রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২

পালে হাওয়া দেওয়া নয়; প্রয়োজন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো

প্রকাশিত:

স্রোতের বিপরীতে চলা খুব কঠিন কাজ। সবাই পারে না। যারা পারেন, তারাই স্মরণীয়, বরণীয় হয়ে থাকেন। বরণীয় সকলে সমকালীন হন এমন নয়, খুব কম ক্ষেত্রেই হন। বরং নিন্দিত হন। ইতিহাস সেটাই সাক্ষ্য দেয়। সেটা সামাজিক সংস্কার, ধর্ম, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০১৩ সালে হেফাজত-ই ইসলামের শাপলা চত্ত্বরে তাণ্ডবের পর থেকে বাংলাদেশকে একটা মুসলিম দেশ হিসাবে প্রমাণের একটা দারুণ প্রবণতা শুরু হয়েছে। সেই পালে হাওয়া দিচ্ছে আমাদের রাজনীতিবিদদের একাংশ, কথিত গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের দেশের কথিত ব্যতিক্রমী চিন্তার তরুণ-যুবকদের অনেকেই। সরকারও বরাবর কথা এবং কাজে প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছে যে তারাও ইসলামের বিপক্ষে তো নয়ই বরং ইসলামের বড় খেদমতগার এবং সেটা প্রমাণ করতে সরকার প্রধানের ব্যক্তিগত ধর্মচর্চার বিষয়টাকেও তারা সামনে এনেছেন। এখন কথা হল, কিসের ভিত্তিতে আমি এই প্রসঙ্গের অবতারণা করছি? সেটা আসলে আপনাদের কারও অজানা নয়। আমরা হয়ত চোখ-কান খুলে সেটা দেখতে কিংবা শুনতে চাই না কিংবা দেখেশুনেও এটাকে আমলে নেয়না। অথবা ভাবি, এই কথা, এই বক্তব্য, এই প্রবণতা তো আমার বিপক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই চুপ থাকি। কিন্ত সংবেদনশীল ইস্যুর তকমা দিয়ে আমাদের এই চোখ-কান বন্ধ রেখে চলা, বুঝেও চুপ থাকা কিংবা নিজের স্বার্থের পরিপন্থী নয় ভেবে নীরব থাকার ফলাফল যে ভয়াবহ সেটা কি আমরা এখনো আঁচ করতে পারছি না? না পারলে আমার কথায় কিংবা আমার মত করে যারা ভাবছেন, তাঁদের কথায়ও যে পারবেন, সেটা মনে হয় না। কারণ আপনাদের মনোজগত এই ক্ষেত্রে বদ্ধ পুকরের মত হয়ে গেছে, যেখানে ইসলামের পদ্মফুল ছাড়া আর কিছুই ফোটে না কিংবা এই ফুল ফোটাকেই আপনারা সুখকর মনে করেন।

এবার আসি ঠিক কোন কোন প্রবণতার কারণে এই প্রসঙ্গের অবতারণা। ২০১৩ সালে শাপলা চত্ত্বরে হেফাজত-ই ইসলামের তাণ্ডবের যে আয়োজন সেটা’র শুরু থেকেই একাধিক রাজনৈতিক দল তাদেকে নৈতিক সমর্থন জানাল। একটা রাজনৈতিক দলের প্রধান তো তাণ্ডবে যোগ দিতে আসা ফ্যানাটিক মবকে পানি খাওয়ানোর নামে নিজের দলের কর্মীদেরকে সেখানে পাঠালেনও। এই পর্যন্ত সবাই রেখে-ঢেকে করলেন কিন্তু আসল প্রবণতা প্রকাশ্যে এল তাণ্ডবের পর থেকে। আমাদের কথিত গণমাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলির নেতা-নেত্রীরা এসে বলা শুরু করলেন, আপনাকে মনে রাখতে হবে এটা নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশ, কেউ কেউ সেটাকে বাড়িয়ে ৯৫ শতাংশেও নিয়ে গেলেন। কেউ বললেন, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে তো আপনি এই কথা বলতে পারেন না, এই কাজ করতে পারেন না। আলোচনাগুলো যারা দেখেছেন, যারা শুনেছেন তারা একটু সংবেদনশীল মানুষ হলে তাদের কানে লাগার কথা। একটা স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কিভাবে গণমাধ্যম থেকে জনতার দৈনন্দিন আলাপে মুসলমানের বাংলাদেশ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হল। এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান সেটা সত্য। কিন্তু একটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের এবং দেশটা একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের দেশ এই দুইটা বক্তব্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই বক্তব্য একটা সম্প্রদায়কে আত্মমভরি হতে উস্কানি দেয়, অসংবেদনশীল হতে প্রেষণা যোগায়। অন্যদিকে সেই এক দেশে বসবাসরত অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমুহের মনোজগতে হীনমন্যতার জন্ম দেয়, রাষ্ট্র এবং অন্য সেই কথিত সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মনোভাব তৈরি মনোলোকে। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সংবিধানে বর্ণিত সকল মানুষ, জাতি-ধর্ম, নারী-পুরুষ, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে নাগিরিক হিসাবে রাষ্ট্রের কাছে সকলে সমান, এই বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ, দিনের পর, মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর ওয়াজ-মাহফিল থেকে শুরু করে কথিত গণমাধ্যমে এই বক্তব্য শুনতে শুনতে আমাদের একটা প্রজন্ম তো রীতিমত বিশ্বাসই করতে শুরু করেছে যে দেশটা শুধুমাত্র মুসলমানদের দেশ। স্কুলে আমরা যাদেরকে কোমলমতি শিশু বলি, সেই কোমলমতি শিশুদের কেউ কেউ অন্য ধর্মের শিশুদের গালি তো দেয়ই এখন মুসলিম হতে পীড়াপীড়ি শুরু করেছে এমন খবর অভিভাবকদের কাছ থেকে, শিক্ষকদের কাছ থেকে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে আমরা জানতে পারছি। অথচ এই বাংলাদেশেই আজ থেকে সিকি শতাব্দী আগে স্কুলে আমি এবং আমার জন্মসুত্রে মুসলিম বন্ধুরা মিলে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী এবং সরস্বতী পূজার চাঁদা তুলতে গেছি। অজ পাড়াগাঁয়ে আমার স্কুলের এক অনুজকে দেখেছি একুশে ফেব্রুয়ারিতে খালিপায়ে প্রভাতফেরিতে আসা, শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসা নিয়ে বাবার ধর্মীয় গোড়ামির বিপরীতে যুক্তি দিয়ে আবেগী বক্তব্য হাজির করতে। এই যে প্রজন্মের ধর্মানন্ধতার পথে যাত্রা, সেই পালে হাওয়া দিচ্ছেন শিক্ষক, সাংবাদিক এবং যুব সম্প্রদায়ের একাংশ। যারা রবীন্দ্রনাথকে ভিলেন বানাতে তৎপর। এটা যে নতুন কথা তা নয়, কিন্তু এতদিন সেই প্রচেষ্টা ছিল, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল অনেক বেশি মেধাবী, সৃষ্টিশীল কিন্তু রবীন্দ্রনাথ হিন্দু এবং নজরুল মুসলমান হওয়াতে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ব্যাহত হয়েছে। দারিদ্রকেও দায়ী করেন কেউ কেউ কিন্তু মুল উদ্দ্যেশ্য হল নজরুলকে বড় করে দেখানো এবং রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি দেবার ক্ষেত্রে অনুদরতা। অথচ এদের অধিকাংশই জানেন না নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং প্রীতির সম্পর্ক কেমন ছিল।

ইদানীং আরো একটা প্রবণতা লক্ষ্য করছি, আমাদের কথিত তরুণ এবং যুব বুদ্ধিজীবিদের একাংশ বাংলাদেশ ভারতে চলে যাওয়া কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ প্রথিতযশা ব্যক্তিদের নিয়েও নানারকম নেতিবাচক লেখালেখি এবং মন্তব্য শুরু করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বাংলাদেশে তাঁদের বসতভিটা সংরক্ষণ এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণ নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন, কথা বলছেন তাদেরকে কটাক্ষ না করলেও সমালোচনা করছেন। বিপরীতে তারা এই যুক্তিও দেখাচ্ছেন ভারত থেকে অনেক প্রথিতযশা মানুষ দেশবিভাগের কারণে এদেশে এসেছেন কিংবা এদেশে এসেই প্রথিতযশা হয়েছেন, ভারতে তো তাঁদের বাড়িঘর সংরক্ষণের দাবী কেউ জানাচ্ছেন না। এই বক্তব্যের মধ্যেও প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতা লুকায়িত। এই বক্তব্য এদশে বর্তমান যে হাওয়া বইছে সেই হাওয়ায় দারুণভাবে জনপ্রিয় হবে। তাহলে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের সাথে আপনার, আপনাদের পার্থক্য কোথায়? আপনারা তো পালেই হাওয়া দিচ্ছেন। এরকম আরো অনেক বিষয় নিয়েই কথা বলা যাবে। শুধুমাত্র দু-একটা প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে এলাম।

উপরের যে বিষয়গুলি উল্লেখ করলাম, সেগুলি দল এবং ব্যক্তি পর্যায়ের কিন্তু রাষ্ট্র তো এইক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ শুরু হয়েছে। হেফাজত-ই ইসলামের সাথে সরকারের সমঝোতা এবং হেফাজত এবং তাদের মিত্রদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পাঠ্যক্রম থেকে বিশেষ বিশেষ লেখকদের বই এবং বিশেষ বিশেষ লেখা বাদ দেওয়া সেই প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান এবং ডকুমেন্টেড বহিঃপ্রকাশ। এই সরকার বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃবহাল নিয়ে এত কথা বলে। কিন্তু একটা বিশেষ বাক্য দিয়ে সংবিধান শুরুর বিষয়ে রা কাড়ে না। একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসুচিতে দোয়া-দরুদ পাঠের প্রচলন সরকারের মাঠ-পর্যায়ের প্রশাসন তাঁদের ইচ্ছামত চালু করছে। এবার পূজোতে দেখলাম একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আদেশ জারি করেছেন কখন কখন বাদ্য বাজানো যাবে, কখন যাবে না। তিনি যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা নিতান্তই অযৌক্তিক বরং কোনো রকম নির্দেশনা ছাড়াই নিজেদের প্রাত্যহিক জানাশোনা এবং সাধারণ জ্ঞানে পূজা কমিটি নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুসারে যে যে সময়টুকু বিরত থাকে সেটাই অনেকগুণ ভাল।

সবশেষে বলতে চাই, দেশকে ইসলামীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যে পালে হাওয়া লেগেছে সেই পালে হাওয়া দেওয়া নয় বরং এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে উলটো কথাটা বলতে পারাটার মধ্যেই কৃতিত্ব আছে এবং সেটাই জরুরী দেশটাকে সব মানুষের দেশ হিসাবে বহাল রাখার জন্য। আরো সুন্দর দেশ হিসাবে বিনির্মাণের জন্য। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের কাছে প্রত্যাশা তাঁরা সেটাই করবেন।

অপূর্ব দাস
অপূর্ব দাস
তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা যশোর জেলায়। লেখাপড়া সম্পন্ন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। মানবাধিকার, নারীর মানবাধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমির অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথেও। কর্মসূত্রে বর্তমানে বসবাস করছেন ঢাকাতে!

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

প্রসঙ্গ শিক্ষাঃ প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

বছর পাঁচেক আগে রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি সিনেট...

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দিবস পালনের প্রাসঙ্গিকতা

শিক্ষা শিক্ষক শিক্ষালয় শিক্ষার্থী সমস্ত শব্দগুলো একে অপরের সঙ্গে...

কার রূপান্তর কে ঘটায়?

গতকাল ৫ অক্টোবর ছিল বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি উদযাপন...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।