বুধবার, আগস্ট ১৭, ২০২২

কবি মহম্মদ মফিজুল ইসলাম’র ছয়টি কবিতা

প্রকাশিত:

সে তো আমার মা

চাঁদের চেয়েও স্নিগ্ধ বেশি সে তো আমার মা।
কোটি ব্যথা মোছে যার পরশে সে তো আমার মা।
লক্ষ তারার চেয়েও উজ্জ্বল সে তো আমার মা।
হীরার চেয়েও আরও দামি সে তো আমার মা।

গুলবাগিচার সুগন্ধে ভরা সে তো আমার মা।
মোর জ্ঞানের আলো যে জ্বেলেছে সে তো আমার মা।
বিরামহীন নাড়ির স্পন্দন সে তো আমার মা।
স্নেহ-ভালবাসা আর মায়ায় ভরা সে তো আমার মা।

যাকে ছাড়া একা, যায় না থাকা, সে তো আমার মা।
শত বিপদে রক্ষাকবচ হাতের মুঠোয় সে তো আমার মা।
তুমুল ঝড়েও ঠিক ঠিকানার মাইলফলক সে তো আমার মা।
সবার সেরা, সবার সেরা, সবার সেরা সে তো আমার মা।

যদি পারো ছুঁয়ে দ্যাখো

শব্দের অট্টালিকাগুলো খেলা করে ঘুমন্ত চাঁদের মতো।
যদি থেকে থাকে নৃশংস অনুভূতি।
যদি ঝর্ণা হয়ে নেমে আসে প্রস্তরীভূত অশ্রু
যদি ধ্রুবতারা থেকে ভেসে আসে ধূসর স্রোত
কল্পনার সাম্রাজ্যে চলা তো বারণ নয়।
আকাশের উপর তখন একটা উঁচু সামিয়ানা।
নক্ষত্র সমারোহে দলা বাঁধা অক্ষর তৃষ্ণার জলে কাতর।
যদি তারা হয়ে না জ্বলো
বাধা হয় উড়ে চলা সিঁড়ির দুর্বল ধাপ।
মুঠো ভরে সঙ্গে নিও এক আকাশ মুক্ত বাতাস।
চেনা অলিন্দ থেকে নেমে বেরিয়ে যদি উড়ে আসো পরিযায়ী মেঘ হয়ে
উত্তাল সংগীতের ঝরনা হয়ে নামো যদি এই পৃথিবীতে।
লুকোনো ইশারায় পেতে থাকি একখানা উন্মুক্ত বুক নির্জন দ্বীপে।
নিঃসঙ্গ আলিঙ্গনের আহ্বানে।
সতেজ শীৎকারের ধ্বনিতে আপ্লুত করার আর্তি নিয়ে।
যদি পারো একবার অন্তত ছুঁয়ে দ্যাখো।

জীবন্ত লাশ

গোটা দেশে এখন ওরা-আমরা।
সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্মে-কর্মে, সভা-সমাবেশে, মিছিলে-মিটিং-য়ে,খাদ্যে-পোশাকে।
অদ্ভুত পরিস্থিতি।
ধর্মীয় ভন্ডামী ও নীতিহীন রাজনীতির সাঁড়াশি চাপে
আমরা সবাই যেন এক একটা জীবন্ত লাশ।
স্তব্ধ মানুষের বাক্ স্বাধীনতা।
থেমে গেছে জৈবিক স্পন্দন।
শুকিয়ে গেছে মস্তিষ্কের ঘিলু।
অসহায় ব্যর্থ নড়াচড়া।
অনুভূতিহীন অভিব্যক্তি।
সাম্প্রদায়িকতা নামক গনগনে আগুনে দগ্ধ সবাই।
তার বিষাক্ত লেলিহান শিখা আতঙ্কের অনুসারী।
বারুদে বিস্ফোরণে ঝলসে উঠছে
শান্তিপূর্ণ মানুষের নিথর দেহ।
নাস্তিক আস্তিক সবার জন্যে
হাবিয়া দোজখের আগুনের হাতছানি।

সবটাই কাল্পনিক

সাল, তারিখ, বার উহ্যই থাক।
স্থান নয়া দিল্লির একটি নির্বাচনী প্রচার সভা।
লোকে লোকারণ্য।
গাড়ির কনভয় থেকে নামলেন তিনি।
অভিনন্দন মুখর হল জনতা।
তিনি এগিয়ে চলেছেন গুটি গুটি পায়ে।
উত্তরীয় ও ফুলের মালা উপহার নিচ্ছেন হেসে হেসে।
কেউ কেউ পা ছুঁয়ে প্রিয় নেতাকে প্রণাম করছে।
একজন সবে পা ছুঁয়েছেন–
মুহূর্তেই বিকট বিস্ফোরণ।
ছত্রভঙ্গ জনতা, ভীতসন্ত্রস্ত সবাই।
পাগলের মতো ছুটছে মানুষ দিগ্বিদিকে।
শোনা যাচ্ছে বুক চাপড়ানো আর্তনাদ।
কান্নার রোল আকাশে বাতাসে।
নিমেষে জনপ্রিয় নেতার দেহ ভূলুণ্ঠিত।
শরীর ছিন্নভিন্ন, রক্তস্রোত বইছে চারিদিকে।
বাতাসে বারুদ, পোড়া মাংসের গন্ধ।
ভোরের আলো ফুটতেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বে। নেই। নেতা আর নেই।
শোকস্তব্ধ হল ভারতবাসী।
স্তম্ভিত হল বিশ্ববাসী।
মানবজাতির এত বড় কলঙ্কে মানুষ বিমূর্ত, বাকরুদ্ধ। ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই।
হিংসার রাজনীতির বলি হলেন নেতা।

আমার রবি

আমার রবি প্রাণের রবি যেন আমার নয়ন-তারা।
​আমার রবি গানের রবি ফিরে আয়রে সব পথ-হারা।
​আমার রবি ধ্যানের রবি স্পন্দনে মোর বুক দোলে।
​আমার রবি সুরের রবি সুর মূর্ছনায় পরান ভোলে।

​আমার রবি আলোর রবি কালো নয়কো ভীষণ ফরসা।
​আমার রবি প্রেমের রবি বাঁচা-আশার শেষ ভরসা।
​আমার রবি দর্শনের রবি স্বপ্ন থেকে আজ জাগরণে।
​আমার রবি চেতনার রবি ঝড় তোলে খুশির তুফানে।

​আমার রবি অহিংসার রবি আপন হাতে গাঁথা মালা।
​আমার রবি মুক্তির রবি ডুব সাগরে জুড়ায় জ্বালা।
​আমার রবি সাম্যের রবি পড়লে বাঁধন তুমি নীহারিকায়।
​আমার রবি কাব্যের রবি উজ্জ্বল তুমি জ্যোতি শিখায়।

​আমার রবি চিন্তার রবি ঘুরে ফেরে জীবন-সাঁঝে।
​আমার রবি মননের রবি ধ্যানে-জ্ঞানে হিয়ার মাঝে।
​আমার রবি প্রকৃতির রবি রঙিন হাসি জাগিয়ে তোলে।
​আমার রবি সংস্কৃতির রবি স্নিগ্ধ হাওয়ায় দোদুল দোলে।

​আমার রবি সত্যের রবি দুঃখ ব্যথা মুছি, ওগো প্রিয়।
​আমার রবি মুক্তির রবি তেজে ম্লান যার রক্ত-উত্তরীয়।
​আমার রবি সম্প্রীতির রবি সাহিত্যে সব দুয়ার খোলে।
​আমার রবি সংহতির রবি মাতল বিশ্ব মুক্তি কলরোলে।

নজরুল আমার

নজরুল আমার ‘অগ্নিবীণা’ কণ্ঠে তার হাজার গান।
নজরুল আমার ‘বিষের বাঁশি’ জেল বন্দিদের জয় নিশান।।

নজরুল আমার ‘দোলনচাঁপা’ তরুলতা আর পাতায় ফুলে।
নজরুল আমার ‘ছায়ানট’ নাচে সাথে দুলে দুলে।।

নজরুল আমার ‘ভাঙার গান’ দখিন হাওয়ার গজল গাওয়া।
নজরুল আমার ‘প্রলয়শিখা’ সব শোষিতের বিরাট পাওয়া।

নজরুল আমার ‘পুবের হাওয়া’ দেখেছি যেই বাতায়ন খুলে।
নজরুল আমার ‘সর্বহারা’র সব প্রতিবাদে মম উঠেছে দুলে।

নজরুল আমার ‘সিন্ধু-হিল্লোল’ ঝড় তোলে সাগর জলে।
নজরুল আমার ‘ঝিঙেফুল’ যত্নে রাখি মোর অন্তর তলে।

নজরুল আমার ‘মরুভাস্কর’ ওড়ায় যখন লাল নিশান।
নজরুল আমার ‘নতুন চাঁদ, ভরে বাতাস জুড়ায় বিমান।

নজরুল আমার ‘সুর সাকি’ পান করে সুরের সুরা।
নজরুল আমার ‘গুলবাগিচা’ কাঁদে গো সব তৃষাতুরা।

নজরুল আমার ‘চোখের চাতক’ যেন অন্তরালের অন্তরীপ।
নজরুল আমার ‘শিউলিমালা’ বিপদ-বাতির সিন্ধু-দীপ।

নজরুল আমার ‘ব্যথার দান’ শ্বেতপাথরের তাজমহল।
নজরুল আমার ‘মৃত্যুক্ষুধা’য় মুছায় যেন নীল কাজল।

নজরুল আমার ‘ধূমকেতু’ কখন সে যেন রুদ্রবীণা।
নজরুল আমার ‘নবযুগ’ হাজার দীপ্ত শোকের সান্ত্বনা।

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
জন্ম দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের মাছিভাঙা গ্রামে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একজন সাংবাদিক, গ্রন্থকার, প্রাবন্ধিক, কবি ও চিত্রকর এবং গ্রাফোলজিস্ট।

Share post:

Subscribe

সর্বাধিক পঠিত

আরো পড়ুন
সম্পর্কিত

জন্মনিবন্ধনে আর লাগবে না মা-বাবার সনদ

এখন থেকে জন্মনিবন্ধন করতে মা-বাবার জন্মসনদ আর লাগবে না।...

জীবন্ত সেতুর দেশে

বর্ষার মৌসুম। সন্ধ্যা হতেই সুড়সুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ছে...

কবি স্বাগতা ভট্টাচার্যের ছয়টি কবিতা

মায়ের আঁচল মায়ের যত্নে আঁকা নজর ফোঁটা,কপালে চাঁদ হয়ে ভাসতো...

টিপু-প্রীতি হত্যা: সেই বাইক-পিস্তলসহ গ্রেপ্তার আরও ৫

রাজধানীর মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু ও...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।