বুধবার, আগস্ট ১৭, ২০২২

অরূপরতন বৃষ্টিবন

প্রকাশিত:

নিবিড় বৃষ্টিবনের ওপর দিয়ে যতদিন পর্যন্ত উড়োজাহাজ উড়ে না গেছে ততদিন পর্যন্ত আমরা এর ওপরের চেহারাটুকু ভালমতো দেখতে পাইনি। যতটুকু আবছায়া দেখা তার কিছুটা হয়তো দূর পাহাড়ের ওপর থেকেই। এই বনের মুকুটের শ্রী দেখার জন্য দেড়শ’ ফুট গাছের মাথায় সহজে বেয়ে ওঠার কোনো কৌশল বনের আদিবাসীদের জানা ছিল না, প্রয়োজনও ছিল না। আমরা নিকট থেকে দেখতে পারিনি এর ঝাঁকড়া সবুজ কেশবিন্যাসের রূপ এবং এই রূপের সঙ্গে ওতপ্রোত মিশে থাকা জীববৈচিত্র্যও।

ভাবতে অবাক লাগে, এমন নিবিড় বনে ১৫ তলা দালানের সমান উঁচু জায়গায় বাস করে বহু প্রজাতির ব্যাঙ যারা কোনো দিন মাটি ছোঁয় না। এরা বংশপরম্পরায় গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়ায়, পদস্খলন হয়ে নিচে পড়ে যায় না কখনো। সারা বন জুড়ে গাছের কাণ্ড থেকে পাতা পর্যন্ত, অর্কিড ছাড়াও দেখা যায় বহু প্রজাতির আনারস জাতীয় গাছ, ব্রোমেলিয়াড। এই গাছের ঢেউ খেলানো পাতার খাঁজে গ্যালন গ্যালন বর্ষার জল জমে থাকে আর তার ভেতরেই বড় হয় ব্যাঙাচি, শামুক। এ ছাড়াও গাছের মুকুটে বাস করে শ্লথ, বানর, সালামান্ডার, পাখি, ইঁদুর, সাপ, ছোট বিড়াল, প্রজাপতি, এমনি অসংখ্য প্রাণি।

2 1 অরূপরতন বৃষ্টিবন
বৃষ্টিবনে নানা ধরনের পরাশ্রয়ী ব্রমেলিয়াড, আনারস-জাতীয় গাছ। ছবি: সংগৃহীত।

বৃষ্টিবন বলতে আমরা সরলভাবে অনুমান করি, যে বনে বৃষ্টিপাতের আধিক্য রয়েছে। এ ধরনের বনে বাৎসরিক বৃষ্টিপাত হওয়া চাই কমপক্ষে ৬০ ইঞ্চি, বেশির পক্ষে ৫০০ ইঞ্চিরও বেশি। আমাদের উপমহাদেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮০ ইঞ্চির কম নয়। অতএব এ দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের বনাঞ্চলও বৃষ্টিবনের অন্তর্গত, যাতে রয়েছে সিলেট ও পার্বত্য চটগ্রামের বনাঞ্চল, সুন্দরবন এবং রাতারগুল জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট। বৃষ্টিবন প্রধানত পৃথিবীর বিষুবীয় অঞ্চলজুড়েই অধিক বিস্তৃত। ব্রাজিলের আমাজন, আফ্রিকার কঙ্গো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপাঞ্চল এবং মাদাগাস্কার ছাড়াও এতে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কিছু বনাঞ্চল।

বৃষ্টিবন, বিশেষত বৃহৎ নিবিড় বৃষ্টিবনগুলো বিক্ষিপ্তভাবে সৃষ্ট সাধারণ বন থেকে অনেক স্বতন্ত্র। এই জটিল এবং অসাধারণ বন সম্পর্কে জানার একটা সহজ উপায় হলো এর কাঠামোর স্তবক বিভাজনগুলো খতিয়ে দেখা।

এই স্তবকগুলির মধ্যে প্রধানতম হল শামিয়ানা বা চন্দ্রাতপ স্তবক (Canopy layer)। এর গাছগুলির মুকুটের উচ্চতা গড়ে ১০০ ফুটের মতো। মেহগনি, সেগুন, বলসা এই স্তবকের গাছ। এখানেই দেখা যায় সবচে বেশি জীববৈচিত্র। আকাশ থেকে এর ছবি নিলে এই চন্দ্রাতপের সাদৃশ্য পাওয়া যাবে হাল আমলের সবুজ কপি ব্রকলির সাথে। এই স্তবকের অধিকাংশ গাছ সালোকসংশ্লেষণের ওপরেই নির্ভর করে বেশি যে কারণে পাতার আকৃতি হয় বড়। অধিকাংশ পাতাই দেখা যায় ডিম্বাকৃতির যা চক্রাকারে সাজালে এক বিন্দুতে এসে মেশে এবং সে কারণে ঘন-সন্নিবিষ্ট পাতার ভেতর দিয়ে বনতলে ২% বেশি আলো পৌঁছুতে পারে না, অর্থাৎ বৃষ্টিবনে বিরাজ করে কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার।

3 1 অরূপরতন বৃষ্টিবন
ইন্দোনেশিয়ায় নির্মিত নান্দনিক ক্যানপি দেখার ব্রিজ, ৩০০ মিটার লম্বা। ছবি: সংগৃহীত।

নিরেট বনের মধ্যে গাছের মৃত্যুর কারণে, কাঠামোগত বা অন্য কোনো কারণে কখনো কিছু জায়গা ফাঁকা হয়ে থাকে। এতে প্রাণিদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলেও কিছু সাপ, কাঠবিড়ালি জাতীয় প্রাণি লাফিয়ে বা উড়ে জায়গাটা অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। ঘন বনে দৃষ্টি চলে না তাই এই স্তবকে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্যে পাখপাখালি ও প্রাণিদের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়, যে কারণে পুরো চন্দ্রাতপ এলাকাই বেশ সরব থাকে। এখন হেলিকপ্টার ছাড়াও নিবিড় অরণ্যের উপরিভাগ দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, বিজ্ঞানীরা গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্যে ব্যবহার করছেন ক্রেন, রোপ-ব্রিজ এবং আধুনিক মই।

পক্ষীচোখে দেখা যায়, ক্যানপি লেয়ারের ওপরে প্রায় ২০০ ফুটের মতো লম্বা কিছু বড় গাছ গলা বাড়িয়ে থাকে। এই অতিউচ্চ বা Emergent Layer-এর গাছে বাস করে বানর, ঈগল, বাদুড়-জাতীয় প্রাণি আর ছোট প্রাণির মধ্যে দেখা যায় প্রজাপতিকে। বৃষ্টিবনের দুর্বল বেলে মাটিতে পোক্ত আস্তানার জন্যে এসব গাছের গোড়ায় প্রায়ই অধিমূল বা বাট্রেস দেখা যায় যা কখনো ১৫ ফুট ব্যসের, উচ্চতাও ১৫ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ‘ক্যাপক’ এ ধরনের এক প্রকার তুলা গাছ। এছাড়া দেখা যায় দীর্ঘ ব্রাজিল নাট গাছও।

ইমার্জেন্ট এবং ক্যানপি লেয়ারের নিচে থাকে আন্ডারস্টোরি (Understory) লেয়ার যেখানে এতো কম আলোক পৌঁছায় যে আলো থেকে খাদ্য সংগ্রহের জন্যে গাছের পাতা হয় আরো অনেক বড়। এসব গুল্ম জাতীয় গাছের উচ্চতা সীমিত থাকে ১২ ফুটের মধ্যেই।

6 অরূপরতন বৃষ্টিবন
বৃষ্টিবনের স্তবকসমূহ। ছবি: সংগৃহীত।

নিবিড় বৃষ্টিবনে বনতল বা ফরেস্ট ফ্লোর (Forest Floor)-এর মাটি থাকে অনুর্বর। এতটাই অনুর্বর যে কোনো কৃষিবিদকে যদি এই মাটির নিউট্রিশান রিপোর্ট দেখানো হয় তবে তিনি হয়তো বলবেন, এমন মাটিতে বড়জোড় কোনো ক্যাকটাস জন্মাতে পারে। এ কারণে বৃষ্টিবনের বনতলকে বলা যায় ‘ভেজা মরুভূমি’ (Wet desert)। সূর্যালোক থাকে না বলে এখানে একটি গাছের পাতা অপকৃষ্ট বা বায়োডিগ্রেডেড হয়ে মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে মাত্র ৬ সপ্তাহ যা স্বাভাবিকভাবে লাগতে পারতো এক বছর। শামুক, স্লাগ ইত্যাদি প্রাণি খুব দ্রুত উদ্ভিদ ও মৃত প্রাণিদেহকে বিশ্লিষ্ট করে কিছুটা নিউট্রিশান ফিরিয়ে দেয় জমিতে যা খুব দ্রুত শোষণ করে নিতে হয় গাছকে, কারণ বৃষ্টির জলে এই পুষ্টি দ্রুত ধুয়ে যেতে পারে।

উষ্ণ, হাওয়া চলাচল বন্ধ, স্যাঁতসেতে অন্ধকার বৃষ্টিবনের অনেক গাছকে আমরা ইন্ডোর-প্ল্যান্ট হিসাবে ব্যবহার করি যার মধ্যে রয়েছে ফিলোডেন্ড্রন, পিস্‌ লিলি, প্রেয়ার প্ল্যান্ট ইত্যাদি। এই বৈরী বনতলেও দেখা যায় কিছু প্রাণি। এশিয়ার বনে দেখা যায় হাতী এবং বাঘ, কঙ্গোতে দেখা যায় গরিলা ও চিতাবাঘ এবং আমাজন অরণ্যে ট্যাপির ও ফুল-চিতা (Jaguar)।

বৃষ্টিবনে স্থান ও খাদ্য নিয়ে দারুণ প্রতিযোগিতা চলে বৃক্ষ ও প্রাণিদের মধ্যে। মাটিতে পুষ্টির অভাবে এখানকার অনেক গাছ মাংসাশী হয়ে পড়েছে যাদের মধ্যে দেখা যায় ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপ এবং কলসি উদ্ভিদ। বায়ু থেকে খাবার সংগ্রহ করার জন্য বড় গাছের শরীরে, শেকড় থেকে পাতা পর্যন্ত আস্তানা নেয় অসংখ্য পরগাছা, অর্কিড। বড় গাছের গা বেয়ে ওঠে অসংখ্য লিয়ানা বা কাষ্ঠল লতা যারা ক্যানপিতে ওঠার পর পত্রপুষ্প ধারণ করে, এক গাছ থেকে আরেক গাছে গিয়ে বংশ বিস্তারে উদ্যত হয়। ইঁদুর, বানর গেছোব্যাংসহ অনেক প্রাণিই এই কাষ্ঠল লতা বেয়ে গাছের চাঁদোয়ায় উঠে যায়।

5 অরূপরতন বৃষ্টিবন
ব্রমেলিয়াডের জলাধারে বাস করে ব্যাঙ-জাতীয় প্রাণি। ছবি: সংগৃহীত।

পৃথিবীর সমস্ত ভূভাগের ৬ শতাংশ বর্ষাবন। তাপ নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী ভূমিকা আছে বলে বর্ষাবনকে বলা হয় দুনিয়ার শীতাতপ নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ ঠান্ডা ও আতপ (heat) নিয়ন্ত্রক। বায়ুমণ্ডল থেকে দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে তা দেহে সংরক্ষণ করে গাছ, ফিরিয়ে দেয় বিশুদ্ধ অক্সিজেন, যেন এরা কাজ করে পৃথিবীর প্রাণিকুলের ফুসফুস হিসাবে। এই বন থেকে আসবাব, বনজ খাবার ইত্যাদি ছাড়াও ২৫% ওষুধ আসে যার ভেতরে আছে ক্যান্সার ও এইডস্‌ জাতীয় অনেক দুরারোগ্য রোগের ওষুধও।

কোনো কোনো বৃষ্টিবনের বয়স প্রায় ১০ কোটি বছরের মতো, অর্থাৎ ডাইনোসররাও এই বনের বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেছে এক সময়। ১০ হাজার বছর আগের বরফ যুগের প্রলয় ঘটানো হিমবাহ বিষুবীয় অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। তাই এই বনে বিবর্তন বা ইভোলিউশান চলেছে অব্যাহতভাবে। অথচ এই বন এখন ধ্বংসের পথে। কৃষিজমি নির্মাণ, রমরমা কাঠের ব্যবসা, গবাদি পশুর প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ইত্যাদি কারণে এই সব বৃষ্টিবন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতি মিনিটে কাটা পড়ছে ২০০০টি গাছ, প্রতি সেকেণ্ডে নষ্ট হচ্ছে ফুটবল মাঠের সমান বনাঞ্চল, প্রতিদিন হারাচ্ছি আমরা গাছ ও প্রাণির ৫০টি প্রজাতি।

এভাবে নির্বনায়ন চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর সমগ্র বনাঞ্চলের ৯০% উজাড় হয়ে যাবে। বন উজাড় হলে তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, পর্বতপৃষ্ঠের বরফ গলে সমুদ্রবক্ষে জলের উচ্চতা বাড়বে, তলিয়ে যাবে অনেক দেশ। এই বন রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে মানুষ, নতুন করে বনায়ন করছে তারা, কিন্তু ১০টি গাছের বদলে লাগানো হচ্ছে মাত্র ১টি গাছ।

ছবি : নেট

১ ওপর থেকে নিবিড় বৃষ্টিবনের ছবি, দেখতে ব্রকলির মতো

২ বৃষ্টিবনে নানা ধরনের পরাশ্রয়ী ব্রমেলিয়াড, আনারস-জাতীয় গাছ

৩ ইন্দোনেশিয়ায় নির্মিত নান্দনিক ক্যানপি দেখার ব্রিজ, ৩০০ মিটার লম্বা

৪ ব্রমেলিয়াডের জলাধারে বাস করে ব্যাঙ-জাতীয় প্রাণি

৫ বৃষ্টিবনের স্তবকসমূহ

Share post:

Subscribe

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

জন্মনিবন্ধনে আর লাগবে না মা-বাবার সনদ

এখন থেকে জন্মনিবন্ধন করতে মা-বাবার জন্মসনদ আর লাগবে না।...

জীবন্ত সেতুর দেশে

বর্ষার মৌসুম। সন্ধ্যা হতেই সুড়সুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ছে...

কবি স্বাগতা ভট্টাচার্যের ছয়টি কবিতা

মায়ের আঁচল মায়ের যত্নে আঁকা নজর ফোঁটা,কপালে চাঁদ হয়ে ভাসতো...

টিপু-প্রীতি হত্যা: সেই বাইক-পিস্তলসহ গ্রেপ্তার আরও ৫

রাজধানীর মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু ও...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।