মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৯, ২০২২

সম্প্রীতির বার্তাবাহক ও ভারতাত্মার মূর্ত প্রতীক মওলানা আবুল কালাম আজাদ

প্রকাশিত:

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অধ্যায়ে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এক বিশেষ স্থান জুড়ে স্ব মহিমায় বিরাজ করছেন। নিবেদিতপ্রাণ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়েও তার দেহ মন প্রাণ জুড়ে ছিল এক অখণ্ড সর্বধর্ম সমন্বয়ের সম্প্রীতির ভারত বর্ষ যেখানে সবাই মিলেমিশে ভারতীয় হয়ে একসাথে দেশের সেবায় উত্তরণে ঝাঁপিয়ে পড়বে। যেখানে থাকবে না কোন ধর্মীয় ভেদাভেদ বিভাজন বিদ্বেষ থাকবে শুধু একটি পরিচয় খাঁটি ভারতীয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভারতবর্ষের প্রতি ছিলেন একাত্ম, উৎসর্গীকৃত। একনিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ হয়েও মওলানা আবুল কালাম আজাদ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক ভারতীয়র কাছের হয়ে উঠেছিলেন এক জনপ্রিয় সর্বজনবিদিত সর্বজনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, দেশ প্রেমিক, দেশনায়ক। ভারত বিভাজনের পূর্বে প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশকালে বিভিন্ন সময়ে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর আবির্ভাব হয়েছে, যারা একটি স্বাধীন, অখন্ড ও সম্প্রীতির ভারতের স্বপ্ন দেখেছেন। যেসব ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ, তন্মধ্যে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ অন্যতম।যিনি আজীবন স্বপ্ন দেখতেন একটি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন ভারত বর্ষের। তিনি একাধারে কবি, লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবী ও দার্শনিক। মাওলানা আজাদ ছিলেন সকল ধর্ম, গোত্র এবং সম্প্রদায়ের ঐক্যের ভিত্তিতে গঠিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, পারস্পরিক ধর্মীয় সহাবস্থান নিশ্চিত করে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ভারত অর্জন করা সম্ভব। তাই তিনি, তার সমস্ত রাজনৈতিক জীবনে এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে সংগ্রাম করে গেছেন।মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ১৮৮৮ সালে ১১ ই নভেম্বর মক্কায় এক সভ্রান্ত রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ। তাঁর পিতা মৌলানা খয়রুদ্দিন সেকালে আরব, পারস্য ও ভারতবর্ষে ধর্মগুরু হিসেবে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক। তরুণ বয়সে তিনি তার ছদ্মনাম আজাদ ধারণ করেন। তার জনপ্রিয় নাম হল মওলানা আজাদ। তরুণ বয়সে আজাদ দর্শন ও ধর্মের উপর উর্দুতে কবিতা লিখতেন।তিনি মূলত ব্রিটিশ রাজত্ব ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উপর লিখতেন। খিলাফত আন্দোলনের সাথে যুক্ত হবার সময় থেকেই আজাদ মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে আসেন। আজাদ গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের এক চরম ভক্ত হয়ে উঠেন। আজাদ মহাত্মা গান্ধীর ‘স্বদেশী আন্দোলনের’ সমর্থন করেন এবং বিদেশী পণ্য বর্জন করতে মানুষকে আহব্বান জানান। দেশ ভাগের পরেও ভারতে থেকে যান।মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক সংবাদপত্র ধারার রূপকার, কবি, দার্শনিক ও শিক্ষা-সংস্কারক। চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী মৌলানা আজাদ আমৃত্যু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। মহম্মদ আলী জিন্নাহ কতৃক প্রস্তাবিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত-ভাগকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন ভারত-ভাগ ঠেকানোর। কারন, তিনি বিশ্বাস করতেন এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাঁরা উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে বিভাজিত হয়ে আরো সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র দুইটিতে বজায় থাকবে চিরকালীন অশান্তি, উভয় দেশেই বার্ষিক বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দ কমে গিয়ে সামরিক বরাদ্দ বাড়বে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ জনগণ। ভারত-ভাগের এত বছর পরে, তাঁর আশঙ্কাই যেন আজ এই উপমহাদেশের জন্য চির বাস্তবতা। শিক্ষা তথা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট মতামত, তাঁর সততা ও সাহসকে যথাযত সম্মান প্রদর্শন ও স্মরণ করার উদ্দেশ্যে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের জন্মদিন ১১ নভেম্বর ভারতের জাতীয় শিক্ষা দিবস (National Education Day) হিসাবে উদযাপন করা হয়। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন “Maulana is the Emperor of learning. I consider him as a person of the calibre of Plato, Aristotle and Pythagorus.” তিনিভারতের সক্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে সর্বমহলে জনপ্রিয় ও প্রশংসিত ছিলেন। ১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তার নামে কলকাতায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ১৯৯২ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন (মরণোত্তর) খেতাবে ভূষিত করা হয় স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু করেন। তিনিই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্থাপন করেন। অর্থাৎ স্বাধীন ভারতবর্ষে শিক্ষা বিস্তারে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের অবদান অপরিসীম। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষার অধিকার প্রতিটা মানুষের মৌলিক অধিকার পরিণত হোক। সর্বজনীন শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ুক প্রত্যেক ভারতের মধ্যে। একমাত্র পরিপূর্ণ শিক্ষার মধ্যে দিয়ে ভারতের আর্থসামাজিক বিকাশ সম্ভব। আজ ছাড়া ভারতবর্ষজুড়ে এই মহান জাতীয়তাবাদী নেতা সর্বোপরি শিক্ষাবিদ মৌলানা আবুল কালাম আজাদের জন্ম দিবস জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা বর্তমান এই অসহিষ্ণু পরিবেশে চারিদিকে যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মানুষের বিদ্বেষ বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল যখন ধর্মীয় মেরুকরণে ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষের বাতাবরণ ঠিক সেই মুহূর্তে দেশনায়ক স্বাধীনতা সংগ্রামী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলোকবর্তিকা মৌলানা আবুল কালাম আজাদের জীবনচরিত আদর্শ সেবাব্রত দেশাত্মবোধ জনহিতৈষী চিন্তাভাবনা আমাদের বিবেক চেতনা মনুষ্যবোধকে জেগে তুলতে সহায়ক হবে। জাতীয় শিক্ষা দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে এই মহান দূরদর্শী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ, দেশ প্রেমিক, সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক ও শিক্ষাবিদ মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবনাদর্শ আমাদের জীবনের চলার পথে স্মরণ করি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিষ্ঠা সহকারে। তবেই এই সংগ্রামী নায়কের জন্ম দিবস পালনের সার্থকতা ও প্রাসঙ্গিকতা। ভারতবর্ষকে নতুন করে চিনতে জানতে ভারতীয় সংস্কৃতি ঐতিহ্য সম্প্রীতির জল হাওয়াকে আরো বেশি ধাতস্থ করতে বর্তমান এই সংকটের সময়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের চর্চা আলোচনা সর্বোপরি জীবন দর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আলোর দিশারী।

পাভেল আমান
পাভেল আমান
ইংরেজিতে স্নাতক। পেশা শিক্ষকতা। ছাত্রাবস্থা থেকেই লেখালেখির প্রতি আকর্ষণ। বিশেষত কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ বিভিন্ন ফিচার লিখতে অভ্যস্ত। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় উদার আকাশ পত্রিকা। এরপর শব্দসাঁকো, জিলিপি, শারদীয়া আগন্তুক, আলেখ্য, আখর কথা, পত্রিকায় কবিতা প্রকাশিত। আনন্দবাজার পত্রিকা, প্রতিদিন, উত্তরের সারাদিন, পুবের কলম, দিনদর্পন, সাত সকাল প্রভৃতি পত্রিকায় প্রবন্ধ চিঠিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এখনো ভালো লাগে কলমটাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিনিয়ত সৃষ্টিশীলতায় ভেসে গিয়ে ভাব জগতে বিচরণ করে কিছু না কিছু লিখতে। লেখালেখিটা অনেকটা জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। ক্রমশই অনুভূত লেখনিই আমার জীবনের অবশ্যিক অভিব্যক্তি।

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

অন্তঃপুরের মসীকথাঃ রাসসুন্দরী দেবী

"হে পরমেশ্বর তুমি আমাকে লেখাপড়া শিখাও", বোবা কান্নায় ঈশ্বরের...

সাহিত্যে সম্পাদকের ভূমিকা

সম্পাদকের প্রধান কাজ হল, নিরপেক্ষ ভাবে লেখা বিচার করা।...

বাঙালির মনন সঙ্গী দেশ পত্রিকা নবতিবর্ষে পদার্পণ

পরাধীন ভারতবর্ষে ১৯৩৩ সালের ২৪ নভেম্বর দেশ পত্রিকার জন্ম।...

কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক

বিভিন্ন দেশের কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা।...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।