-5.6 C
Drøbak
সোমবার, নভেম্বর ২৯, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্য‘মহাশূন্যে জুরান’ সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

‘মহাশূন্যে জুরান’
সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

শুরু হল কথাসাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহের কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস মহাশূন্যে জুরান। শরিকি বিবাদে পূর্বপুরুষের কড়িবরগার প্রকাণ্ড পাঁচ মহলা বাড়িটা বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাটে উঠে এসেছিলেন জুরানের বাবা। আসার সময় ওই বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি ইট আর দুটো সেগুন কাঠের খড়খড়িওয়ালা জানালা লাগিয়ে নিয়েছিলেন এই ফ্ল্যাটে। সেই জানালা দিয়ে যখন ফুরফুর করে হাওয়া ঢোকে, তখন নাকি সেই হাওয়ার মধ্যে তিনি তাঁর পুরনো বাড়ির গন্ধ খুঁজে পান। সেই গন্ধই তাঁকে টানতে টানতে নিয়ে যায় ছোটবেলায়। তিনি খুঁজে পান তাঁর ছেলেবেলাকার সঙ্গী-সাথীদের। পাঁচ মহলা বাড়ির কানাঘুঁজি অলিন্দে তিনি তখন ছোটাছুটি করেন। চোর চোর খেলেন।একদিন রাত্রিবেলায় লোডশেডিং হয়ে যাওয়ায় সেই জানালা দিয়ে তাকাতেই জুরানের জীবনে এক ঘটল বিপত্তি। কী কী ঘটল? তা জানতে হলে আপনাকে পড়তেই হবে কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক এই উপন্যাস— মহাশূন্যে জুরান।

।।উনিশ।।

একে ওকে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে শেষ পর্যন্ত ইমলি যে-বাড়িটার কাছে গিয়ে পৌঁছলেন, সেটা আসলে কোনও বাড়ি নয়। এই শহরতলির শেষপ্রান্তে, একটা পরিত্যক্ত মাঠের ধারে, দরমা-টরমা দিয়ে বানানো একটা ঝুপড়ি। ঝুপড়িটা কোন্ আদ্যিকালে তৈরি হয়েছিল কে জানে! বছরের পর বছর ধরে ঝড়বৃষ্টির ধকল সয়ে, কাঠফাটা রোদ্দুরে পুড়ে এমন দশা হয়েছে যে, বোঝাই যাচ্ছে, এটার আয়ু আর বেশি দিন নেই। টালির চাল দিয়ে বোধহয় জল পড়ে। তাই কালো রঙের বড় একটা প্ল্যাস্টিক-শিট টালির উপরে বিছিয়ে এ দিকে ও দিকে আধলা ইট বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু মনে হচ্ছে, একটু জোরে হাওয়া দিলেই এর দফারফা হয়ে যাবে। অথচ তুবড়ে-তাবড়ে ব্যাঁকাতেরা হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে আসা দরমার এই ঘরেই নাকি সেই তান্ত্রিক থাকেন।
সাত পুরুষের তান্ত্রিক এঁরা। শুধু ভূতে ধরা নয়, পরিতে ধরা নয়, যে কোনও সমস্যার সমাধানই নাকি ইনি করে দিতে পারেন। তাঁর কারসাজিতে নাকি ডাক্তার ফেল পড়া রোগী আবার সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। নির্ঘাৎ হারা মামলা কী করে যেন জিতে যায় হাল ছেড়ে দেওয়া বিবাদী পক্ষ। তাঁর অঙ্গুলি হেলনেই নাকি ভাঙা সংসার ফের জোড়া লেগে যায় আগের মতোই। পরীক্ষার হলে একদম ধবধবে সাদা খাতা জমা দিয়ে এলেও অত্যন্ত ভাল নম্বর পেয়ে পাস করে যায় পরীক্ষার্থী। তাঁর করুণাতেই নাকি বাঁজা-মায়ের কোল আলো করে খিলখিল করে হেসে ওঠে ফুটফুটে শিশু।
চোখ বুজে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে বলে দিতে পারেন হারানো জিনিস আদৌ আছে, না কি বেহাত হয়ে গেছে। কিংবা পাওয়ার আর কোনও সম্ভাবনা আছে কি না। যিনি এত কিছু পারেন, তিনি কি তাঁর ছেলেকে এনে দিতে পারবেন না! আনতে না-পারলেও, ও কোথায় আছে, সেটা তো নিশ্চয়ই বলতে পারবেন, নাকি? আমার তো মনে হয়, উনি পারবেন। অবশ্যই পারবেন।
কিন্তু কথা হচ্ছে, যে-তান্ত্রিক এত দিন ধরে এত লোকের জন্য এত কিছু করে আসছেন, তিনি নিজের অবস্থাটা ফেরাতে পারেননি কেন! কেন এ রকম একটা ঘরে তিনি থাকেন! যত লোকই সমীহ করুন, কেউ কেউ কেন তাঁর দিকে এখনও সন্দেহের চোখে তাকান! নানা রকম কু-মন্তব্য করেন!
ইনি তাঁর ছেলেকে ঠিক এনে দিতে পারবেন তো! ভাবতে ভাবতে ইমলি যখন মাথা নিচু করে ওই ঘরের মধ্যে পা রাখলেন, গোটা ঘর তখন ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় অন্ধকার। তাকানো যাচ্ছে না। তবু তারই মধ্যে তিনি দেখলেন, সামনেই মেঝের উপরে একটা লোক কালো কুচকুচে জোব্বা মতো কী একটা পরে পদ্মাসন হয়ে বসে আছেন। তাঁর পাশে আর একটা চাটাই পাতা। মেঝেটা মাটির। কত দিন জল-ন্যাতা পড়েনি কে জানে! সামনে থানইট দিয়ে ঘেরা এক হাত বাই এক হাত মাপের মতো একটা চৌকো খোপ। খোপের ভিতরে কাঠকুটো জ্বেলে উনি যজ্ঞ করছেন। সেই যজ্ঞের ধোঁয়াতেই সারা ঘর ভরে আছে। তাঁর বাঁ দিকে পর পর পাঁচখানা মানুষের মাথার খুলি। তাতে সিঁদুর-টিদুর মাখানো। প্রতিটা খুলির সামনেই তেলে-চুপচুপ পানপাতার উপরে রাখা একটা করে সামুদ্রিক ফেনার পাত্র। তার মধ্যে কী আছে, দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। তারই মধ্যে টান টান করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক কোমড়-সমান একটা ত্রিশূল।
উনি ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই। তার মানে ইনিই সেই তান্ত্রিক। চোখ বন্ধ করে কী সব অং বং মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন। ঘরে যে কেউ ঢুকেছে, মনে হয় উনি টেরই পাননি। এই সময় তাঁকে ডেকে তাঁর কাজে বিঘ্ন ঘটানোটা নিশ্চয়ই ঠিক হবে না। ফলে তাঁর এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু কোথায় বসবেন তিনি! কিছুই তো ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। না। আলো থেকে আচমকা এখানে ঢুকেছেন বলে নয়, আসলে এই দিনের বেলাতেও ঘরের ভিতরটা কেমন যেন অন্ধকার-অন্ধকার মতো। ঘরটা এত ছোট, যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। এ দিকে ও দিকে তাকিয়েও কোথাও কোনও জানালা-টানালা দেখতে পেলেন না তিনি। মনে হল, এই ঘুপচি ঘরে কোনও আলো-বাতাসও ঢোকে না। চারিদিকে একেবারে হতদরিদ্র চেহারা। বাঁ দিকে একটা ছোট্ট তক্তপোশ। তার উপরে শতচ্ছিন্ন একটা মাদুর পাতা। মাদুরের মাথার দিকে বালিশ-সমেত গুটিয়ে রাখা ময়লা-তেলকাষ্টি একটা কাঁথা।
পায়ার নীচে পুরনো কয়েকটা ইট ঢুকিয়ে তক্তপোশটাকে অনেকটা উঁচু করা হয়েছে। তলায় জিনিসপত্র ঠাসা। তার মধ্যে থেকে যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, থালা-বাসন-গ্লাস। জল-ভরা বালতি, মগ। কালিঝুলি-মাখা একটা স্টোভও আছে সেখানে। মনে হচ্ছে, কেনার পরে ওটাকে আর কোনও দিনই পরিষ্কার করা হয়নি। রান্না করার পর কোনও রকমে খাটের তলায় ঠেলে দেন। আবার পর দিন রান্না করার জন্য বার করে আনেন।
দেওয়ালের গায়ে নায়লনের একটা মশারি ঝুলছে। তার বিভিন্ন জায়গায় দায়সারা ভাবে তাপ্পি দেওয়া। তার একটু উপরেই আড়াআড়ি ভাবে দড়ি টাঙানো। সেখানে গুঁজিমুজি করে রাখা ফতুয়া, জোব্বা, লুঙ্গি, গামছা-সহ আরও কত কী। সারা দেওয়াল জুড়ে কালশিটে পড়ে যাওয়া কাচের ফ্রেমে বাঁধানো দেবদেবীদের সার সার ছবি। কোনও কোনওটায় এত সিঁদুর আর চন্দন মাখানো, বোঝাই যাচ্ছে না, ছবিটা আদতে কার।
হঠাৎ পাশের কৌটো থেকে মুঠো করে তুলে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা ওই যজ্ঞকুণ্ডে উনি কিছু একটা ছুড়ে দিতেই দপ্‌করে আগুন জ্বলে উঠল। কয়েক মুহূর্তমাত্র। আর তাতেই তান্ত্রিকটার মুখ দেখতে পেলেন ইমলি।
একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে আসার সময় বিভিন্ন লোকের মুখে তিনি শুনেছিলেন, এঁর বয়স নাকি একশো বারো। এই বয়সেও যে, কেউ চলাফেরা করতে পারেন, এ ধরনের কাজ করতে পারেন, তাঁর ধারণা ছিল না। তাই একটু অবাকই হয়েছিলেন তিনি। তার পর ভেবেছিলেন, তাঁর অজস্র অলৌকিক কাজকর্মের মধ্যে বয়সের ভারে নুইয়ে না-পড়াটাও বুঝি তাঁর আর একটা অলৌকিক কাজ। কিন্তু যজ্ঞের এই এক ঝলক আলোয় তাঁকে দেখে ওঁর একবারও মনে হল না, তাঁর অত বয়স।
যতই দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা পড়ে থাক তাঁর মুখ, তবু তার মধ্যে দিয়েই যেটুকু দেখা গেল, তাতেই ওঁর মনে হল, তাঁর বয়সের মধ্যে একটু নয়, বেশ অনেকটাই জল মেশানো আছে।
আসলে, শুধু মেয়েদের মধ্যে নয়, বয়স নিয়ে পুরুষদের মধ্যেও নানা রকম সংশয় আছে। তাই আঠাশ বছর বয়সের পরে ঊনত্রিশ ছোঁয়ার জন্য লেগে যায় প্রায় তিন-চার বছর। বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, কিন্তু ঊনচল্লিশের পর আর কিছুতেই চল্লিশ হতে চায় না। আর মেয়েদের? বাইশের পর তেইশ হতেই লেগে যায় কমপক্ষে পাঁচ-ছয়-সাত বছর।
অথচ ষাট পেরোলেই, যখন বয়স নিয়ে রাখ-ঢাকের আর কোনও দরকার নেই, তখন আর ধীরে ধীরে নয়, এমনকী স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি বছর আর ‘এক’ করেও বাড়ে না। একেবারে লাফিয়ে লাফিয়ে প্রতি বছর দুই-তিন-চার করে বাড়ে। সত্তরের পরের বছরই হয়ে যায় তিয়াত্তর। আশির পরেই পঁচাশি।
জীবনের প্রথম দিকে কমানো এবং পরের দিকে লাফিয়ে-লাফিয়ে বাড়ানো বছরগুলি হিসেব করলে দেখা যাবে, যখন সে পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছে, তখন তার প্রকৃত বয়স বা তার কাছাকাছি বয়সটাই সবাই বলাবলি করছে।
শেষ অবধি মৃত্যুর পরে আসল বয়সটাই যখন সবাই জানতে পারবে, তখন শুধু শুধু কেন যে বয়স নিয়ে লোকে এত লুকোছাপা করে, কে জানে! ইমলির দৃঢ় বিশ্বাস, এই তান্ত্রিকটার বয়স কিছুতেই একশো বারো হবে না। কিছুতেই না। তা হলে তিনি এটা রটিয়েছেন কেন! বয়স বাড়লে কি অভিজ্ঞতা বাড়ে! দক্ষতা বাড়ে! কদর বাড়ে! যাঁর যত কদর, তাঁর তত দাম! তবে কি নিজের দাম বাড়ানোর জন্যই তিনি তাঁর বয়সটাকে বাড়িয়ে রটাচ্ছেন! হতে পারে। হতেই পারে।
উফ্ বাবা। যা ধোঁয়া চোখ দুটো একেবারে জ্বলে যাচ্ছে। লোকটা মনে হয় ওই যজ্ঞের মধ্যে তখন ধুনো ছিটিয়ে দিয়েছিলেন। না-হলে এত ধোঁয়া আসবে কোত্থেকে। সারা ঘর একেবারে ধোঁয়ায় ধোঁয়াময় হয়ে গেছে। বেরোবার কোনও রাস্তা নেই। দরমার ফাঁকফোকর থেকে বেরোতে কতক্ষণ লাগবে বলা মুশকিল!
নাঃ। আর বসা যাচ্ছে না। যতক্ষণ না-ধোঁয়া কমে, ততক্ষণ একটু বাইরে গিয়ে বসি… ভেবে, ইমলি যে-ই ঘরের বাইরে পা বাড়াবার জন্য ঘুরতে যাবেন, অমনি জলদগম্ভীর গলায় তান্ত্রিক বলে উঠলেন, কোথায় যাচ্ছিস বেটি? এ দিকে আয়। বলেই, পাশের ফাঁকা চাটাইটি দেখিয়ে বললেন, নে, ইখানে বস। এ সব কাজ তাড়াতাড়ি হয় না। সবাইকে সন্তুষ্ট করতে হয়। বশ করতে হয়। তবেই ওরা আমার হয়ে কাজ করে। নে, বস।
ইমলি ওই চাটাইয়ের উপরে জোড়াসন হয়ে বসে প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে যে-ই তাঁকে বলতে যাচ্ছিলেন, বাবা…
— দাঁড়া। চুপ কর। মেলা বকবক করিস না। তোর ছেলে তো?
তান্ত্রিকের কথা শুনে একদম চমকে উঠলেন ইমলি। ইনি কি অন্তর্যামী! সব জানেন! সে তো তাঁর ছেলের কথাই বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ইনি জানলেন কী করে! না। লোকজন তাঁকে ঠিক লোকের হদিশই দিয়েছেন। তার মানে, ঠাকুর তাঁর দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। তাঁর আর কোনও চিন্তা নেই। এখন চিন্তা করবেন চিন্তামণি। এখানে যখন একবার এসে পড়েছি। ছেলেকে এ বার পাবই। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, এই যা। তাই উনি বললেন, হ্যাঁ বাবা, আমার ছেলে। আপনি জানলেন কী করে?
— আরে বুরবক। আমি জানব না? তা হলে কে জানবে?
থতমত খেয়ে ইমলি বললেন, আমার ভুল হয়ে গেছে বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আসলে সকাল থেকে ছেলেকে পাচ্ছি না তো… তাই আমার মাথার ঠিক নেই। কী বলতে কী বলে ফেলেছি।
— ঠিক আছে, ঠিক আছে, দাঁড়া। কী নাম যেন তোর ছেলের?
— জুরান।
— জুরান! এ রকম নাম যেন বাপের জন্মে শোনেননি, এমন মুখ করে খাটের উপরে পাতা মাদুরের তলা থেকে একটা কাগজের টুকরো বার করে, হাত দিয়ে লেখার ভঙ্গিমা করে উনি বললেন, পেন আছে?
আমতা আমতা করতে লাগলেন ইমলি, না মানে… আসলে…
— বুঝেছি। বলেই, উঠে গিয়ে দড়িতে ঝুলতে থাকা ফতুয়ার পকেট থেকে একটা কলম বার করে ইমলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নে, ওটার মধ্যে ওর পুরো নাম, জন্ম তারিখ, গোত্র, গায়ের রং, শরীরের বিশেষ কোনও চিহ্ন থাকলে সেটা কোথায় আছে, লিখে দে।
কলমটা নিতে নিতে নিজেকে আর সামলাতে না-পেরে ইমলি বলে উঠলেন, ওকে পাব তো বাবা?
— আরে বুরবক, আমার কাজে কোনও সন্দেহ থাকলে দরজা খোলা আছে, অন্য কোথাও যেতে পারিস।
— না বাবা, না। আমি সে কথা বলিনি।
আরও গম্ভীর হয়ে উনি বললেন, যা লিখতে বলেছি, লিখে দে।
কাগজের টুকরোটার উপরে ইমলি তাঁর ছেলের নাম-ধাম লিখতে লাগলেন। লেখাটা যখন শেষের দিকে তান্ত্রিক তখন বললেন, শোন, তোকে একটা বশীকরণ করতে হবে। না। সাধারণ বশীকরণ বা বিশেষ বশীকরণ করলে হবে না। তোকে একেবারে পুরশ্চরণসিদ্ধ বশীকরণ করতে হবে।
উদ্বিগ্ন গলায় ইমলি বললেন, কেন বাবা? বশীকরণ কেন?
— কারণ, তোর ছেলে যাদের কাছে আছে, তাদের বশীভূত না-করে তোর ছেলেকে ওখান থেকে আনা যাবে না।
— কেন বাবা?
বিরক্ত হয়ে উনি বললেন, যা বলছি শোন। অত প্রশ্ন করিস না।
— না, মানে, আমি বলছিলাম কী, বশীকরণ না-করলে হবে না, না?
উনি লাল টকটকে চোখ তুলে বললেন, না।
— ঠিক আছে বাবা, আপনি যখন বলছেন, তখন তা-ই হবে। কিন্তু কত পড়বে বাবা?
দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে উনি বললেন, আট হাজার ধরে রাখ।
চোখ কপালে তুলে ইমলি বললেন, আট… হাজার… টাকা…!
— এ কাজ তো খালি হাতে হয় না। অনেক জিনিসপত্র লাগে… আট হাজার টাকা বললাম। এ বার বাজার বুঝে… একটু কম-বেশিও হতে পারে।
— না মানে, আট হাজার টাকা তো…
গলা চড়িয়ে উনি বললেন, শোন, বশীকরণ করা অত সহজ কাজ না। বাজার ঘুরে আয়। বহু লোক তো বশীকরণ করে। ক’জনেরটায় কাজ হয় বল তো। অত সহজ না। তিথি, নক্ষত্র, বার, সময়, সব হিসেব কষে এই কাজ করতে হয়। শনিবার সূর্য ওঠার আগে সপ্তমী কিংবা তৃতীয়া অথবা ত্রয়োদশী, আর তা না হলে অষ্টমী বা নবমী, তবে সব চেয়ে ভাল হয়, যদি মাহেন্দ্র মণ্ডল আর বারুণী মণ্ডলের মধ্যবর্তী সময়ে করা যায়।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, শুধু দিনক্ষণ দেখলেই হবে না। দেখতে হবে, যা যা লাগার, সব কিছু ঠিকঠাক মতো ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। একেবারে নিখুঁত ভাবে গুনে গুনে সঠিক বার মন্ত্র জপ করা হচ্ছে কি না। আনুষঙ্গিক সমস্ত ক্রিয়াকলাপ নিপুণ ভাবে করা হচ্ছে কি না। শুধু তাই-ই নয়, এর পাশাপাশি দেখতে হবে, কাজটা যে করছে, সে কোন পদ্ধতিতে করছে। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঠিক ভাবে মন্ত্র উচ্চারণ করছে কি না।
অবাক হয়ে ইমলি বললেন, উচ্চারণ! মন্ত্র যে রকম ভাবে লেখা থাকে, সে রকম ভাবেই তো উত্তারণ করবে, নাকি? এর মধ্যে আবার উচ্চারণের আলাদা কোনও কায়দা আছে নাকি?
— থাকবে না? তোমাদের কাছে এখন যেটা সব চেয়ে আধুনিক যন্ত্র— সেই কমপিউটার যাতে অন্য কেউ খুলতে না-পারে, সে জন্য তো তোমরা চোখের মণি, হাতের আঙুলের স্পর্শ কিংবা পাঁচমিশালি কোনও সংখ্যা অথবা উদ্ভট কোনও শব্দ দিয়ে লক করে রাখো। এমনকী, নিজে খুলতে গিয়ে ভুল করেও যদি অন্য কোনও পাশওয়ার্ড দিয়ে দাও, তা হলে কি সেটা ওপেন হয়? হয় না তো? ঠিক তেমনি। মন্ত্রের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এই মন্ত্রটন্ত্র যেহেতু বহু যুগ আগেকার পদ্ধতি, তাই এখনকার মতো গোপনীয়তা এতটা আঁটোসাঁটো ছিল না। তবে হ্যাঁ, উচ্চরণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা নিয়েছিলেন তখনকার লোকেরা। ফলে এখনও সে যুগের ভাষার মতো খানিকটা সংস্কৃত ঘেঁষা উচ্চরণ না-হলে কোনও মন্ত্রই জীবন্ত হয়ে ওঠে না। আর মন্ত্র জীবন্ত না-হলে সেই মন্ত্র কোনও কাজও করতে পারে না। তাই মন্ত্রকে প্রাণদান করার জন্য ঠিক মতো উচ্চারণ করাটা অত্যন্ত জরুরি। আর তার থেকেও বড় কথা, কাজটা কে করছে। যোগ্য লোক না হলেই মুশকিল। কারণ, অনেকে জানেই না, মন্ত্রের সংখ্যা গোনার জন্য সোনা, রুপো, মণি, মুক্তো, পলা, রুদ্রাক্ষ বা স্ফটিক নয়, সব থেকে ভাল হল আঙুলের কড় গোনা। তবে পর পর কড় গুনে গেলেই হবে না। তারও আবার অনেক নিয়ম আছে। সব সময় মাঝের দুই কড়ই গুনতে হবে। গোনার জন্য নীচের কড় কিংবা আঙুলের ডগা ধরলেই সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্ত্র নিষ্ফলা হয়ে যাবে। অনেকে তো এটাও জানে না যে, মন্ত্রের সেতু হচ্ছে— ওঁ। জপের সময় প্রতিবার মন্ত্র উচ্চারণের আগে ‘ওঁ’ বলে নিতে হয়। না-হলে সারা রাত ধরে মন্ত্র উচ্চারণ করলেও সেটা আর মালার মতো গাঁথা হয়ে ওঠে না। প্রত্যেকটা মন্ত্রই ছেঁড়া মালার পুঁতির মতো টপ টপ করে পড়ে যায়। ফলে ওটা কোনও কাজেই আসে না।
সে কথা শুনেও ইমলি বিড়বিড় করে বললেন, কিন্তু আট হাজার টাকা…
— তা হলে তুই করে নে। আমি তোকে মন্ত্র বলে দিচ্ছি। লেখ— ওঁ ঝাং ঝাং ঝাং হাং হাং হাং হেং হেং। এই মন্ত্র পাঁচশো বার জপ করলেই শুধু মানুষ নয়, অসুর, দেবতা, যক্ষ, নাগ, রাক্ষস, স্থাবর এবং জঙ্ঘম— সবাইকে বশীভূত করা যায়।
অবাক চোখে ইমলি বললেন, পাঁচশো বার?
— ও, পাঁচশো বার পারবি না? আরও সহজ চাই? ঠিক আছে, লেখ— ওঁ চামুণ্ডে জয় জয় স্তম্ভয় স্তম্ভয় মোহয় মোহয় সর্ব্ব সত্ত্বান নমঃ স্বাহা। এই মন্ত্র ফুলে পড়ে যার হাতে দিবি, সেই তোর বশ হয়ে যাবে।
— মন্ত্রটা কী বললেন?
— ও। এটা বড় লাগছে? ছোটও আছে। লেখ— ওঁ নমঃ কটবিকট-ঘোররূপিনী স্বাহা। এই মন্ত্র জপ করে যার নাম উল্লেখ করে সাত গ্রাস ভাত খাবি, তাকেই তুই বশে রাখতে পারবি।
— মন্ত্রগুলি খুব কঠিন… ঠিক মতো উচ্চারণ…
কয়েক মুহূর্ত কী একটা ভেবে নিয়ে উনি বললেন, তা হলে একটা কাজ কর। তোকে মন্ত্র পড়তে হবে না। বটগাছ বেয়ে ওঠা যে কোনও একটা পরগাছা রোহিনী নক্ষত্রে ছিঁড়ে হাতের তালুতে পেষ। তা হলেই হবে। আর যদি পরগাছাওয়ালা কোনও বটগাছ না পাস, তা হলে মৃগশিরা নক্ষত্রে যজ্ঞডুমুরের মূল তুলে হাতে বেঁধে নে। তার পর যাকে ছুঁবি, দেখবি, সেই তোর বশীভূত হয়ে যাবে। যদি যজ্ঞডুমুরের গাছ না পাস, তবে অশ্বিনী নক্ষত্রে পলাশ গাছের মূল তুলে কড়েয় বেঁধে নিলেও হবে।
— এতে কাজ হবে?
— হবে। তবে শুধু ওগুলো করলেই হবে না। অনেক নিয়মকানুন, পদ্ধতি আছে। সেগুলি ঠিকঠাক মতো মেনে করতে হবে।
আগ্রহ সহকারে ইমলি জানতে চাইলেন, যেমন?
— যেমন, প্রথমত শিকড়-বাকড়ের জন্য আগে গাছটাকে ভাল করে চিনতে হবে। তার পর সেটা তোলার ক্ষেত্রে সব সময় গোটা গাছটাকে এক টানে উপড়ে নিতে হবে। তাই কাজের জন্য বড় গাছ নয়, সব সময় চারা গাছ বাছাই বাঞ্ছনীয়। তার আগে মন্ত্র পড়ে গাছটাকে কিন্তু বন্দনা করে নিতে হবে।
— সেটা আবার কী মন্ত্র?
বিরক্তি মেশানো স্বরে উনি এ বার বললেন, সব মন্ত্র কি একদিনেই শিখে নিবি রে বেটি? এটা শিখতে আমার সারা জীবন লেগে গেছে।
মিন মিন করে ইমলি বললেন, আসলে, আমার পক্ষে আট হাজার টাকা…
— তা হলে যেখানে কমে হবে, সেখানে যা।
— না বাবা, আমি আর অন্য কোথাও যাব না। আপনার কাছে যখন এসেছি, আপনিই করে দেবেন। শুধু টাকাটা যদি একটু কম করেন…
— তুই কি ভাবছিস এই সব করে আমি টাকা নিই? একদম না। এই সব কাজ করতে গেলে অনেক কিছু লাগে। সোনাভষ্ম যেমন লাগে, তেমনি তামা, পেতল, কাঁসাও লাগে। লাগে পেরেক। নানান গাছের কাঁটা। আলতা-কুমকুমও। বাসনই লাগে একগাদা। কত রকমের পদ রান্না করতে হয় জানিস? ঠিক আছে, তোকে টাকা দিতে হবে না। আমি ফর্দ লিখে দিচ্ছি, তুই শুধু সেগুলি এনে দে। ব্যস। তা হলেও হবে।
— তাতে কত পড়বে? আন্দাজ…
উনি বললেন, ওই যে বললাম, আট হাজার… তবে তোরা কিনতে গেলে কিঞ্চিত বেশিই পড়বে। দ্যাখ, কী করবি। তোর ব্যাপার। ভেবে দ্যাখ।
— না বাবা, ভাবার কিছু নেই। আপনি করুন। যত কষ্টই হোক আমি ওই আট হাজারই দেব। তবে একটা কথা। আমার ছেলে যেন সুস্থ শরীরে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসে।
— আসবে রে বাবা, আসবে। দে, টাকাটা দে।
কাঁচুমাচু মুখ করে ইমলি বললেন, এখন তো টাকাটা আমার সঙ্গে নেই। আমার বাড়ি কাছেই। আমি এক্ষুনি গিয়ে নিয়ে আসছি। আপনি ততক্ষণে কাজটা শুরু করে দিন।
— কতক্ষণ লাগবে?
— ঘণ্টাখানেক। খুব বেশি হলে দেড় ঘণ্টা।
উনি বললেন, ঠিক আছে, যা। নিয়ে আয়। আমার কাছে যা জিনিসপত্র কেনা আছে, তাই দিয়েই আপাতত কাজটা শুরু করে দিচ্ছি। এ তো আর এক-আধ ঘণ্টার কাজ না। সারা দিন লেগে যাবে। তবে তুই যদি বেশি দেরি করিস, আমি কিন্তু সব পণ্ড করে দেব।
আঁতকে উঠে ইমলি বললেন, না বাবা, না। আপনি করুন। আমি এই যাব আর আসব।
— ঠিক আছে, যা বেটি, যা। তোর মঙ্গল হবে।
তান্ত্রিকের মুখে ‘মঙ্গল’ শব্দটা শুনেই ওঁর মনে পড়ে গেল, না। আজ মঙ্গলবার নয়। শনিবার। এই দিনেই তো বশীকরণ করার মোক্ষম দিন। উনিই তো বললেন। তা হলে! না। আর দেরি করা ঠিক হবে না। এক্ষুনি তাঁকে বাড়ি গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসতে হবে। টাকার জন্য চিন্তা করলে হবে না। ছেলে আগে, না টাকা আগে?
মাঝে মাঝেই টাকা গুনতে দেখে তাঁর স্বামী তাঁকে কত বার বলেছেন, যেটুকু জমিয়েছ, ব্যাঙ্কে রেখে দাও। অন্তত কিছু সুদ তো পাবে। শুধু শুধু ঘরে রেখে দিয়ে কী লাভ, ডিম পাড়বে?
তবু তিনি রাখেননি। ভাগ্যিস রাখেননি। না-হলে এই বিপদের সময়… হ্যাঁ, একটু একটু করে আলমারির মধ্যে তিনি যা জমিয়েছেন, তাতে আট হাজার কেন, গুনলে, তার থেকে অনেক বেশিই হবে। আজ যদি হারিয়ে না-গিয়ে, ওর বড় কোনও অসুখ-বিসুখ হত, আমি কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারতাম? ওকে নার্সিংহোমে ভর্তি করাতাম না? আর নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে গেলে তো এর থেকেও অনেক অনেক অনেক বেশি টাকা ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে আগে জমা দিতে হত। তাই নয় কি? ওঁরা কি কোনও কথা শুনত? নাকি কোনও কাকুতি-মিনতিতে ওঁদের মন গলত? তার পর বাকি খরচা তো আছেই। আমি কি তখন নার্সিংহোমের লোকেদের সঙ্গে এই ভাবে দরদস্তুর করতে পারতাম? না, করা যেত? সে তুলনায় এই টাকা তো কিছুই না। তাই চাটাই ছেড়ে ঝটপট করে উঠে ছেলের নাম-ধাম লেখা কাগজটা কোনও রকমে তান্ত্রিকের হাতে দিয়েই পড়ি কি মড়ি করে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগলেন ইমলি। পিছন ফিরে আর তাকালেন না।
চলবে…

আরও পড়ুন:
মহাশূন্যে জুরান- আঠারো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- সতেরো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- ষোল পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- পনেরো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- চোদ্দো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- তেরো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- বারো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- এগারো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- দশ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- নয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- আট পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- সাত পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- ছয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- পঞ্চম পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- চতুর্থ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- তৃতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- দ্বিতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- প্রথম পর্ব

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।