বুধবার, আগস্ট ১৭, ২০২২

মেঘে ঢাকা আকাশ

প্রকাশিত:

আগামীকাল ফরহাদের চাটার্ড একাউন্টেন্সির ফাইনাল পরীক্ষা। এটা তার শেষ সুযোগ। এবার পাশ না করতে পারলে “অটোমোশনে” পড়ে যাবে। অর্থাৎ পুনরায় সে আর পরীক্ষা দিতে পারবেনা। আগের যে দুটো পার্ট পাশ করেছে সেগুলি ভেস্তে যাবে, ওই পাশ করা সমস্ত সাব্জেক্টগুলির কোনো মূল্য থাকবেনা। ফরহাদ ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র নয়, আবার খারাপ ছাত্র ও নয়। জীবনে ফেল করে নাই। ওর কাল হয়েছে ওই ফাইনাল পার্ট পরীক্ষাটা নিয়ে। পর পর তিনবার ফেল করার পর এটাই ওর শেষ সুযোগ।
পরীক্ষার প্রস্তূতি ভালোই হয়, কিন্তু পরীক্ষা আরম্ভ হবার দু-তিন দিন আগে থেকে সে কেমন যেন নার্ভাস হয়ে পড়ে। বিলেতের প্রবাস জীবনে অফিসের হাড় ভাঙা খেটে পড়াশুনা করা সহজ কাজ নয়। তবুও এই প্রবাসে জানাশুনা সবাই এ ভাবে লেখাপড়া চালিয়ে নিচ্ছে এবং পাশ ও করছে। ফরহাদ কেন পারবেনা? এ প্রশ্ন আজকাল প্রায়ই তার মনে সাড়া জাগায়। ম্যানচেস্টার থেকে ফাইনাল সাবজেক্টের (পার্ট থ্রি ) উপর চার সপ্তাহের একটা “ইনটেনসিভ কোর্স” করে এসেছে। এতে একটা মোটা অংকের পাউন্ড খরচা হয়েছে। সে ভাবে এবার পরীক্ষার বেড়াজাল পার হয়ে যেতে পারলে এ ত্যাগ কিছুই না।
ফরহাদের আজও মনে পরে তার ঢাকার ছাত্র জীবনের কথা। বিলেতে যাবে, ডিগ্রী নিবে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে নিজের ফার্ম খুলে প্রাকটিস শুরু করবে। কত আশা, কত রঙিন কল্পনা ছিল, এখন যা অবস্থা, তাতে মনে হয় এ যেন গুড়ে বালি হতে চলেছে।
এবার যে করেই হোক তাকে পরীক্ষায় পাশ করতে হবে।
ফরহাদের বৌ, রোকেয়া এ বছর দেশে যেতে চেয়েছিল- ওর বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনদের দেখবে বলে। প্রায় সাত বছর দেশ ছাড়া।
টাকার অভাবে দেশে যাওয়া হচ্ছেনা। অবশ্য ফরহাদের কোর্সের জন্য যে মোটা অংকের ফিস দিয়েছে, তা থেকে অনায়াসে রোকেয়া ঢাকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতো। ফরহাদ অনেক বার রোকেয়াকে বলেছে, “না, আমি কোনো কোর্স করতে যাবো না, তুমি বরং দেশ থেকে ঘুরে আসো। আত্মীয় স্বজনদের কাছে পেলে আনন্দ পাবে, তার সাথে মনটাও ভালো লাগবে। তাছাড়া এমন কি গ্যারান্টি আছে যে আমি কোর্সটিতে জয়েন করলে পাশ করে যাবো। সবারই তো প্রস্তূতি ভালো হয়, কিন্তু কি জানি পরীক্ষার হলে গিয়ে মাথামুণ্ডু সব গুলিয়ে ফেলি। কে জানে, হয়তোবা অজানা আশঙ্কায় নার্ভাস হয়ে পড়ি।”
ফরহাদের এ সমস্ত কথা রোকেয়া মোটেই শুনতে রাজী নয়। সে বলল, “সারাদিন অফিসের কাজ করে আর কি সে রকম মনোযোগ দিয়ে ভালো ভাবে লেখাপড়া করা যায়! তুমি ম্যানচেস্টারের “ইনটেনসিভ” কোর্সটিতে যোগ দিলে কিছুটা ফুলটাইম স্টাডির সুযোগ পাবে এবং অন্যান্য সহপাঠিদের সাথে মিলে মিশে পরীক্ষার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারবে- মানে “নেট ওয়ার্কিং” করতে পারবে। ওই তো তোমার বন্ধু শরীফ, মনসুর ,সাগর ওরা সবাই তো কোর্সে যোগ দিয়েছিলো আবার পাশও করে গেছে, তুমি কেন পারবেনা? ও সমস্ত বাজে চিন্তা মন থেকে দূর করে দিয়ে কোর্সটিতে জয়েন করে ফেলো।” একটু দম নিয়ে রোকেয়া আবার বলল, “তুমি পাশ করে গেলে আমি দেশে প্রতি বছরই হলিডে করতে যেতে পারবো।” এ কথায় ফরহাদের আর কিছুই বলার থাকেনা।

পরীক্ষার দিন সকাল বেলায় ফরহাদ হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করার জন্য টেবিলে বসলো। নাস্তা খেতে খেতে সে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে, হয়তো আসন্ন পরীক্ষার আশঙ্কায়। আনমনে ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই ফরহাদ দেখলো আকাশটা মেঘে ভীষণ কালো হয়ে উঠেছে, যে কোনো সময় বৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। সামনের রাস্তায় এক ঝাঁক পায়রা একটা দোকানের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, খাবারের খোঁজে। ফরহাদের চোখে পড়লো ওই ঝাঁকের মাঝে একটা পায়রা খোঁড়া। খুব কষ্ট করে খোঁড়া পা টাকে মাটির সাথে টেনে টেনে হাটছে, আর ওদের সাথে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। পথচারীরা সামনে এসে পড়লে অন্যান্য পায়রাগুলো উড়ে চলে যায়, আবার ফিরে আসে। কিন্তু সে খোঁড়া পায়রাটি যেখানে ছিল সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, সে লোক দেখলে উড়ে যায় না। হয়তো পায়রাটি ভাবে এমন করে বেঁচে থাকার চাইতে কোথাও উড়ে পালিয়ে না যাওয়াই ভালো। কি লাভ এমন করে বেঁচে থাকা!

মেঘের বিকট গর্জন, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে সব পায়রাগুলি উড়ে চলে গেলো সামনের দোতলার বাড়ির ছাদের আঙিনায়, আর সেই খোঁড়া পায়রাটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে সামনের দিকে এগুতে থাকে, কোথায় যাবে হয়তো সে নিজেই জানে না।
“কি গো, তুমি এখনো তোমার ব্রেকফাস্ট শেষ করোনি আটটা যে বাজে” রোকেয়ার ডাকে ফরহাদের ওই করুন দৃশ্যটি দেখার ছেদ পড়লো। ফরহাদ কিছুটা হকচকিয়ে গেলো। তারপর কফির কাপ থেকে শেষ চুমুকটি দিয়ে বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো।
পরীক্ষার “সিট” পড়েছে লন্ডনের উডগ্রীন টিউব স্টেশনের পাশে “আলেকজেন্ডার প্যালেস” নামে এক হলে। সাহেবরা হলটিকে আদর করে বলে “এলেপেলে।” ফরহাদের বাসা থেকে ডাবল ডেকার বাসে করে সোজা আলেকজেন্ডার প্যালেসে যাওয়া যায়। আন্ডার গ্রাউন্ড টিউব হয়ে গেলে অনেক ঘুরে ফিরে যেতে হয়, তাই ফরহাদ বাসে করে পরীক্ষার হলে যাবার মনস্থির করলো।
এই দুর্যোগ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেও বাসটি সময় মতো এলো। ডাবল ডেকার বাস, ফরহাদ দোতলার উপর এসে একটি সিটে বসলো। আলতো চোখে সে বাসের ভিতরে চারদিকে চেয়ে দেখলো তার মতো আরো কয়েকজন পরীক্ষার্থী বাসটিতে রয়েছে। কেও কেও শেষবারের মতো নোট বয়ের মধ্যে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। বাসটি নির্ধারিত জায়গায় আধ ঘন্টার ভিতর পৌঁছানোর কথা। হঠাৎ বাসটি ঘটাং করে এক অস্বাভাবিক শব্দ করে থেমে গেলো, আর সেই সাথে সবাই একে অপরের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। তারপর বাসটি সামনের এক বাড়ির দেয়ালে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা খেলো। ফরহাদ নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখ লোকজন মোটর সাইকেল আরোহী তার সাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে ব্যথায় মাটিতে ছটফট করছে, আর তার সাথে তার শরীর থেকে রক্তের বন্যায় পিচ ঢালা রাস্তাখানি ভিজে যাচ্ছে। ক্ষণিকের মধ্যে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স এবং ফায়ার ব্রিগেডের লোক এসে হাজির। পুলিশ বাসের ভিতরে ঢুকে যাত্রীদের খবরাখবর নিচ্ছে, কারো কোনো আঘাত বা অন্য কোনো অসুবিধা হলো কিনা তা দেখার জন্য। আশ্চর্য, কারো কোনো গুরুতর আঘাত লাগেনি। এভাবে প্রায় আধ ঘন্টা কেটে গেলো। পরে পুলিশ বাসের সব যাত্রীকে অন্য আরেকটি বাসে চড়িয়ে দিলো। ফরহাদের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, বাসা থেকে কিছুটা সময় নিয়ে বেরিয়েছিল তাই পরীক্ষা শুরু হবার আগেই সে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারলো।

ঢং ঢং করে পরীক্ষার হল ঘরের দেয়াল ঘড়িটা দশটা বাজার সংকেত ঘোষণা করলো। পরীক্ষার পরিদর্শক প্রশ্ন পত্র দিয়ে গেলেন। দুরু দুরু বুকে ফরহাদ প্রশ্ন পত্রের উপর চোখ বুলালো। মোট প্রশ্ন সংখ্যা নয়টি। পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ফরহাদের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। কারণ সবগুলি প্রশ্নের উত্তর তার জানা। কোন প্রশ্নের উত্তর আগে দিবে সেটা ভাবছে। এমন সময় তার মাথার পিছন দিকটা ব্যথায় টনটন করে উঠলো। হাত দিয়ে অনুভব করলো জায়গাটায় আলুর মতো ফুলে উঠেছে, মনে হয় যেন এক পাকা আম। পথের দুর্ঘটনার সময়ে ফরহাদের মাথায় বাসের এক রডের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিলো তখন সে কোনো খেয়াল করে নাই। এখন মাথার সেই জায়গায় ব্যাথাটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ব্যাথাটা ক্রমে ক্রমে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো… তারপর ফরহাদের আর কোনো হুশ রইলোনা। যখন তার জ্ঞান ফিরে এলো, তখন দেখতে পেলো সে এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।
দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্ণ হয়েছে। বেডের সামনে বসে রোকেয়া এবং তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু নবী ব্যাকুল চিত্তে তার দিকে চেয়ে আছে। ফরহাদ ভাবছে আজ সকাল বেলার দেখা ওই পা ভাঙ্গা পায়রাটির মতো বেঁচে থেকে লাভ কি? রোকেয়া, নবী, আরো অনেক প্ৰিয়জন আছে যারা তাকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে চায়। বেঁচে থাকার প্রেয়না জোগায়। নবী, ফরহাদের হাতে হাত রেখে বললো, “বন্ধু, পৃথিবীটা এখানেই শেষ নয়, এখনো তোমাকে অনেক কিছু করার আর দেবার আছে এই পৃথিবীতে। সুখ -দুঃখ নিয়েই তো জীবন। তোমার আকাশ এখন মেঘে ঢেকে আছে। সময় মতো আবার তোমার জীবনে নুতন করে সূর্য উদয় হবে।সে জন্য তোমাকে সজাগ এবং প্রস্তুত থাকতে হবে।” বন্ধুর কথাগুলি শুনার পর ফরহাদের দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো, তার সাথে বেঁচে থাকার আশা তীব্র হয়ে উঠলো।

Share post:

Subscribe

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

জন্মনিবন্ধনে আর লাগবে না মা-বাবার সনদ

এখন থেকে জন্মনিবন্ধন করতে মা-বাবার জন্মসনদ আর লাগবে না।...

জীবন্ত সেতুর দেশে

বর্ষার মৌসুম। সন্ধ্যা হতেই সুড়সুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ছে...

কবি স্বাগতা ভট্টাচার্যের ছয়টি কবিতা

মায়ের আঁচল মায়ের যত্নে আঁকা নজর ফোঁটা,কপালে চাঁদ হয়ে ভাসতো...

টিপু-প্রীতি হত্যা: সেই বাইক-পিস্তলসহ গ্রেপ্তার আরও ৫

রাজধানীর মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু ও...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।