শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

সমাজতত্ত্বের ভাবনায় ‛Sologamy’ বিবাহ ব্যবস্থার পর্যালোচনা

প্রকাশিত:

বিবাহ হল একটি প্রতিষ্ঠান। এটি একটি সর্বজনীন বিষয়। অর্থাৎ পৃথিবীর যেখানে যেখানে পরিবার নামক সংগঠন আছে, সেখানেই বিবাহের অস্তিত্বও লক্ষ্য করা যায়। তবে তা প্রকৃতিগতভাবে অভিন্ন হতে পারে। ওয়েস্টার মার্ক এই প্রসঙ্গে বলেছেন- “Marriage is a rooted in the family, rather than the family in the Marriage.” বিবাহ হল এমন একটি আচার পদ্ধতি যার মাধ্যমে পরিবার সৃষ্টি হয়। সাধারণভাবে বিবাহ বলতে বলা হয়, নারী পুরুষের মধ্যে যৌন মিলনের এক সমাজ অনুমোদিত উপায়। বিবাহ হল নর-নারীর স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত হওয়ার এক সমাজ স্বীকৃত উপায়। এককথায় বলা যায়, বিবাহ হল সুনিয়ন্ত্রিত যৌনাচারের সামাজিক স্বীকৃতি।

এই বিবাহ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিকরা বিভিন্ন ব‍্যাখ‍্যা প্রদান করেছেন। যথা- হর্টন ও হান্টের মতে, বিবাহ হল স্বীকৃত সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি পরিবার গড়ে তোলে। ম্যালিনোস্কি মনে করেন, বিবাহ হল সন্তান প্রজনন ও প্রতিপালনের চুক্তি বিশেষ এবং মজুমদারের মতে, বিবাহ হল নর-নারীর সমাজ স্বীকৃত এক বন্ধন যা একটি আবাসগৃহ প্রতিষ্ঠা, যৌন সম্পর্ক স্থাপন, সন্তান উৎপাদন ও তার প্রতিপালনের উদ্দেশ্যে তৈরি। সুতরাং বিবাহ হল এক বা একাধিক পুরুষের সঙ্গে এক বা একাধিক নারীর মিলন। এই মিলন হল সমাজ স্বীকৃত, এবং এই মিলনের পর নর-নারীরা স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত হয়।

আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের বিবাহ ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। যথা – Monogamy Marriage, Group Marriage, Polyandry এবং Polygyny Marriage, Homogamy, Heterogamy, Hypergamy, Hypogamy, Endogamy, Exogamy, Arranged Marriage, Romantic or Love Marriage, Exchange Marriage প্রভৃতি সহ আরও অন্যান্য অসংখ্য বিবাহ ব্যবস্থা। যাইহোক, উল্লিখিত সমস্ত বিবাহে কিন্তু নর-নারী বা পাত্র-পাত্রীর প্রয়োজন আছে। কেবলমাত্র ‛সমকামীতা’ (Homosexuality) দের বিবাহে কিছুটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু একটি বিষয় উল্লিখিত সব বিবাহের ক্ষেত্রেই সত্য তা হল, বিবাহের ক্ষেত্রে দুজন বা তারও বেশি নর-নারী, শুধু নারী বা শুধু পুরুষ (সমকামী) এর প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ আরও স্পষ্টভাবে বললে বলা যায় যে, উল্লিখিত সব বিবাহেই কিন্তু একের বেশি ব্যক্তির (নর-নারী) প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। এই বিশ্বায়ন ও আধুনিকীকরণের যুগে মনে হয় সবই সম্ভব। সমাজে অসম্ভব বলে যেন কিছুই নেই। সাম্প্রতিক সময়ে পাশ্চাত্য দেশের পাশাপাশি ভারতবর্ষেও এক নতুন বিবাহ ব্যবস্থার প্রচলন হয়। সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে বিবাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নানান পরিবর্তন, সংযোজন-বিয়োজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিবাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও যেন সর্বদা ‘পাশ্চাত‍্যকরণ’ ঘটে চলেছে। যাইহোক, সম্প্রতি ভারতবর্ষের বিবাহ ব্যবস্থায় যে নতুন বিবাহটি সংযোজন হয়েছে সেটি হল- ‛Sologamy Marriage’। এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত- ‛Self Marriage’ অথবা ‛Self love’ প্রভৃতি নামে। এই বিবাহ যিনি প্রথম করেছিলেন তিনি হলেন লিন্ডা বেকার (Linda Baker)। তিনি ১৯৯৩ সালে এই বিবাহ করেন। যাইহোক, এবার আমাদেরকে জানতে হবে এই ‛Sologamy Marriage’ আসলে কী?

‘Sologamy Marriage’ বা ‘Self Marriage’ বা ‘Self love’ বলতে বোঝায়, যখন কোন ব্যক্তি (নারী অথবা পুরুষ) নিজে নিজেকেই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিবাহ করে তখন তাকে বলা হয় Sologamy বিবাহ। এই বিবাহে পাত্র-পাত্রীর প্রয়োজন হয় না। কেবলমাত্র পাত্র বা পাত্রী থাকলেই হবে। এক্ষেত্রে আবার বিবাহের সমস্ত নিয়ম কানুনও মানা হয়ে থাকে। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যখন নিজের প্রতি নিজেই আকৃষ্ট হয়ে নিজেকেই ভালোবেসে ফেলে এবং অবশেষে নিজেকেই বিয়ে করে তখন তাকে Sologamy বা Self Marriage বা Self love বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ Sologamy means marriage by a person to themselves and it is also referred to as self-uniting marriage. এই বিবাহ ব্যবস্থা কিন্তু সব দেশে স্বীকৃত নয়। এমনই একটি বিবাহ ব্যবস্থা আমাদের ভারতবর্ষেও লক্ষ্য করা গেছে। যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম এক যুগান্তকারী একটি বৈবাহিক ঘটনা। এই sologamy বৈবাহিক ঘটনাটি ঘটতে চলেছে ভারতের গুজরাটের বরোদার এলাকায়। মেয়েটির নাম ক্ষমা বিন্দু। বয়স ২৪ বছর। ১১ই জুন (২০২২) তার বিয়ে। বিয়ের প্রস্তুতিও শেষ। এই বিয়েটি আর পাঁচটি বিয়ের মতোই সমস্ত প্রথা, রীতি-নীতি মেনেই হবে। অর্থাৎ সিঁদুর দান থেকে কিছুই বাদ থাকবে না। তার বাড়ির সবাই এই বিয়েতেও রাজি রয়েছে। ক্ষমা বিন্দু বলেন, আমি কখনই বিয়ে করতে চাইনা। কিন্তু বধূ হতে চাই। সে কারণেই নিজেকে বিয়ের সিদ্ধান্ত। এই বিয়েতে সবকিছুই থাকবে, কেবল বর এবং বরযাত্রী থাকবে না। তিনি নিজেই নিজেকে অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করবেন। ক্ষমা বিন্দু যুক্তি দিয়েছেন, “বিয়ে দুটি মানুষকে ভালোবেসে একসঙ্গে থাকার কথা বলে, আমি যদি নিজেকে ভালোবাসি তাহলে নিজেকে বিয়ে করতে আপত্তি কোথায়?” তিনি আরও বলেন যে, “বিয়ের দিন আমি নিজেকে নিঃশর্ত ভালোবাসার অঙ্গীকার করব, আমি যেমন সে ভাবে নিজেকে মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করবো। এমনকি, প্রয়োজনে নিজের পাশে থাকারও অঙ্গীকার করবো।” তিনি এই বিয়ে করে প্রমান করতে চান, মেয়েরা পুরুষের উপর নির্ভরশীল নন। তাঁরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনিই হলেন প্রথম ভারতীয় sologamy বা self marriage নারী।

যাইহোক, ভারতে এই প্রথম sologamy বিবাহব্যবস্থার প্রচলন হতে যাচ্ছে। যদিও এই বিবাহ ভারতে এখনো পর্যন্ত সাংবিধানিক তথা আইনগত ভাবে স্বীকৃত হয়ে ওঠেনি। এর পাশাপাশি এই বিবাহকে সমাজ কতটা অনুমোদন দেবে তারও বিভিন্ন জটিলতা থেকেই যায়। কিন্তু আশা করি এই বিবাহও অন্যান্য বিবাহ ব্যবস্থার মতোই একদিন সমাজ অনুমোদিত ও সমাজ স্বীকৃত হয়ে উঠেবে। সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন যতই আধুনিক হয়ে উঠবে ততই এইরকম বৈচিত্র্যমূলক ভিন্ন ধরনের ঘটনা সমাজে ঘটে চলবে। তাই বলা যায়, ‘sologamy’ বিবাহ ব্যবস্থা হল, ভারতীয় বিবাহ ব্যবস্থার কাঠামোতে সংযুক্ত এক ‛নবতম’ সংযোজন। এই বিবাহও একদিন অন্যান্য বিবাহের মতোই সমাজে অনুমোদিত বা সমাজ স্বীকৃত হয়ে উঠবে।উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সমাজতত্ত্বের আলোচনাতে অন্যান্য বিবাহ ব্যবস্থার মতো এই বিবাহ ব্যবস্থাও এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেবে।

জয়দেব বেরা
জয়দেব বেরা
জয়দেব বেরা ভারতবর্ষের একজন তরুণ কবি,সাহিত্যিক এবং লেখক। তিনি 'মানসী সাহিত্য পত্রিকা'র সম্পাদক। তিনি রামধনু ছদ্মনামে দুই বাংলায় পরিচিত। পিতার নাম রিন্টু বেরা ও মাতার নাম মানসী বেরা। তিনি ১৯৯৭ সালে ১২ই আগস্ট পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বৃন্দাবনপুর নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি 'সেবব্রত নার্সিং কলেজ' এ সমাজতত্ত্বের গেস্ট লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। তিনি ছাত্রাবস্থা থেকেই একজন অক্ষরকর্মী হিসেবে পরিচিতি। তিনি 'পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ' এবং 'ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি' এর সদস্য। তিনি ভবিষ্যতে গবেষণাকে সামনে রেখে জীবনে এগিয়ে যেতে চান। দেশ - বিদেশের অসংখ্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা সমাদৃত হয়েছে। তিনি লেখা-লেখির জন্য একাধিক সম্মাননাও অর্জন করেছেন। তাঁর রচিত একক ও যৌথ গ্রন্থ এবং জার্নাল গুলি হল- একক কাব্যগ্রন্থ- 'কবিতার ভেলা', 'কবিতায় মার্ক্সবাদ' , 'বাস্তবতা'। যৌথ কাব্যগ্রন্থ- কবিতার মহল্লা, প্রেমনগরী,দোহার,হেমন্তিকা,কাচের জানলা,দুই মলাটে কবিসভা,কবিতার চিলেকোঠা, সমকালের দুই বাংলার কবিতা-২(বাংলাদেশ),নাম দিয়েছি ভালোবাসা, সৈকতের বালুকনা,কবির কল্পনায়, শব্দভূমি,হৃদয়ের প্রাঙ্গণে, কবিতা সংকলন-১,আলাপন, কবিতারা কথা বলে প্রভৃতি সহ একাধিক যৌথ কাব্যগ্রন্থ। একক প্রবন্ধ এর বই:- 'জাগরণ', 'কোভিড-১৯ ও সমাজতত্ত্ব।' একক নিবন্ধ এর বই :- মনের কথামালা (বাংলাদেশ)। সম্পাদনা মূলক বই- 'দলিত', 'পলাশের ডাকে বসন্ত প্রহরীরা','আদিবাসীদের সমাজ ও জীবনযাত্রা'। সম্পাদনা মূলক জার্নাল- সেতু (ISSN: 2454-1923 14 th year, 37 Issue, December-2020.) একক সমাজতত্ত্বের বই/স্কুল পাঠ্য বই:- 'সমাজতাত্ত্বিকদের ইতিবৃত্ত', ' শিশুদের সমাজতত্ত্ব'(চতুর্থ শ্রেণি), 'উচ্চ মাধ্যমিক সমাজতত্ত্বের সাফল্য'(দ্বাদশ শ্রেনি), 'উচ্চ মাধ্যমিক সমাজতত্ত্বের প্রশ্ন সম্ভার (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি),উচ্চ মাধ্যমিক সমাজতত্ত্বের সমাধান (দ্বাদশ শ্রেণি) প্রভৃতি।

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

অন্তঃপুরের মসীকথাঃ রাসসুন্দরী দেবী

"হে পরমেশ্বর তুমি আমাকে লেখাপড়া শিখাও", বোবা কান্নায় ঈশ্বরের...

সাহিত্যে সম্পাদকের ভূমিকা

সম্পাদকের প্রধান কাজ হল, নিরপেক্ষ ভাবে লেখা বিচার করা।...

বাঙালির মনন সঙ্গী দেশ পত্রিকা নবতিবর্ষে পদার্পণ

পরাধীন ভারতবর্ষে ১৯৩৩ সালের ২৪ নভেম্বর দেশ পত্রিকার জন্ম।...

কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক

বিভিন্ন দেশের কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা।...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।