ছোটগল্প: রোপওয়ের‌ আরোহী

গোলোকেশ্বর সরকার
26 মিনিটে পড়ুন
রোপওয়ের‌ আরোহী, চিত্র: থর, টুনস ম‍্যাগ

মঙ্গলবার। গ্রীষ্মকাল। দুপুর দুটো বাজে। টোটো তার নিজস্ব-ছন্দ ছিন্ন করে,নিজস্ব-গতি ভেঙে পাকা রাস্তা ধরে আদিনা থেকে পান্ডুয়ার দিকে এগিয়ে চলছিল। রাস্তা ফাঁকা, সুনসান। অন্যান্য দিন এই জাতীয় সড়ক গাড়ি-ঘোড়াতে ভরতি থাকলেও আজ এই সময়‌ এই রাস্তায় বাস,ট্রাক,বড় গাড়ি,কোনও কিছুই ছিল না। টোটোর ওপর একা বসে ছিল আলেখ্য। আলেখ্য দু’হাতে তার কোলের ওপর একটি ব্যাগ শক্ত করে ধরেছিল। ক্ষতচিহ্নহীন সন্তুষ্ট-রাস্তার বুকে টোটো মসৃণভাবে সামনের দিকে ছুটছিল। রাস্তার দু’পাশে সদ্য যৌবনে-পা-দেওয়া সবুজ গাছের‌ সারি। মাঝে-মধ্যে নিবিড়,ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত ঝোপঝাড় আর লতাপাতা। দূরে কৃষি জমিতে মাথাল মাথায় পরিশ্রমী কৃষক। মাঝে-মাঝে দেখা যাচ্ছিল ক্লান্ত,অবসন্ন পথিককে দেওয়া গাছের পাতার উষ্ণ-অভ্যর্থনা। কম-রাগী রোদ্দুর। ফিনফিন করে ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। ফিনফিনে স্নিগ্ধ হাওয়া ‘টুকটুক’-এর শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিল।‌ শীতল হালকা বাতাসের ছোঁয়া পেয়ে ‘টুকটুক’ অর্থাৎ টোটোর হৃদয়ে আনন্দ ঝরছিল,টোটোর চোখে-মুখে খুশি উপচে পড়ছিল। টোটো একবার রাস্তার এদিক যাচ্ছিল,আর একবার ওদিক যাচ্ছিল।

 আনন্দে ভরা ‘টুকটুক’ রাস্তার মাঝে নর্তকীর মতো হেলে-দুলে কোমর বেঁকিয়ে,কোমর নাচিয়ে ঐতিহাসিক জায়গা পান্ডুয়ার দিকে এগিয়ে চলছিল।

 মাঝ-রাস্তায় মধ্য-বয়সী টোটোওয়ালা মধ্যম স্বরে বাউল গান ধরল, ‘হাতির দাঁতের পালঙ্ক তোর রইবে খালি পড়ে/ যাবি যেদিন শ্মশান ঘাটে বাঁশের দোলায় চড়ে।’ গানটা অনেকটা গাওয়ার পর গান থামিয়ে টুকটুকওয়ালা আলেখ্যর উদ্দেশ্যে বলল,”জানেন দাদা,গাজোল বাসস্ট্যান্ডের পাশে রাস্তার ধারে প্রতি বছরের মতো সেবারও বাংলার লোকগান ‘বাউল’ হচ্ছিল। বহু লোকজন। মাইকে বহুদূর অবধি বাউল গান শোনা যাচ্ছিল। বিজয় নামে এক যুবক ছেলে অনেকটা দূরে সোনার অলংকারে পরিপূর্ণ তার নিজস্ব বড় একটা সোনার দোকানে একা বসে মাইকে বাউল গান শুনছিল। চিত্তহরণ দাস বাউল নামে এক বিখ্যাত বাউল শিল্পী এই বাউল গানটি গাইছিল। মাইকে গানটি শুনতে-শুনতে বিজয় তার সোনায় ভরা দোকানের মধ্যে বুক চাপড়াতে-চাপড়াতে একা-একা‌ বলতে আরম্ভ করেছিল,’হায়,হায়!আমি একদিন মারা যাব! আমার রক্ত-মাংসের এই শরীর একদিন শেষ হয়ে যাবে! প্রতিদিন পরিচর্যা করা আমার সুন্দর দেহ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে! সোনার দোকান,সোনার গহনা,অলংকার সব কিছু ফেলে, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন আমাকে চলে যেতে হবে! হায়রে,হায়।” গানটি শুনে অবিনাশ নামে পাশের এক যুবক খেলনা পুতুল বিক্রেতাও তার দোকানে একাকী বসে নিজে-নিজে বলতে আরম্ভ করেছিল,”আমরা সবাই পুতুল। খেলার পুতুল। আমরা সকলে খেলনা পুতুল।” দোকানের মধ্যে কথাগুলো বলতে-বলতে বিজয় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। জানতে পেরে অবিনাশ এসে দেরি না করে বিজয়কে সঙ্গে-সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারি চিকিৎসায় বেশ কিছুদিন পর বিজয় সুস্থ,স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।” টোটোওয়ালা গাড়ির গতি অনেকটা কমিয়ে দিল। টোটো আস্তে-আস্তে চলতে লাগল। দু’হাতে হ্যান্ডেল মজবুত করে ধরে আলেখ্যর দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে টোটোওয়ালা আবার বলল,”আসলে জানেন দাদা,’মৃত্যু’ হচ্ছে অপ্রতিরোধ্য,মহাপরাক্রমশালী একটি শব্দ। ‘মৃত্যু’ কথাটি শুনলে অনেক বড় বড়-পালোয়ানের ঘাম ঝরতে থাকে, বহু মস্তানের মস্তানি থমকে যায়, জিম করা বডি-বিল্ডারের বডি-প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়।”

 পান্ডুয়া এসে গেল। টোটো দাঁড়িয়ে পড়ল। আলেখ্য টোটোওয়ালাকে বলল,”দাদা,আমার বাড়ি এখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ভেতরের দিকে। পকেট রুটের রাস্তা। আমার বাড়ি পর্যন্ত যাবেন?” টোটোওয়ালা জানাল,”না। আমি ভেতরের দিকে যাব না।” আলেখ্য ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে‌ টোটো থেকে নামল। আলেখ্য তার কাঁধে রাখা ব্যাগটা খুলে ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা কাঁসার ঘটি বের করল। ঘটিটির মুখ একটি কালো পলিথিনের টুকরো দিয়ে মোড়ানো ছিল। কালো পলিথিনের টুকরোটি আবার একটা নাইলনের দড়ি দিয়ে ঘটিটির মুখের সাথে বাঁধা ছিল। আলেখ্য ঘটির এপাশ-ওপাশ,নিচে-ওপরে বেশ তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে দেখল। পর্যবেক্ষণে সন্তুষ্ট হয়ে আবার ঘটিটি ব্যাগের মধ্যে খুব যত্ন সহকারে রাখল। এরপর ব্যাগটিকে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। ম্যানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে টোটো ওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিল। টোটোওয়ালা আলেখ্যকে জিজ্ঞেস করল,”দাদা,কালো পলিথিন দিয়ে ঢাকা কাঁসার ঘটিটির মধ্যে কী আছে বলা যাবে? আপনি ঘটিটির চারদিক খুব ভালো ভাবে দেখলেন,তাই জানতে ইচ্ছে করছে।” আলেখ্য বলল,” ঘটিটির মধ্যে আছে মৃত্যু-পুকুরের জল। ঘটির বাইরে মৃত্যু-কুন্ডের জল চুঁইয়ে পড়েছিল কিনা সেটা দেখছিলাম।” হঠাৎ করে অপ্রত্যাশিত ভাবে ‘মৃত্যু’ কথাটি শুনে টোটোওয়ালার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। দু’চোখে একরাশ আশ্চর্য। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে পড়ল,”মানে!”

- বিজ্ঞাপন -

আলেখ্য বলল,”যে-পুকুরে মানুষকে ফেলে দিলে মানুষ মরে যেত,সেই-পুকুরের জল এটা। সেই মরণ-পুষ্করিণীর জল এটা।”

টোটোওয়ালার হাত-পা ঝিনঝিন করে উঠল। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে লাগল। ক্ষণিকের জন্য তার মস্তিষ্ক কার্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। গলা শুকিয়ে গেল তার। দেরি না করে কোনও মতে টোটো ঘুরিয়ে নিয়ে দ্রুত আদিনার দিকে পালাতে লাগল টোটোওয়ালা।

 পান্ডুয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ভেতরের দিকে উত্তর-পাড়ায় আলেখ্যর পাকা একতলা বাড়ি। আলেখ্য পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোন লাগাল। রিং হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ফোন ধরল। ফোনে আলেখ্য বলল,”সেঁজুতি,আমি পান্ডুয়ায় পৌঁছে গেছি। বাড়ি পৌঁছতে আর কিছু সময় লাগবে?” অপর প্রান্ত থেকে সেঁজুতি বলল,”ঠিক আছে। তুমি তাড়াহুড়ো না করে নিশ্চিন্তে ধীরে-সুস্থে বাড়ি এসো”। আলেখ্য আর কথা না বলে ফোনটা কেটে দিল। রোদ ছিল। ছাতাটা ফুটিয়ে নিয়ে আলেখ্য কাঁধের ব্যাগটা ভালো মতো করে নিয়ে পাকা পকেট রুটের রাস্তা ধরে ধীরে-ধীরে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার পাশে একটা হলুদ শিমুল ফুলের গাছ দেখতে পেল। শিমুল ফুল সাধারণত লাল রঙের হয়। কিন্তু বিরল প্রজাতির এই হলুদ-শিমুল-ফুলের গাছটি কীভাবে যে এখানে হয়েছিল, সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। আলেখ্য শিমুল গাছটির নিচে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁধে মৃত্যু-পুকুরের-জল নিয়ে হলুদ-শিমুল-ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগল। মন ভরে হলুদ-শিমুল-ফুলের অপরূপ রূপ আস্বাদন করল।

আবার সন্তর্পণে পাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল আলেখ্য। সামনে কিছুটা পথ হাঁটার পর আলেখ্য রাস্তার পাশে একটা সুন্দর পার্ক দেখতে পেল। পার্কের সামনে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। পার্কের মধ্যে নানা রকমের গাছপালা, সবুজ ঘাস,ফোয়ারা, হাঁটার রাস্তা, বসার বেঞ্চ ছিল। আলেখ্য দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পার্কটি দেখতে লাগল। পার্কের দরজা খোলা ছিল। আলেখ্য ধীরে-ধীরে পার্কের মধ্যে প্রবেশ করল। পার্কের রাস্তা ধরে পার্কের মধ্যে হাঁটতে লাগল। পার্কের ভেতর দোলনা ছিল। আলেখ্য হাঁটতে-হাঁটতে দোলনার কাছে গেল। দোলনাতে বসল। মৃত্যু-পুকুরের জল ভরা ব্যাগটি কোলে শক্ত ভাবে ধরল। মৃত্যু-পুকুরের জল নিয়ে আলেখ্য দোলনাতে দোল খেতে লাগল।

হাঁটতে-হাঁটতে আলেখ্য বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। দূরে থেকে আলেখ্য দেখতে পেল,সেঁজুতি দরজায় দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সেঁজুতি আলেখ্যর বউ। চার বছর হতে চলল ওদের বিয়ে হওয়া। আলেখ্য ধীরে-ধীরে সেঁজুতির কাছে এসে পৌঁছল। সেঁজুতি ও আলেখ্য একসাথে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের জানালাগুলো বন্ধ ছিল। সেঁজুতি আগে ঘরে ঢুকে জানলাগুলো খুলে দিল। ঘরটির ছাদের ওপর থেকে মাটির তৈরি টেরাকোটার একটি লন্ঠন ঝুলছিল। আলেখ্য ঘরে ঢুকে ব্যাগ থেকে কালো পলিথিনে মোড়া কাঁসার ঘটিটা

- বিজ্ঞাপন -

বের করে হাতে দু’হাতের ওপর নিয়ে বলল,” সেঁজুতি,এই নাও মৃত্যু-পুকুরের জল।”

ঘরের মধ্যে আলেখ্যর দু’হাতে ধরা মৃত্যু-পুকুরের জল। সেঁজুতি দেখতে লাগল‌ আলেখ্যকে।আলেখ্যর মায়া-ভরা‌‌ দু’চোখ,মিষ্টি সুন্দর মুখ,বাঁশীর মতো নাক,কান,পুরু ঠোঁট,লম্বা গলা,সুগঠিত হাত-পা, শোভনীয় হাত-পায়ের আঙুল,গায়ের ফর্সা রং খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মাথা ভরতি আলেখ্যর কালো চুল এক নজরে দেখতে লাগল। মৃত্যু-পুকুরের জল হাতে আলেখ্য তাকিয়ে রইল সেঁজুতির দিকে। সেঁজুতির টানাটানা হরিণের মতো দু’টি চোখ, মনমোহিনী মুখ,কালো চিকণ ভ্রু,তীক্ষ্ণ নাক, সুন্দর কান ও কানের লতি,মুগ্ধকরা-গলা, গোলাপি সরু ঠোঁট, আলেখ্যর স্পর্শ পাওয়া হাত-পা,সরু হাত-পায়ের আঙুল,আকর্ষণীয় গায়ের দুধে-আলতা রং,পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখতে লাগল। সেঁজুতির মাতাল করা মাথার চুল আলেখ্য খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।

 সেঁজুতির বয়স তিরিশ বছর। আলেখ্যর বয়স বত্রিশ বছর। সেঁজুতির বাড়ি মালদা জেলার চাঁচোল শহরে। আর আলেখ্যর বাড়ি বর্ধমান জেলায়। মালদা কলেজে পড়ার সময় প্রেম করে দু’জনের বিয়ে হয়েছিল। আলেখ্যর বাবা-মা মানেনি তাদের বিয়ে। তারা দু’জনে মালদা জেলার পান্ডুয়াতে ঘর বানায়,সংসার পাতে। আলেখ্য এদিককার অনেক কিছু জানে না। অনেক জায়গা চেনে না।

- বিজ্ঞাপন -

 সেঁজুতি ‘তরল-গাছ’ নিয়ে ভীষণ উৎসাহিত হয়ে পড়েছিল। তরল-গাছ হলো বাতাসের কার্বন-ডাই -অক্সাইড শোষণকারি ও অক্সিজেন উৎপাদক এক বিশেষ ধরণের যন্ত্র। তরল-গাছ হলো জল আর সবুজ শ্যাওলার সংমিশ্রণে তৈরি একটি বায়ো-রিঅ্যাক্টর। সার্বিয়া নামক দেশের বেলগ্রেড শহরে প্রথম তরল-গাছ লাগানো হয়েছিল। তরল-গাছ দিয়ে এদেশের কম সবুজ-গাছগাছালি যুক্ত শহরকে দূষণমুক্ত করার জন্য সেঁজুতি চেষ্টা করছিল।

 বৃষ্টি-ঝরা অন্ধকার রাতে সেঁজুতি বলেছিল,”আলেখ্য,লন্ঠনের একটা আলাদা ভাষা আছে,লন্ঠনের একটা অন্যরকম স্বাদ আছে। লন্ঠনের ভেতর মজা রয়েছে,লন্ঠনের মধ্যে নেশা আছে। লন্ঠন স্বামী-স্ত্রীর কাছে খুবই আকর্ষণীয়।” উত্তর দিনাজপুর জেলার কুনোর গ্রামে আগে মাটির ঘোড়া,মাটির হাতি বিখ্যাত ছিল। এক সময় সারা ভারতব্যাপী এগুলোর ব্যাপক চাহিদা ছিল। বর্তমানে এখন আর মাটির ঘোড়া,মাটির হাতি তৈরি হয় না। পরিবর্তে মাটির তৈরি কুলো,প্রদীপ,মাটির তৈরি নারীর অলংকারসহ টেরাকোটার লন্ঠন তৈরি হয়।

সেঁজুতির কথাকে মান্যতা দিতে একদিন আলেখ্য ও সেঁজুতি কুনোর গ্রামে গিয়েছিল এবং সুন্দর দেখে একটা মাটির তৈরি টেরাকোটার লন্ঠন কিনে এনে শোওয়ার ঘরের ছাদে তেলবিহীন‌,ফিতেহীন ভাবে ঝুলিয়ে রেখেছিল।

রোপওয়ের‌ আরোহী
রোপওয়ের‌ আরোহী, চিত্র: থর, টুনস ম‍্যাগ

সেঁজুতি ও আলেখ্য যখন প্রেমে বিভোর হয়ে পড়েছিল,তখন রাস্তার ধারে হলুদ-শিমুল-ফুলের গাছটির নিচে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছিল। হলুদ-শিমুল-ফুলের তত্ত্বাবধানে,শিমুল পাতার সেবা-যত্নে,শিমুল গাছের পাহারায় তাদের প্রেমকে তারা নাবালক থেকে ধীরে-ধীরে সাবালক করেছিল। আলেখ্য আর সেঁজুতি মাঝে-মাঝে পার্কে আসত। পার্কের আনাচে-কানাচে তারা দু’জনে ঘুরে বেড়াত। পার্কের ভেতর হাত-ধরে বসে থাকত। পার্কের মধ্যে থাকা দোলনাতে তারা দু’জন পাশাপাশি বসত। অনেক সময় ধরে তারা দু’জনে দোলনায় দোল খেত। দোল খেতে খেতে সেঁজুতি বলত,”জানো আলেখ্য,দোলনায় থাকে প্রেম,দোলনায় আছে ভালোবাসা। দোলনার দু’দিকের দুটো স্ট্যান্ড পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থেকে প্রেমকে সুরক্ষিত রাখে। দোলনার ওপরের রড প্রেমকে শ্রদ্ধা জানায়। দোলনার শেকল প্রেমকে সাহস যোগায়। দোলনার বসার জায়গা প্রেমকে মর্যাদা দান করে। দোলনার প্রতিটি দোলন প্রেমকে সম্মান জানায়।

 ওদের এখনও সন্তান হয়নি। সেঁজুতি দেখতে খুবই সুন্দরী । ফর্সা দুধে-আলতা গায়ের রং। আলেখ্য বলেছিল,”সেঁজুতি, তোমার ঘন কালো চুলে আছে অরণ্যের গভীর অন্ধকার। তোমার দু’টি চোখ যেন অজন্তা-ইলোরা গুহা। গুহাচিত্রে ভরপুর তোমার দুটো চোখ। চোখের ভ্রু মনে হয় পাহাড়ি সরু রাস্তা,যে-রাস্তায় চলতে গেলে সাবধানে হাঁটতে হয়,নইলে পা হড়কে নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তোমার নাক যেন আরোহনযোগ্য-উচ্চভূমি। তোমার গ্রীবার অলিতে-গলিতে রয়েছে বহু কৃষ্ণ-গহ্বর। তোমার হাসির মধ্যে রয়েছে রাশি-রাশি সাদা-সাদা মেঘ।তোমার সুঢৌল দু’টি গাল যেন বিস্তৃত চাষ-জমি। তোমার গোলাপি রঙের পুরু দুটো ঠোঁটে যেন আছে স্থাপত্য,আছে প্রাসাদ,আছে পর্যটনকেন্দ্র।

 ‌ সেঁজুতির ক্যানসার হয়েছে। স্তন-ক্যানসার। নারীদের যে-স্থানে শিশুদের জন্য দুধ সঞ্চিত থাকে,সেই পবিত্র স্থানে কর্কট রোগ থাবা বসিয়েছে। তিন মাসের কিছু দিন আগে সেঁজুতি সকালবেলা কাজ করছিলেন। হঠাৎ করে সেঁজুতি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গে-সঙ্গে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল তার আলেখ্য। স্থানীয় হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দিয়েছিল যে,এখানে হবে না। কলকাতায়‌ নিয়ে যান। আলেখ্য ঠিক করেছিল,একেবারে ভেলোরে গিয়ে সেঁজুতিকে ডাক্তার দেখাবে। আলেখ্য সেঁজুতিকে ভেলোরে নিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আলেখ্যকে জানিয়ে দিয়েছিল,”সেঁজুতির স্তন-ক্যানসার হয়েছে। আর মাত্র নব্বই দিন বাঁচার সম্ভাবনা আছে। রোগীকে বাড়িতে নিয়ে যান। ভালো মতো সেবা-শুশ্রুষা করুণ।” আলেখ্য ডাক্তারবাবুর হাত ধরে বলেছিল,”ডাক্তারবাবু,আপনাদের তরফ থেকে সেঁজুতি যেন জানতে না পারে যে, সেঁজুতির ক্যানসার হয়েছে এবং আর মাত্র নব্বই দিনের মতো সে বাঁচবে।” হতভাগ্য স্বামীর করুণ আবেদনে সাড়া দিয়ে ডাক্তারবাবু সেঁজুতিকে তার রোগের কথা জানায়নি আর আলেখ্যও সেঁজুতিকে তার ক্যানসার রোগের কথা জানায়নি।

 গতকাল সোমবার রাতের বেলায় সেঁজুতি আলেখ্যকে বলেছিল,” আলেখ্য, আমার একটা ইচ্ছে হয়েছে, সেটা পূরণ করবে?” আলেখ্য বলেছিল, “কী ইচ্ছে সেঁজুতি, বলো। আমি প্রাণপণে সেটা পূরণ করার চেষ্টা করব।” সেঁজুতি বলেছিল,”দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় গঙ্গারামপুরে ‘বাণগড়’ নামে একটি ঐতিহাসিক জায়গা আছে। সেই বাণগড়ে অতীতে ‘বাণরাজা’ থাকত। সেখানে মরণ-কুন্ড নামে একটি পুকুর রয়েছে। সেই মৃত্যু-পুকুরের এক ঘটি জল আমাকে এনে দিতে পারবে?” সেঁজুতি আবার বলেছিল,”আমি যখন কলেজে মালদা কলেজে পড়তাম,তখন একদিন বান্ধবীদের সাথে খুবই আনন্দ করতে-করতে বাণগড়ে গিয়েছিলাম। তখন সেখানে ঘুরতে-ঘুরতে আমি মৃত্যু-পুকুর দেখেছিলাম।”

আলেখ্য মনে-মনে ভেবেছিল,সেঁজুতি আর বেশিদিন বাঁচবে না। এই সময় সেঁজুতির মনের ইচ্ছে তার পূর্ণ করা উচিত। তাছাড়া সেঁজুতি তো এমন অবাস্তব কিছুর জন্য ইচ্ছে প্রকাশ করেনি, যেটা পূরণ করা দুঃসাধ্য। আলেখ্য বলেছিল, “সেঁজুতি, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, আমি আগামি কাল-ই তোমাকে বাণগড়ের মরণ-কুন্ডের এক ঘটি জল এনে দেব।”

আকাশে ধীরে-ধীরে পরদিন মঙ্গলবারের সূর্য দেখা দিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠেছিল আলেখ্য। আকাশটা পরিষ্কার ছিল। কর্মব্যস্ত শহর। সকালে উঠে যে-যার কাজে যাচ্ছিল। আলেখ্য স্নান করে নিয়েছিল। সেঁজুতি বিছানায় শুয়ে ছিল। চোখ দুটো তার বন্ধ করা। আলেখ্য সেঁজুতিকে গিয়ে বলেছিল,”সেঁজুতি,আমি তোমার জন্য মৃত্যু-পুকুরের জল আনতে যাচ্ছি ।” সেঁজুতি চোখ খুলে তাকিয়ে বলেছিল,”ঠিক আছে,যাও। তবে সাবধানে রাস্তা ঘাট পার হবে।” আলেখ্য রওনা হতে যাচ্ছিল,এমন সময় সেঁজুতি বলেছিল,”আলেখ্য, দাঁড়াও।” আলেখ্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সেঁজুতি বিছানা থেকে উঠে একটা ছাতা এনে বলেছিল,”আলেখ্য, ছাতাটা সাথে রাখো। ছাতাটা রোদেও কাজে লাগবে আবার বৃষ্টিতও কাজে লাগবে।” আলেখ্য ছাতাটা নিয়েছিল।

 আলেখ্য একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বাস ধরে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছিল। আলেখ্য কখনও গঙ্গারামপুর আসেনি। মরণ-কুন্ড কোনওদিন দেখেনি। আলেখ্য বাসের মধ্যে সিটে বসে মনে-মনে ভাবছিল,এখন তো গ্রীষ্মকাল। এই সময়ে পুকুরের জল তো শুকিয়ে যায়। মৃত্যু-পুকুরের জল কি পাওয়া যাবে? আলেখ্যর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছিল, আচ্ছা,এখন তো অনেক জায়গায় পুকুর ভরাট করে বড়-বড় পাকা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। মৃত্যু-পুকুর ভরাট করে বাড়ি তৈরি হয়ে যায়নি তো?

আলেখ্যর মনের মধ্যে একটা ভয় হচ্ছিল ,সে কি তার সেঁজুতির শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে পারবে? নইলে অপূর্ণ থেকে যাবে যে সেঁজুতির শেষ ইচ্ছে।

 দু’ঘন্টা বাসযাত্রার পর আলেখ্য গঙ্গারামপুরে এসে পৌঁছেছিল। এখানে আকাশ পরিস্কার। মাথার ওপর সূর্য। বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল না। কিছুটা দূরে অনেক বড়-বড়, আধুনিক গাড়ির ভিড়ে একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালা বিধ্বস্ত, অসহায় ভাবে,কাঁচুমাচু চোখে-মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। আলেখ্য মনে-মনে ঠিক করেছিল, ওই রিকশাওয়ালা যদি তার গন্তব্য স্থলে যেতে রাজি হয়, তবে বর্তমানে উপেক্ষিত,অবহেলিত, দুঃখিত,ব্যথিত রিকশা করেই সেখানে সে যাবে। আলেখ্য রিকশাওয়ালাকে গিয়ে বলেছিল,”দাদা, ঊষা-অনিরুদ্ধের ছায়া-মন্ডপ কোথায়?” রিকশাওয়ালা বলেছিল,” বাণগড়ের মিশন পাড়ায় চারটি পাথরের তৈরি স্তম্ভ রয়েছে। এই চারটি স্তম্ভকে স্থানীয় লোকেরা বলে,চারটি কলাগাছ। বাণরাজার মেয়ে ঊষা ও শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধের বিয়ের ছায়া মন্ডপ এটি।” আলেখ্য বলেছিল, “আপনি ঊষা-অনিরুদ্ধের ছায়া-মন্ডপে নিয়ে যেতে পারবেন?” রিকশাওয়ালা বলেছিল,”ঠিক আছে। উঠে বসুন।” আলেখ্য রিকশাতে উঠে বসেছিল । রিকশা চলতে শুরু করেছিল। আধঘন্টা পর রিকশাওয়ালা চারটে পাথরের স্তম্ভের সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলেছিল,”বাবু,এটাই বাণরাজার মেয়ে ঊষা আর শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধের বিয়ের ছায়া-মন্ডপ।” আলেখ্য সামনের দিকের চারটি পাথরের স্তম্ভ দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আলেখ্য রিকশাওয়ালাকে বলেছিল, “দাদা,আপনি যদি অনেকটা সময় আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন,তাহলে আমি আপনার রিকশা করেই গঙ্গারামপুর বাসস্ট্যান্ডে ফিরে যাব।” রিকশাওয়ালা রাজি হয়ে গিয়েছিল। একটা গাছের ছায়ায় রিকশা দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতে লেগেছিল। ছাতা ফুটিয়ে আলেখ্য মৃত্যু-পুকুরের খোঁজে বের হয়েছিল। পথে এক লোকের সাথে দেখা। আলেখ্য লোকটির কাছে মৃত্যু-পুকুরের অবস্থান জিজ্ঞেস করেছিল। লোকটি বলেছিল, “আমার সাথে চলুন।” আলেখ্য লোকটির সাথে-সাথে চলেছিল। যেতে-যেতে আলেখ্য জেনেছিল,লোকটির নাম রত্নেশ্বর। এখানেই বাড়ি। যেতে-যেতে রত্নেশ্বর জানিয়েছিল,” কথিত আছে, বাণগড়ের বাণরাজা যুদ্ধ-বন্দিদের, মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের বা রাজ্যের বিদ্রোহীদের মরণ-কুন্ড নামক পুকুরটিতে ফেলে দিত। শোনা যায়, মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য পুকুরের জলে নাকি সেই সময় বিষাক্ত ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক ওষুধ মেশানো থাকত। ” কিছুটা পথ যাওয়ার পর রত্নেশ্বর একটি পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আলেখ্যকে পুকুরটি দেখিয়ে বলেছিল,”দাদা,এই সেই মরণ-কুন্ড।” রত্নেশ্বর চলে গিয়েছিল।

আলেখ্য পুকুরটির দিকে তাকিয়ে দেখেছিল,পুকুরে অনেকটা জল। আলেখ্য মনে করেছিল,মৃত্যু-পুকুরের জল কালো হবে। কিন্তু আলেখ্য দেখেছিল,সাধারণ পুকুরের জল যেমন হয়, তেমনই। আলেখ্য ভেবেছিল,পুকুরটি হয়তো কচুরীপানায়‌ ভরতি থাকবে,কিন্তু আলেখ্য লক্ষ করে ছিল,পুকুরে কোনও কচুরিপানা ছিল না। পুকুরের জল একদম পরিষ্কার। আলেখ্য চিন্তা করেছিল, পুকুরের চারপাশ ঝোপঝাড়ে ভরতি থাকবে, ভয়াবহ পরিবেশ থাকবে,কিন্তু সে রকম কিছু দেখতে পায়নি আলেখ্য। আলেখ্য দেখেছিল, মৃত্যু-পুকুরের জলে হাঁস খেলা করছিল। পুকুরের জলে স্থানীয় লোকেরা সাঁতার কাটছিল, স্নান করছিল।

 মৃত্যু-পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে আলেখ্য অবাক হয়ে গেল। সে দেখল,তার কল্পনা করা মৃত্যু-পুকুরের সাথে আসল মৃত্যু পুকুরের কোনও মিল নেই। সে ভেবেছিল, মৃত্যু পুকুর মানে ফাঁকা মাঠের মাঝে একটা পুকুর হবে। আশপাশে মরা কিছু গাছ থাকবে। আশপাশে কোনও জন-প্রাণী থাকবে না। শুনশান করবে জায়গাটা। জায়গাটা দেখলেই ভয় করবে,গায়ে কাঁটা দিয়ে‌ উঠবে।কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল যে, মৃত্যু পুকুরের আশপাশে অনেক বাড়ি তৈরি আছে। বউরা জলে বাসন মাজছে, মেয়েরা জলে স্নান করছে। মরণ-পুকুরের জলে হাঁসেরা খেলা করছে। মৃত্যু-পুকুর মানেই যে একটা ভয় ভীতি সেরকম কোন কিছু কিন্তু আশেপাশের লোকজনদের মধ্যে দেখা গেল না। লোকজনরা আনন্দে, খুশিতে চলাফেরা করছে। আলেখ্য খেয়াল করেছিল,পুকুরে নামার জন্য সিঁড়ি করে দেওয়া আছে।

 পুকুরে কোনও আবর্জনা ছিল না,পুকুরের জল স্বচ্ছ। আলেখ্য ধীরে-ধীরে সিঁড়ির কাছে গিয়েছিল। ব্যাগের ভেতর থেকে ঘটি বের ঘটি হাতে আস্তে-আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেছিল। তারপর পুকুর থেকে এক ঘটি জল তুলে ঘটিটি হাতে নিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছিল।

 মৃত্যু-পুকুরে জল নিয়ে আলেখ্য ওপরে ওঠার জন্য যখন প্রথম সিঁড়িতে পা দিয়েছিল,তখন তার চোখ দিয়ে টপ করে এক ফোঁটা জল পড়েছিল। দ্বিতীয় সিঁড়িতে ওঠার পর টপটপ‌ করে চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করেছিল। তৃতীয় সিঁড়িতে পা দেওয়ার সাথে-সাথে আলেখ্যর দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরতে শুরু করেছিল। চতুর্থ সিঁড়িতে পা দেওয়ার সাথে সাথে আলেখ্যর দু’চোখ দিয়ে অজস্র ধারায় জল ঝরছিল। পঞ্চম সিঁড়িতে পা দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আলেখ্য কেঁদে উঠেছিল।

‌‌ ওপরে উঠে কালো পলিথিন দিয়ে ঘটির মুখ ঢেকে নাইলনের দড়ি দিয়ে পলিথিনটি ভালো করে বেঁধে দিয়েছিল যাতে ঘটির জল বাইরে না পড়ে। ঘটিটি ব্যাগের মধ্যে রেখে ছাতা ফুটিয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে আস্তে-আস্তে হেঁটে-হেঁটে রিকশাওয়ালা কাছে এসেছিল। ছাতা বন্ধ করে খুবই সাবধানে আলেখ্য রিকশার উঠে সিটে বসেছিল। আধ-ঘন্টার‌ মধ্যে রিকশা করে আলেখ্য গঙ্গারামপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর বালুরঘাট থেকে মালদা যাওয়ার বাস গঙ্গারামপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছিল। আলেখ্য মৃত্যু-পুকুরের জল নিয়ে বাসটিতে উঠেছিল। বাসটি ঘন্টা-খানেক যাওয়ার পর আদিনা বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ড্রাইভার স্টার্ট বন্ধ করে দিয়েছিল। কন্ডাক্টর সকল যাত্রীকে এসে জানিয়েছিল,” শ্রমিক সংগঠনের পথ-অবরোধ চলছে। কোনও বাস,ট্রাক, ট্যাক্সি পান্ডুয়ার দিকে যাবে না আর পান্ডুয়ার দিকে থেকে কোনও আদিনার দিকে আসবে না। আপনারা সকলে নেমে পড়ুন।” যদিও জাতীয় সড়ক দিয়ে টোটো-চলা নিষিদ্ধ,তবু অনেক অনুরোধ করার পর জাতীয় সড়ক গাড়ি-শূণ থাকায় শ্রমিক সংগঠনের অনুমতিতে আলেখ্য আদিনা থেকে পান্ডুয়া অবধি একটা টোটো রিজার্ভ করেছিল। টোটোয় উঠে আলেখ্য আদিনা থেকে পান্ডুয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল।

 সেঁজুতি আলেখ্যর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে‌ মৃত্যু-পুকুরের জল নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। আলেখ্য সেঁজুতির হাতে ঘটিটি তুলে দেওয়ার জন্য সেঁজুতির দিকে এগোতে লাগল। ছাদের ওপর থেকে ঝুলন্ত মাটির তৈরি লন্ঠন অসহায় ভাবে ওদের দু’জনকে দেখছিল। সেঁজুতির হাতে মৃত্যু-পুকুরের জল তুলে দিতে আলেখ্যর বুকের ভেতর ফেটে যেতে লাগল। আলেখ্যর শরীরের মধ্যে অজস্র ধারায় কান্না বয়ে যেতে লাগল। দেহের মধ্যে অবিরত অশ্রু ঝরতে লাগল। চোখের জল আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। ভেতরে-ভেতরে নিজেকে সামলে নিয়ে আলেখ্য সেঁজুতির হাতে মৃত্যু-পুকুরের জল তুলে দিল। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে‌ আলেখ্য দ্রুত বাড়ির বাইরে চলে গেল।

 সেঁজুতি ঘটি হাতে ঘটিটির দিকে তাকিয়ে রইল। সেঁজুতির মনে পড়ল,দিনটা ছিল মেঘলা। সকাল থেকে আকাশ মুখ ভার করে ছিল। বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস। সেঁজুতির মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল আকাশের মন-মরা ভাব দেখে। সেঁজুতি মনে-মনে বলছিল,”আকাশের যা অবস্থা,তাতে করে ঋতুপর্ণা বোধহয় আসবে না। তাহলে কি তার মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে না? তাহলে কি চারটি পাথর দিয়ে তৈরি বিয়ের ছায়া-মন্ডপ তার দেখা হবে না?

ঋতুপর্ণা আর সেঁজুতি কলেজ বান্ধবী। দু’জনের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব। দু’জনে মিলে ঠিক করেছিল, তারা গঙ্গারামপুরের বাণগড়ে অবস্থিত পাথরের তৈরি বিয়ের ছায়া-মন্ডপের চারটে কলাগাছ দেখতে যাবে। দু’জনে মিলে দিন ধার্য করেছিল। কিন্তু যাওয়ার দিন যে,আকাশ এমন বিরূপ থাকবে,সেটা ভেবে সেঁজুতির মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। হঠাৎ সেঁজুতির মনটা ভালো হয়ে গিয়েছিল। দূর থেকে সে দেখতে পেয়েছিল, ঋতুপর্ণা আসছিল। মনটা তার খুশিতে ভরে গিয়েছিল। ঋতুপর্ণা এসে বলেছিল,”চল,চল। আর দেরি করা যাবে না।” সেঁজুতি আগের থেকে প্রস্তুত হয়ে ছিল। সময় নষ্ট না করে দু’জনে মিলে বাণগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। বাণগড়ে পৌঁছে তারা দু’জনে মুগ্ধ হয়ে ছায়া-মন্ডপের পাথরের কলাগাছ দেখেছিল। ছায়া-মন্ডপ দেখে খুবই আনন্দ হচ্ছিল সেঁজুতির। একজন স্থানীয় লোক জানিয়েছিল,এখান থেকে কিছুটা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে একটা বহু পুরনো আমলের বিখ্যাত পুকুর রয়েছে। তার নাম-মরণ-কুন্ড। সেঁজুতির খুবই কৌতুহল হয়েছিল মৃত্যু-পুকুর দেখার। উদ্যমী স্থানীয় লোকটা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল আর সেঁজুতি ও ঋতুপর্ণা লোকটির পেছন-পেছন যাচ্ছিল। কিছুটা পথ যাওয়ার পর লোকটি একটি জল ভরা পুকুর দেখিয়ে বলেছিল,”এটা মরণ-কুন্ড। এটাই মৃত্যু পুকুর।” সেদিন বাণগড়ে সেঁজুতি আর ঋতুপর্ণা মৃত্যু-পুকুর দেখেছিল।

 শোওয়ার ঘরের মধ্যে একটা সো-কেস ছিল। সো-কেস বিভিন্ন ধরণের জিনিস সাজানো ছিল। সেঁজুতি আলেখ্যর দেওয়া ঘটিটি নিয়ে ঘরের সো-কেসটিতে সযত্নে রাখল। তারপর সো-কেসের কাঁচ টেনে দিল।

 রাত তখন দুটো। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর আকাশের সূর্য চোখের পাতা বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল। অন্ধকার রাত। গাঢ় অন্ধকার। সারাটা দিন এদিক-ওদিক জোরে-জোরে ঘোরাঘুরি করার পর ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে বাতাস মৃদু-ভাবে বইছিল। আলোকসজ্জা হয়ে আকাশের তারাগুলো আকাশে বিরাজ করছিল।

সেঁজুতি দেখল,আলেখ্য গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিন আলেখ্যর শরীরের ওপর দিয়ে অনেকটা‌ পরিশ্রম গেছে। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় শরীরটা‌ এলিয়ে দিয়ে আলেখ্য চোখ‌ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল। চোখ বন্ধ করে থাকতে-থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে,সেটা আলেখ্য জানে না।

 সেঁজুতি বিছানা থেকে উঠল। আস্তে-আস্তে ঘটিটি নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকল। ঘরের টিউবলাইট জ্বালিয়ে দিল। ঘরের ভেতর পরিষ্কার ফটফটে। ঘরের মধ্যে একটি খাট ছিল। খাটের ওপর জাজিম।‌ তার ওপর একটি তোষক। তোষকের ওপর টানটান করে একটি বিছানার চাদর পাতা ছিল। সেঁজুতি লুডোর- ছক-আঁকা একটি ছোট-টেবিল বিছানার ওপর রাখল। এরপর ঘটিটি নিয়ে খাটের ওপর উঠল।খাটের ওপর বসে ঘটিটি লুডো-খেলার ছক- -আঁকা-ছোট-টেবিলের ওপর রাখল।

ঘরে একা সেঁজুতি আর তার সামনে মৃত্যু-পুকুরের জল। ঘরের বাইরে আশপাশের বাড়িঘর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাঝে-মাঝে অনেক দূর থেকে খুবই অস্পষ্ট ভাবে ট্রেনের ঝিকঝিক ঝিকঝিক……. শব্দ শোনা যাচ্ছিল। দূর থেকে হালকা ভাবে শোনা যাচ্ছিল মালদা জেলার ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা‌ পালাগান।

সেঁজুতি আস্তে-আস্তে ঘটিটির মুখ থেকে দড়ি খুলল। তারপর ঘটির মুখ থেকে পলিথিনটি খুলতে লাগল। ধীরে-ধীরে খুব সাবধানে প্লাস্টিক ছাড়িয়ে যত্ন সহকারে ঘটির মুখটি খুলল সেঁজুতি। ঘটির জল স্থির। সেঁজুতি তার মুখটি আস্তে-আস্তে ঘটির মুখের কাছে নিয়ে যেতে লাগল। সেঁজুতি তার মুখটি ঘটির মুখের কাছে নিয়ে যেতেই মৃত্যু-পুকুরের স্থির জলে ভেসে উঠল সেঁজুতির মুখ। মরণ-পুষ্করিণীর পরিষ্কার জলে ফুটে উঠল সেঁজুতির সমগ্র মুখমন্ডল।

 সেঁজুতি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মৃত্যু-পুকুরের জলে ফুটে ওঠা তার মুখমন্ডলের দিকে। সেঁজুতি মৃত্যু-পুকুরের জলে তার চোখ,নাক,কান,ভ্রু,চোয়াল,গ্রীবা,মাথার চুল, দু’টি পাতলা ঠোঁট ভালো ভাবে দেখতে লাগল। সেঁজুতি মরণ-কুন্ডের জলে তার ‘হাসি’ দেখতে লাগল।

 সেঁজুতি তার ডান হাতের একটি আঙুল দিয়ে আলতোভাবে মরণ-কুন্ডের জল স্পর্শ করল। জলের মধ্যে হালকা ঢেউয়ের সৃষ্টি হলো। ঢেউয়ের সাথে নড়াচড়া করতে লাগল সেঁজুতির মুখমন্ডল। এদিক-ওদিক চলাফেরা করতে লাগল সেঁজুতির মুখ। আবারও আঙুল দিয়ে আলতোভাবে জল-স্পর্শ করল সেঁজুতি।

ঘটির আনাচে-কানাচে আসা-যাওয়া করতে লাগল সেঁজুতির মুখমন্ডল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে মাঝে-মাঝে সেঁজুতি আঙুল দিয়ে জল-স্পর্শ করতে লাগল আর প্রসন্ন মনে মৃত্যু পুকুরের জলের মধ্যে তার মুখমন্ডলের ঘোরাফেরা, হাঁটাচলা দেখতে লাগল।

 সেঁজুতি জল-স্পর্শ করা বন্ধ করল। অল্প সময়ের মধ্যে জল স্থির হয়ে গেল। স্থির হয়ে গেল সেঁজুতির মুখমন্ডল। নড়াচড়া,চলাফেরা, ঘোরাঘুরি,হাঁটাহাঁটি বন্ধ করে দিল সেঁজুতির মুখ। সেঁজুতি জলে-ফুটে-ওঠা তার মুখমন্ডলের দুটো চোখের দিকে তাকাল। মরণ-কুন্ডের জলে ফুটে ওঠা সেঁজুতির মুখমন্ডলের দুটো চোখও সেঁজুতির দিকে তাকাল। সেঁজুতি ও তার জলে ফুটে ওঠা মুখ একে-অপরের সাথে চোখে-চোখ মেলাল। সেঁজুতি অপলক ভাবে তাকিয়ে রইল জলে-ভেসে-ওঠা তার মুখের

দু’টি চোখের দিকে আর জলে-ফুটে-ওঠা সেঁজুতির মুখের দুটো চোখও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেঁজুতির দুটো চোখের দিকে।

 জলে-ভেসে থাকা-মুখমন্ডলের চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে সেঁজুতির দু’চোখ‌ দিয়ে‌ টপটপ করে জল পড়তে লাগল। সেঁজুতির দু’টি চোখের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে জলে-ফুটে ওঠা সেঁজুতির মুখমন্ডলের দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। জলের-মুখের দু’চোখের দিকে স্থির ভাবে চেয়ে সেঁজুতির দুটো চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অবিরাম অশ্রু ঝরতে লাগল, সেঁজুতির চোখের দিকে স্থির ভাবে চেয়ে থাকা জলে-ফুটে-থাকা সেঁজুতির মুখমন্ডলেরও দুটো চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অবিরত অশ্রু পড়তে লাগল। মৃত্যু-পুকুরের জলের মধ্যে দু’টি মুখ একে-অপরের দিকে তাকিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল। অজস্র ধারায় কাঁদতে লাগল………

সমাপ্ত

✍️এই নিবন্ধটি সাময়িকীর সুন্দর এবং সহজ জমা ফর্ম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আপনার লেখা জমাদিন!

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন
পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন। ঊষাতিটি, মেখলা ও হসন্তিকা নামে লেখকের মোট তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। নিয়মিত লিখছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায়। ২০১৫ সালে 'কলকাতা পার্ক সার্কাস লেখক-শিল্পী মহল' থেকে 'ঊষাতিটি' নামক ছোটগল্প বইয়ের জন্য সাহিত্যে স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। এছাড়াও ২০১৯ সালে কলকাতা 'বুলবুল' পত্রিকা আয়োজিত সাহিত্যে 'শহীদউদ্দিন খান' পুরস্কার লাভ করেছেন।
মন্তব্য নেই

প্রবেশ করুন

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

একটি অ্যাকাউন্ট নেই? নিবন্ধন করুন

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

আপনার অ্যাকাউন্টের ইমেইল বা ইউজারনেম লিখুন, আমরা আপনাকে পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার জন্য একটি লিঙ্ক পাঠাব।

আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার লিঙ্কটি অবৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

প্রবেশ করুন

Privacy Policy

Add to Collection

No Collections

Here you'll find all collections you've created before.

লেখা কপি করার অনুমতি নাই, লিংক শেয়ার করুন ইচ্ছে মতো!