বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২

গল্প: শাঁখের করাত

প্রকাশিত:

বিয়ের ক’দিন পরেই নাজমা জুম্মানের চোখে নাজ হয়ে উঠল। বেশ সুর করে ডাকত, ও নাজ, এখন কী হেঁসেলে?
জুম্মানের বয়স ছাব্বিশ, নাজমার চব্বিশ। সুরেলা ডাকের তাৎপর্য নাজ যে সবটুকু হজম করতে পেরেছিল, তা বলা যাবে না। বুদ্ধির ফাঁক গলে অনুভূতির আয়নায় যে ছবি ভেসে উঠত মনের ক্যানভাসে, তাতে নাজ বুঝেছিল, লোকটা তাকে সত্যি সত্যি মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। এমন কী নিজেকে ‘জুম’ বলে ডাকতে জুম্মান জোর দেখিয়েছিল নাজ-এর উপর। সবই রোমাঞ্চঘটিত কাকতালীয়।
বছর তিনেক পরে সংসারের চোরাবালিতে নৌমান আসার ফলে জুমের হিসেব সম্পূর্ণ বিপরীতমুখি হয়ে উঠল। লোক বাড়লে খরচ বাড়বে, তা বহন করতে হবে তাকে, তাই নাজ-এর মনের রাশ টেনে ধরতে বাধ্য হল জুম। প্রতিদিন সূক্ষ্ম হিসেবের খাতায় চোখ রাখতে রাখতে জুম থেকে জুম্মানে ফিরে যেতে খুব বেশি সময় নিল না, অবশ্য নাজকে ফিরিয়ে নিল না পুরনো নামে। কৃপণেরও মন আছে, শরীরের উদ্যোগ মেটাতে নাজমার চেয়ে নাজ নামে অনেক বেশি আধুনিকতা রয়েছে। সেটুকু না থাকলে যেন যৌবনের আঁতুড় ঘরে খিদে মেটানোর সূত্রে একধরণের অভাব থেকে যেতে পারে, জুমের ভিতরের ভাবখানা এমনিই।
সাম্প্রতিক সময়ে সেই নাজমা ওরফে নাজের অবস্থান শাঁখের করাতের মতো, দুদিকেই সমান ধার, যেতেও কাটে, আসতেও কাটে, শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। চোখের সামনে দুবেলা দেখত, বাপছেলে সমান সমান, বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল। এ বৈপরীত্য বাড়িতে লেগে থাকত সকাল বিকেল সন্ধেয়। নৌমানকে কিছুতেই বোঝাতে পারল না নাজ, তার এক কথা, এত একগুঁয়ে হয়ে থাকলে সমাজে চলা যায় না মা। গ্রামে থাকতে গেলে সকলকে মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে, সেটুকু জানে না লোকটা।
নৌমানের বিরুদ্ধে জুমের আস্ফালন ছিল মনে রাখার মতো। নাজকে শুনিয়ে বলত, তুমি কী ভাবছ গেঁটের টাকা ‘অব্যয়’ করে ছেলের সঙ্গে দোস্তি করতে যাব? অনেকবার সাবধান করে দিয়েছি, এভাবে ঘরের খেয়ে বিলের মোষ তাড়াতে যাবি নে। শুনল আমার কথা? ওর জন্যেই তো ক্লাবের ছেলেরা এভাবে মাথায় ওঠার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। ছেলে হয়ে বাপের এ দুঃখ বুঝবে কবে শুনি? ওর মনে কী প্রশ্ন জাগে না, ক্লাবের ছেলেরা কারণে অকারণে টাকার দাবি নিয়ে আমার কাছে আসবে কেন? অনেক কষ্টে জমানো টাকা এভাবে নয়ছয় করা যায় না নাজ।
তাই বলে ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে শুধু শুধু বিরোধে যাবে কেন?
জুমের বুকের গভীরে হাপর চলা শুরু হল। মুখের ওপর না বলে দিলে আর এক বিপদ। গ্রামের মধ্যে তার চাষবাস সবচেয়ে বেশি। মেশিনপত্তর রয়েছে, কখন কী ক্ষতি করে বসে। তবুও মনের তলানিতে জমে থাকা নাজ-এর ওপর নিজের রাগ এতটুকু কমাতে পারল না। ছেলেকে আরেকটু বেশি করে বোঝাতে পারত, তা কেন পারল না নাজ? বাপকা বেটা হলে তো কোনো ঝামেলাই থাকত না। নাজ নিজেই তা বুঝতে চাইল না কোনোদিন। শুধু শুধু ছেলেকে দোষ দিয়ে লাভ কী? জুম হতাশ মুখে বারান্দার উপর বসে থাকল। নানা ঝক্কিঝামেলার বোঝা মাথার ওপর চেপে রয়েছে কয়েক কুইন্টাল ভারী বোঝা হয়ে, সব সামলাতে হবে তাকে, নাজ-এর ফুটুনি আর ছেলের ক্লাবপিরিতি কোনোদিন কোনো কাজে আসে নি, আসবেও না।
কিছুটা লজ্জাবতী নাজ-এর মধ্যে একগুয়েমি ছিল না এতটুকু। গ্রামের বউ হিসেবে জুমের ঘরে আসার পর থেকে সকলের সঙ্গে মানিয়ে চলতে বেশ শিখে ফেলেছিল। সেই চেষ্টায় নানা বাধাবিপত্তি থাকলেও নিজেকে কিছুতেই সরিয়ে নিতে পারেনি। ভারসাম্য ধরে রাখার জন্যে সংসারের ঘাতপ্রতিঘাতে পোক্ত হতে হতে নতুন রাস্তা তৈরি করেও ফেলেছিল— ছেলের কাছে ছেলের মতো, স্বামীর কাছে স্বামীর মতো। সেভাবেই এতদিন চলে এসেছে। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোয় জুম বেশ বুঝে গিয়েছিল, তালবেতাল হলে নাজ ছেলের দিকে ঝুঁকে পড়বেই। আজও মাথায় ঢুকল না, তার খেয়ে, তার সংসারে থেকে নাজ-এর এ দ্বিচারিতা কেন?
দীর্ঘ সংসারযাত্রায় নাজ-এর ভাবনা ঘুরপথে ঘুরতে ঘুরতে শেষপর্যন্ত কেবলমাত্র নৌমানকে স্পর্শ করতে পারল। ছিটমহলের মতো জায়গায় বসবাস, যেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় দায়ভার নেই, সব ঝক্কি সামলাতে হয় ক্লাবের ছেলেদের। টাকা নিয়ে তারা যে মানুষের সেবায় ব্যয় করে, সেই বিশ্বাস নাজ-এর মধ্যে প্রকট হতে হতে পর্বততুল্য হয়ে উঠেছে। তার ছেলে মানুষের উপকারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, অনুভূতির এ তাড়নায় বেশ গর্বিত হত। নৌমানকে সমর্থন করতে কথায় কথায় ছলাকলার শেষ রাখত না নাজ। প্রয়োজন হলে আদ্যন্ত মিথ্যে বলে ছেলেকে স্বস্তিতে রাখতে শেষতম চেষ্টা করত। জুমের যত ভয় সেখানেই।
শনিবার রাত করে বাড়িতে ফিরে সন্ধের ঘটনা শুনে জুম নিজেই যেন বাঁধভাঙা জোয়ারের প্রবল জলস্রোত হয়ে উঠতে বাধ্য হল, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, হারামির বাচ্চারা ভেবেছে কী? ক্লাব করে বলেই যা দাবি করবে তাই মেনে নিতে হবে নাকি? আমারও তো অন্য পছন্দ থাকতে পারে, সেই স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই? ‘লাই’ পেতে পেতে বিড়ালগুলো খাবারের থালা থেকে মাছের মুড়ো তুলে নিতে শিখেছে।
শান্ত করার এতটুকু চেষ্টা করল না নাজ, বরং জুমকে উসকে দিয়ে বলল, ঠিক কথাই বলেছ তুমি, এ স্পর্ধা মেনে নিলে মাথায় উঠে বসবে ক্লাবের ছেলেরা। অন্যের টাকায় যেভাবে জমিদারি চালাচ্ছে, তা মেনে নেওয়া যায় না।
উস্কানির শক্তি আগুনের চেয়ে অনেক বেশি, জুম আপন মনে গজগজ করতে শুরু করল। বিড় বিড় করে যা বলল, তা কানে গেল না নাজ-এর। বুঝল, লোকটাকে এখনিই সামলাতে না পারলে হিতে বিপরীত করে দিতে পারে। মাথারাগি মানুষ, অকারণে এককাট্টা হয়ে গেলে কিছুতেই নীচে নামতে চায় না। বিশেষ মসকরার হাসি নাজ-এর দুঠোঁটের ফাঁকে— এমন তেজি পুরুষটা বেশ তো তার মোহিনী মায়ায় রাত হলে পোষা বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে। চাপা স্বরে বলল, প্রতিবাদ করা ভালো কিন্তু ক্লাবের ছেলেদের এভাবে গালমন্দ করে কী ঠিক কাজ করলে?
ওদের কী সতীর বাচ্চা বলতে হবে নাকি? পাড়ার করিম বাঁচল, না মরল তা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে কেন? কেন সব দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে? হারামির বাচ্চারা কত বড়ো বেআক্কেলে, তা একবার ভেবে দেখেছ? বাড়িতে নেই জেনেও কীভাবে সন্ধের পরে তোমার কাছে আসতে পারল এত টাকার দাবি নিয়ে? এটা হুমকি নয়? অপমানিত হওনি তুমি? আমার অপমান হওয়া নিয়ে ভাববে না? মগের মুলুক পেয়েছে নাকি? একটাই পুরানো বুলি শিখে রেখেছে, ছিটমহলে বসবাস, সরকার নেই, সব দায় বাবুদের সামলাতে হয়। তোদের এসব করতে বলেছে কে শুনি? আগেভাগে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে পারত, সুধিয়ে বলতে পারলে মতামত বিনিময় করা সম্ভব হত, ভালোমন্দ জানতে পারতুম। সেই সুযোগটুকু কেন দিতে পারল না? কেবল টাকার দাবি, মনে রেখো নাজ, এ নতুন ধরনের সন্ত্রাস ছাড়া কিছুই নয়। ওই দলে রয়েছে তোমার পেটের ছেলে। বলিহারি এক কুলাঙ্গারকে জন্ম দিতে পেরেছ তুমি। দুদিকের সরকার একটু হাত পা বাড়ালে হারামির বাচ্চারা কবে কাত হয়ে যেত।
নাজ জানত, হাপড়ে পুড়ে যে লোহা লাল হয়, বাইরে আনতে পারলে খুব দ্রুত তার রঙ পাল্টায়, একসময় হাতেও সয়। জুমকে থিতু হওয়ার আরেকটু সময় দিয়ে রান্নাঘর থেকে ঢিল ছোঁড়ার মতো করে বলল, টাকা দেবে না ভালো কথা, তা নিয়ে তোমার সঙ্গে বিরোধে যেতে চাই না, তাই বলে কিসের বাচ্চা বলে গাল দিতে পারো না তুমি।
আবার জুম্মান গর্জে উঠলো, ভালো কথা শোনার শক্তি আছে কী ওইসব হারামি বাচ্চাদের?
ভুলে যেও না, ওই দলে তোমার ছেলেও রয়েছে।
ঢোক গিলে জুমের মন্তব্য, তাই তো। বাপ হারামি হলেই তবে ছেলেকে হারামির বাচ্চা বলা চলে।
জুম থমকে যেতে বাধ্য হল। এতক্ষণ যে ভারিক্কির আকাশে উড়ন্ত বাজপাখি হয়ে ভাসছিল, তা থেকে নামতেই হল মনের তলানিতে। জুমের তো তো মন্তব্য, ঠিক বলেছ নাজ, উপরে থুতু ছিটুলে সবার আগে নিজের গায়ে লাগে।
নাজ-এর মুখে দুষ্টু হাসি ঠিক ডোজ দিতে পেরেছে বলেই। জুম ভীষণ থমথমে, সুপরামর্শ দিলেও নাজকে ঠিকমতো বিশ্বাস করতে মন চাইল না। বড়ো কৌশলী মেয়ে, কথায় ফোঁড়ন দিয়ে তাকে অনেকবার পিছনে ফেলে দিয়েছে। কিছুতেই মাথায় এল না, ছেলের কথা ভেবে নাজ এভাবে ক্লাবঅন্ত হয়ে পড়ল কী করে? গলার স্বর নামিয়ে বলল, নৌমান যে ওদের সঙ্গে রয়েছে, তা নিয়ে তো একটা কথাও বললে না।
নাজ নরম করার সূত্র ধরে ফেলেছিল, নিজের মতো করে আবার বলতে শুরু করল, এভাবে অন্যের ছেলেকে গাল দিতে নেই গো। তুমি যদি নিজের ছেলেকে হারামির বাচ্চা বলতে না পারো, সে কথা অন্যের ছেলেকে বলতে পারো কী? পছন্দ না হলে দিও না, এসব অবাক্যকুবাক্য কেন?
নাজ-এর বিনিয়ে কথা বলার মধ্যে জুম-এর নতুন সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। কথার ফাঁদ পেতে মেয়েটা কী তাকে বশ করতে চাচ্ছে? ভারি বদ মেয়েমানুষ, গাঁটে গাঁটে বিষ, রাগের আগুনে ভালো পানি ঢালতে শিখেছে। গলার স্বর কঠিন করে বলল, অকারণে করিমকে আত্মীয় ভাবতে যাব কেন শুনি? একশ দুশ হলে না হয় ভাবা যেত, একেবারে পাঁচ হাজার।
ছেলে ফিরলে তাকে বুঝিয়ে বলো, কাল থেকে ক্লাবে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দাও। ক্লাবের ছেলেরা একটু পরে আসবে, একটা কিছু তো বলতে হবে। সেই সমস্যা নিয়ে এখনও তো কিছু বললে না। কেমন যেন ভয়ে দুলছি। বলছি কী, অকারণে বিরোধে যেও না বরং বুদ্ধি করে ফিরিয়ে দেওয়া যায় কিনা, তাই নিয়ে ভাবো। টাকার অঙ্ক কমানোর কথাও বলতে পারো, এই যেমন ওরা দাবি করল পাঁচ হাজার, তুমি তা কমিয়ে দুই বা তিনে নামিয়ে দিলে। যে গ্রামে করি ঘর, অর্ধেক আপন অর্ধেক পর। পরের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই গো।
এভাবে ভাবতে বলছ?
তুমি আমার একমাত্র এ, বড়ো দুশ্চিন্তায় পড়ে থাকতে হয়।
জুম কেমন যেন উদাসীন হল, মর্মে মর্মে নাজ-এর জন্যে বিশেষ দুর্বলতায় দুলতে থাকল। এত বকুনি ঝকুনির পরেও মেয়েটা তার ছায়াসঙ্গী হয়ে রয়ে গেছে। আপদে বিপদে ছেড়ে চলে যাবার কোনো বাসনা কখনো প্রশ্রয় দেয় নি। সংকটে স্বামীর জন্যে তার দুর্ভাবনা তো থাকবেই।
‘জাগরণ’ ক্লাবের সভাতে তখন ভীষণ থমথমে পরিবেশ। হারিকেনের আলোয় সকলে মুখোমুখি বসে, মাথার ভিতরে একটাই জট পাকানো অবস্থান, গুরুতর অসুস্থ করিমকে যে কোন মূল্যে বাঁচাতে হবে। তার স্ত্রীর কান্নায় সকলের মন গলে গেছে। ভিতরের সেই গুমোট পরিবেশ পলে পলে আরও ভারী হয়ে উঠছে, সকলের সহানুভূতি গভীরতর হয়ে উঠল অসুস্থ করিমকে কেন্দ্র করে। অর্থের অভাবে করিমের কপালে কতটা দুর্যোগের মেঘ জমতে পারে, সেই চিন্তায় সকলে মগ্ন ছিল। পরস্পর মতামত বিনিময় পর্বে বিক্ষিপ্ত মন্তব্য করা শুরু হল।
সেলিম বলল, করিমকে কিছুতেই মরতে দিতে পারি না।
সমীর বলল, ছিটমহলে সরকার নেই কিন্তু আমরা আছি, ওকে সারিয়ে তুলতেই হবে।
সোমনাথের মন্তব্য, বৌদি ভীষণ ভেঙে পড়েছে।
হার্দিক সমর্থনে হালিমের কথা, সেটাই স্বাভাবিক।
আমানের প্রশ্ন, আমরা কী ছাতা হিসেবে বৌদির পাশে দাঁড়াতে পারি না?
রহিম বলল, দাঁড়াতেই হবে।
হাসেমের মন্তব্য, করিমদার বিপদে জুম্মানকাকু বিগলিত না হয়ে পারবেন না।
রঘু বলল, গ্রামের সেরা ধনী, করিমদার পাশে দাঁড়ানো উচিত।
এমনি করে উপস্থিত সকলের মননে বাজল যন্ত্রণাক্লিষ্ট করিমের প্রতি আন্তরিকতার সূক্ষ্ম রিদম। মানবিকতার ঝড়ে সমবেত প্রচেষ্টার গভীরে সবার আভ্যন্তরীণ আকুতি ফুল হয়ে ফুটে উঠল।
‘জাগরণ’ এর সাধারণ সম্পাদক ওহিদুল ধরা গলায় বলতে শুরু করল, জুমকাকু খুব সহজে এ টাকা দিয়ে দিতে পারেন। কী নেই লোকটার? দুটো গম ভাঙানো মেশিন, তিনটে ট্রাক্টর, একটা পাওয়ার টিলার, বিঘে তিরিশ জমি, সবই দোফসলি। বোরো চাষ থেকে প্রতি বছর কয়েকশ মণ ধান গোলায় ওঠে। বিঘে পাঁচেক পুকুর রয়েছে। সব মিলিয়ে মোটা অঙ্কের মনসবদার, তুলনায় সংসারে লোকজন অনেক কম। এক ছেলে এক মেয়ে। গতবছর মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। দেখতে ভালো বলেই তেমন কিছু দিতেও হয়নি। খুব সহজে কাজটা সারতে পেরেছেন। সকলে ভেবেছিল, এক বেলা ভালোমন্দ খেতে পাবে, কিন্তু লোকজন জড়ো করে এমনিই কাঁদতে শুরু করল যে তারাই বলতে বাধ্য হল, যে কোনো মূল্যে কাজটা সেরে ফেলো, এক বেলা খেতে দেওয়া নিয়ে এত ভাবতে হবে না। বিয়ের দিন সকলে অবাক হয়ে দেখল, জামাইকে কিছুই দিতে হয়নি, ছেলের বাপের কাছে একই কান্নার ভনিতায় বেশ ম্যানেজ করে নিতে পেরেছেন।
ছিটমহলের হাড়ুই গ্রামে যে জুম্মান লোকের বাড়িতে গতর নিংড়ে জীবন শুরু করেছিল, সেই লোকটা কর্মদক্ষতার জোরে এখন গ্রামের মধ্যে সেরা সম্পদশালী মানুষ। সেই প্রসঙ্গ উঠলে হেসে বলত, আল্লা দিলে তো কারুর কিছু করার নেই। এ ফোড়নে যে সুপ্ত খোঁচা ছিল, তা বুঝতে কারুর অসুবিধা হত না। কিন্তু কে বা কারা বাধা দিয়েছিল, তা জানত না কেউ। এমন হতে পারে, নিজের বাহাদুরিকে বড়ো করে দেখাতে বানিয়ে বানিয়ে এসব বলত।
একমাত্র ছেলে নৌমান অনার্স গ্রাজুয়েট, সারাদিন ‘জাগরণ’ এর কর্মকাণ্ড নিয়ে পড়ে থাকে। তার ধারণা, মাথার ওপর সরকার নেই বলেই তাদেরকে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তাতেই জুমের যত বিরক্তি, শচীনের চওড়া ব্যাটের মতো। ঘরের খেয়ে বিলের মোষ তাড়ানোর তত্ত্বে তার এতটুকু বিশ্বাস ছিল না। নৌমান ভাবত, মানুষের উপকারে লাগতে না পারলে জীবনে উজ্জ্বল ভাবনা বলে কিছুই থাকে না। সেই পথে জাগরণ-এর কর্মকাণ্ডে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে উঠেছিল সে।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে সম্পাদক ওহিদুল বলল, আমরা সকলে করিমের জীবন বাঁচাতে জুমকাকুর কাছে যেতে পারি যদি নৌমান সম্মতি দেয়। ‘জাগরণ’ জোর করে টাকা আদায়ের বিরুদ্ধে।
তপনের মন্তব্য, এতদিন ক্লাবের সঙ্গে রয়েছে, নৌমান না বলতে পারবে না।
সাব্বির বলল, জুমকাকু না বললে আমাদের সব পরিশ্রম পণ্ডশ্রম হয়ে যাবে।
প্রবীরের মন্তব্য, তাহলে কদিনের মধ্যে করিমের কপাল ভাঙবে।
চাপা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল নৌমানের বুকের গভীর থেকে। একটা পুরানো স্মৃতি তখনও ভেসে ছিল তার মনের ক্যানভাসে। অনার্স গ্রাজুয়েট হবার খবর শুনে বিকেলে বিজয়ের তেলেভাজা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দুটো গরম চপ হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, শুনলুম তুই অনকোর্স পাস করেছিস, খুব গর্বিত হয়েছি রে। মূর্খ করিম অনার্সকে অনকোর্স বলেই উচ্চারণ করতে শিখেছিল।
সম্পাদক ওহিদুল তাড়া দিল, এভাবে চুপচাপ বসে থেকো না নৌমান, একটা কিছু তো বলতে হবে।
এতে বলাবলির কী আছে, করিমদাকে যে কোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে। গলা বুজে এল নৌমানের।
রাত নটার পরে ‘জাগরণ’-এর ছেলেরা দল বেঁধে নৌমানদের বাড়িতে ঢুকল, জুমের মনে হল, নদীবাঁধ ভেঙে জোয়ারের জল ঢুকছে হুড়মুড় করে। ঘরের ভিতরে বিছানার উপরে বসে এতক্ষণ ফাইনাল ছক কষে নিতে ব্যস্ত ছিল। নাজ রান্নাঘরে ভীষণ ব্যস্ত, মনের আকাশে আশ্বিনের অকাল ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডব। নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে ঘোমটা টেনে দ্রুত পায়ে শোবার ঘরে ঢুকে বলল, ছেলেগুলো তো আবার এসেছে।
ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।
মানে?
যা বলার আমিই বলব।
বলছি কী…
আগে বলো, তোমার পুত্তুর ওদের সঙ্গে এসেছে কিনা?
দেখতে তো পাচ্ছি নে।
তা পাবে কেন? দাঁতে দাঁত রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে জুমের মন্তব্য, শুনেছিলুম বাপকা বেটা হয়, এখন দেখছি মাকা বেটাও হতে পারে। একেই বলে আক্কেল গুড়ুম।
নাজ ভেবে পেল না এতগুলো ছেলেকে তার মাথারাগি সোয়ামি কীভাবে সামাল দেবে। সদুত্তর শোনার জন্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। জুমের বিরক্তিকর কটুক্তি, এভাবে অভব্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে কেন?
না মানে…
আবার মানে মানে করছ?
বাধ্য হয়ে নাজ বিলম্বিত পায়ে হেঁসেলে ফিরল। জুমের মানসিক বিরুপতা আনমনে প্রকাশ পেল, একেবারে পেট পাতলা মেয়েমানুষ যা শুনবে ছেলেকে বলা চাই। আমি না থাকলে এ ছেলে যে কোথায় পেত, সেই ভাবনা বদ মেয়েমানুষটার মাথায় নেই। আগেই জেনে ফেলেছিল, নাজ ছেলের পথেই হাঁটছে। হালফিল সময়ে নৌমানের সঙ্গে বার বার নিরিবিলি কথায় তা বুঝে গিয়েছিল জুম। তাই নিয়ে তার যত ভয়। সেই প্রসঙ্গ পাল্টে একগাল হেসে বারান্দায় এসে বলল, আমার ওপর এত বড়ো বোঝা চাপাতে পারলি তোরা?
আর কোনো পথ ছিল না কাকু।
কাল সকালেই দরকার?
নার্সিং হোমে ভর্তি করা জরুরি।
বোঝাটা ভারী হয়ে যাচ্ছে না তো?
এটুকু করুন কাকু, একটা অসহায় প্রাণ বাঁচুক।
আমার খারাপ আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাববি নে?
কী যে বলেন কাকু?
জুম গুম মুখে দাঁড়িয়ে থাকল। মনের ইজেলে সন্ধের ছবিটা ভাসছে। এই সব কিসের বাচ্চারা বাড়িতে ঢুকেছিল টাকা পাওয়ার নামে তম্বি দেখাতে, তারাই এখন ভিজে বিড়াল সেজে মিউ মিউ করতে এসেছে ফাউ ঝোলভাত খাওয়ার লোভে। গাঁটি খসবে তার, ক্লাবের বাবারা হাসবে মন খুলে। যত সব হারামির বাচ্চা… বাক্যটা শেষ করার আগে নাজ-এর কথা আবার মনে পড়ল। মাথা নেড়ে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, আমাকে আরেকটু ভেবে দেখতে দে, নৌমান বাড়িতে ফিরুক, লায়েক ছেলে, ওর পরামর্শ নেওয়া খুব প্রয়োজন।
জাগরণ-এর ছেলেরা খুশি মনে ফিরতে বাধ্য হল, নৌমান ক্লাব অন্ত প্রাণ, তার সম্মতিও নেওয়া হয়ে গেছে, করিমের প্রসঙ্গে কিছুতেই না বলতে পারবে না। ক্লাবে বসে যে দুর্ভাবনা তাদের মাথার ওপর কয়েক কুইন্টাল ভারী বোঝা হিসেবে চেপে বসেছিল, তা হাল্কা হতে হতে তুলোর মানদণ্ডে পরিণত হল। সকলের চিন্তা সরল অঙ্কের মতো বুদ্ধির খাতায় যোগ বিয়োগ গুণ ভাগে দিব্যি মিলে যাচ্ছিল। যে টাকা সংগ্রহ হয়েছে তা দিয়ে এখনিই করিমকে নার্সিংহোমে ভর্তি করে দেওয়া যেতে পারে। অপারেশন শেষ হলে ফিরিয়ে আনার দিনে জুমকাকুর টাকা পেলেই হল। সবার নতুন মূল্যায়ন, বড়ো বিষয় সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত থাকতে থাকতে জুমকাকু বড়ো মনের মানুষ হয়ে উঠেছেন।
নৌমান সব শুনে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল দুঠোঁটের ফাঁকে। তাতে যে গভীরতা ছিল তার তল খুঁজে পেল না কেউ। আলোচনার প্রসঙ্গ শুনে রাত এগারোটার পরে এমন চুপিসারে পড়ার ঘরে ঢুকল যে জুম এতটুকু টের পেল না। সময়ের বিড়ম্বনা ঢাকতে কীভাবে বাড়ির একগুঁয়ে ষাঁড়টাকে এড়িয়ে চলতে হয়, তা বেশ শিখে ফেলেছিল সে। দুকথা শোনানোর ইচ্ছায় জুম জেগে থাকলেও কিছুতেই সেই সুযোগ পেল না। মনের বিরক্তি বাড়তে বাড়তে হিমালয় হয়ে উঠলেও বেডরুমে অসহায় হয়ে বসেছিল। বিছানার এক পাশে মড়ার মতো শুয়ে থাকা নাজ-এর উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলল, এই মেয়েমানুষটাকে সংসারে আনাই সবচেয়ে বড়ো ভুল হয়েছে, একটা ভালো ছেলে পেটে ধরতে পারল না।
রাত একটা, সামনের উঠোন জুড়ে অন্ধকারের লুকোচুরি খেলা। নৌমান পড়ার ঘরে ঘুমে অচেতন, নাক ডাকছে ফরফর শব্দে। সাত পাঁচ ভাবনায় অতিষ্ঠ জুম নিঃশব্দে শোবার ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো, মাথার ভিতরে জটপাকানো ভাবনাগুলো কোপ খাওয়া কেঁচোর মতো কিলবিল করছে। আর থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, প্রতিকার করার প্রতিজ্ঞা সমগ্র হৃদয় জুড়ে। আগেই জেনে ফেলেছিল, চরম সংকটে ছেলে বউ কাউকে সঙ্গে পাবে না সে। বারান্দা থেকে উঠোনে নামল। শুভজিৎ তার ঘনিষ্টতম বন্ধু, পাশের গ্রামে বািড়। সেখানেই যেতে হবে জুমকে। অন্ধকার মাড়িয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
নাজ জেগে উঠে দেখল, বিছানায় জুম নেই, অবচেতন মনে ভয়ের ভাবনা সঞ্চারিত হতে থাকল, ভাবল, টাকার প্রয়োজনে নিশ্চয় পাশের গ্রামে বন্ধুর বাড়িতে গেছে। ছেলে ক্লাব করে, শেষ পয’ন্ত না বলা সম্ভব হবে না বলেই। আগেও বেশ কয়েকবার নিজের দরকার মেটাতে ভোর রাতে বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিল। মনটা ভারী হয়ে উঠল নাজ-এর। হিমেল বাতাস বইছে, ভোরের কুয়াশা ঠেলে এতটা পথ একাকী হেঁটে যাওয়া বেশ কষ্টের। ঠাণ্ডা লাগলেই লোকটা সর্দিকাশিতে ভোগে। বিশেষ কষ্টের বোধ ছ্যাকা দিতে থাকল নাজকে।
প্রায় দেশ কিলোমিটার রাস্তা। জুমের চলার গতি দ্রুততর হল। সামনে ঢাউস মাঠ, তার বুক চিরে চলে গেছে মোরাম রাস্তা। শুভজিৎ নাগের বাড়ির সামনে পৌঁছালো রাতের শেষ প্রহরে। শ্রী নাগ ব্যবসায়ী, এক অর্থে জুমও তাই, আর্থিক লেনদেন সূত্রে দুজনের নিবিড় সখ্যতা, অঙ্কের হিসেব মিল করে তা দিন দিন দৃঢ়তর হয়েছে। জুমের ডাকাডাকির শব্দে শুভজিৎ সামনের গেট খুলে দিয়ে বলল, কী ব্যাপার, এত রাতে?
শুনতে শুনতে শুভজিতের তির্যক মন্তব্য, মগের মুলুক পেয়েছে নাকি? একটা টাকাও দেবে না, বৌদি সঙ্গে রয়েছে তো?
সেটাই সমস্যার।
ভালো করে বোঝাতে পারলে না?
কেন যে এভাবে ছেলের দিকে ঝুঁকে রয়েছে।
ভায়া, আগেই বলেছিলাম, ছেলের প্রতি এত বিশ্বাস রাখা ঠিক নয়। আজকালকার পোলা, বাপের মর্যাদাটুকুও বুঝতে চায় না।
জানো শুভজিৎ, ছেলে রাতদিন ক্লাব নিয়ে পড়ে থাকে।
দুবেলা খায় কোথায়?
আমার বাড়িতে।
নিকুচি করেছি ওই ক্লাবকে, বাপের চেয়ে ক্লাব পিরিতি বড়ো হলো নাকি?
তাহলে কী সিদ্ধান্ত নেব?
যত দিন পারো, আমার এখানে থেকে যাও, হাত বাড়িয়ে সাহায্য করতে যেও না।
অন্য ভয় রয়েছে শুভজিৎ, গ্রামের লোকজন বিপক্ষে চলে যাবে না তো?
ওদের বিরুদ্ধে যাওয়ার কী আছে শুনি?
শুধু অন্ধ বিরোধিতা।
না মানলে তা স্তিমিত হয়ে পড়তে বাধ্য।
জুম অপরিসীম বল পেল ভিতরে। শুভজিৎ সব সময় আপদে বিপদে যথেষ্ট সাহস দিতে পারে যা আত্মিক প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে আছে তার জীবনে। শুভজিতের সাজেশন, সোফাকামবেডে শুয়ে পড়ো ভায়া, ঘুমালে ভাবনার জট সরে পড়তে বাধ্য হবে। কিন্তু জুম সোফায় বসে সাত পাঁচ ভাবনায় ডুবে না থেকে পারল না। দুশ্চিন্তার পাকানো জট সাহায্য করছে জেগে থাকতে।
পরের দিন সকালে জামালপুরের হাট। ছিটমহল জুড়ে এ হাটের যথেষ্ট নাম রয়েছে, সুপ্তাহে দুদিন বসে, সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত। অর্ধেক লোক বাংলাদেশের, বাকি অর্ধেক ছিটমহলের। রাতবিরেতে বিপদ হলে বাংলাদেশের ডাক্তাররাও ঢোকে। দুহাজার দশ সাল পয’ন্ত সেই টানাপোড়েনে এতটুকু ছেদ পড়েনি। ছিটমহল নিয়ে মাঝেমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কথাবার্তা চলেছে কিন্তু ওই পর্যন্তই।
ভাবনাতুর জুম গেস্টরুমে বসে নিজস্ব চেতনার বিশ্লেষণে ডুবে থাকল। ধারেভারে সেরা বলেই গ্রামের বেশকিছু লোক তাকে বেশ সমীহ করে চলে। ফিরে গিয়ে বুঝিয়ে বললে বোধহয় তারা তার সঙ্গে না থেকে পারবে না। যে গ্রামে করি ঘর, অর্ধেক আপন অর্ধেক পর— প্রবাদবাক্য মেনে নিলে খুব বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শুভজিতের কথায় বাড়তি ভরসা পাচ্ছে জুম। মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হল, কিছুতেই নতি স্বীকার করবে না। প্রয়োজন হলে শুভজিতের বাড়িতে কয়েকদিন থেকে মেয়েকে দেখার ছল করে জামাইবাড়িতে চলে যাবে। এভাবে এক সপ্তাহের বেশি সময় পার করতে পারলেই ক্লাবের খচ্চরদের চিন্তার ভাঁঝে মরচে পড়তে শুরু করবে। পুত্তুর রয়েছে ওদেরই সঙ্গে, ওই সময়ে একটু নরম হয়ে কথা বললে নৌমানও তার সমর্থনে চলে আসতে পারে।
একটু পরেই চমকে উঠল হাটমুখো একজনের মন্তব্য শুনে। বেচারা করিমের পেটের টিউমার নাকি রাত তিনটের সময় ফেটে গেছে, একেবারে বেগতিক অবস্থা। ক্লাবের ছেলেরা ডাক্তার ডেকেছিল কিন্তু না সূচক ভাবনা দিয়ে ডাক্তারবাবু ফিরে গিয়েছেন। সম্পাদক ওহিদুল প্রশ্ন করেছিল, তাহলে কী ভাবছেন ডাক্তারকাকু?
সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
জুম মানসিক তাড়নায় দোল খেতে লাগল, মনের নদীতে বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব, উথালপাতাল ঢেউ। শুভজিতকে জানানোর কোনো সৌজন্যবোধ দেখালো না, পায়ে পায়ে গেস্টরুম থেকে সদর রাস্তায় এসে একবার থমকে দাঁড়ালো, এক পলক কী ভাবলো, নতুন বোধোদয়ে বার বার রোমাঞ্চিত হতে থাকল। সূর্য ওঠার আগে তাকে গ্রামে ফিরতেই হবে। অভিনব তাগিদে মুখর না হয়ে পারল না, অনুভূতির গভীরে নতুন চেতনার অপূর্ব নির্যাস। দেরি হয়ে যেতে পারে ভেবেই পাল্লা দিয়ে আধদৌড়ে সামনে এগিয়ে চলল। হাঁপিয়ে উঠছিল ভিতরে ভিতরে। প্রায় মিনিট পঁচিশ লাগল। পশ্চিমের রাস্তা ধরে গ্রামে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেল, করিমের বাড়িতে জনকলরব চলছে। নারীকণ্ঠে একজনের আকুল কান্না পরিবেশকে কেমন যেন ভারী করে তুলছে। করিমের বউ বড়ো ভালো মেয়ে, মন খারাপ হয়ে গেল জুম-এর। বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখল ‘জাগরণ’-এর সম্পাদক ওহিদুল ছলছলে দুচোখ নিয়ে উঠোনের একধারে দাঁড়িয়ে। জুমের দুচোখে টলটলে জল, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরল ওহিদুলকে।
একটা অবরুদ্ধ পরিবেশ। আবেগে আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে জুম বলল, ভোরে উঠে পাশের গ্রামে গিয়েছিলুম রে খোকা কিন্তু এত কষ্ট করেও তো শেষ রক্ষা করতে পারলুম না। সবই কপালরে, তা নে, কাফন দাপন সারতে একটা খরচ তো লাগবে। ওহিদুলের হাতে তিনশ টাকা গুঁজে দিয়ে হনহন পায়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।
বিস্ফারিত চোখে সবাই চেয়ে থাকল জুমের চলে যাওয়া পথের দিকে। রাস্তার বাঁকে সকলের দৃষ্টিপথ থেকে একসময় হারিয়েও গেল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
মুসা আলি
মুসা আলি
শিক্ষক জীবনের ৫৫ বছরে এসে সাহিত্যচর্চা শুরু। ইতিমধ্যে পঞ্চাশের বেশি উপন্যাসের মনসবদার। গল্প উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় কঠোর বিশ্বাসী। এখন বিদগ্ধ পাঠক শুধুমাত্র কাহিনি বা চরিত্র খোঁজেন না বরং তার ভিতরে লেখক এর নিজস্ব গভীর মনন আবিষ্কার করতে চান। ঔপন্যাসিক মুসা আলি দীর্ঘ জীবন পরিক্রমার জাদুতে তার নিজস্ব মনন দিয়ে বাঙালি পাঠককে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ করে তুলতে বদ্ধপরিকর।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

কাঁটাতারে লাঠির সাঁকো

হেমতাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে টোটো চলছিল পকেট রুটের রাস্তা ধরে।...

তিমির অবগুণ্ঠনে/পৃথিবীর মাহসা আমিনিরা – ১ 

আমাদের স্কুলে মেয়েদেরকে উড়না এবং মাথায় ঘোমটা প’রে আসতে...

একবার কোরবানির ঈদে

দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন। সেবারের কোরবানির ঈদে...

পথের গল্প : ১

এবারের গ্রীষ্মের ছুটি চলাকালীন একদিন আমার পার্শ্ববর্তী শহরে একটি...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।