শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

আজি হতে শতবর্ষ আগে

একশো বছর পূর্তি হ’লে ফিরে দেখার রেওয়াজ সর্বত্রই আছে। জন্মশতবর্ষ উদযাপন হয় ব্যক্তির, হয় প্রতিষ্ঠানের। শতবর্ষের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাদের ইতিহাস। আবার কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান ও ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞানতার আঁধার, শতবর্ষের আলোও ঘোচাতে পারে না। সেরকমই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ঘটনাকে স্মরণ করে লেখা একটি বই বেরিয়েছে এবছর, ২০২২-এ। তবে ২০২২-এ বেরিয়েছে মানেই যে এই বইয়ে স্মরণ করা সব শতবর্ষ পূর্তি এই সময়েই হয়েছে তা নয়। ২০১৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত, শতবর্ষপূর্তি উদযাপনের উদ্দেশ্যে লেখা প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে এই বইতে। এই সংকলনের প্রধান উদ্দেশ্য, লেখকের মতে, দুটি; লেখাগুলি যাতে হারিয়ে না যায় আর যাতে হঠাৎ কারুর দরকার পড়লে চটজলদি মেলে। আমরা আর একটা বিষয় যোগ করতে পারি; তা হল, এই শতবর্ষপূর্তিগুলো যেন মানুষের স্মৃতিতে জেগে থাকে।

কেন একথা বলছি তা বইটির বিষয়সূচিতে চোখ বোলালে স্পষ্ট হবে। শতবর্ষে স্মরণ করা হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ (১৯১৯) সংগঠনকে, সওগাত (১৯১৮) পত্রিকাকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১)-কে, খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯)-কে, বিদ্রোহী (লেখা ১৯২১-এ, প্রথম প্রকাশ ১৯২২-এ) কবিতাকে আর একজন ব্যক্তি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)-কে। স্মরণ করেছেন যিনি, তিনি সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের পাঠক এবং লেখক, ভারতের সংসদের দুটি কক্ষেরই প্রাক্তন সদস্য মইনুল হাসান। উদার আকাশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে মইনুল হাসান-এর ঐতিহাসিক গ্রন্থ “শতবর্ষে স্মরণ”।

কী ভাবছেন, সবই একটু মুসলমান ঘেঁষা? আসলে বাঙালির ইতিহাস বলতে হিন্দু বাঙালির ইতিহাসই বোধ হয় বেশি আলোচিত হয়, ফলে তা আলোকিত হয়। স্বভাবতই অজ্ঞানতাহেতু বাঙালি মুসলমান যেখানে শিরোভাগে, তা সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যাত হয়ে আঁধারে থেকে যায়! আর সেই আঁধার ঘোচানোরই চেষ্টা করেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট মইনুল হাসান। তিনি দেখিয়েছেন, জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ মুসলমানদের সর্ববৃহৎ সর্বভারতীয় ধর্মীয় সংগঠন হলেও সাম্প্রদায়িক নয়। তা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরুর মতো জাতীয় নেতারা এই সংগঠনের মঞ্চে এসেছেন। মইনুল হাসান জানিয়েছেন, এই হিন্দের আর একটা বড় কাজ হল জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আর্ত মানুষের সেবা করা।

বাঙালি ও মুসলমান আজি হতে শতবর্ষ আগে
আজি হতে শতবর্ষ আগে 4

সওগাত পত্রিকা সম্বন্ধে সমসাময়িক মোহাম্মদী পত্রিকার অভিযোগ ছিল সওগাত ইসলাম বিরোধী। আসলে সওগাতের সম্পাদক মহম্মদ নাসিরুদ্দিন ছিলেন প্রগতিশীল ভাবধারার মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন বাঙালি মুসলমান সমাজে আধুনিকতার স্পর্শ দিতে। সওগাতের পাতায় তুলে ধরা হত সামাজিক কুসংস্কার, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও রক্ষণশীল দলের প্রগতি-বিরোধী কাজকর্মের ছবি। স্বভাবতই তিনি সমাজের এই রক্ষণশীল অংশের বিরাগভাজন হন। কিন্তু নাসিরুদ্দিন এবং তাঁর সহযোগীরা ভয়ও পাননি, দমেও যাননি। অবিচলচিত্তে তাঁরা প্রগতির পথে হেঁটেছেন। সওগাতের স্লোগান ছিল, “নারী না জাগলে জাতি জাগবে না”। এই পত্রিকায় লিখতেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, ফজিলতুন্নেসার মত বিশিষ্ট মানবী। সওগাতে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম লেখা বের হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলাম-এর এই পত্রিকার পাতায়, তা ছিল “বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী” নামে একটা গল্প। ১৯২৯-এ কাজী নজরুল ইসলামকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয় সওগাত পত্রিকার উদ্যোগে।

এর বছর সাতেক আগে বেরিয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম-এর বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতা। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে কলকাতার ৩/৪সি তালতলা লেনে নজরুল লিখেছিলেন এই কবিতা। তা বের হয়েছিল একাধিক পত্রিকায়। প্রথমে বেরিয়েছিল অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত বিজলি পত্রিকায়, ১৯২২-এর ৬ জানুয়ারি। পরে পরপর বের হয় প্রবাসী, সাধনা এবং ধূমকেতুতে। ভাষা, বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার, ছন্দ ও বিষয়ভাবনায় বাংলা কবিতায় নতুন গতি এনে দেয় বিদ্রোহী। বইতে ১৪১ চরণের মূল কবিতাটিও সংকলিত হয়েছে।

অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে/ ভাগ হয়নিকো নজরুল”। সত্যিই কি আমরা দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার আপন ঐতিহ্য আর ইতিহাসকেও ভাগ করে ফেলেছি? তা না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের সমারোহের রং এপার বাংলায় এত কম লাগল কেন? সেই বিবর্ণতাকে একটু হলেও বর্ণময় করল মইনুল হাসান-এর এই বিষয়ক প্রবন্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সময় পর্বে রমেশচন্দ্র সামলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব। রবীন্দ্রনাথও বক্তৃতা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আর স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের কথা বললে যাঁর কথা প্রথমেই মনে আসে তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উদযাপনের একবছর আগেই পার হয়েছে শেখ মুজিবর রহমান-এর শতবর্ষ। তাঁকে শতবর্ষে স্মরণ করেছেন মইনুল হাসান। শেখ মুজিবর রহমান-এর কলেজজীবনে লেখা প্রবন্ধ উদ্ধৃত করে মইনুল হাসান ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার পরিপক্বতার পরিচয় তুলে ধরেছেন। দেখিয়েছেন বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর স্বপ্ন ও সঙ্কল্প। “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”-তে শেখ মুজিবর রহমান লিখেছিলেন, “জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি –আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।” সেই বাংলাদেশ গড়ে উঠল ১৯৭১-এ। ২৬ মার্চ পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তির কথা ঘোষিত হল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। আর তা কার্যকর হল ১৬ ডিসেম্বরে, যা বাংলাদেশের বিজয় দিবস। এর চার বছরের মধ্যেই ঘাতকের গুলিতে প্রাণ দিতে হল শেখ মুজিবর রহমানকে। তারিখ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। যে ১৫ আগস্ট দেশ ভাগ হয়েছিল, সেই তারিখেই প্রাণ দিলেন বঙ্গবন্ধু। মইনুল হাসান যথার্থই লিখেছেন, “বাঙালির ট্রাজিক হিরো তিনি। তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলার ইতিহাস লেখা হবে না কোন সময়।”#

ড. সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়
ড. সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়
ড. সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়। এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়।
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।