‘দ্য ডিভাইন কমেডি’ – মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরি

এ কে এম রেজাউল করিম
এ কে এম রেজাউল করিম
35 মিনিটে পড়ুন
ছবি সংগৃহীত।

মহাকবি দান্তের নাম শোনেননি, সাহিত্যের এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইতালিয়ান বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক দান্তে। পুরো নাম দুরান্তে দেইলি আলিগিয়েরি বা দান্তে।

অনেক সময় লেখকের চেয়ে লেখকের কৃতকর্ম বেশি খ্যাতি পেয়ে যায়। দান্তে আলিগিয়েরির ক্ষেত্রে কোনটা ঘটেছে তা অনুমান করা বেশ মুশকিল। সারা বিশ্বে ব্যক্তি দান্তে আলিগিয়েরি বেশি বিখ্যাত নাকি তার অমর কীর্তি ‘ডিভাইন কমেডি’ বেশি বিখ্যাত?

বিখ্যাত যিনিই বেশি হোক না কেন, কৃতিত্ব তো লেখক আলিগিয়েরিরই!

আর এই মহান লেখকের জন্মে হয়েছিল ১২৬৫ সালের ১৫ জুন ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে। শহরটি এখনো টিকে আছে সগর্বে। বর্তমানে ফ্লোরেন্স ইতালির খুবই বিখ্যাত একটি শহর। ইউরোপে যে রেনেসাঁ বা সভ্যতার পুনর্জন্ম হয়েছিল তা প্রধানত এ ফ্লোরেন্সকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে সারা ইতালিতে। তারপর ধীরে ধীরো সমগ্র ইউরোপে। মূলত দান্তের হাত ধরেই ইতালির সাহিত্যভাণ্ডার সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

- বিজ্ঞাপন -

ইতালির মানচিত্রটি দেখতে বেশ মজার, অনেকটা পুলিশের বুটজুতোর মতো। দু’পাশ আর পায়ের নিচে সব সাগর, উপরটা ছুঁয়ে আছে আল্পস পর্বতমালা সংলগ্ন ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়া। আর এই বুটজুতোর ঠিক মধ্যখানে দান্তের জন্মস্থান ফ্লোরেন্স নগরী। অার্নো নদীর তীরে গড়ে ওঠা বেশ পুরনো শহর। সম্ভবত দান্তের কারণেই শহরটি পেয়েছে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি।

দান্তের জন্ম এই মার্তিনো দেল ভেস্কোভোতেই। যে ঘরে তিনি জন্মলাভ করেছিলেন সেটি এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। তার পিতার নাম ছিল আলিয়াগিয়েরো, আর মাতার নাম ছিল বেল্লা। পিতামহের নাম ছিল বেল্লিনচোন, আর মাতামহের নাম ছিল দুরান্তে।

অনেক গবেষকের ধারণা, মাতামহ দুরান্তের নাম অনুসারেই দান্তে আলিগিয়েরির নামের একাংশ ‘দান্তে’ অংশটি চয়ন করা হয়েছিল। অপর অংশটি চয়ন করা হয়েছিল পিতা আলিয়াগিয়েরোর নামানুসারে। যদি এই অনুমান সঠিক হিসাবে ধরে নেয়া হয় তবে দান্তের নামের মধ্যে তার বাবা ও নানার নামের সুরভী মিশে আছে।

দান্তের বাবা দুটি বিয়ে করেছিলেন, তার প্রথম পক্ষের একমাত্র সন্তান ছিলেন মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরি। তিনি যখন মাত্র ছয় বছরের বালক তখন তার মা মারা যান। তারপর থেকে সৎ মা লাপার কাছে তিনি লালিত হন। আঠারো বছর বয়সে তার বাবা আলিয়াগিয়েরো মারা যান। দান্তের সৎ ভাই ছিলেন একজন, নাম ফ্রাঞ্চেস্কো। আর সৎ বোন ছিলেন দুজন। এক বোনের নাম গাইতানা, যদিও তার ডাকনাম ছিল তানা। আর অন্য বোনের নাম সঠিকভাবে জানা যায় না, তবে তিনি লেওন পোজ্জি নামে এক ভদ্রলোকের স্ত্রী ছিলেন। এদেরই ছেলে আন্দ্রেয়া দেখতে অবিকল তার মামা দান্তের মতো ছিলেন।

বংশপরম্পরা বিবেচনায় ফ্লোরেন্সে দান্তের পরিবার ছিল বেশ পুরনো। তবে আগে থেকেই তাদের পরিবারটি অভিজাত বা সম্ভ্রান্ত বলে গণ্য হতো কিনা তাতে কিছুটা সন্দেহ থেকে যায়। এমনও হতে পারে যে, প্রপিতামহ কাচ্চাগুইদা যখন থেকে খেতাব পেলেন, তখন থেকে তার পরিবার অভিজাত হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

- বিজ্ঞাপন -

তাছাড়া এই অভিজাত ভাব দান্তের সময়ে এসে ফের কমে গিয়েছিল, অর্থাৎ তার সময়ে তাদের পরিবারের অবস্থা হয়ে পড়েছিল ‘গরীব অথচ অভিজাত’ বংশের মতো। দান্তের পরিবারের এই সামাজিক অবস্থাটা আমাদের একটু খেয়াল রাখা দরকার, কারণ দান্তের জন্মের সময়ে ফ্লোরেন্সের অবস্থার সঙ্গে তার সুদূরপ্রসারীদের একটা সম্পর্ক রয়েছে।

ফ্লোরেন্স সে সময়ে ইতালির একটি শহর হলেও কার্যত এটি ছিল একটি স্বাধীন দেশের মতোই ক্ষমতাধর। মধ্যযুগে ইউরোপের অন্যান্য শহরগুলোও স্বাধীন দেশের মতোই ক্ষমতাধর ছিল। এখন যেমন এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের শত্রুতার বা মৈত্রীর সম্পর্ক থাকে, সে সময়ে তেমনি একই দেশের ভিতরে এক শহরের সঙ্গে অন্য শহরের বন্ধুত্ব বা শত্রুতার সম্পর্ক থাকতো।

পাশাপাশি শহরের শাসনভার নিয়ে বিভিন্ন ধনী ও অভিজাত পরিবারের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো। যা-ই হোক, দান্তের জন্মের সময়ে ফ্লোরেন্সের লোকজন প্রধানত দুটো দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। কেউ গুয়েলফো পার্টি করতো আর কেউ গিবেল্লিনো পার্টি। অর্থাৎ দুটো প্রধান রাজনৈতিক দলে শহরটি জনগণ ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগীতা আর ক্ষমতার লড়াই লেগেই থাকতো।

- বিজ্ঞাপন -

সাধারণত গুয়েলফো পার্টিতে যেত গরীব অথচ অভিজাত এমন পরিবারের লোকজন। আর গিবেল্লিনো পার্টিতে যেত ধনাঢ্য, জমিদার ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদী লোকজন। স্বভাবতই দান্তে যোগ দিয়েছিল গুয়েলফো পার্টিতে। ফলে তিনি সারা জীবন গিবেল্লিনো দলের সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গিয়েছেন।

তখন শুধু ফ্লোরেন্স নয়, ইতালির অন্যান্য শহরও ভাগ হয়ে গিয়েছিল এ দুটো দলে। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। গুয়েলফো পার্টির ভিতরেও ছিল দুটি ভাগ- শ্বেত গুয়েলফো ও কৃষ্ণ গুয়েলফো। দান্তে ছিলেন শ্বেত গুয়েলফো। আর এই রাজনীতিই কাল হয়ে দাঁড়ালো তার জন্য।

দান্তে যখন কবিতা লেখা শুরু করলেন তখন প্রধানত প্রেমের কবিতাই লিখতেন। তার প্রথম কবিতার বই ‘লা ভিতা নুওভা’ যেটি অনেকটা তার স্মৃতিচারণামূলক কাব্য। একত্রিশটি কবিতার সংকলন। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১২৯২ বা ১২৯৩ সালের দিকে। তার এই প্রথম বইটিই প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়।

আর তার সর্বশেষ জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’। এটির মূল নাম ছিল ‘লা কোম্মেদিয়া’। বইটি মূলত লেখা হয়েছিল ফ্লোরেন্সের স্থানীয় ভেনেশিয়ান ভাষায়। বইটি তিন খন্ডে বিভক্ত। এতে তৎকালীন চার্চের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সমসাময়িক রাজনীতির ব্যাঙ্গাত্মক রূপ তুলে ধরা হয়েছে।

কাব্যরচনায় তার গুরু ছিলেন কবি গুইদো গুইনেৎসেল্লি। আর তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছিলেন আরেক কবি গুইদো কাভালকান্তি। কাভালকান্তিকেই তিনি তার প্রথম গ্রন্থ ‘লা ভিতা নুওভা’ উৎসর্গ করেছিলেন। এছাড়াও তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইল কনভিভিও, দে ভুলগারি এলোকুয়েন্তিয়া, দে মনার্কিয়া, অন মোনার্কি ইকলোইউজে, রিমি, অপেরি, দ্য পোর্টেব্‌ল দান্তে, দান্তে’স লিরিক পোয়েট্রি ইত্যাদি।

ডিভাইন কমেডিকে ইতালিয়ানরা তাদের ভাষায় বলে, দ্য দিভাইনা কোম্মেদিয়া। এই মহাকাব্যটি মহাকবি দান্তে আলিঘিয়েরি রচনা শুরু করেন ১৩০৮ সালে এবং শেষ করেন ১৩২০ সালে তার মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে। অর্থাৎ এই মহাকাব্যটি রচনার জন্য লেগে যায় প্রায় ১২টি বছর।

তিনি মারা যান ১৩২১ সালে। এর ভাষা মূলত লাতিন। এটি একেবারে ইতালির প্রাচীন ভাষায় রচিত। শুধু তাই নয়, দান্তে এই মহাকাব্যে প্রচুর পরিমাণে ইতালির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেরও স্থানীয় প্রচুর শব্দ ব্যবহার করেছেন। যে কারণে ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পাঠকের কাছে এটি বেশ দুরূহ বলে মনে হয়।

কবি দান্তে শুধু কাব্যচিন্তা ও কবিতা রচনাতেই মগ্ন ছিলেন না। তিনি একজন বিশিষ্ট নাগরিকও হয়ে উঠেছিলেন। নগর শাসন পরিষদে নির্বাচনের জন্য যেসব বিজ্ঞ ব্যক্তিকে ডাকা হত তিনি তাদের মধ্যে একজন ছিলেন। ধারণা করা হয়, পৌরসভার পরিচালকমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন তিনি। এমনকি রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করেছিলেন একবার। রাজনীতিতে তিনি প্রবেশ করেছিলেন তিরিশ বছর বয়সে।

তখনকার রাজনৈতিক সময়টা খুব একটা ভালো ছিল না ফ্লোরেন্সের জন্য। নানা ধরনের রাজনৈতিক অরাজকতা এবং সামাজিক অস্থিরতা চলছিল শহরজুড়ে। বিশেষ করে রোমের পোপ আর ফ্লোরেন্স নগরবাসীদের ভেতর ক্ষমতার লড়াই নিয়ে পরিবেশ বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। দান্তে ছিলেন পোপের অন্যায় কাজকর্মের একজন কড়া সমালোচক। এমতাবস্থায় দান্তের সাথে পোপের এক ধরনের সমঝোতার জন্য সবাই দান্তেকে রোমে পাঠায়। এদিকে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দান্তের চোখের আড়ালে ফ্লোরেন্সের ক্ষমতার রদবদল ঘটে যায়। ঘটনাটি ঘটে মূলত পোপের গোপন ইশারায়।

ইতিমধ্যে রাজনীতির নানা হিসাব নিকেশের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ গুয়েলফো পার্টি শ্বেত গুয়েলফো পার্টির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এমন ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে নানা অজুহাত দেখিয়ে দান্তেকে রোমে আটক করে রাখে পোপ। ওদিকে ফ্লোরেন্সে তার বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। ঘটনা সেখানেই শেষ নয়। উল্টো উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হয়। দান্তের অনুপস্থিতিতেই তার অজ্ঞাতসারে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে বিচার করা হয় এবং রায়ও দিয়ে দেওয়া হয়। রায়ে শাস্তি ধার্য হয়, তাকে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন জরিমানা দিতে হবে ও আগামী দুই বছর ফ্লোরেন্স শহরে তিনি ঢুকতে পারবেন না, অর্থাৎ দুই বছরের নির্বাসন দণ্ড এবং বাকি জীবনে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবেন না। ১৩০২ সালের ২৭ জানুয়ারি দান্তের বিরুদ্ধে এই রায় দেওয়া হয়।

কিন্তু দান্তে এই বিচার বা রায় কোনোটাই মেনে নেননি। ফলে ক্ষমাপ্রার্থনা কিংবা জরিমানা দেওয়া- এসবের কিছুই করেননি তিনি। ফলে দুই মাস পর তথা ১০ মার্চ পুনরায় রায় দেওয়া হয় যে, দুই বছর নয়, আর কোনোদিনই দান্তে ফ্লোরেন্সে ফিরতে পারবেন না, অর্থাৎ আজীবন নির্বাসন। তবুও যদি ফেরার চেষ্টা করেন তাহলে শহরের সীমানায় ঢুকতেই তাকে ধরা হবে এবং জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। এর পরের বছর এই রায়ের সঙ্গে আরও যুক্ত করা হয় তার ছেলেদের বয়স যখন চৌদ্দ বছর হবে তখন তারাও শহর থেকে নির্বাসিত হবে।

এভাবেই দান্তের ভাগ্যে নেমে আসলো অন্ধকার, যদিও এর বারো বছর পর ১৩১৫ সালে তার কাছে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়া হয় যে, যদি তিনি অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা ভিক্ষা করলে তাহলে তার জন্য শহরে ফেরার ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু এর জবাবে দান্তে চমৎকার একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন,

“প্রায় পনের বছর নির্বাসন সইবার পর দান্তে আলিগিয়েরিকে তার জন্মভূমিকে ফিরিয়ে নেবার জন্য এটা কি কোনো একটা উদার আহ্বান হলো? যে লোক সবসময়ে ন্যায়ের জন্য লড়াই করলো আর যার ওপর কেবলই অন্যায় করা হচ্ছে, এটাই কি তার প্রাপ্য? যারা অন্যায় করেছে তাদেরকেই ফের টাকা দিতে হবে? না, এভাবে আমি আমার নিজের দেশে ফিরতে চাই না।

এ ছাড়া ফিরবার যদি কোনো পথ না থাকে তো আমি ফ্লোরেন্সে ফিরবো না। তাতে কী! যেখানেই থাকি না কেন আমার চোখে কি সূর্য-তারার আলো থাকবে না? এই আকাশের নিচে যেকোনো মাটিতে আমি কি সত্যের ধ্যান করতে পারব না? তবে? তা হলে কিসের জন্য ফ্লোরেন্স আর ফ্লোরেন্সবাসীর কাছে মানসম্মান-খ্যাতি সব বিসর্জন দিয়ে আমার দেশে ফিরতে হবে? রুটির অভাব কোথাও ঘটবে বলে আমার মনে হয় না।”

দান্তের এমন সিদ্ধান্তের ফলে পূর্বের ঘোষণা অনুসারে তার সন্তানদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে। শুধু রায় নয়, বলা হলো দান্তে যেহেতু দেশে নেই সেজন্য কালবিলম্ব না করে ছেলে দুটির গর্দান নেওয়া হোক। কিন্তু তার সন্তানদের সৌভাগ্য বলতে হবে যে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা পালিয়ে বাবার কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

চির নির্বাসন থেকে দান্তে আর কখনোই তার জন্মশহর ফ্লোরেন্সে ফিরে যেতে পারেননি। বিশ বছরের নির্বাসিত জীবন তাকে কাটাতে হয়েছিল বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে। ত্রেভিজো, লুচ্চা, পাদুয়া, ভেরোনো, রাভেন্না, তাসকানি, ভেনিস, মিলান প্রভৃতি জায়গায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময়ে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ তাকে করতে হয়েছে- ছাত্র পড়ানো, অলঙ্কারশাস্ত্র সম্পর্কে বক্তৃতা দেওয়া, দানশীল ধনাঢ্য জমিদারদের মজলিস অলঙ্কৃত করা ইত্যাদি।

দান্তে কখনো বিত্তশালী হতে পারেননি, তবে এত দুঃখকষ্টের মধ্যেও তিনি তার নিজের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করে গেছেন। কখনো বিশুদ্ধ কবিতায়, কখনো গুরুগম্ভীর প্রবন্ধে। লিখেছেন প্রেম, দর্শন, সাহিত্য, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি বিষয়ে।

‘লা কোম্মেদিয়া’ বা ‘ডিভাইন কমেডি’ রচনার পর তিনি খুব বেশি দিন বাঁচেননি। ১৩২০ সালে তাকে ভেরোনা শহরে যেতে হয়েছিল পদার্থবিদ্যার ওপর একটি বক্তৃতা প্রদানের জন্য। ভেরোনা থেকে রাভেন্নায় তিনি ফিরেছিলেন। শেষ দুই বছর তিনি রাভেন্নাতেই ছিলেন। রাভেন্নাতেই তার মৃত্যু হয়। ১৩২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মারা যাওয়ার পর ফ্লোরেন্সের অধিবাসীরা ক্রমে ক্রমে বুঝতে পেরেছিল কাকে তারা অনাদরে ও অবহেলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। গভীর অনুশোচনায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা রাভেন্না শহরের কাছে আবেদন জানায়- মহাকবি দান্তের পবিত্র কবর তাদের ফেরৎ দেওয়ার জন্য, তারা নিজেদের সন্তানকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে সমাহিত করবে। কিন্তু তাদের আবেদন রাভেন্না কখনই গ্রাহ্য করেনি। দান্তে এখনো শুয়ে আছেন দুঃখ দিনের আশ্রয়স্থল রাভেন্নায়। দান্তে চলে গেলেও এখনো স্বমহিমায় জীবন্ত তার সাহিত্যভাণ্ডার, বিশেষত তার অমর কীর্তি ‘ডিভাইন কমেডি’।

247183746 104331858710113 4866451883828970281 n 'দ্য ডিভাইন কমেডি' - মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরি
ছবি সংগৃহীত।

মূল কাহিনী:

দান্তের মহাকাব্য দ্য ডিভাইন কমেডির কাব্য শুরুই হয়েছে গুড ফ্রাইডের আগের রাতের বেলার একটি বিবরণ দিয়ে। দান্তের বয়স তখন মাত্র ৩৫ বছর (১৩০০ সাল)। এটিকে বাইবেলের মতো জীবনের মধ্য ভাগ বলা হয়, দান্তে সেই বিশ্বাস নিয়েই এই কাহিনী নির্মাণে ব্রত হন।

তিনি ডিভাইন কমেডিকে সাজিয়েছেন খ্রিষ্টধর্মের অবতার প্রভু যিশু খ্রিষ্টের কথা দিয়ে, নানা বাণী দিয়ে। মূলত ডিভাইন কমেডির কাহিনীকে, বাইবেলে উল্লিখিত পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাসের আদম-হওয়ার গল্পের ছায়া অবলম্বনেই বানানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। মানুষের পাপের কথা টেনেছেন ঠিক পবিত্র বাইবেলের মতো কোরেই বারবার।

মহাকাব্যের চাহিদা অনুসারে সাহিত্যের ধ্রুপদী বিষয়গুলো ব্যবহার না করে, আরো বেশি করে তৈরি করা হয়েছে খ্রিষ্টধর্মের নানা কাহিনী এবং ভালো দিকগুলোর মনোমুগ্ধকর বর্ণনা। শুধু তাই নয়, দান্তে স্বর্গ এবং নরকের নানা বর্ণনায় যেমন ইসলামিক বইপত্রের ওপর নির্ভর করেছেন, তেমন একেবারে সরাসরি বাইবেলে বর্ণিত স্বর্গ এবং নরকের বর্ণনা এনেছেন প্রতি পদে পদে।

পাশপাশি তৎকালীন নানা ধরনের ঘটে যাওয়া অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বিষয়গুলোও এনেছেন তার দ্য ডিভাইন কমেডিতে।

যিশুখ্রিষ্ট, বাইবেল এবং ঈশ্বরের ওপর তার ছিল প্রবল বিশ্বাস। তাই তার রচিত মহাকাব্য দ্য ডিভাইন কমেডিতে সেগুলোই চলে এসেছে বারবার।

দান্তে গির্জার বেশ কজন বড় বড় সেইন্টদের সঙ্গে দেখা করেন, এদের মধ্যে থমাস একুইনাস, বোনাভেনচার, সেইন্ট পিটার এবং সেইন্ট জনের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা যায়। যে কারণে দান্তের প্যারাদিসো পর্বটি ইনফার্নো বা পুরগেটোরিও পর্বের চেয়ে বেশি জীবন্ত ও শিল্পসম্মত বলে ধরে নেয়া যায়। দান্তে তার ডিভাইন কমেডি শেষ করেছেন যিশুখ্রিষ্টের পবিত্রতার কথা বলে। তিনি জয়গান গেয়েছেন যিশুর পবিত্র জন্মের। তার মানবতার এবং যিশুতেই তার সব ভালোবাসা এবং নশ্বর জীবনকে সঁপে দেয়ার কথাও বলেছেন তিনি বারবার।

এই মহাকাব্য যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, এতে নরকের বর্ণনা কতটা ভয়াবহ অথচ শৈল্পিকভাবে দেওয়া হয়েছে। ডিভাইন কমেডি আসলে একটি রূপক কাহিনী।

হৃদয়ের আবেগ, নিখুঁত বর্ণনা, দার্শনিক-চিন্তা এবং ইতিহাস ও পুরাণের অসামান্য সুন্দর মিশ্রণের জন্যই এটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্যগুলোর একটি রূপে কালজয়ী হয়ে বিরাজ করছে। বিশ্বসাহিত্যে দান্তে অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন তাঁর এ মহাকাব্যের জন্যই।

মহাকাব্যটি লেখেন তিনি স্থানীয় ভেনেশিয়ান কথ্যভাষায়। একে ইতালীয় সাহিত্যের অসাধারণ কাজ এবং বিশ্বসাহিত্যগুলোর একটি বিরাট সফলতম সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। মধ্যযুগে পাশ্চাত্য গির্জাগুলোয় কিভাবে জীবনযাত্রা বিকশিত হয়েছিল, তা দান্তের এই কাব্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

১৪২৩৩ লাইনের এই মহাকাব্য তিন ভাগে বিভক্ত: ইনফেরনো, পুরগাতোরিও এবং পারাদিসো। এগুলোর প্রতিটি আবার ৩৩টি ভাগে বিভক্ত। দান্তে তাঁর এই মহাকাব্যে একটি পরলোক যাত্রার কথা বর্ণনা করেন, যা এই তিন রাজ্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। তাঁর কল্পনাত্মক এবং রূপকাত্মকতা মধ্যযুগের খ্রিস্টানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা মৃত্যুর পরের জীবন, যা ক্যাথলিক গির্জাগুলোর মাধ্যমে বিকশিত হয়েছিল।

এই মহাকাব্যের অন্যতম চরিত্র বিয়াত্রিচে। পৃথিবীতে ভালোবাসার যেসব বাস্তব কাহিনী রয়েছে, তার মধ্যে দান্তের জীবনের কাহিনীটি যেমন মধুর, তেমনি বিস্ময়কর। তাঁর বয়স যখন ৯ বছর, তখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয় বিয়াত্রিচে নামের একটি মেয়ের। মেয়েটির বয়সও ৯ বছর। প্রথম দেখার সময় দুজনের মধ্যে কোনো কথা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে সারা জীবনে দু-তিনবারের বেশি দুজনের দেখাও হয়নি। কিন্তু দান্তে জানিয়েছেন, প্রথম দেখার দিনই তিনি বিয়াত্রিচের প্রেমে পড়েন এবং এই প্রেম তাঁর সমগ্র জীবনকে নিয়ন্ত্রিত ও মহান করেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, দান্তের এই একনিষ্ঠ ভালোবাসার কথা কখনো জানতে পারেননি বিয়াত্রিচে। একসময় দান্তে ও বিয়াত্রিচে দুজনেরই বিয়ে হয়ে যায় ভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ১২৯০ সালে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে বিয়াত্রিচে মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর পরও দান্তে তাঁকে কখনো ভুলতে পারেননি। ২০ বছর বয়সের সময় থেকে তিনি বিয়াত্রিচের উদ্দেশে কবিতা লিখতে শুরু করেন। ‘ডিভাইন কমেডি’র মধ্যেও বিয়াত্রিচের প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে।

১৯১৯ সালে, মিগুয়েল আসিন প্যালাসিওস নামক একজন স্পেনীয় দান্তে গবেষক এবং খ্রিষ্টিয়ান ধর্মযাজক তার লা এস্কাতোলোজিয়া মুসুলমানা এন লা ডিভাইন কমেডিয়া গ্রন্থে লিখেছেন “দান্তের এই ডিভাইন কমেডি গ্রন্থটিতে, কেন জানি না, নানা ধরনের মহামূল্যবান সব ইসলামী দর্শনের কথা, অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তার রচনার ছত্রে ছত্রে।

প্যালাসিয়াস আরো লিখেছেন যে, দান্তের ডিভাইন কমেডিতে উল্লিখিত মৃত্যুর পরের জীবনের আধ্যাত্মিক ধারণার সবটুকু তিনি গ্রহণ করেছেন, ইবনে আরাবিয়া এবং ইসরা ও মহানবীর মিরাজে গমন, অর্থাৎ মহানবীর স্বর্গে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করার সেই যাত্রা থেকে।

এর পর পরেই তিনি লিখেছেন, যদিও দান্তে হাদিস এবং কিতাব আল মিরাজ (লাইবার স্কেলাই ম্যাখোমিটি যে গ্রন্থটি ১২৬৪ সালে একটু সংক্ষিপ্ত আকারেই বলা যায় প্রকাশিত হয়েছিল ল্যাটিন ভাষায়, যার ইংরেজি নাম হচ্ছে দ্য বুক অব মুহাম্মদ’স ল্যাডার) সেখান থেকেও অনেক ধারণা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু সেগুলো হাদিসের মতো সুন্দর করে তিনি লিখতে পারেননি। বিশেষ করে দান্তের ডিভাইন কমেডির প্যারাদিসো অর্থাৎ প্যারাডাইস পর্বের সপ্তম খণ্ডটি পাঠ করলে, তা বেশ ভালো করেই বোঝা যায়।

দান্তের ডিভাইন কমেডি’তে বেশ কিছু বিষয় আছে, যেগুলো সরাসরি অতি মানবিক বা দৈবিক ঘটনার বলে ধরে নেয়া যায়। যেমন আল-মারি’র লিখিত গ্রন্থ রিসালাত আল গুফরান এর ক্ষমা বিষয়ক রচনার কথা বলা যায়। দান্তে তার থেকে অসাবধানতার ছলেই হোক, আর সচেতনভাবেই হোক, ক্ষমার বিষয়টি গ্রহণ করেছেন এবং তার ডিভাইন কমেডির সাথে হুবহু মিলও রয়েছে।

বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বর্গ ও নরক সম্পর্কে যে সব কথা দান্তে তার ডিভাইন কমেডিতে বলেছেন, তার সবটুকুই কিতাব আর মিরাজ নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া। ডিভাইন কমেডি’তে অবশ্য স্বর্গ নরকের এই বর্ণনা অল্প পরিমাণ আছে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে এই সব গ্রন্থ থেকেই নেয়া।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে দান্তে ইসলামিক দর্শনের এসব গ্রন্থ পেলেন কিভাবে বা কেনই বা এর প্রতি এত অনুরক্ত হয়ে উঠেছিলেন? এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায় যে, দান্তে ইওরোপে বসবাসকালে ইসলামিক জীবন এবং নানা ধরনের দর্শনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন। তাই তার ছাপ এসে পড়ে তার রচনায়।

মহাকবি দান্তে তার প্যারাদিসোর দশম পর্ব রচনাকালে দার্শনিক অ্যারিস্টটল সম্পর্কে আরবী ভাষায় লিখিত, আরবীয় পণ্ডিতদের মতামত পড়েন এবং প্রভাবিত হন হাদিস কুরআন দ্বারা। এর সাথে অবশ্য প্রাচীন খ্রিষ্টতত্ত্বের যথেষ্ট মিল রয়েছে। যেখানে আধুনিক সুফি তত্ত্বের কথা উঠে এসেছে। যেমন: ইবন আরাবিয়া, তৎকালীন আরবীয় একজন বিজ্ঞ সুফি। তার বর্ণিত মুসলিম দর্শনে দান্তে প্রভাবিত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।

দান্তেকে আরবীয় সুফি পণ্ডিতরা ইসলামী দর্শনের উপযুক্ত ব্যবহারের অত্যন্ত সম্মানের সাথে যে স্বীকারোক্তি দান করেছেন, জগৎবিখ্যাত দার্শনিক ফ্রেডরিক কোপেলস্টোন ১৯৫০ সালে বলেছেন, তা যথাযথ যুক্তি সঙ্গত। যদিও এই ইতিহাস সর্ব্বৈব সত্য, কিন্তু কিছু কিছু দুর্জন তার নানা ধরনের ব্যাখ্যা তুললেন। তাদের প্রশ্ন হলো, দান্তে আরবি বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ভাষাই জানতেন না। আবার যে বইগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো সবই আরবি ভাষায় লিখিত। তো তিনি পড়ে বুঝলেন কিভাবে? তিনি তো আরবি জানতেন না।

তবে দান্তে গবেষক গাব্রিয়েলির মতে, এমনও হতে পারে যে, দান্তে শুধুমাত্র ইলামিক দর্শন বোঝার জন্যেই লাতিন ভাষায় অনূদিত এই বইগুলো পড়েছিলেন! এবং পড়েছিলেন বলেই তিনি তার ডিভাইন কমেডি’তে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন বেশ সার্থকভাবে। তার প্রমানও মেলে দান্তের জীবন থেকেই।

দান্তে যখন দশম আলফানসোর সভায় সভাসদ ছিলেন, তখন তার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল একজন তুসকান দর্শন শাস্ত্র বেত্তার। তার নাম ছিল মারিয়া কোর্তি, তিনি কিতাব আল মিরাজকে আরবি থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।

কোর্তিও ঠিক এই কথাটাই বলেছেন, দান্তে সেই বই থেকেই মূলত, মুসলিম সুফি বাদের সব কিছু গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে রেনে গুইনোন একজন পণ্ডিত আবার সে কথাকে অস্বীকার করেছেন। তবে এটা সত্য যে, দান্তে তার লেখায় প্রচুর পরিমাণে ইসলামিক দর্শন এবং হাদিস ও কুরআনের নানা কাহিনী ব্যবহার করেছেন। এ কথা এখন বিশ্বব্যাপী সব পণ্ডিতরাই মেনে নেন।

মহাকবি দান্তের জন্ম ১২৬৫ সালে, রিপাবলিক অব ফ্লোরেন্সের খোদ ফ্লোরেন্স শহরে। মারা যান ১৩ বা ১৪ সেপ্টেম্বর ১৩২১ সালে প্যাপাল অঙ্গরাজ্যের র্যাভেন্নায় মাত্র ৫৬ বছর বয়সে।

তিনি ছিলেন একাধারে কবি, রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিক এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টাও বটে। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি ইতালিয়ান। তিনি ইতালির সাহিত্যের মধ্যযুগের কবি ছিলেন। তিনি ইতালির বিখ্যাত সাহিত্য আন্দোলন দোলসি স্তিল নোভোর প্রবক্তা। অসম্ভব জেদি এবং একরোখা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন।

বিশ্বসাহিত্যে তার অমর সৃষ্টি দ্য ডিভাইন কমেডি। যে লেখা লিখে তিনি আজ সারা বিশ্বে মহাকবি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। এই মহাকাব্যে বিয়াত্রিচের প্রসঙ্গ থাকলেও এর বিষয়বস্তু কিন্তু প্রেম নয়। এখানে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কবির গভীর দার্শনিক-চিন্তার অত্যন্ত সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে।

কাহিনীটি এ রকম যে এক বনের মধ্যে দান্তের দেখা হয় প্রাচীন খ্রিস্টপূর্ব যুগের মহাকবি ভার্জিলের সঙ্গে। স্বর্গে অবস্থানরতা বিয়াত্রিচে ওই সময় ভার্জিলকে সেখানে পাঠিয়েছেন, ভার্জিল যেন দান্তেকে মৃত্যু-পরবর্তী ভুবনে পথ দেখিয়ে স্বর্গে নিয়ে আসেন। ওই ভ্রমণের নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথাই দান্তে এই মহাকাব্যে বর্ণনা করেছেন।

এর মধ্যে স্বর্গ, নরক ও পার্গেটরির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। যেসব আত্মা শেষ পর্যন্ত ত্রাণ লাভ করে স্বর্গে যাবে, পার্গেটরি বা প্রেতভূমিতে নানা কষ্ট ও পীড়নের মধ্য দিয়ে তাদের পাপ ধুয়ে-মুছে তাদের পবিত্র ও শুদ্ধ করে তোলা হয়। ভার্জিল দান্তেকে প্রথমে নরক, তারপর পার্গেটরি এবং সব শেষে স্বর্গের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন।

ইতালির সাহিত্যের মধ্যযুগের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উঁচু মানের মহাকবি ছিলেন দান্তে আলিঘিয়েরি। যার সমতুল্য লেখক বা কবি বোধ করি আজো ইতালির সাহিত্য জগতে আসেননি।

তাকে রেনেসাঁর পূর্ব সময়ের কবিও বলা হয়। তার রচিত মহাকাব্য ডিভাইন কমেডি ইতালির সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যের সম্পদ বলে বিবেচনা করা হয়। মধ্যযুগের পরবর্তী ইতালীয় সাহিত্যে, বেশির ভাগ কাব্যই রচিত হয় লাতিন ভাষায়। যেগুলো কেবল শিক্ষিত সম্প্রদায়ের পাঠকদের জন্যই রচিত হত। তবু দান্তে কিন্তু দেশীয় ভাষা ব্যবহারে ছিলেন তৎপর। এমনকি তিনি সাহিত্যে দেশীয় শব্দ ব্যবহারের পক্ষে কথাও বলেছেন।

246816719 104331738710125 7370238429927023110 n 'দ্য ডিভাইন কমেডি' - মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরি
ছবি সংগৃহীত।

দান্তেকে এক কথায় ইতালিয়ান ভাষার জনক বলা হয়। শুধু তাই নয়, তাকে পশ্চিমা সভ্যতার একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক বলে বিবেচনা করা হয়। ইতালীতে তাকে প্রায়ই ‘ইল সোমো পোয়েতো’ অর্থাৎ মহান কবি বল হয়। ‘ইল পেয়েতো’ অর্থাৎ মহান কবি। তাই পের্টাক এবং বোকাচ্চিও, এই তিনজনকে একত্রে ‘তিনটি ঝর্ণা বা তিনটি মুকুট’ বলা হয়।

বর্তমানে যে এলাকাটি রিপাবলিক অব ফ্লোরেন্স হিসেবে পরিচিত, তার পূর্ব নাম হচ্ছে- ফ্লোরেন্স, মহাকবি দান্তে, এই শহরেই জন্মেছিলেন।

মহাকবি দান্তের মায়ের নাম ছিল বেল্লা। সম্ভবত তিনি ইতালির বিখ্যাত বংশ আবাতি পরিবারের বংশধর ছিলেন। দান্তের যখন মাত্র দশ বছর বয়স তখনই তার মা মারা যান এবং তার পিতা আলিঘিয়েরি অল্পদিনের মধ্যে পুনরায় লাপা দি সিয়ারিসিয়ানো সিয়াউ লুফফি নামক এক মহিলাকে বিবাহ করেন।

দান্তের যখন মাত্র দশ বছর বয়স তখনই তার মা মারা যান এবং তার পিতা আলিঘিয়েরি অল্পদিনের মধ্যে পুনরায় লাপা ডি সিয়ারিসিয়ানো সিয়াউ লুফফি নামক এক মহিলাকে বিবাহ করেন। অবশ্য তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন কি না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে দান্তের যে একজন সৎভাই ফ্রানসেসকো এবং সৎবোন টানা (গাইটানা) ছিল, এটা নিশ্চিত।

দান্তের যখন বারো বছর বয়স, তখন তিনি জেম্মা ডি মেনিট্টো ডোনি, নামের এক কন্যাকে বিবাহের জন্য প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মেনিট্টো ডোনাটি নামক এক সম্ভ্রান্ত মহিলার কন্যা, যিনি সেই আমলের ক্ষমতাধর ডোনাটি পরিবারের সদস্য ছিলেন। এখনকার দিনে এটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, সেই আমলে এই অল্প বয়সেই বিবাহের রেওয়াজ ছিল। তাই তিনি এই কাজটি করেছিলেন। অবশ্য তিনি রাজার একজন এশবজন আইনকে সামনে রেখেই তিনি এই কাজটি করেছিলেন।

কিন্তু কি কারণে তা জানা যায় না, দান্তে হঠাৎ করেই বিয়াত্রিসে পোর্টিনারি বা বাইসি নামক এক নারীর প্রেমে পড়ে গেলেন। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার এই নারীর সাথে যখন দান্তের প্রথম পরিচয় ঘটে তখন তার বয়স ছিল মাত্র নয়। জেম্মাকে বিবাহের ঠিক পরের বছরেই বিয়াট্রিসেকে নিয়ে তিনি বিবাদে পড়ে গেলেন।

এই কবি দান্তে তার বহু সনেটে বিয়াট্রিসের কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু কোথাও জেম্মার কথা তিনি বলেননি। দান্তের সঠিক বিবাহের দিন আজো জানা যায়নি। তবে সঠিক তথ্য হলো এই যে, তিনি ১৩০১ সালে যখন নির্বাসনে যান, তখন তার সাথে ছিল তিন সন্তান, যেমন পিয়েট্রো, জ্যাক্কো এবং অ্যান্টোনিও।

দান্তে ১২৮৯ সালে ১১ জুন তারিখে, একটি মল্লযুদ্ধে জয়লাভ করেন। এই মল্লযুদ্ধের জয়ই তার জীবনে এনে দেয় এক মস্ত বড় সুযোগ। তিনি স¤্রাটের নজরে পড়ে যান এবং ফ্লোরেন্টাইনের সংসদীয় বিষয়ে জনসংযোগ দায়িত্বে ন্যস্ত হন। যেখানে তিনি নগরের ব্যবসায় এবং শিল্পের দিকটি বেশি কোরে দেখতে শুরু করলেন।

এর ফলে পরবর্তী বছরেই, সমাজে, রাজপরিবারে, এমনকি রাজদরবারেও ক্ষমতার কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য, দান্তেকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা শুরু হয়ে গেল। আলোচনার বিষয় বস্তু হচ্ছে, দান্তেকে কোনো ক্ষমতার কোনো একটি জায়গায় বসিয়ে দেয় হোক।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, ১২৯৮ থেকে ১৩০০ শতাব্দীর মধ্যে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল, যে কারণে তার নির্বাচনে অংশ নেয়াটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জেম্মা এবং দান্তে পরিবারের বেশ কটি সন্তান ছিল। এদের মধ্যে জেকোপো, পিয়েত্রো, জিওভান্নি এবং আন্তোনিয়া প্রধান। যদিও ইতিহাসে আরো সন্তান-সন্তুতির সন্ধান মেলে, তবে তারা তার সঠিক সন্তান নয়।

এই অ্যান্টোনিয়াই এক সময়ে সন্ন্যাসিনী হয়ে যান, তখন তার নাম হয় সিস্টার বিয়েত্রিচ।

247297871 104331872043445 3296648789732847052 n 'দ্য ডিভাইন কমেডি' - মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরি
ছবি সংগৃহীত।

শিক্ষা ও কাব্য রচনার ইতিহাস:

দান্তের শিক্ষা জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে তিনি বাড়িতে বা তার বাড়ির কাছে ফ্লোরেন্সের কোনো গির্জায় কিছু দিন পড়ালেখা করেছিলেন, এটা সত্য। ইতিহাস অনুসারে জানা যায় যে, তিনি তুসকান কবিতার বেশ বড় ভক্ত পাঠক ছিলেন এবং তিনি সেই ধারাতে কবিতা লেখাও শুরু করেছিলেন। এই ধারায় কাব্য রচনা করতে করতে এক সময়ে দান্তে বিশালাকার কাব্য রচনায় অনুরাগী হয়ে উঠলেন। এক সময়ে তিনি পরিচিত হলেন মহাকবি ওভিদ, সিসেরো এবং বিশেষ কোরে মহাকবি ভার্জিলের তিনি ভক্ত হয়ে উঠলেন সাঙ্ঘাতিকভাবে।

দান্তে বলেছিলেন যে, তিনি ফলকো পোর্টিনারির কন্যা, বিয়েত্রিচ পোর্টিনারিকে প্রথম দেখেন, তার মাত্র নয় বছর বয়সে। তিনি তখনই দাবি করেছিলেন যে, দান্তে বিয়েত্রিচের প্রথম চোখাচোখিতেই তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সত্য কথা বলতে কি, দান্তে তার ১৮ বছর বয়সে বিয়েত্রিচকে একবার মাত্র পথের মধ্যে দেখে ছিলেন। কিন্তু তার সাথে কোনো ধরনের কথাও কোনোদিন সরাসরি হয়নি।

সত্য কথা বলতে কি, বিয়েত্রিচের সাথে দান্তের ভালোভাবে কোনো দিন দেখাও হয়নি। ফলে হলো কি যে, দান্তে হয়ে উঠলেন মামুলি ভালোবাসার বিরুদ্ধে একজন স্বার্থক প্রেমিকের উদাহরণ পুরুষ। তিনি তার প্রেমকে শৈল্পিক বলে দাবিও করতেন। তিনি ধীরে ধীরে তার সমকালীন সব কবি এবং লেখকদের সাথে একটি সম্পর্ক গড়তে শুরু করলেন।

বিয়েত্রিচের সাথে তার প্রেম শৈল্পিক ছিল বলে তিনি পরবর্তীকালে তার বহু কবিতায় বিয়েত্রিচের নাম উল্লেখ করেছেন। দান্তের কবিতায় বিয়েত্রিচ এসেছে নানা ভাবে। বিয়েত্রিচ ১২৯০ সালে যখন মৃত্যুবরণ করলেন, দান্তে তখন সাথে সাথে ল্যাটিন সাহিত্য থেকে যেন হঠাৎ করেই বিদায় নিলেন। তিনি নিজেকে সঁপে দিলেন ধর্ম দর্শন তত্ত্ব পাঠের দিকে। যে কারণে তিনি ভর্তি হলেন সান্তা মারিয়া নেভিল্লাতে।

নির্বাসন ও মৃত্যু :

১৩০১ সালের ১ নভেম্বর, ঠিক এই দিনে, ভেলোইসের চার্লস কালো গুয়েলফদের নিয়ে ফ্লোরেন্সে ঢুকে পড়লেন। যারা পরবর্তী ছয় দিনে জঘন্য ধরনের ধ্বংষ যজ্ঞ চালালো এবং তাদের শত্রুদেরকেও নির্বিচারে হত্যা করল। সঙ্গে সঙ্গে কালো গুয়েলফরা একটি নতুন সরকার গঠন কোরে ফেলল এবং কান্টে ডি গাব্বিওকে নগরের প্রধান বানানো হলো।

১৩০২ সালের মার্চে দান্তে সাদা গুয়েলফদের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে, সেরারডিনি পরিবারের সাথে দুই বছরের জন্য নির্বাসনে যাওয়ার শাস্তি পেলেন।

দান্তেকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো অবশ্য ভিন্ন এক কারনে। দান্তে নাকি ১৩০০ সালে মাত্র দুই মাসের জন্যে ফ্লোরেন্সের নগর প্রধান থাকার সময়ে, কালো গুয়েলফদের সাথে বেশ বৈরী আচরণ করেছিলেন। কালোদের ব্যয়ভারের টাকা নিয়ে তিনি সাদাদের পেছনে খরচ করেছিলেন। দান্তে কিন্তু তার এই প্রিয় শহরে পরবর্তী দুই বছর অর্থাৎ ১৩০২ সাল পর্যন্ত ছিলেন। যেখানে স্বয়ং পোপ সব সময়েই দান্তোর বিরোধিতা করতেন। পোপ সার্বক্ষণিকভাবে দান্তের পেছনে কালো গুয়েলফদের লাগিয়ে রেখেছিলেন।

ফ্লোরেন্স যখন পুরোপুরি কালো গুয়েলফদের নিয়ন্ত্রণে, তখন দান্তেকে তারা পলাতক একজন জঘন্য অপরাধী বলে ঘোষণা করল। এমনকি তার বিরুদ্ধে জরিমিানা স্বরূপ এক বিশাল অঙ্কের টাকাও ধার্য করা হলো, কিন্তু দান্তে নিজে অপরাধী নয় বলে, তিনি জরিমানার সেই টাকা দেননি। যার জন্য কালো গুয়েলফরা পরবর্তীকালে ফ্লোরেন্সে অবস্থিত দান্তের যাবতীয় সম্পত্তি সব, লুট করে নিয়েছিল।

বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে দান্তে ১৩০৮ থেকে ১৩১০ সালের মধ্যে, কোনো এক সময়ে প্যারিসেও বেড়াতে গিয়েছিলেন। আধুনিক দান্তে বিশারদদের ধারণা অবশ্য এটি। এই মতটি পাওয়া গেছে খোদ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির দান্তে বিশারদদের কাছ থেকেই।

দান্তে মারা গিয়েছিলেন ১৩২১ সালে। কিংবদন্তি রয়েছে যে তাঁর মৃত্যুর পর দেখা গেল ডিভাইন কমেডির পাণ্ডুলিপির শেষ অংশ কেউ যেন সরিয়ে নিয়েছে সেখান থেকে! ফলে তাঁর দুই ছেলে জ্যাকোপো ও পিয়েত্রে মাসের পর মাস তন্নতন্ন করে খুঁজে চললেন সেই হারানো পাণ্ডুলিপি। পিতার কাগজপত্র ঘেঁটে ঘেঁটে পিয়েত্রে আর জ্যাকোপো রীতিমতো হয়রান। শত চেষ্টা করেও পাণ্ডুলিপির শেষ অংশটুকু খুঁজে পেলেন না। অবশেষে সব আশা ছেড়ে দিয়ে অন্য কাজে মন দিলেন তাঁরা।

এভাবে কেটে গেল কিছুদিন। এক রাতে পিয়েত্রে স্বপ্নে দেখতে পেলেন তাঁর পিতাকে। সাদা পোশাক পরিহিত পিতা যেন নরম আলোতে ডুবে এসে দাঁড়ালেন পিয়েত্রের সামনে। পিয়েত্রে তখন পিতাকে জিজ্ঞেস করলেন ডিভাইন কমেডির শেষ অংশটুকুর কথা। বললেন, ‘পিতা! আপনি কি এ মহাকাব্য অসম্পূর্ণ রেখেই মারা গিয়েছিলেন, না অন্য কেউ তা চুরি করে নিয়ে গেছে?’ স্বপ্নের ভেতরই দান্তে তাঁর স্নেহময় পুত্রকে জানালেন, মৃত্যুর পর মূল্যবান এই মহাকাব্য বেহাত হয়ে যেতে পারে আশঙ্কা করে তিনি পাণ্ডুলিপির শেষাংশটুকু লুকিয়ে রেখেছেন পাশের ঘরের ভেন্টিলেটরের ভেতরে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে পিয়েত্রে রাতের স্বপ্নের কথা জানালেন সবাইকে। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না তাঁর কথা। যারা বিশ্বাস করল তারাও তেমন একটা প্রয়োজন মনে করল না পাণ্ডুলিপিটি আবার খুঁজে দেখার ব্যাপারে। পিয়েত্রে তখন তাঁর এক আইনজীবী বন্ধুকে নিয়ে খুলে ফেললেন পিতার নির্দেশিত সেই ভেন্টিলেটর। খুলে তো তিনি অবাক! দেখতে পেলেন, একটি মোটা কাপড়ে জড়ানো রয়েছে অনেক অগোছালো কাগজ এবং সেগুলো ডিভাইন কমেডির শেষাংশ ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

সেদিন যদি দান্তে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পিয়েত্রেকে পাণ্ডুলিপির জায়গাটি না দেখিয়ে দিতেন, তবে হয়তো চিরতরেই তা লুকানো থেকে যেত। তাতে ডিভাইন কমেডি পরিচিত হতো একটি অসফল ও অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি হিসেবে।

কবিতাটি তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে যথাঃ ইনফেরনো, পুরগাতোরিও এবং পারাদিসো। এগুলো প্রত্যেকটিকে আবার ৩৩টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। কবি এই কবিতায় একটি পরলোক যাত্রার কথা বর্ণনা করে যা এই তিন রাজ্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। তার কল্পনাত্মক এবং রূপকাত্মকতা মধ্যযুগের খ্রীষ্টানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা মৃত্যুর পরের জীবন যা ক্যাথলিক গির্জাগুলোর মাধ্যমে বিকশিত হয়েছিল।

ইনফেরনো (Inferno বা নরক) : দান্তে আলিগিয়েরির লেখা মহাকাব্য কবিতা ডিভাইন কমেডির প্রথম অংশ। এটি পুরগাতোরিও এবং পারাদিসোকে অনুসরণ করে। এখানে দান্তের ভিজিলিওর সাথে দেখা হয় এবং ইনফেরনো অতিক্রম করতে সাহায্য করে। ইনফেরনো বা নরক নয় স্তর বিশিষ্ট্য বৃত্ত দ্বারা গঠিত হয়েছে, যার এক একটি বৃত্ত এক এক ধরনের শাস্তি দেয়। আসলে, ডিভাইন কমেডি ঈশ্বরের প্রতি আত্মার যাত্রা প্রতিনিধিত্ব করে এবং ইনফেরনো গুনার স্তর ও তার শাস্তির ধরনের কথা বর্ণনা করা।

পুরগাতোরিও (Purgatory) : হল দান্তে আলিগিয়েরির লেখা মহাকাব্য কবিতা ডিভাইন কমেডির দ্বিতীয় অংশ। এখানে ইনফেরনো (নরক) থেকে আসা সমস্ত আত্মারা যন্ত্রণাভোগ করে। পুরগাতোরি সাগর দিয়ে পরিবেষ্টিত একটি সুউচ্চ পর্বত। এখানে দান্তে এবং ভিরজিলিও ইনফেরনোথেকে একটি দীর্ঘ পাতাল বারান্দার মাধ্যমে পুরগাতোরি পৌছায়, যেটি লূসিফেরের পায়ের থেকে শুরু হয়। আর সমস্ত আত্মারা তাদের পাপ পূর্ণপ্রাশচিত্ত করে, পরে একটি নৌকা দ্বারা সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় পারাদিসোতে।

(ডিভাইন কমেডিয়ার চিত্রে দান্তে নরকে বেত্রিচের সাথে)

পারাদিসো (বাংলা: স্বর্গ) : দান্তে আলিগিয়েরির লেখা মহাকাব্য কবিতা ডিভাইন কমেডির তৃতীয় এবং শেষ অংশ ।

দান্তের উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহঃ

১। লা ভিতা নুওভা (LA VITA NUOVA), ১২৯৩ – The New Life
২। ইল কনভিভিও (IL CONVIVIO), ১৩০৭ – Dante’s Convivio
৩। দে ভুলগারি এলোকুয়েন্তিয়া (DE VULGARI ELOQUENTIA),৪। লা দিভিনা কোম্মেদিয়া LA DIVINA COMMEDIA,
৫। The Divine Comedy (হেনরি লংফেলো কর্তৃক অনূদিত)
৬। দে মনার্কিয়া DE MONARCHIA, ১৩১৩ – On Monarchy
৭। ইকলোগুয়েস, ECLOGUES, ১৩১৯
৮। কোয়েস্টিও ডি সিটু এ্যকুয়ি ইট টিরি QUAESTIO DE SITU AQUE ET TERRE, ১৩২০
৯। রিমি, (RIME), ১৯৪৩
১০। ওপিরি, (OPERE), ১৯৪৪
১১। দ্য পোর্টেব্‌ল দান্তে, ১৯৪৭ (পাওলো মিলানো সংস্করণ)
১২। লা ওপিরি ডি দ্যান্তে (LE OPERE DI DANTE), ১৯৬০
১৩। চিঠিপত্র, ১৯৬৬
১৪। দান্তে’স লিরিক পোয়েট্রি, ১৯৬৭ (২ খন্ড)

তবে একটি কথা এখানে না বললেই নয় যে, দান্তের জীবনে তিনি ভালো যা কিছু লিখেছেন, তার সবটাই হচ্ছে নির্বাসিত জীবনের সৃষ্টি। তিনি ওই সময়ে যেমন ছিলেন ফ্লোরেন্সোর স্থানীয় কুটিল ও জটিল রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত এবং বিকারগ্রস্ত, তেমন ছিলেন সাহিত্য চর্চায় মশগুল। অন্যদিকে দারিদ্র তখন তাকে কুরে কুরে খেয়েছে, যার শেষ নেই এমনভাবে। কিন্তু তিনি সেই সময়েই সৃষ্টি করেছেন তার সাহিত্যের সেরা সেরা সব রচনা।

সাহিত্য রচনার বাইরেও দান্তে মাঝে মাঝে রাজনীতি চর্চা এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৩০০ সালে সানজিমিগনানোতে এবং ১৩০২ সাল পর্যন্ত রোমে ইটালির রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।

ইতালিয়ান এই মহাকবি ১৩২১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করেন। তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

সূত্র:
১। দান্তে রচনাসমগ্র, অনুবাদঃ সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ, তুলি-কলম প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৭৭
২। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশ সাহিত্যিক, হায়াৎ মামুদ, সাহিত্য প্রকাশ, নভেম্বর ২০০৭

গুগল নিউজে সাময়িকীকে অনুসরণ করুন 👉 গুগল নিউজ গুগল নিউজ

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম ১৯৭৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। কে এম আবদুল করিম এবং মিসেস ফাতেমা করিমের জেষ্ঠ্য সন্তান তিনি। তিনি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিখ্যাত ওয়েষ্টমিনষ্টার ইউনিভারসিটি থেকে জি.ডি.এল ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি দেশে বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক ডিগ্রী সহ ট্রেনিং গ্রহন করেন। ছোটবেলা থেকেই রেজাউল করিম লেখালেখি ও গনমাধ্যমের সাথে জড়িত। ছাত্রজীবনে বরিশালের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক প্রবাসী দিয়ে সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি দেন। এর পরে ঢাকায় ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পযর্ন্ত মোহম্মদী নিউজ এজেন্সিতে তিনি কনিষ্ঠতম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ‘চ্যানেল আই’তে বিজনেস ফাইল এবং এটিএন বাংলায় অর্থনৈতিক পরিক্রমা নামে অনুষ্ঠান উপস্থপনা করতেন। এছাড়া দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক যায়যায় দিন প্রতিদিন ও জনকন্ঠ পত্রিকাও তিনি লেখালেখি করতেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমার দেশ (অন লাইন), দৈনিক দিনকাল সহ কয়েকটি অন লাইন মিডিয়ায় নিয়মিত কলাম লিখছেন এবং লন্ডনে কয়েকটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলে ‘টক শে’ তে অংশ নিচ্ছেন। সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এব্ং ডেমোক্রেসি সেন্টারের সাবেক সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে তিনি জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি আর্ন্তজাতিক সম্মেলন, বৈঠক ও আলোচনায় অংশগ্রহন করেন। যার মধ্যে ২০০০ সালে জার্মানির বার্লিনে আয়োজিত এসিসিয়েশন অব নিউজপেপারস ( ডব্লিউ.এ.এন) এবং এডিটরস এন্ড মার্কেটরস কনফারেন্স অন্যতম। এছাড়াও বিভিন্ন প্রোগ্রামে ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম রাশিয়ার মস্কো, ইটালির রোম, স্পেনের মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা, কানাডার টরেন্টো, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, ইটালির রোম, সিঙ্গাপুর, মালেয়শিয়ার কুয়ালালামপুর, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এবং যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গ সহ বিশ্বের বিভিন্ন শহর ভ্রমন করেছেন। বর্তমানে শিক্ষানুরাগী রেজাউল করিম তার নিজ গ্রাম সাতুরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন ‘ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ’ এবং ‘শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনষ্টিটিউট’। ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম এক কন্যা সন্তানের জনক। তার স্ত্রী সাদিয়া করিম লন্ডনের একটি বহুজাতিক কোম্পনীতে কর্মরত। একমাত্র মেয়ে রুকাইয়া করিম।
একটি মন্তব্য করুন

প্রবেশ করুন

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

আপনার অ্যাকাউন্টের ইমেইল বা ইউজারনেম লিখুন, আমরা আপনাকে পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার জন্য একটি লিঙ্ক পাঠাব।

আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার লিঙ্কটি অবৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

প্রবেশ করুন

Privacy Policy

Add to Collection

No Collections

Here you'll find all collections you've created before.

লেখা কপি করার অনুমতি নাই, লিংক শেয়ার করুন ইচ্ছে মতো!