15.1 C
Drøbak
রবিবার, জুলাই ৩, ২০২২
প্রথম পাতাইতিহাসপ্রসঙ্গ রাজা রামমোহন রায়৮৫এ, আমহার্স্ট স্ট্রিট

প্রসঙ্গ রাজা রামমোহন রায়
৮৫এ, আমহার্স্ট স্ট্রিট

কলকাতার শিয়ালদা অঞ্চলের মানিকতলার কাছে আমহার্স্ট স্ট্রিটে দক্ষিণমুখী একটি বিশাল দোতলা বাড়ি আছে। বাড়িটার নম্বর ৮৫এ। বহু পুরনো ওই বাড়িটার পুব দিকের দেওয়ালে একটা শ্বেতপাথরের ফলক আছে। তাতে লেখা-– ‘‘This house was the family residence of Raja Rammohon Roy, Founder of the Brahmo Samaj, Born 1772, Died 1833.’’

হ্যাঁ, এই বাড়িতেই থাকতেন রাজা রামমোহন রায়। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার দশ লক্ষ টাকা করে মঞ্জুর না করলে এই বাড়িটা আর সংস্কার করা সম্ভব হতো না। আর সংস্কার না করলে ‘রাজা রামমোহন রায় মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’ও গড়ে উঠত না।

এই বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ত দোতলার বেশ কিছুটা অংশ ধ্বসে পড়েছে। সেখানেই কোনও রকমে বাস করত কয়েকটা পরিবার। ভিতরে ঢুকলে দেখা যেত বিশাল বিশাল ঘর। অথচ জানালা দরজাগুলো উধাও। মেঝে থেকে মার্বেলের টালিগুলো কারা যেন নিজের মনে করে তুলে নিয়ে গেছে। বাড়ির এখানে-ওখানে স্তুপাকৃত জঞ্জাল। জোরে হাওয়া দিলে মেঝেয় পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো এমন ভাবে সরসর করে সরে যেত, মনে হতো পাতা নয়, যেন কোনও অশরীর আত্মা হেঁটে বেড়াচ্ছে।‌ এ কার্ণিশ ও কার্নিশ থেকে মাথা তুলেছে বট-অশ্বত্থের চারা। গোটা বাড়ি খাঁ খাঁ করত। মনে হতো ভূতের বাড়ি। তারই মধ্যে এ খোপে ও খোপে থাকা কবুতরদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আর ও দিকটায়? পরিত্যক্ত খোলা জায়গা পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক এসে ছোট ছোট খুপড়ি বানিয়ে এক সময় এতটাই ঘিঞ্জি করে তুলেছিল যে, দেখলে মনে হতো বাড়ি নয়, একটা নোংরা বস্তি।

বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে থাকা পুকুরটা ছিল কচুরিপানায় ভরা। বাড়ির মধ্যেই রীতিমতো গড়ে উঠেছিল খাটাল। বিভিন্ন ধরনের সন্দেহভাজন লোকজন এখানে এসে আশ্রয় নিত। তাদের খোঁজে কখনও-সখনও পুলিশও টহল দিয়ে যেত এই বাড়ির ভিতরে। এখন আর সে সবের বালাই নেই। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের আর্থিক সাহায্যে ৭৬ কাঠার এই বাড়িটার পুরনো কাঠামো হুবহু এক রেখেই খুব সুন্দর ভাবে সংস্কার করে গড়ে তোলা হয়েছে দারুণ এই মিউজিয়াম।

হ্যাঁ, এখানেই থাকতেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ভারত পথিক— রাজা রামমোহন রায়।
তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত আছে যে, তিনি নাকি দিনে বারো সের দুধ খেতেন! একাই একটা আস্ত পাঁঠার মাংস সাবাড় করে দিতেন! সঙ্গে নাকি একটু আধটু সুরাপানও করতেন!

এই বাড়ির এক দিকে একটা টিনের শিট কাটিংয়ের কারখানা ছিল। এটা কিন্তু একটা কাকতালীয় মিল। কারণ, এই বাড়িটা যখন লোকজনে গমগম করত, তখন গোটা বাড়িটার ওপরের ছাউনি সাজানো হয়েছিল ছাঁচে ঢেলে বানানো কারুকার্য করা টিন শিট দিয়ে। ও রকম দৃষ্টিনন্দন টিনের কাজ কিন্তু কলকাতার অন্য কোনও বনেদি বাড়িতে ছিল না।

পুকুরঘাটে বাড়ির মেয়ে-বউদের যাওয়ার জন্য বাড়িটার একতলার পুব দিকের ঘরে একটা দরজা করা হয়েছিল। সেটার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হলেও এখনও আছে। কিন্তু কোন যুগ থেকে যে ওটা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে কে জানে! খুঁজে পেলেও কি সেই চাবি দিয়ে ওই প্রকাণ্ড তালাটা আর খোলা যাবে!
ফটক পেরোলেই গাড়িবারান্দা। সেই বারান্দাটাকে ধরে রেখেছে, দুই হাতে বেড় পাওয়া যাবে না এমন মোটা মোটা দু’পাশের দশাসই ছ’টা থাম। এই গাড়ি বারান্দার নীচেই এসে থামত ঘোড়ায় টানা টমটম। এক্কাগাড়ি। রাজা রামমোহন রায় এই বাড়িতে থাকতেন। কথাগুলো বাড়ির ফলকে ইংরেজিতে ফলাও করে লেখা থাকলেও এই বাড়ির মালিকানা নিয়ে কিন্তু বিভিন্ন লোকের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে।

ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকায় (সাহিত্য সাধক চরিতমালা ১৬) লিখেছেন, “১৮১৪ সালে রামমোহনের দুটো বাড়ি কেনা হয়েছিল। উহার প্রথমটি চৌরঙ্গীতে অবস্থিত বড় হাতা সংযুক্ত একটি দোতলা বাড়ি। উহা ২০,৩১৭ টাকায় এলিজাবেথ ফেনউইক নামে এক মেমের নিকট হইতে কেনা হয়। দ্বিতীয় বাড়িটি মানিকতলায়; এই বাড়িটি এখন উত্তর কলিকাতার পুলিশের ডেপুটি কমিশনারের আপিসে পরিণত হইয়াছে। উহা ১৩,০০০ টাকায় ফ্রান্সিস মেন্ডেস নামে এক সাহেবের নিকট হইতে কেনা। এই সময়েই সম্ভবত জোড়াসাঁকোতে তাঁহার যে বাড়িটি ছিল উহা বিক্রয় করিয়া ফেলা হয়।’’

রামমোহনের এই দুটি বাড়ির কথা উল্লেখ থাকলেও, কোথাও কিন্তু ৮৫এ, আমহার্স্ট স্ট্রিটের, মানে এখন যার নতুন নামকরণ হয়েছে, রাজা রামমোহন রায় সরণি, সেই বাড়িটির উল্লেখ নেই। প্রথমে আনন্দমোহন চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, আমহার্স্ট স্ট্রিটের এই বাড়ি রাজা রামমোহন কেনেননি বা তৈরিও করেননি। এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র, সদর দেওয়ানী আদালতের উকিল রমাপ্রসাদ রায়। রাধারমণ মিত্র তাঁর ‘কলিকাতা দর্পণ’ বইটিতে আনন্দমোহন চট্টোপাধ্যায়ের উক্তির সত্যতা কিন্তু খুব সহজেই নিউ ক্যালকাটা ডিরেক্টরি ও পুরনো কলকাতার সার্ভে ম্যাপ থেকে প্রমাণ করে দিয়েছেন।

কবে, কখন, কে বা কারা রাজা রামমোহনের বসবাসের স্মৃতি হিসেবে এই বাড়িতে শ্বেতপাথরের ফলকটি বসিয়েছিলেন তা জানা যায় না। তবে মানিকতলার বাসিন্দাদের বিশ্বাস, এটাই ছিল রামমোহনের বসতবাড়ি, আর ১১৩ নং আপার সার্কুলার রোডে রামমোহন রায়ের নামে যে বাড়িটা আছে, সেটা ছিল তাঁর বাগানবাড়ি। রামমোহন রায়ের জীবনী যিনি লিখেছিলেন সেই কুমারী সোফিয়া কোলেত’ও বিশ্বাস করতেন যে, এই দুটো বাড়িই রামমোহন রায়ের ছিল।
কিন্তু রাধারমণ মিত্রের গবেষণার পরে সন্দেহের আর কোনও অবকাশ রইল না যে, রাজা রামমোহন রায় আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িটা তৈরি করেননি বা কেনেন ওনি।
রাজা রামমোহন রায়ের আরও একটি বাড়ি ছিল চৌরঙ্গীতে, মানে এখনকার ধর্মতলায়। কিন্তু সেই বাড়িটির আর কোনও হদিস পাওয়া যায়নি।

রাজা রামমোহন রায় মারা যান ১৮৩৩ সালে। তখনকার লোকেরাই হয়তো কোনও কারণে ওই বাড়িটি দেখিয়ে রটিয়েছিলেন, এটাই রামমোহন রায়ের বাড়ি। সেটাই হয়তো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং অনেকের মনেই বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, হ্যাঁ, এটাই রামমোহন রায়ের বাড়ি। আর তার ওপর ভিত্তি করেই হয়তো ওই শ্বেতপাথরের ফলকের জন্ম এবং তা থেকেই অনেকের ধারণা, আমহার্স্ট স্ট্রিটের ওই বাড়িটি সত্যিই রাজা রামমোহন রায়ের।

রাধারমণ মিত্র লিখে গিয়েছেন— ‘ডিরেক্টারি ও ম্যাপ থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে, ৮৫ নং আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িটি রমাপ্রসাদ রায় ১৮৫৭ সাল থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে কোনও এক সময়ে তৈরি করান।’

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জন্য ওই বাড়িটি এক সময় হুকুমদখল করা হয়েছিল। পরে সেই হুকুমদখল বাতিলও হয়ে রায়। ৮৫ নং আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িটি নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। বিতর্ক থাকবেও। আদৌ কি কোনও দিন প্রমাণ হবে যে, এই বাড়িতেই রাজা রামমোহন রায় ছিলেন! সেটা প্রমাণ হোক বা না হোক, তিনি এই বাড়িটি কিনে থাকুন বা না থাকুন, এখন এই বাড়িটিটাই কিন্তু শেষপর্যন্ত ধরে রেখেছে রাজা রামমোহনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচিহ্ন।

‘সিমলা হাউস’ নামে পরিচিত এই বাড়িটির একতলাতে রয়েছে একটি বড় হলঘর, যেখানে রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে লেখা অসংখ্য বই রয়েছে। রয়েছে একটি লাইব্রেরিও। দোতালাতে আছে একটি সংগ্রহশালা। সেখানে আছে রাজা রামমোহনের ব্যবহৃত বই। এ ছাড়াও বিভিন্ন ঘরে রয়েছে তাঁর জীবনে ঘটা নানান উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি। যেগুলো ছবি এবং স্কাল্পচারের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে। ইংল্যান্ডে মারা যাওয়ার সময় তিনি যে আসবাবপত্রগুলো ব্যবহার করেছিলেন, ব্রিস্টল শহরের মেরি কার্পেন্টারের কাজ থেকে সেই আসবাবপত্রগুলো নিয়ে এসে এখানে একটি ঘরে সাজানো হয়েছে। থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে তাঁর ব্যবহৃত পোশাক-আশাক, ব্রহ্মসংগীতের নানা খচরা, তাঁর ব্যবহার করা বইয়ের তাক রয়েছে তাঁর কবরে ব্যবহৃত মুখোশটির একটা প্রতিলিপি, যেটা ব্রিস্টল থেকে নিয়ে এসেছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। এই বাড়িতে শেষ বসবাস করেছিলেন রাজা রামমোহনের নাতী প্যারীমোহনের দত্তকপুত্র ধরণী মোহন রায়। এখন এই বাড়িতে, মানে রাজা রামমোহন রায় মেমোরিয়াল মিউজিয়ামটি খোলা থাকে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত, শুধু সোমবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। টিকিটের দাম মাথাপিছু ১০টাকা, আর ক্যামেরা ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ৫০টাকা।#

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।