শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

‘সাগর আমায় ডাক দিয়েছে’- চট্টগ্রাম ও জাফর আলী হিলে কাজী নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত:

বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যে জাতীয় কবি, সাম্যের কবি, বিদ্রোহী কবি, অনুভূতির কবি, প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক ও অভিভাজ্য বিষয়। কবির গান, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা ইত্যাদি ছিল মানব মুক্তির পক্ষে। বাংলাদেশের অন্য অনেক এলাকার মত কবি চট্টগ্রামেও বার বার এসেছেন। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের ভূমিকা অনন্য। আর কবি ছিলেন এই আন্দোলনের পুরোধা। যার ফলে কবিকে বার বার চট্টগ্রামে ছুঁটে আসতে হয়েছে। তিনি এসেছেন, কবি বন্ধু কমরেড মোজাফ্ফর আহমেদ, কবি দিদারুল কমরেড আলম, হাবিবুল্লাহ বাহার, কাজী মোতাহের হোসেন প্রমুখের সাথে। ১৯২৬ সালে জুলাই মাসে কবি প্রথমবারের মত চট্টগ্রামে আসেন। কিন্তু ১৯২২ সালে একবার আসতে চেয়েছিলেন। কবি বন্ধু আফজল উল হকের লেখা চিঠি থেকে তা জানা যায়। সেসময়ে কবিভক্তবৃন্দ কবির চট্টগ্রামে আগমনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি জবাবে বলেন, ‘সাগর আমায় ডাক দিয়েছে মন নদী এই ছুটছে ঐ’ কবিতাটি তাৎক্ষণিক রচনা করেছিলেন।

কথিত আছে, এক সময়ে এই পাহাড়ের নাম ছিল “জাফর আলী হিল” বর্তমানে যা “ডিসি হিল” নামে প্রসিদ্ধ। বাঁশখালী থানার কালিপুর নিবাসী ১৯ শতকের প্রসিদ্ধ জমিদার সরকারি উকিল মুন্সি জাফর আলী চৌধুরী সাহেব এখানে বসবাস করতেন। তার অবর্তমানে তাঁর পৌত্র দার্শনিক ডিপুটি হযরত শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম ১৮৫৬ সালে এইখানেই জন্মগ্রহণ করেন। তারপর ডিপুটি শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম সাহেব এই জায়গাতেই বসবাস করতেন। কাজী মোতাহের হোসেনের দাওয়াতে কবি ডিসি হিলে ডিপুটি হযরত শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম শাহ্ সাহেবের সাথে দেখা করতে আসেন।

চট্টগ্রামের ডিসি হিল 'সাগর আমায় ডাক দিয়েছে'- চট্টগ্রাম ও জাফর আলী হিলে কাজী নজরুল ইসলাম
চট্টগ্রামের ডিসি হিল। ছবি: সংগৃহীত

কবি যখন ডিসি হিলের উপরে উঠেছিলেন, সেই সময় ডিপুটি হযরত শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহ:) এর ছেলে হযরত শাহ্ মোহাম্মদ মোজহেরুল আলম প্রকাশ সাহেব মিয়া (রহ:) সাহেব স্বীয় পিতাকে গান গেয়ে শুনাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় কবি কর্ণপাত করলেন এবং উকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। তিনি যখন দেখেছিলেন ঠিক সেই সময়েই ভিতর থেকে আওয়াজ এল ‘‘ভিতরে আস বাবা কবি সাহেব’’ আওয়াজটি ছিল ডেপ্যুটি হযরত শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম শাহ্ সাহেব (রহ:)। এই স্থানে একটু বলে রাখি সেই সময়ে কবি হতবাক হয়ে গেলেন! কিভাবে শাহ্ সাহেব তাঁকে কবি বলে সম্বোধন করলেন? কারণ ডেপ্যুটি সাহেবের সাথে কবির এটাই ছিল প্রথম সাক্ষাৎ। এর আগে কখনো তাঁদের দেখা হয়নি। তারপর কাজী মোতাহের সাহেব তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর ডেপ্যুটি সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন কবির পছন্দের খাবার কি? কাজী মোতাহের হোসেন সাহেব বলিলেন, কবি চা এবং পান অত্যধিক পছন্দ করেন। তারপর কবি নজরুল ডেপ্যুটি সাহেবকে গান শোনালেন। সেই রাত পুরো সময় ধরে গানের সুরের মূর্ছনা ও সাথে চা এর আড্ডায় কেটে গেল। এরপর থেকেই শাহ্ সাহেব এবং সাহেব মিয়া সাহেবের সাথে কবির এক গভীর সখ্যতা গড়ে উঠল। শাহ্ সাহেব কবির গানে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি কবিকে বলেছিলেন “বাবা তুমি অনেক বড় হবে” আমি দোয়া করি। শাহ্ সাহেবের ছেলে সাহেব মিয়া সাহেবের সাথে কবির চিঠি আদান প্রদান হত এবং এরপর থেকে কবি চট্টগ্রাম আসলে “জাফর আলী হিল” তথা ডিসি হিলে অবস্থান করতেন। এই ডিসি হিলে বসেই কবি সেই বিখ্যাত কবিতা- ‘কর্ণফুলী’ ও ‘গোবাক তরুর সারি’ রচনা করেছিলেন।

kobir natni 'সাগর আমায় ডাক দিয়েছে'- চট্টগ্রাম ও জাফর আলী হিলে কাজী নজরুল ইসলাম
কবির নাতনী খিলখিল কাজী ও মিষ্টি কাজীর হাতে প্রবন্ধ তুলে দিচ্ছেন লেখক নাজমুল শামীম।

যে ডিসি হিলে বার বার রাত কাটিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানে যেন সকল মানুষের ক্লান্তির অবসান। এভাবে সূর্য উঠার আগ থেকে রাত অবদি হাজারো মানুষের মিলন স্থল ডিসি হিল। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। জাতীয় কবির এই তীর্থকে (ডাকবাংলো) ১৯৯৯ সালে ভেঙ্গে তছনছ করেছে সিডিএ। গড়ে তোলা হয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯ সালে এই ভবনের উদ্বোধন করেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার। এই ভবনটি যখন উদ্বোধন করছে ঠিক কেউ একবার আমাদের জাতীয় কবির কথা মনে রাখবার প্রয়োজনটুকু বোধ করেনি। সেখানে শুধু কমিশনারের কার্যালয় নয় খোলা মঞ্চ, দর্শকের বসবার ব্যবস্থাসহ নানা আয়োজন করা হয়। সাবেকমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সেই কাজের উদ্বোধন করেন। সাবেকমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের চেষ্টায়, সিডি-এ এর অর্থায়নে অবশেষে ১০ এপ্রিল, ২০০৫ সালে নজরুল স্কয়ার এর নাম ফলক উদ্বোধন করা হয়। দেয়া হয় কবির ম্যুরাল, এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেকমন্ত্রী আলমগীর কবির এমপি। কথা হল যারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে করুক না কেন নজরুলের নাম দেয়া হয়েছে এটি আমাদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। কবি চট্টগ্রামে আসেন, ১৯২৬, ১৯২৯, ১৯৩২/১৯৩৩ সালে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং সেসময়ে কবি চট্টগ্রামকে নিয়ে লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের অসামান্য কবিতা, নাটক, গল্প। যেমন- ২৬ সালের ২৯ মে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে কবিকে গণসংবর্ধনাকালে ওই মসজিদে বসেই কবি রচনা করেছিলেন-
‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।‘

১৯২৬ সালের ৩রা জুন কবিকে চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্র সংবর্ধিত হন কবি। সেসময় কবি ছাত্রদের আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল গানটি গেয়ে শোনান। ‘ছাত্র দলের গান’ সেসময়েই রচিত।

১৯২৯ সালের ৩রা নভেম্বর কবি দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে আগমন করেন এবং দীর্ঘ সময় তিনি এখানে অবস্থানকালে কবি রচনা করেন সিন্ধু হিন্দোল কাব্য গ্রন্থের সিন্ধুঃ প্রথম তরঙ্গ কবিতাটি।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে সাম্পানে চড়ে ভ্রমণকালে তিনি রচনা করেছিলেন সেই বিখ্যাত গান-
‘আমার সাম্পান যাত্রী না লয় ভাঙ্গা আমার তরী।’

এরপরে ১৯২৯ সালের ৪ জুলাই বন্ধু হাবীবুল্লাহ বাহারকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি ও ঝর্ণাধারা ও চন্দ্রনাথ মন্দির দর্শনকালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেছিলেন-
‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐও
ঐ পাহাড়ের ঝর্ণা আমি
ঘরে নাহি রইগো আমি
উধাও হয়ে রই।’

চট্টগ্রামে অবস্থানকালে সে বছরেই কবি সন্দ্বীপ বেড়াতে গিয়েছিলেন এবং সন্দ্বীপ কারগিল স্কুলে কবিকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সন্দ্বীপে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কবি রচনা করেছিলেন- ‘চক্রবাক’, ‘গোপন প্রিয়া’ কবিতা কবির সন্দ্বীপে বসেই লেখা। ওখানকার ডাবের জল পান করে কবি রচনা করেছিলেন ‘শরাবান তহুরা।’

চট্টগ্রামবাসী তাঁর কাছে ঋণী।

তথ্য সূত্র:
১। হজরত হেকীম শাহ্ হেফাজত উল্লাহ (রহ:) ডায়েরী।
২। ডা: মোঃ শহীদুল্লাহ, মীরপুর, ঢাকা
এর ডায়েরী। তিনি ইতিহাস গবেষক ও সংগ্রাহক।
৩। চট্টগ্রামে নজরুল, ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন।
৪। এনামুল হক মুকুল, বিশিষ্ট লেখক ও শিল্পী এর ডায়েরী।
৫। আমাদের নজরুল আমাদের চট্টগ্রাম ।
৬। নজরুল চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ

মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম সাংবাদিক, লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সংগীত শিল্পী। এছাড়াও তিনি যুক্ত আছেন চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, বাংলাদেশ মুসলিম ইতিহাস সমিতি, বাংলাদেশ-ভারত সংস্কৃতি মৈত্রী ফাউন্ডেশন, স্বরলিপি সংস্কৃতি অঙ্গন, চাঁটগাইয়া নওজোয়ান সহ বিভিন্ন সংগঠনে সাথে।

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

অন্তঃপুরের মসীকথাঃ রাসসুন্দরী দেবী

"হে পরমেশ্বর তুমি আমাকে লেখাপড়া শিখাও", বোবা কান্নায় ঈশ্বরের...

সাহিত্যে সম্পাদকের ভূমিকা

সম্পাদকের প্রধান কাজ হল, নিরপেক্ষ ভাবে লেখা বিচার করা।...

বাঙালির মনন সঙ্গী দেশ পত্রিকা নবতিবর্ষে পদার্পণ

পরাধীন ভারতবর্ষে ১৯৩৩ সালের ২৪ নভেম্বর দেশ পত্রিকার জন্ম।...

কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক

বিভিন্ন দেশের কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা।...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।