6.3 C
Drøbak
শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যঅমিতা মজুমদারের হাফ ডজন কবিতা

অমিতা মজুমদারের হাফ ডজন কবিতা

অনুভব

আজকাল নিজেকে আমার মায়ের প্রতিবিম্ব মনে হয়,
বলতে গেলে সব মেয়েকেই তাই মনে হয়।
একটু একটু বড়ো হয়েছি আর মায়ের কাছ থেকে,
ধীরে ধীরে দূরে সরে গিয়েছি।
একইভাবে আমার মেয়েরা বড়ো হচ্ছে,
আমার সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ছে।
আমি যেমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম,
আমার সংসার সন্তান আর আমাকে নিয়ে।
আমার মাও হয়ত তেমনি একদিন,
তার সংসার সন্তান আর নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
আবার আমার মেয়েরাও ব্যস্ত হয়ে পড়বে,
তাদের সংসার সন্তান আর নিজেকে নিয়ে।
সময়ের আবর্তে মা আজ এক অর্থে একা,
আমার আগামী বলছে আমিও এগিয়ে যাচ্ছি একাকীত্বের বারান্দায়।
সীমান্তের এপার ওপারের মাঝের দেয়ালে কিছু ছবি এঁকে যাওয়া,
যার কিছু সত্য কিছু কল্পনা।
এ যেন সেই,
শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে শূন্যে ফিরে আসা।।

ঘুণপোকা

খাবার টেবিলে ওরা বসেছিল মুখোমুখি,
কথা হচ্ছিল এটা সেটা নিয়ে।
হালের বাজার দর থেকে স্কুল কোচিং,
ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে মতবিনিময়।
বেশ যাচ্ছিল এপাশ থেকে ওপাশে,
ডালের বাটি, মাছ ভাজার প্লেট।
হঠাৎ বেজে ওঠে এ পাশের,
পাখির ডাকের সুরে মুঠোফোন।
ভাতের থালা রেখে উঠে পড়ে তড়িঘড়ি,
মোলায়েম স্বরে বলে হ্যালো।
ওপাশের হাত ভাতের থালায় করে নড়াচড়া,
মুখ হয় থমথমে।
মনে মনে ভেবে নেয় কে হতে পারে ?
এই মনে মনে ভাবনার ঘুণপোকাগুলো,
বড্ড জ্বালাতন করে।
এপাশ ওপাশের মাঝে গড়ে তোলে শক্ত দেয়াল,
যে দেয়ালে বেড়ে ওঠে যতসব আগাছা জঞ্জাল।

এখন নাকি কবিতা অন্য কথা বলে

নিশুতি রাতের জোনাকিদের জ্বালানো আলোর ভাষা,
কবিতায় কেউ খোঁজে না।
মেঠো রাস্তার দু ধারে ফুটে থাকা ভাঁটফুলের আমন্ত্রণের খবর,
এখন কবিতায় থাকে না।
পলেস্তারা খসা দালানবাড়ির ঘুলঘুলিতে, বাসা বেঁধেছিল যে চামচিকে জোড়া,
তাদের খোঁজ নেয়ার সময় আজকের কবির হয় না।
খোলা প্রান্তরজোড়া ধানক্ষেত যেমন বদলে গিয়ে,
হয়ে উঠেছে নানারকমের মৌসুমী ফসলের ক্ষেত।
কবিতাও আজ শুধু বিকিকিনির কথা বলে,
বলে মৃত্যুর কথা।
বিপ্লবের কথা, অমরত্বের কথা, প্রেমের কথা,
যদিও বা কবিতায় আসে—
সে যেন শব্দের পরে শব্দ বসিয়ে ,
কবিতার অবয়ব দেয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা মাত্র।
ঠিক যেন কাচঘরে সাজিয়ে রাখা সুন্দরী পুতুল,
যাতে থাকে না প্রাণের স্পন্দন।
আবেগ আর অনুভবের বদলে,
কবিতা পাঠে উঠে আসে যান্ত্রিক আর্তনাদ।

ক্ষুধা

রেল স্টেশনে ঢোকার মুখে সিঁড়ির উপরে বসে থাকে ,
একটা নেড়ি কুকুর।
গায়ের পশম কোথাও কোথাও উঠে গেছে,
দেখতে মোটেও সুশ্রী নয়।
রেলের বড়বাবু গাড়ি থেকে নেমে অফিস ঘরে যেতে,
রোজ চোখাচোখি হয় তার সাথে।
আর এই চোখাচোখি,
বড়বাবুকে সারাদিন কি এক বিরক্তিতে তাড়িয়ে বেড়ায়।
কি যেন আছে ঐ কুকুরের চাহনিতে,
কুতকুতে চোখে একটা বিদ্রুপের হাসি দেখতে পায়।
মনে হয় যেন সেই হাসি বলতে চায়–
তোমরা মানুষেরা যতই ধোপদুরস্ত পোশাক পরে ঘুরে বেড়াও,
তোমাদের ভেতরটা আমাদের এই রাস্তার কুকুরের চেয়েও ময়লা।
আমাদের শুধু পেটে খিদে পেলেই একটু খাবার খেতে চাই,
কিন্তু তোমাদের ক্ষুধার কোনো অন্ত নাই।
তাই সারাক্ষণ,
তোমরা ক্ষুধা নিবারণের রাস্তা খোঁজ।

ঋণ শোধ

মানুষের আসা যাওয়া দেখে,
স্টেশনে বসে থাকা নেড়ি কুকুরটা।
মনে তার হাজার প্রশ্ন !
এই মানুষেরা কেন এত ছুটছে ?
গাড়ি যখন থামে ষ্টেশনে,
সবাই কেমন হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে।
যাত্রাপথে গাড়িতে শান্ত হয়ে ছিল যারা,
তারাই পল-ভর সময়ের জন্য দাঁড়াতে চায় না।
যেন পেছনে তাড়া করেছে পাগলা ষাঁড়,
তাই প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে সবাই।
পেছনে যা-কিছু ফেলে এসেছে তা যেন কিছু নয়,
এই শহরই তার একান্ত আপন।
আবার গাড়ি যখন ছাড়ছে স্টেশন,
সবার কী তাড়া ওঠার জন্য।
অথচ এই শহরেই তার নিত্য বসবাস !
যেন ছেড়ে যেতে পারলেই বাঁচে।
আমরা কুকুর’রা তো এমনটা পারি না !
যেখানে আবাস গড়ি—
সে জায়গা ছেড়ে যেতে পারি না,
যত অসম্মান ,অবহেলাই জুটুক না কেন।
পড়ে থাকি মাটি কামড়ে-
জোর করে উৎখাত না করলে,
আমৃত্যু আমরা করে যাই আশ্রয়ের ঋণ শোধ ।

ভালোবাসার রকমসকম

কবে কোন জনমে সূর্য বলেছিল সূর্যমুখীকে ভালোবাসি,
সেই থেকে সূর্যমুখী চেয়ে আছে আকাশপানে।
রাতের শিশির না-কী বলেছিল দূর্বাঘাসকে,
আমার ভা্লোবাসা মুক্তো হয়ে ঝরে পড়বে তোমার মাথায়।
সেই থেকে চাপাপড়া ইটের তলা থেকে,
ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে।
রাস্তার মাথার শিরীষ গাছটিকে না-কী মেঘ বলেছিল,
ভালোবেসে বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দেবো তোমায়।
তাই-তো নীরবে গ্রীষ্মের খরতাপেও সে হয় না বিমর্ষ।
ভা্লোবাসার নিদান নিয়ে ওপাড়ার তরুলতা মাসি,
কাটিয়ে দিল দীর্ঘজীবন ভাইপো ভাইজি নিয়ে।
কবে না-কী এক মাস্টারমশাই বলেছিল ভালোবাসি,
তারই আশায় পড়ে রইল বাপ ভাইয়ের সংসারে।
ভালোবেসে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে,
কুমারী মা হতে চলেছিল বয়ঃসন্ধিতে ওপাড়ার বনলতা।
একরাতে পাশের গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার ,
গলা টিপে মারে তার মাতৃত্বকে।
অসহায় মা হাসপাতালের বিছানায় চোখ মেলে দেখে,
ভালোবাসার মানুষটি নেই পাশে।

অমিতা মজুমদার
অমিতা মজুমদার
কবি ও লেখক
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।