শনিবার, নভেম্বর ২৬, ২০২২

অজয় ভট্টাচার্যের কবিতা

প্রকাশিত:

সেই মেয়েটি

ছোট্ট টিলা থেকে নেমে এলো মেয়েটি, বগলে ছাগলছানা।
ছাগলছানার মতই দুষ্টুমি চোখে মুখে।
পরনে আধময়লা শাড়িটা দেহাতিভাবে গোড়ালির উপরে-
একহাতে সর্ষেফুল নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
শীতের দুপুরের পড়ন্ত আলোর শেষ রশ্মিছটায়
ভেসে যাচ্ছে তার মুখ !
শ্যামলা মেয়েটি এসে শুধালো, বাবু, চামচিকে মসজিদটা দেখেছেন?
চামচিকে মসজিদের সমস্ত আলো গাঁয়ের মেয়েটি কেড়ে নিয়ে,
আমার কাছে এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
আবারও জিজ্ঞাসা করল,”বাবু”, বল্লাল ঢিবি দেখেছেন?
উত্তর দেওয়ার ভাষা আমি পাইনি।
শুধু চোখে চোখ রেখে বলেছি, তোমার বাড়ী কোথায়?
আঙ্গুল উঁচিয়ে মেয়েটি বলল, ঐ আম বাগানের পরের বাগানে।
বিস্মৃতির অতল তলে খুঁজে পেলাম বল্লাল ঢিবি।
ফিরে আসি চামচিকে মসজিদে-
কারুকাজ দেখার ফাঁকে ফাঁকেই খুঁজতে থাকি সেই মেয়েটিকে,
স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যাওয়া সেই মেয়েটিকে!

অপু-দুর্গা

দাঁড়িয়ে আছি বিকেল পাঁচটায় টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের গেটে।
অফিস ফেরত এককাপ গরম চায়ের জন্য।
হাতে জ্বলন্ত সিগারেটটা ধীরে ধীরে শহীদ হয়ে চলেছে।
সম্বিত ফিরল, লাউয়ের কচি ডগার মতো নরম একটা সুরে।
কাকু, একটা পাউরুটি কিনবো,দশটা টাকা দেবে।
তাকিয়ে দেখলাম সাত বা আট বছরের একটা মেয়ে।
মাথার দুপাশে চুলে লাল ফিতের বিনুনি, লজ্জা নিবারণের জন্য রাস্তার ধুলোমাখা একটা ফ্রক পরা।
প্লাষ্টার না করা দেওয়ালের মতো দাঁতের সারি,
আর তার সাথে মায়াবী দুটো চোখ।
মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম,” তোর নাম কি?”
কৌশল্যা।
বলে, বিনা পয়সার একটা মিষ্টি হাসি দিল।
থাকিস কোথায় জিজ্ঞাসা করাতে, আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল।
আমি বললাম, চলতো দেখি।
মেয়েটি হেঁসে বলল, চলো।
মানুষের বসার সিমেন্টের জায়গার উপর সাইনবোর্ড রেখে তলার ফাঁকা অংশটা পিজবোর্ড দিয়ে দশ ফুট বাই দুই ফুটের একটা অস্থায়ী ভঙ্গুর ছাউনি দেখিয়ে অনাবিল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলল, এইটা আমাদের ঘর।
বিকালের পড়ন্ত সূর্য তখন আলু-বোখারা রঙ্গে
রঞ্জিত হয়ে পশ্চিমে ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞাপনের পিছনে ঢলে পড়েছে।
মেয়েটির গলার আওয়াজ পেয়ে ছাউনির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো আদুল গায়ে একটা বছর চারেকের ছেলে, হাতে কাশফুল।
বাঙ্গালীর আবেগতাড়িত কল্পনামনে পৌঁছে গেলাম সত্যজিৎ রায়ের অপু-দুর্গায়।
টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাইশ শতকের অপু-দুর্গাকে।

উমা

চলে গেলি মা’রে তুই,একটি বছরের তরে।
অপেক্ষাতে থাকবো আমি, আবার আসিস ফিরে।।
পরের বছর আসবি যখন, আর দুটো দিন থাকিস তখন।
মায়ের মন কী বাঁধ মানে রে, জামাই ছাড়া মেয়ের যতন।।
নাতি-নাতনী সঙ্গে নিয়ে,আসিস যখন নৌকা ভরে।
পাড়া-পড়শীর আনন্দ দেখে, চোখটা আমার যায় যে জুড়ে।।
বাপের বাড়ী আসিস যখন,কাশ-শিউলির শোভা তখন।
মুচি-মেথর,গরীব-ধনী সবার মুখে তোর আগমনী।।
নীলাকাশে ভাসে মেঘ,পেঁজা তুলোর নৌকা হয়ে।
সরোবরে সরোজ ফোঁটে,তোর আসার পথটি চেয়ে।।
তোর আসার গন্ধ পেয়ে,ভোরাই এ সুর ভরিয়ে।
দোয়েল,কোয়েল,ফিঙ্গে,শ্যামা নেচে যে যায় লেজ উঁচিয়ে।।
তোর আসার সময় হলে, নদীর বুকেও নৌকা দোলে।
পাড়ার ঐ রহিম চাচা, ভাটিয়ালীতে সুর তোলে।।
আমারই মেয়ে যে তুই,সবারি করিস ভালো।
স্বামী- সন্তান নিয়ে, যেন সংসার করে আলো।

আকাশ

আকাশ, একটা নাম।
এ আকাশের বুকে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায় না।
এ আকাশের বুকে হংসবলাকার দল পাখা মেলে উড়ে যায় না।
এ আকাশ- সংস্কৃতে পি.এইচ.ডি সাথে বি.এড্।
এ আকাশ সকালে শিয়ালদা থেকে কাঁচা সবজি কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করে।
এ আকাশ সময় নিয়ে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করে।
এ আকাশ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংসারের দায়িত্ব পালন করে।
এ আকাশ চাকরি পায়নি বলে কোনো অভিযোগ নেই।
এ “আকাশের বাবা প্রান্তিক চাষী।
কোথায় পাবে সে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার জন্য।
সে জানে , তার থেকে কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীরা বেনিয়মে চাকরি পেয়েছে।
ছোট বেলা থেকেই সে শিক্ষা পেয়েছে বাবার কাছে নৈতিকতা ও মানবিকতার পাঠ।
মিছিল মিটিং এ শোনে মন্ত্রীদের কঠোর অনুশাসন ও ফাঁকা প্রতিশ্রুতি।
চাকরি না পাওয়া শিক্ষিত বেকারদের মিছিলে কখনো সে পা মেলায় নি।
ফাটা টালির ঘরে শুয়ে কখনো এ “আকাশ” স্বপ্ন দেখেনি।
সব্জি বিক্রেতা থেকে টিউশন মাষ্টার “আকাশ “অনেক বেশি সমুজ্জ্বল।
এ “আকাশ “স্বপ্ন দেখায় ভবিষ্যৎ কে,নিজে অন্ধকারে থেকেও।
এ “আকাশ” বাতাসে বারুদের গন্ধ থেকেও অক্সিজেন খোঁজে।
ঘুষের রাজ্যে শিক্ষা যেখানে বিক্রি হয়, আগামীটা সেখানে পোড়া রুটি।
এ”আকাশ” গরীব শিক্ষিত বেকারদের প্রতিনিধি।

বেল বরণ

তুমি বিল্ব, ত্রিপত্রের সমাহার।
তুমি একাধারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর।
অপরদিকে পূজা, স্তোত্র ও জ্ঞান।
তোমার মেরুদন্ড সম ডাল সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়।
তোমার ত্রিপত্র দেব-দেবীর তিন নয়নের অধিকারী।
দেবী দুর্গার কপালের ঘামে মর্তধামে তোমার জন্ম।
তোমার কাছেই মাতৃপক্ষে এসে আশ্রয় নেয় উমা।
তোমার পত্র ও শ্রীফলেই সৃষ্টি হয় নবপত্রিকার কলেবর।
তোমার বৃক্ষতলেই হয় দেবীর বোধন।
দেবাদিদেব মহাদেবের মস্তকে শোভা পায় তোমার ত্রিপত্র।
তোমার পত্রে তৈরী মালিকা শোভা পায় দেবীর কণ্ঠে।
বৃক্ষরাজির মধ্যে তুমি অমুর্যাম।
তোমাকে অগ্রাহ্য করে এমন সাধ্য কার !

ওরা কারা

প্রচণ্ড গতিতে উচ্চ শব্দে গাড়ীর হর্ণ বাজিয়ে, রাস্তায় বাইক চালিয়ে যারা যায় তারা কারা ?
মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়ে, বাম্পারের বুকে চাবুক কষে ওরা ঊড়ে চলে।
হাতে-গায়ে উল্কি এঁকে পরিচয় দেয় নিজেদের।
মাথার চুলে রঙিন ছবি আঁকে বিচিত্র বিন্যাসে।
ওরা অঞ্চলের বেকার ছেলেদের দল।
হয়তোবা ওরা স্কুলের লাষ্ট বেঞ্চের ছাত্র ছিল,
এখন ওরা সমাজ সেবা করে।
আর স্কুলের ভালো ছেলে বলে পরিগণিত,
তারা ওদের দেখলে ভ্রু কোচকায়।
ওরা দাদা-দিদির হয়ে নির্বাচনে সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়।
ওরা অঞ্চলের বেকার ছেলেদের দল।
আগে ওরা আডডা মারত গাছতলায়, চায়ের দোকানে,
এখন আর গাছতলা নেই,তাই আডডা মারে দলীয় অফিসের সামনে।
ওরা যে সাপ্লায়ার-
নবজাতকের জন্মগ্রহণ থেকে, মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত।
সংসার জীবনের হাঁসি- কান্না, সবকিছুরই দায়িত্ব
ওরা নিয়েছে।
ওরা যে অঞ্চলের বেকার ছেলেদের দল।
বাৎসরিক যে কোনো পূজো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,
অঞ্চলের মানুষের আনন্দ দানই ওদের একমাত্র লক্ষ্য।
তখন হয়তঃ ওরা হয়ে ওঠে একটু নির্দয়।
আরে ! তখন তো ওরা সদ্য কৈশোর ছেড়ে যুবকে পদার্পণ করেছে।
ওরা তারুণ্যের অগ্রদূত।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
অজয় ভট্টাচার্য
অজয় ভট্টাচার্য
কলকাতায় ১৯৬৪ সালে জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি ,এড্ পাশ। বাংলা বিষয়ে দীর্ঘ সাতাশ বছর শিক্ষকতা করছেন। তার লেখা কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

তৈমুর খানের নির্বাচিত ছয়টি কবিতা

আস্ফালন একা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছি নিরক্ষরসব অক্ষরগুলি মার্জিত নিবেদনে...

জয়িতা ভট্টাচার্যের নির্বাচিত ছয়টি কবিতা

আবহমান যখনই উল বুনিঘর ভুল হয়ে যায়।দুটো কাঠি বলাবলি করে...

আবু আশরাফী’র ছয়টি নির্বাচিত কবিতা

নিস্তব্ধ সান্তনা মাছে মাছ খাবেতুমি কেন খাবে? আসমানে আছে লক্ষ কোটি...

মাজরুল ইসলাম এর ছয়টি কবিতা

জেগে থাকো উৎসর্গ: প্রয়াত কবি নাসিম এ আলম মৃত্যুর খবর...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।