8.8 C
Drøbak
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২১, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যপ্রবন্ধবন্দে আলী মিয়া: একজন কবি ও কিশোরী পাঠিকা

বন্দে আলী মিয়া:
একজন কবি ও কিশোরী পাঠিকা

বর্ষার জল সরিয়া গিয়াছে জাগিয়া উঠেছে চর
গাঙ শালিখেরা গর্ত খুঁড়িয়া বাঁধিতেছে সবে ঘর৷
গহীন নদীর ঐ পাড় দিয়া আঁখি যায় যত দূরে
আকাশের মেঘ অতিথি যেনোগো তাহার আঙিনা জুড়ে …

নবীন কবির কবিতা৷ দুরুদুরু বুকে পাঠিয়েছেন আর এক কবির কাছে৷

আষাঢ়ের জলভরা মেঘের দুপুর৷ সামনে শান্তি নিকেতনের ভূবনডাঙার খোলা মাঠে বৃষ্টির খেলা দেখতে দেখতে “ময়নামতির চর” পড়ছেন কবিদের যিনি কূলগুরু৷ বারবার কবিতাটি পড়েও যেনো পড়া হয়না … এমনই মনোমুগ্ধকর! এক সময় কলম টেনে নেন তিনি…৷ নবীন কবির প্রতি তাঁর আবেগ তিনি গোপন রাখতে না পেরে চিঠি লিখতে শুরু করেন —
‘… পদ্মাতীরের পাড়াগাঁয়ের এমন নিকটস্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবিতায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না৷বাংলা সাহিত্যে তুমি আপন বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছ…’
নবীন কবির নাম ‘বন্দে আলী মিয়া’৷ পাবনার রাধানগর গ্রামে ১৯০৬ সালে জন্ম৷ ‘দুখু’ কবির মতই অল্প বয়সে বাবার মৃত্যু৷ মা গ্রামের ‘মজুমদার একাডেমি’তে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন৷
এরপর সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান৷ ১৯৩০ সালে ২৫বছর বয়সে কোলকাতার একটি বিদ্যালয়ে চাকরিও যোগাড় করে নেন৷
এই সব গুরুগম্ভীর কথা, পড়ে জেনেছি – অনেক পরে৷

241652657 1016888099124577 5237558829506758848 n বন্দে আলী মিয়া: <br>একজন কবি ও কিশোরী পাঠিকা
কবি বন্দে আলী মিয়া

রবীন্দ্রনাথের প্রিয় কবিতাটি ছোটোদাদারও অনেক ভালো লাগতো৷ দরজা ছিলনা চিলেকোঠার ঘরে৷খোলা ছাদের পাঁচিলের ওধারে সারি সারি গাছ-গাছালি৷ সেখান থেকে ছুটে আসত দামাল হাওয়া৷ সু এবং উচ্চ স্বরে এই কবিতাসহ আরো অনেক কবিতা দাদা পড়ত-পাঠ্যছিল যে৷
পাঠ্য নয়, তবু শুনতে শুনতে আমারও মুখস্থ হয়ে যেতো এক সময়৷ বড় ভাইবোনদের জামা-কাপড়-জুতোর মতন একদিন বইগুলোও আমরা পেতাম দু’এক বছরের ব্যবধানে৷ তার অনেক আগেই অবশ্য পড়া হয়ে যেতো তাদের ক্লাসের বাংলা বইয়ের গল্প কবিতা৷
আমাদের বাড়িময় ছিল আম-জাম, কাঁঠাল, ডুমুর, কদম – লেবু আরও নানান গাছের ছড়াছড়ি৷যে যার মতন দাঁড়িয়ে থাকত৷ সকাল সকাল ঘুমানোর জন্যে ভোর ভোর ঘুম ভেঙে যেতো৷কাঠ কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতাম আর মুখ ধুতাম পুকুরের জলে৷
অত ভোর – তখনও পুকুরের জলের সর ভাঙেনি৷ উত্তর কোণের ডুমুর গাছের পাতারা ছায়া নামতো সেই জলে৷ ভয় আর ভাবহীনতায় দেখতাম দোয়েল আর কুবো পাখির আলসেমি…৷ একটু পরেই বারান্দায় পড়তে বসেই প্রথমেই মুখস্থ যত কবিতার মহড়া দিতাম৷
আক্ষরিক অর্থেই খুব সকাল অর্থাৎ জীবনেরও সেই প্রথম লগনে যে সব কবিতা পড়েছি, সেখানে রবি বা দুখু কবির কবিতা থেকে অন্যদের কবিতার স্মৃতি অধিক স্পষ্ট৷ মাটির কাছাকাছি সে সব কবিতা, সবুজের গন্ধমাখা৷ হৃদয়ের বড় আপন…

‘আমাদের ছোটগায়ে, ছোটছোট ঘর,
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর৷
আমগাছ জামগাছ, বাঁশঝাড় যেনো
মিলেমিশে আছে তারা, আত্মীয় হেনো৷’

পাঠ্যের সাথে প্রকৃতির, আরও ভাল করে বললে জীবনের প্রতিটি বিষয়ের সাথে এমন মিল থাকায় কবিতাগুলো আজও প্রায় কন্ঠস্থ৷আর সেই কবিদের মধ্যে অন্যতম ‘বন্দে আলী মিয়া’৷
পদ্মাচরের দৃশ্যকাব্য ‘ময়নামতীর চর’৷
রং তুলি দিয়ে যেমন ছবি আঁকা হয়, কবি তাঁর এই প্রথম কাব্যগ্রন্থটিকে শুধু কলম দিয়েই ছবির আঁকার সেই অসাধ্যকে সাধ্য করে তুলেছেন৷ বাস্তব জীবনের কাব্য ধর্মের সে এক মনোগ্রাহী মেল-বন্ধন৷ কবিতা, অথচ বুঝবার জন্যে ব্যাখ্যা-টীকা-টিপ্পুনি-শব্দার্থ সব কিছুই অপ্রয়োজন৷চারপাশে তাকাও আর কবিতার বাহার দেখো…
কবিতার উপকরণ যৎসামান্য,গাঁয়ের আলাভোলা সহজ-সরল নির্দোষ এক জীবনের জলছবি! মাঠের পাশে একা দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন বটগাছ, শালিখের গর্ত করা,পায়ে চলার মেঠো পথ৷ নিরিবিলি- নিঝুমতায় কবির কেটেছে সকাল-সন্ধ্যা-দুপুর ৷ আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচানো প্রাণ, আর জল ভরা দিঘির সাহচর্যে… তারই প্রতিফলন কবিতাগুচ্ছে৷ যা মনকে স্নিগ্ধ করতে বাধ্য-সকল হিংসার বিরুদ্ধে প্রদীপ জ্বেলে৷গুরুর আর্শীবাদ মিথ্যে হয়নি৷ বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান বিশেষ জায়গাটি কেউ নিতে পারেননি৷
শিশু মনে সেই যে স্নিগ্ধতার আনন্দ জেগেছিল তাঁর কবিতায়, তার অভিঘাত ছিল গোপন৷ যার জন্যে সারা জীবনে আধুনিক কবিতা আর পড়তেই ইচ্ছে করল না -বুঝতেও পারলাম না!
বর্ষাকে কবি ভালবাসতেন৷ এমনই এক আষাঢ়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি৷ নতুন দিনের কবিদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল—

‘তোমরা লিখিও নতুন কাব্য
ওগো আগামী দিনের কবি,
তোমাদের লেখায় ফুটে ওঠে যেনো
এই গ্রাম বাংলার ছবি৷’

নতুন কবিদের কবিতায় গ্রাম বাংলার দর্পন কতটা স্পষ্ট জানা নেই৷ কিন্তু এক অখ্যাত গ্রামের বালিকা আপনার কবিতা পড়েছিল একদিন৷ যে কবিতার প্রতিটা শব্দে গ্রাম-বাংলার ছবি তুলে ধরা৷ আপনার অনেক কবিতা আজও তার মুখস্থ৷ একজন গুণমুগ্ধ পাঠিকা আপনাকে স্মরণ করছে৷
নিশ্চয় আগামীর কোনো বালিকাও একই রকম ভালোবেসে পড়বে আপনার কবিতা।

অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।