সোমবার, নভেম্বর ২৮, ২০২২

অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করুন, শিশুকে খাদ্য দিন: শেখ হাসিনা

প্রকাশিত:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ বন্ধ করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব বিবেকের কাছে আমার আবেদন, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা বন্ধ করুন। শিশুকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দিন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন।’ জাতিসংঘ সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে শুক্রবার প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

কোভিড-১৯ মহামারি প্রাদুর্ভাবের পর এই প্রথম ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশন ১৩ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সংস্থার সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

শেখ হাসিনার ভাষণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, কোভিড-১৯ মহামারি, ফিলিস্তিন এবং অভিবাসন বিষয়ক বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বরাবরের মতো এবারও জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, ‘যুদ্ধ বা একতরফা জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার মতো বৈরী পন্থা কখনও কোনও জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাই সঙ্কট ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম উপায়। আমরা বিশ্বাস করি, সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান না করে আমরা শান্তি বজায় রাখতে পারি না।’

বিশ্ববাসীর শান্তি কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাতের অবসান চাই। নিষেধাজ্ঞা পাল্টা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে নারী, শিশুসহ ও গোটা মানবজাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এর প্রভাব কেবল একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সব মানুষের জীবন-জীবিকা মহাসঙ্কটে পতিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে, শিশুরাই বেশি কষ্ট ভোগ করে। তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

‘আমরা দেখতে চাই, একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব। যেখানে থাকবে বর্ধিত সহযোগিতা, সংহতি, পারস্পরিক সমৃদ্ধি এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। আমাদের একটি মাত্র পৃথিবী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই গ্রহকে আরও সুন্দর করে রেখে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।’

বিশ্বব্যাপী নানা সংকটের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, সহিংসতা ও সংঘাত, কোভিড-১৯ মহামারির মতো একাধিক জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রতিকূলতায় পৃথিবী নামক আমাদের এই গ্রহ আজ জর্জরিত। মানবিক চাহিদা গভীর হচ্ছে, বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গত আড়াই বছরে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারির বিধ্বংসী প্রভাব থেকে মুক্ত হতে শুরু করেছে, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে একটি সম্মিলিত অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত করেছে।

‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়তা-প্রার্থী ঝঁকিপূর্ণ দেশগুলো এখন আরও প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। বর্তমানে আমরা এমন একটি সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছি, যখন অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে অধিক পারস্পরিক সংহতি প্রদর্শন করা আবশ্যক।’

বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের এগিয়ে আসার আহ্বান শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, সংকটের মুহূর্তে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো জাতিসংঘ। তাই সর্বস্তরের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনের জন্য জাতিসংঘকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সবার প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে।’

এই পরিপ্রেক্ষিতে, ‘গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ’ গঠন করায় জাতিসংঘের মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই গ্রুপের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, আমি বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব ও সঙ্কটের গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বৈশ্বিক সমাধান নিরূপণ করতে অন্য বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেখে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-এর উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিপাদ্য-উদ্ভূত জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে আসছে।’

১৯৭৪ সালের ২৫-এ সেপ্টেম্বর এই মহান পরিষদে জাতির পিতা প্রদত্ত ভাষণের একটি চুম্বকাংশ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য, তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার ফল আস্বাদন করতে পারবো। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সব সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই বক্তব্য এখনও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, শান্তি হলো বিশ্বের সব নারী-পুরুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিরূপ। যুদ্ধের ফলে মানবজাতি, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা চরম কষ্ট ভোগ করে। কত মানুষ রিফিউজি হয়ে পড়ে।’

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারির শুরু থেকে এ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ রেখে কৌশল নির্ধারণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, মহামারির সংক্রমণ ও বিস্তার রোধ করতে আমরা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রসারিত করেছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করেছি, এবং তৃতীয়ত, আমরা জনগণের জীবিকা সুরক্ষিত রেখেছি। এসব উদ্যোগ মহামারিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করার পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সাহায্য করেছে।’

Subscribe

সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

সংবাদ
সম্পর্কিত

বাংলাদেশ: এসএসসির ফল প্রকাশ

বাংলাদেশে ২০২২ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের...

খেরসন অঞ্চলে রাশিয়ার হামলা, নিহত অন্তত ৩২

ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় কমপক্ষে ৩২ জন নিহত...

হুয়াওয়েসহ পাঁচ চীনা প্রতিষ্ঠানের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে হুয়াওয়ে, জেডটিইসহ চীনের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি...

ইতালিতে ভূমিধস, নিখোঁজ ১৩

পশ্চিম ইউরোপের দেশ ইতালিতে ভারী বর্ষণের পর ভূমিধসের ঘটনা...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।