8.8 C
Drøbak
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২১, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্য'চন্দন রোশনি' মোহিত কামালের ধারাবাহিক উপন্যাস

‘চন্দন রোশনি’
মোহিত কামালের ধারাবাহিক উপন্যাস

সাগরের অথই জলে তলিয়ে গেছে অর্ণব। কী ঘটবে অর্ণবের জলজজীবনে? সমুদ্রসৈকতে অপেক্ষারত উর্বশীর জীবনে নেমে এলো কোন ঝড়? একে অপর থেকে কি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল নবদম্পতি? সাগরতলের জীবনে অর্ণব আর বাস্তব জীবনযুদ্ধে অশুভ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে থাকা উর্বশীর মধ্যে কীভাবে যোগাযোগ ঘটতে থাকে? হারিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে অর্ণব বার বার ফিরে আসে উর্বশীর ঘটমান চলার পথে? বাস্তব আর পরাবাস্তবের আলোয় কীভাবে জ্বলে ওঠে ম্যাজিক রিয়ালিজম? সচেতন ও অবচেতন মনের এক সমগ্রতা বা অভিন্নতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুররিয়ালিজমের কোন পথ মাড়িয়ে এগোবে এই উপন্যাসের কাহিনি? জানতে হলে পড়তে হবে উপন্যাসটি।

।।আট।।

জোছনাকন্যার অন্যরূপ
আঁধার ফুঁড়ে যে আলোতেও দাঁড়ানো যায়, ভাবেনি কখনও উর্বশী- এ বিশ্বাসের পেছনে কণামাত্র সাহসও ছিল না কখনও। আলোর অন্তরালেও আঁধার থাকে, তা-ও জানা ছিল না তার। অর্ণব-নক্ষত্রের আলো বুকে নিয়ে একা থাকার প্রেরণা যে এত দুর্নিবার হবে– জোরালো শক্তির সেই আঁচ আগে ভাবনায় ঠাঁইই পায়নি। এ মুহূর্তে মাথার ওপর শক্ত ছাদ নেই। অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে উঠে এসেছে বান্ধবী চন্দনাসহ। তাই সুবিধে বেশি। ছাদেও দু বাহু বাড়িয়ে তাকানো যায় আকাশের দিকে। আটকে থাকা রুদ্ধশ্বাসও ছাড়া যায়। আর বিস্তীর্ণ মহাশূন্যে বুক ভরে প্রশ্বাস টেনে নেওয়া যায়- শুদ্ধ বাতাসের চাপে ফুলে উঠল ফুসফুস, রক্তে সঞ্চারিত হলো গোপন অক্সিজেন, গোপন জ্বালানি- সিলগালা করা মনোভুবনে পাষাণচিত্রের নমুনা ফুটে থাকলেও উর্বশীর এখন ভেতরের কোমলরূপই ফুটে উঠল। একা থাকার ইচ্ছায় আকাশের সীমানায় নতুন ফ্ল্যাট সাজিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে উঠে দু বাহু বাড়িয়ে আনন্দের বদলে হু হু করে কেঁদে উঠল ও।
আচমকা বিদ্যুৎঝলক এ বাড়ির ছাদ থেকে ছুটে গেল আকাশে। পাশে দাঁড়ানো বান্ধবী চন্দনা সেই আলোয় দেখল উর্বশীর মুখ। চেনা যায় না, পরিচিত মুখখানা অজানা সৌরজগতের অন্য কোনো তরুণীর কিনা ভাবতে সময় লাগল।
পার্থিব কোনো সংশ্রব না পেয়ে চন্দনা ভীত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার উর্বশী, তুমিই আছো তো ছাদে? নাকি অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে তোমার জায়গায়?’
শব্দ বেরুল না। চন্দনা কেবল দেখল একটা রংধনু। উর্বশীর শরীরের ভেতর থেকে রংধনুর সাত রঙ প্রজাপতির পাখনায় চড়ে বুরবুর করে উড়ে গেল আকাশে। রূপক কিংবা প্রতীকের ছাঁচে নয়, জোছনাপদ্মের মতো চন্দনা দেখল জোছনাকন্যার অন্য রূপ।
হঠাৎ জোছনায় জেগে উঠল জোছনাছায়া। ছায়াটি নড়ে কাছে এলো, চন্দনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কী সব প্রশ্ন করছো, চন্দনা?’
‘ওঃ। তাহলে তোমার মধ্যেই তুমি ছিলে?’
‘ছিলাম মানে? আছিই তো। আমি আবার কার মধ্যে যাব, কোথায় যাব?’
‘মনে হচ্ছিল তোমার মধ্যে তুমি নেই, ভয় পেয়ে গিয়েছিলো!’
‘আমি ছাদেই দাঁড়িয়ে আছি, কারও মধ্যে যাইনি তো! বোধ হয় অর্ণব এসেছিল আমার মধ্যে। মনে হচ্ছিল ও জোছনাআদর ঢেলে দিয়ে গেছে দেহে, মনও তাই ভরে উঠেছে জোছনাকণায়।’
উর্বশীর উত্তর শুনে নিঝুম রাতের মতো নির্বাক হয়ে গেল চন্দনা।
দীর্ঘক্ষণ আবার কথা নেই। প্রবল জোছনার ঢল ঝেঁপে নামছে ছাদে। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে উর্বশী। স্নাত হচ্ছে কোমল আলোয়, স্বর্ণসুখে ভরে উঠছে তার মন। চন্দনজ্যোতি ধুয়ে দিয়ে গেল বুকের কালিমা।
অনেকক্ষণ পর বাকরুদ্ধ চন্দনার কণ্ঠ থেকে বেরুল নতুন জিজ্ঞাসা, ‘তোমার একা থাকাটা কি ডিস্টার্ব করছি? প্রশ্ন করে কি বিরক্ত করছি?’
‘হুম।’
ছাদ থেকে সিঁড়ির দরজার দিকে পা বাড়াল চন্দনা।
চট করে মগ্নতার ভেতর থেকে জেগে উঠে উর্বশী বলল, ‘একা থাকতে ভালো লাগছে, তবে একাকী থাকলে একা থাকার অনুভব টের পাওয়া যায় না। আরেকজন কেউ পাশে আছে, সেই ভাবনার মধ্যে একাকীত্বের অর্থ নতুনভাবে বোঝা যায়। এই, এখন যেমন, তুমি ছিলে পাশে, একা হয়ে গিয়েছিলাম আমি, এই একাকী ডুবে যাওয়ায় আসল আমিকে টের পেয়েছি। তুমি না থাকলে একা থাকার অর্থ বোঝা যেত না। তোমার উপস্থিতির কারণেই আবিষ্কার করেছি আমাকে আর অর্ণবকেও।’
উত্তর শুনে আরেকবার হোঁচট খেল চন্দনা। ছায়ার ভেতর থেকে জেগে, জোছনা সরিয়ে নতুন করে দেখল উর্বশীকে- জোছনার কোমল অভিব্যক্তিতে বুঝল ভীত নয় ও। সামনে দাঁড়িয়ে আছে নির্ভীক উর্বশী। তার ছায়া এখন পড়েছে নিজের দেহে। সেই ছায়া থেকে হাত বের করে চন্দনা শক্ত করে ধরল উর্বশীর হাত- টান দিয়ে বলল, ‘চলো ঘরে যাই।’
উর্বশী বলল, ‘আমার ঘর নেই- পুরো খোলা আকাশ আর সমুদ্রের তরঙ্গমালায় বানিয়েছি নতুন ঘর। কোন ঘরে নিতে চাও আমায়?’
হাত ছেড়ে দিল চন্দনা।
সে কেবলই ছায়াসঙ্গী হতে চায় না উর্বশীর। সঙ্গী হতে চায়। সেই ভরসায় ঢাকার জীবনযুদ্ধের পথে নেমেছে দুজনে। একে অপরের জন্য অপরিহার্য, সাহসী-সঙ্গী, বন্ধু বা কখনো অভিভাবক- সব দায়িত্ব কাঁধে তুলেই সামনে চলার অঙ্গীকার উভয়ের। অথচ উর্বশীর এখনকার কথায় বাস্তবতার ছোঁয়া নেই, অতিপ্রাকৃত কল্পনার ঘোরে ডুবে আছে সে। মা-বাবা থাকা সত্ত্বেও আলাদা থাকতে চেয়েছে। আলাদা কি হতে পেরেছে? পারলে কেন সঙ্গী করল বান্ধবীকে? ভাবনায় ঝাঁকি খেল নতুন করে। যে-মেয়ে বাবা-মা থেকে আলাদা থাকতে চায়; অতি-প্রাকৃতিক ভৌতিক কল্পনা লালন করে, সে যে তাকেই ছেড়ে যাবে না, নিশ্চয়তা কোথায়? ভেবে শংকিত হয়ে চন্দনা আবার ধরল উর্বশীর হাত।
জোর গলায় বলল, ‘চলো, ঘরে চলো।’
‘চন্দনা, তুমিও কি মা’র মতো আমার ফ্রিডম কেড়ে নিতে চাও?’
‘না। কেড়ে নিতে চাই না। তোমার ফ্রিডম তোমার। আমারটা আমার। আমার এ মুহূর্তের ফ্রিডম হচ্ছে তোমাকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়া। মধ্যরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। এত রাতে দুই তরুণী ছাদে আছে জানলে অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা কী ভাববে জানি না, আমার ভাবনা হচ্ছে, এত রাতে ছাদে থাকা উচিত নয়। আমার ভালো বোধকে সম্মান করার দরকার নেই, কেবল অনুভব করো। তারপর চলো ঘরে।’
‘একই কথা হলো, তোমার ইচ্ছায় চালাতে চাও আমাকে। আমার ইচ্ছার দাম দিতে চাও না।’
‘তুমি কল্পজগতে আছো এখন। বাস্তবে ফিরে এসো। তাহলেই বুঝবে, আমি এখন যা বোঝাচ্ছি তোমাকে, তা আসলে তোমারই মনের কথা। তোমার কথাকেই কেবল তুলে ধরছি তোমার বোধের সামনে। তোমার ইচ্ছাকেই সম্মান করছি, তোমার স্বাধীনতা হরণ করছি না।’
চন্দনার শক্ত কথা শুনে শান্ত হয়ে গেল উর্বশীর মন। হাত ধরে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল উভয়ে।
সিঁড়িতে লাইট জ্বলছিল। হঠাৎ আলো নিভে গেল। নামার পথে থমকে দাঁড়াল উভয়ে। গা ছমছম করা ভুতুড়ে কোনো অনুভূতি নয়। আচমকা হ্যাঁচকা টান খেল চন্দনা। মুখ চেপে ধরেছে শক্তিশালী কেউ। শক্ত স্কচটেপ এঁটে হাতজোড়া পেছন থেকে বেঁধে ফেলেছে আক্রমণকারী। টুঁ-শব্দ করার শক্তি পেল না সে।
উর্বশী ডাকল, ‘চন্দনা কোথায় তুমি? মনে হচ্ছে আমার হাত থেকে কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে তোমাকে!’
সাড়া না পেয়ে আঁধারেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে গোঙানির শব্দ পেল উর্বশী। ভীত হলো না, সন্ত্রস্তভাব জেগে উঠল না। আঁধারে ওত পেতে থাকা শত্রুর আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে ভেবে ভেতরের প্রচণ্ড শক্তির আলোড়নে দেহকোষের পরমাণু বিদীর্ণ করে হিগ্স বোসন কণার বিকিরণ ঘটল। সঙ্গে সঙ্গে আলোহীন আঁধারে জেগে উঠল আলোর ঝলকানি। উর্বশী দেখল সিঁড়ির রেস্টিংফ্লোরে এক দস্যু চেপে ধরেছে চন্দনাকে। আরেকজন ওপরে উঠে আসছে নিজের দিকে। দাঁত-মুখ খিঁচে, হাত মুষ্টিবদ্ধ রেখে দম বন্ধ করে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে গেল উর্বশী। কালো মুখোশে ঢাকা শক্ত-সমর্থ দস্যুটি হাত বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে শক খাওয়ার মতো ঝাঁকি খেয়ে উড়ে গেল চন্দনার ওপর ঠেসে বসা আক্রমণকারীর মাথার ওপর দিয়ে। উড়ে যাওয়ার সময় পায়ের দুরন্ত গতির লাথি খেল চন্দনার ওপর আসন নেওয়া ধর্ষক। সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ল দুজনই। মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল চন্দনা। উঠতে গিয়ে আবার পড়ল ধপাস করে। ছুটে গিয়ে উর্বশী ধরল চন্দনাকে। একটানে খুলে নিল মুখের স্কচটেপ। ওকে কোলে তুলে দুরন্ত গতিতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিজেদের ফ্ল্যাটে। চন্দনাকে বেডে শুইয়ে হাত খুলে আবার ছুটে এলো উপরে। দুই আক্রমণকারী উধাও হয়ে গেছে। কারা ওরা? এ অ্যাপার্টমেন্টের কেউ, সিকিউরিটি গার্ড? বিদ্যুৎ না থাকায় লিফট বন্ধ। পালিয়েছে নাকি ছাদে লুকিয়ে আছে, নাকি নেমে গেছে সিঁড়ি বেয়ে- ভাবনার ঝড় এলো মাথায় ওদের ধরার জন্য উপরে যাবে না নীচে নামবে, দ্বিমুখী প্রশ্নের প্রভাবে ঠান্ডা হয়ে গেল উর্বশী। মাথা গরম করে সমস্যা জয় করা যায় না, বুঝে গেছে পোড় খেয়ে। শীতল হতে সময়ে নিলে কয়েক মিনিট। ইন্টারকমে এবার কল করল নীচে।
সিকিউরিটি গার্ড ফোন রিসিভ করে প্রশ্ন করল, ‘ম্যাডাম, এত রাতে কল করলেন, জরুরি কোনো সমস্যা?’
‘আপনারা কজন ডিউটিতে থাকেন রাতে?’ শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল উর্বশী।
‘তিন জন।’
‘সবাই নীচে আছেন?’
‘জি। সবাই আছে এখানে।’
‘অন্য দুজন এতক্ষণ কোথায় ছিল?’
‘এখানেই ছিল। আমরা তো একত্রে আড্ডা দিচ্ছি।’
‘সবাই সুস্থ আছে?’
‘জি। সুস্থ।’
‘আচ্ছা। থাকুন, আমি আসছি নীচে।’
‘কেন, আপা, নীচে নামবেন কেন? বিদ্যুৎ নেই, অন্ধকারে নিচে আসাটা কি ঠিক হবে?’
‘না। শোভন নয়। আর অন্ধকার নেই, আমার চোখে আলো আছে।’
রিসিভার ইন্টারকম হোল্ডারে রেখে দপদপ করে এক ছুটে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল উর্বশী।
আঁধার চারপাশে। অথচ সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ দেখতে পাচ্ছে ও। চৌদ্দতলা ফ্ল্যাটের ওপর থেকে নিচে নেমে আসতে ৩০ সেকেন্ড পার হয়েছে কিনা সন্দেহ।
তিন নিরাপত্তা রক্ষী, ঘরোয়া ড্রেস পরনে, ভূত দেখার মতো চমকে উঠে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে গেল উর্বশীর সামনে।
চার্জলাইটের আলোয় উর্বশী দেখছে ওদের মুখ। কারুর মাথায় বা মুখে ইনজুরির চিহ্ন নেই। পরিশ্রান্ত হওয়ার নমুনা নেই। ওদের চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ বসে থাকলেও ক্লান্তির আঁচড় নেই।
উর্বশী প্রশ্ন করল, ‘রাস্তায় তো দেখছি বিদ্যুৎবাতি জ্বলছে। ওপাশের বাড়িতেও আলো জ্বলছে। এটা তো লোডশেডিংয়ের আঁধার নয়। আর লোডশেডিং হলেও জেনারেটর অন হয়নি কেন?’
নিরাপত্তা রক্ষীরা একসঙ্গে সড়কের দিকে তাকাল। আবার তাকাল পাশের বাড়ির দিকে। তাই তো! সেখানে বিদ্যুৎবাতি জ্বলছে। যার অর্থ, এ এলাকায় এখন লোডশেডিং চলছে না, তবু বিদ্যুৎ সংযোগ নেই! তবে কি কার্টআউট পুড়ে গেলে জেনারেটর অন নাও হতে পারে ভেবে রেড অ্যালার্ট জ্বলে উঠল তাদের চোখেমুখে। একজন ছুটে গেল মেইন সুইচ বক্সের দিকে আর একজন গেল জেনারেটরের দিকে। অটো অন হয় জেনারেটর। জেনারেটর সুইচ অন হয়ে আছে। অথচ পুরো বাড়ি আঁধারে ঢাকা? কিছুই খেয়াল করেনি তারা। আর একজন পড়ে থাকা মেইন সুইচ উপরে উঠিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো করিডর ঝলমল করে উঠল বিদ্যুতের আলোয়। এবার ন্যাচারাল চোখ মেলে উর্বশী দেখল তিন সিকিউরিটির দিকে। তাদের চোখে-মুখে ভীতির ছায়া আছে, অপরাধের ছাপ নেই- দেখে নিজেকে সংযত করে উর্বশী প্রশ্ন করল, ‘দুজন লোক ঢুকেছে বাড়িতে। সম্ভবত আপনাদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে তারা আক্রমণ করছে আমাদের। বাধা পেয়ে পালিয়েছে।’
‘দরজা কি ভেঙে ঘরে ঢুকেছে ম্যাডাম?’
‘না। ছাদের সিঁড়ির গোড়ায় আক্রমণ করেছে আমাদের।’
‘এত রাতে আপনারা ছাদে গিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ। জোছনা দেখার লোভে উঠেছিলাম ছাদে।’
তিনজন একে অপরের দিকে চোখ ঘুরিয়ে চোখাচোখি করল। একজন বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘মধ্যরাতে কেউ ছাদে যায়, ম্যাডাম?’
‘আমার প্রশ্নের জবাব দিন। প্রশ্ন করছেন কেন? দেখুন ওরা কোথায় লুকিয়ে আছে, না পালিয়েছে।’
ধমক খেয়ে তিন জন ছুট দিলে দেয়ালঘেরা বাড়ির তিন দিকে। ইন্টারকমের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ফ্ল্যাটে কল করল উর্বশী। রিংটোন বাজছে। রিসিভার উঠাচ্ছে না চন্দনা। আবার ভয় পেল ও। দুজন আবার ঢুকতে পারে তাদের ফ্ল্যাটে ভেবে আবার আক্রমণ করেছে চন্দনাকে।
ছুটে এলো লিফটের সামনে।
না। বিদ্যুৎ এলেও লিফট বন্ধ। মধ্যরাতে বন্ধ থাকে। ফজরের নামাজের সময় অন হবে লিফট, জানে উর্বশী। এক ছুটে উঠে এলো উপরে। আশ্চর্য! হার্ট দপদপ করছে না। দারুণ স্টামিনা ভর করেছে দেহে। হিগ্স বোসন কণার ভেতর থেকে ছুটে বেরুচ্ছে অপরিচিত এক দুর্দমনীয় শক্তি। শক্তির টানে এক দমে উঠে এলো ওপরে।
ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখল অচেতন পড়ে আছে চন্দনা। গাল বেয়ে রক্ত ঝরছে। রক্ত দেখে দিশেহারা হয়ে গেল উর্বশী। হঠাৎ মনে হলো আক্রমণকারীরা মানুষরূপী রক্তখেকো ভ্যাম্পায়ার। চন্দনার রক্তশুষে খেয়ে গেছে। এজন্যই অচেতন হয়ে আছে সে। কী করবে এখন? হাসপাতালে তো নিতে হবে চন্দনাকে। নতুন ভাবনার ঘোরে ডুবে প্রথমে এক হাত রাখল ওর কপালে, আর এক হাত বুকে। চন্দনার বুকের ঢিবঢিব টের পাচ্ছে। বেঁচে আছে। বেঁচে থাকার অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে উর্বশী জড়িয়ে ধরল তাকে। আশ্চর্য। চোখ খুলে তাকাল চন্দনা। চোখ খুলে যেন কিছুই ঘটেনি এতক্ষণ, প্রশ্ন করল, ‘কী করছো? আমি তোমার অর্ণব নই, আমি চন্দনা। এভাবে আদর করছো কেন আমাকে?’
দুম করে ছিটকে গেল উর্বশীর দেহ। বিদ্যুতের শক খেল ও। কোত্থেকে এলো এই বিদ্যুৎতরঙ্গ? উর্বশী প্রশ্ন করল, ‘তুমি ঠিক আছো? জ্ঞান ফিরেছে তোমার?’
‘হ্যাঁ। ঠিকই তো আছি? কী হয়েছে তোমার?’ প্রশ্ন করল চন্দনা।
‘আমার কিছু হয়নি, গালে হাত দিয়ে দেখো, রক্ত ঝরছে তোমার গাল বেয়ে।’
হাতে রক্তের স্পর্শে চমকে উঠল চন্দনা। মনে পড়তে লাগল পুরো ঘটনা। তারপর আধশোয়া থেকে উঠে সজোরে ঝাপটে ধরল উর্বশীকে। আবারও শক খেল সে। ছিটকে গেল খাটের ওপর।
এ কি কাণ্ড! নিজের দেহের দিকে তাকাল উর্বশী।
দেহে মনে হচ্ছে বাসা বেঁধেছে বৈদ্যুতিক কোনো শক্তি। সেই শক্তি ঘটিয়ে দিচ্ছে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। কী সেই শক্তি- ভেবে কূল পেল না উর্বশী।
ইন্টারকমের শব্দে চমকে উঠে রিসিভার ধরে উর্বশী বলল, ‘কিছু কি বুঝলেন?’
‘না। মাডাম। আপনি এত দ্রুত নেমে আবার কীভাবে গেলেন চৌদ্দতলার ফ্ল্যাটে?’
উর্বশীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল গার্ড।
‘জানি না।’
হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল গার্ডের। উর্বশী বলল, ‘হ্যালো! হ্যালো! কোনো জবাব এলো না ইন্টারকমে। শব্দতরঙ্গ ঠিকই আছে। কেবল শব্দ নেই। শব্দখেকো ভ্যাম্পায়ার যেন গিলে ফেলেছে সব শব্দ। সিনিয়র গার্ড অন্যদের উদ্দেশে বলছে, ‘উনি চৌদ্দতলার ম্যাডাম তো? নাকি ভূত? এত দ্রুত নামলেন কীভাবে, লিফট ছাড়া উঠেই বা গেলেন কীভাবে?’ হাজার কোটি মাইল দূর থেকে যেন ভেসে এলো ক্ষীণ শব্দতরঙ্গ। সেই শব্দ ঢুকে গেল উর্বশীর কানেও। আর তখনই ভীত হয়ে আবার তাকাল নিজ দেহের দিকে।
সঙ্গে সঙ্গে বুঝল বাইরে ঘটছে মেঘরাজির সংঘর্ষ। বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে সংঘর্ষে। সেই বিদ্যুৎতরঙ্গ আছড়ে পড়ছে সাগরে। আর সাগর থেকে সাত রঙা বাঁকা রংধনুর চন্দন রোশনি এসে ঢুকে যাচ্ছে নিজের দেহে। পায়ের দিকে তাকাল উর্বশী। সেখানে অদ্ভুত সুন্দর আলোকমালা ঝিকমিক করছে। তা দেখে ভয় দূর করে আপন শক্তিতে হেসে উঠে চন্দনার উদ্দেশে ও বলল, ‘তুমি চন্দনা, আমার অর্ণব নও, জানি আমি। এ-ও জানি ওয়েব পোর্টালে ভর করে যেমন মুহূর্তে এক দেশ থেকে আরেক দেশে উড়ে যায় দৃশ্যপট, যেমন স্ক্রিনে মূর্ত হয়ে ওঠে আলোর কণায় ভর করে চলা দৃশ্য, মানুষ, যেমন শুনতে পাওয়া যায় চলমান মানুষের কথা, তেমনি অর্ণবের অলৌকিক আলোর ছোঁয়া পেয়ে আমার দেহে জেগে উঠেছে অন্য শক্তি। সেই শক্তির পরশে সুস্থ হয়ে উঠেছো তুমি।’
জবাব দিলো না চন্দনা। এ কথার পিঠে কথা চলে না। কেবল চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ল খাটে। ফ্ল্যাটভাড়া নিয়ে একা চলার আকাক্সক্ষায় দুজনে নেমেছে ঢাকার জীবনযুদ্ধে। বুঝল এ যুদ্ধ সহজ নয়, কঠিন। তবে এই যুদ্ধে জয়ী হতে হবেই তাদের। এটাই আস্থা, এটাই বিশ্বাস।

চলবে…

আরও পড়ুন:
চন্দন রোশনি- সপ্তম পর্ব
চন্দন রোশনি- ষষ্ঠ পর্ব
চন্দন রোশনি- পঞ্চম পর্ব
চন্দন রোশনি- চতুর্থ পর্ব
চন্দন রোশনি- তৃতীয় পর্ব
চন্দন রোশনি- দ্বিতীয় পর্ব
চন্দন রোশনি- প্রথম পর্ব

মোহিত কামাল
মোহিত কামাল
কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের জন্ম ১৯৬০ সালের ০২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম আসাদুল হক এবং মায়ের নাম মাসুদা খাতুন। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম ও খালিশপুর, খুলনায়। বর্তমান নিবাস ধানমন্ডি, ঢাকা। স্ত্রী মাহফুজা আখতার মিলি, সন্তান মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, পুত্রবধূ ইফফাত ইসলাম খান রুম্পা ও জিদনি ময়ূখ স্বচ্ছকে নিয়ে তাঁর সংসার। চার ভাই এক বোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান তিনি। তাঁর অ্যাফিডেভিট করা লেখক-নাম মোহিত কামাল। তিনি সম্পাদনা করছেন শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ, সাহিত্য-সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা শব্দঘর। তাঁর লেখালেখির মুখ্য বিষয় : উপন্যাস ও গল্প; শিশুসাহিত্য রচনার পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণাধর্মী রচনা। লেখকের উড়াল বালক কিশোর উপন্যাসটি স্কলাস্টিকা স্কুলের গ্রেড সেভেনের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে; ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি (ঝঊছঅঊচ) কর্তৃকও নির্বাচিত হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কথাসাহিত্য ৩৭ (উপন্যাস ২৪, গল্পগ্রন্থ ১৩)। এ ছাড়া কিশোর উপন্যাস (১১টি) ও অন্যান্য গ্রন্থ মিলে বইয়ের সংখ্যা ৫৫। জাতীয় পুরস্কার: কথাসাহিত্যে অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার ১৪১৮ বঙ্গাব্দ (২০১২) অর্জন করেছেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অন্যান্য পুরস্কারও; হ্যাঁ (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০২০) উপন্যাসটি পেয়েছে সমরেশ বসু সাহিত্য পুরস্কার (২০২০)। পথভ্রষ্ট ঘূর্ণির কৃষ্ণগহ্বর (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১৪) উপন্যাসটি পেয়েছে সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার (২০১৪)। সুখপাখি আগুনডানা (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০০৮) উপন্যাসটি পেয়েছে এ-ওয়ান টেলিমিডিয়া স্বাধীনতা অ্যাওয়ার্ড ২০০৮ এবং বেগম রোকেয়া সম্মাননা পদক ২০০৮―সাপ্তাহিক দি নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস-প্রদত্ত। না (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০০৯) উপন্যাসটি পেয়েছে স্বাধীনতা সংসদ নববর্ষ পুরস্কার ১৪১৫। চেনা বন্ধু অচেনা পথ (বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১০) উপন্যাসটি পেয়েছে ময়মনসিংহ সংস্কৃতি পুরস্কার ১৪১৬। কিশোর উপন্যাস উড়াল বালক (রোদেলা প্রকাশনী, ২০১২; অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৬) গ্রন্থটি ২০১২ সালে পেয়েছে এম নুরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১২)। তিনি মনোচিকিৎসা বিদ্যার একজন অধ্যাপক, সাবেক পরিচালক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ,ঢাকা
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।