বেশি ডুমুরের চাষ করা হয় বলে জানান তিনি।

নাটেরের পরিবেশবাদীদের দাবি বন জঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডুমুর গাছ গুলি সংরক্ষণের, পাশাপাশি নাটোরর মহাসড়কের পাশে এবং বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা পাখিদের অভয়ারণ্যে এই ডুমুর গাছ বেশি বেশি রোপন করা গেলে একদিকে যেমন পাখিদের খাবারের চাহিদা মিটবে অপরদিকে রক্ষা পাবে হারিয়ে যেতে বসা এই গাছটি।

অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।