16.3 C
Drøbak
রবিবার, জুন ২০, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যআলো অন্ধকারে যাই (পর্ব ১)

আলো অন্ধকারে যাই (পর্ব ১)

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট-সম্ভাবনা বিষয়ে ধারাবাহিক রচনার প্রথম পর্ব।  

বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় ঠাসা আমার স্কুল জীবন। জীবনের প্রথম স্কুলে যাবার দিন সে কি কান্না! সারা পথ কাঁদতে কাঁদতে গেলাম। স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলো আমার মেজদি। সারা পথ মনে হচ্ছিলো আমার অবস্থা একেবারে কোরবানির পশুর মতো। ক্লাসে আমাকে বসতে দেয়া হলো সামনের বেঞ্চিতে বসা একটি মেয়ের পশে। মেয়েটির নাম আমার মনে নেই তবে এটুকু মনে আছে তার বাবা আমার বাবার বন্ধুস্থানীয় ছিলেন এবং দুই পরিবারের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কারনেই বালিকাটি ছিলো ক্লাসে আমার একমাত্র পরিচিত মুখ। বালিকাটি আমাকে কান্না থামাতে বলছিলো বারবার। কিন্তু কে শোনে কার কথা! প্রথম দিন কান্নার প্রাবল্যে শিক্ষকেরা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কিছুক্ষণ পরেই আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। স্কুলে যাবার পথে কান্না থামতে আমি অনেক লম্বা সময় নিয়েছি।  

ধীরে ধীরে স্কুলের রিনা আপা, আলেয়া আপা, সেকেন্ড স্যার (সম্ভবত উনার নাম ছিল মোখলেস স্যার, কিন্তু সবাই উনাকে এই নামেই কেনো ডাকতেন আমি জানিনা।) – কে পছন্দ করে ফেলি। স্কুলও ভালো লাগতে শুরু করলো একসময়। আমাদের কাছে সাক্ষাৎ সন্ত্রাস ছিলেন জলি আপা আর রজব স্যার। দুজনেই শিক্ষার্থীদের খুব মারতেন। জলি আপা মারতেন পড়া না পারলে আর রজব স্যার এর সুখ্যাতি ছিল মূলত ডিসিপ্লিন ইস্যুতে। ক্লাসে গোলমাল হচ্ছে, রজব স্যার এসে দরোজায় দাঁড়াবার সাথে সাথে পিন পতন নিস্তব্ধতা। বরাবর পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত, হালকা-পলকা রজব স্যারের কাছেই জীবনের প্রথম বেত্রাঘাত প্রাপ্তি হলো আমার। আমি সম্ভবত তখন তৃতীয় শ্রেনির ছাত্র। তবে সেদিনের বেত্রাঘাত খুব বিবেচনাপ্রসুত ছিলোনা। 

স্বাধীনতার পরে আমাদের সময়ে স্কুলে শিক্ষকের অভাব ছিল, ক্লাসরুমের মাঝে পার্টিশন ছিলোনা। অনেক সময় নানা কারণে শিক্ষক ক্লাসে আসতে দেরিও করতেন। আশা করা উচিত হবেনা যে সেই সময় ছোট ছোট শিশুরা পুতুলের মতো নির্বাক হয়ে বসে থাকবে বা কানে কানে কথা বলবে। আমরাও তেমনটি করিনি। খুব শোরগোল চলছিলো ক্লাসে। রজব স্যার এরকম হৈ চৈ এর মাঝে বেত হাতে ক্লাসে ঢুকে এক প্রান্ত থেকে মারতে মারতে আরেক প্রান্তে চলে গেলেন। প্রতি ছাত্রের জন্যে বরাদ্দ দুই / তিনটি বেতের বাড়ি সজোরে। প্রথম বেঞ্চিতে বসার সুবাদে দ্বিতীয় বেত্রাঘাতের পাল্লায় পড়লাম আমি। প্রথমটি পেলো আমার পাশেই বসা আমার প্রিয় বন্ধু জাভেদ, যে সে সময়ের মহকুমা মুনসেফ এর ছেলে ছিলো।  

রজব স্যার বোধ হয় এখানেই ভুল (?) করে ফেললেন। বাসায় গিয়ে আমার জ্বর এসে যায়। তবে সেটি থেকেও যেটা আমাকে ভাবিয়ে তুললো সেটা হলো হাতের উপরে বসে যাওয়া বেতের বাড়ির দাগ। নিশ্চিত ছিলাম অভিভাবকরা এটি দেখে ফেললে আরেক প্রস্থ ধোলাই হয়ে যাবে। কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না অনর্থক মার খেয়েছি। ধরা পড়লাম স্নান করার সময়। জাভেদের বাসাতেও তাই হলো। হলো আরো অনেকেরই। আমাদের কারণে হয়তো কোনো সমস্যা হতোনা, কিন্তু ব্যাটা জাভেদ তো ‘মুনসেফ সাহেবের ছেলে’। তাই পরদিন স্কুলে থমথমে অবস্থা। হেড স্যার আমাকে ও জাভেদকে তার কক্ষে ডেকে নিলেন। আমাদের জবানবন্দি নেয়া হলো। আমরাও যা হয়েছে গড়গড় করে বলে দিলাম। হেডস্যার রজব স্যারকে বেশ রাগারাগি করলেন। সেই একদিনই রজব স্যারকে দেখেছি অসহায় হতে। কোলের উপর আমাকে আর জাভেদকে বসিয়ে উনি যখন আদর করে বললেন তাঁর ভুল হয়ে গিয়েছে, আমরা যেন কিছু মনে না করি – তখন রজব স্যারের সাথে আমরাও খুব বিব্রত হই। স্কুলের ছেলেমেয়ে যারা জানালার ফাঁক দিয়ে এই দৃশ্য দেখছিলো, রজব স্যার এর মতো ভয়ঙ্কর মানুষের এই রূপ তাদের কাছে রীতিমত অবিশ্বাস্য ছিলো। প্রাথমিকে ওই একদিনই মার খেয়েছি আমি সাকুল্যে।  

মনে পড়ে আরেকদিনের কথা আমি তখন বোধহয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়তাম। স্কুলে আসার সময় বাসা থেকে আমাকে বেশ বাবু সাজিয়ে পাঠানো হতো। হাফ প্যান্ট এর মাঝে ইন করা জামা, পায়ে একটা কালো বুট জুতো, সাথে সাদা ‌মোজা। হাতে স্টিল এর একটা বইয়ের ব্যাগ। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো। আমি কোনো উচ্চবিত্তের সন্তান ছিলাম না তবুও আমাকে বাসা থেকে এভাবেই পাঠানো হতো। সেটি ঐ সময়ের প্রেক্ষিতে খানিকটা বেমানান ছিল এজন্যেই যে অন্য ছাত্ররা ওভাবে আসতো না। হয়তো আসতে পারতোও না। সময়টিও অর্থনৈতিকভাবে ছেলেমেয়েদের এভাবে আসার জন্যে সহায়ক ছিলোনা। এর ফলে আমি অনেকদিন ক্লাসের আপামর শিক্ষার্থীদের কাছে খানিকটা দূরের মানুষ ছিলাম যা আমাকে বেশ একাকী করে রাখতো।  

একদিন হেডস্যার শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দিলেন স্কুলের সামনের মাঠ ও ক্লাসরুম পরিষ্কার করার জন্যে। সেই সময় স্কুলের মাঠ পরিষ্কার করা বিশেষত স্কুলের মাঠে গজিয়ে ওঠা চোরকাঁটা পরিষ্কার করা শিক্ষার্থীদের একটি রুটিন কাজ ছিল এবং এটি করাতে আমাদের আগ্রহের কোন কমতি ছিলনা। বছরে অন্তত একদুবার এটি করতেই হতো। আমি ক্লাসের মেঝেতে বই এর ব্যাগ রেখে অন্যদের সাথে লেগে পড়লাম। হঠাৎ রিনা অপার চোখে পড়লো আমি এই কাজটি করছি। উনি দৌড়ে এসে আমাকে কোলের ভিতরে নিয়ে অনেক আদর করে বললেন – উলে বাবা, বাবুটা তো অনেক কাজ করে ফেলেছে। থাক, তোমাকে আর কাজ করতে হবেনা। 

মাতৃরূপী, স্নেহশীল রিনা আপার সেই আদর আমি সেদিনও উপলব্ধি করেছি, আজও করি। আমাদের বাড়ির কয়েকটা বাড়ি পরেই রিনা আপার বাসা ছিলো। তাই আপাকে প্রতিবেশীও বলা যায়। কিন্তু সেই ছোট বেলায় সেদিন আমার মনে হয়েছিল, রিনা আপা আদরের আধিক্যে অন্য শিক্ষার্থী ও আমার মাঝে একটি দেয়াল তুলে ফেললেন। আমি সবার হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই একবার সবার সামনে শুধু আমাকেই কোলে তুলে নিয়ে আর সেই সাথে আমাকে অন্যদের সাথে কাজ করতে না দিয়ে উনি আল্টিমেটলি অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে এই ভুল মেসেজটি দিয়ে ফেলেন যে আমি সবার থেকে আলাদা। 

যাহোক, হাজারো স্মৃতির কারনে আমি আমার প্রাথমিকের সকল স্যার ও আপাদের (আমাদের সময় ম্যাডাম বা মিস এর প্রচলন হয়নি) কাছে দারুণভাবে কৃতজ্ঞ। আদর, ভালোবাসা, স্নেহ, শাসন, অনুপ্রেরণা দিয়ে তারা আমাকে ও আমাদেরকে বড় করেছেন মাধ্যমিকের জন্যে। সেখানে প্রাইভেট পড়ানোর ইঙ্গিত ছিলোনা। প্রাইভেট না পড়ার কারণে নম্বর কম দেয়ার প্রবৃত্তি ছিলো না। নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক বা অন্য কারনে তাঁরা শিক্ষার্থীদের মাঝে কোন বিভেদের দেয়ালও তুলে দেননি অন্তত সচেতনভাবে।

চতুর্থ শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠে আমি ও আর ক’জন ছাত্র – অলোক, বরুন, তাপস, ফজলু, রাজ্জাক প্রমুখ মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ৫ম শ্রেণী খোলা হলে স্কুল পরিবর্তন করতে চাই। এমনিতেও আমাদের ষষ্ঠ শ্রেণীতে যেতেই হতো। অভিভাবকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন সুযোগ যখন আসছেই তাহলে এক বছর আগেই যাই আমরা। সেদিন অবতারণা হলো আরেক দৃশ্যের। স্বল্পভাষী হেডস্যার খুব একটা উচ্চবাচ্য না করলেও অন্যান্য স্যার ও আপারা একযোগে বেরিয়ে এলেন। কিছুতেই ছাড়বেন না আমাদের। কিছুতেই দেবেন না টিসি। রিনা আপা ও জলি আপা রেগেমেগে স্কুল থেকে বেরিয়েই গেলেন। আমরা ৪/৫ দিন টিসি পেলাম না। শেষদিন টিসি দেয়া হলো কিন্তু রিনা আপা ও জলি আপা বোধ হয় ক্ষমা করতে পারলেন না এই অপরাধ। অনেকটাই স্নেহচ্যুত হলাম তাঁদের।  

তবুও আমার ছাত্রজীবনে তাঁরা নমস্য কিছু মানুষ। তাঁদের কাছে আমার স্নেহের ঋণ আছে। ভালোবাসার ঋণ আছে। গুরুদীক্ষার ঋণ আছে যা কোনদিন শোধ হবার নয়।  

কিন্তু মাধ্যমিকের চিত্রটি একেবারেই এরকম ছিলোনা। সেটি নিয়ে এর পরে লিখবো।

(চলবে)

গৌতম রায় ইংরেজির অধ্যাপক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেবার পর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেশ তরুণ বয়সেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পড়িয়েছেন দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই পরবর্তীতে ছাত্র হয়েছেন ইংল্যান্ডের এক্সিটার ইউনিভার্সিটির।‌ যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি ও ওয়ার্ল্ড লার্নিং থেকে নিয়েছেন পেশাগত প্রশিক্ষণ। এখন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের জাতীয় ‌শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে। শিক্ষা বিষয়ক বর্ণিল কাজে নিজেকে ‌সম্পৃক্ত রাখার জন্যই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থাকে তিনি দেখেছেন খুব কাছে থেকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে গৌতম রায়ের পছন্দের আঙ্গিনা শিক্ষকের অনিঃশেষ পেশাগত দক্ষতা, ইন্টারেক্টিভ মেটিরিয়ালস ডিভ্যালপমেন্ট, ও লার্নিং এসেসমেন্ট। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট-সম্ভাবনা বিষয়ে ধারাবাহিক রচনার প্রথম পর্ব।  

গৌতম রায়
গৌতম রায়
গৌতম রায় ইংরেজির অধ্যাপক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেবার পর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেশ তরুণ বয়সেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পড়িয়েছেন দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই পরবর্তীতে ছাত্র হয়েছেন ইংল্যান্ডের এক্সিটার ইউনিভার্সিটির।‌ যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি ও ওয়ার্ল্ড লার্নিং থেকে নিয়েছেন পেশাগত প্রশিক্ষণ। এখন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের জাতীয় ‌শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে। শিক্ষা বিষয়ক বর্ণিল কাজে নিজেকে ‌সম্পৃক্ত রাখার জন্যই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থাকে তিনি দেখেছেন খুব কাছে থেকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে গৌতম রায়ের পছন্দের আঙ্গিনা শিক্ষকের অনিঃশেষ পেশাগত দক্ষতা, ইন্টারেক্টিভ মেটিরিয়ালস ডিভ্যালপমেন্ট, ও লার্নিং এসেসমেন্ট।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।