বুধবার, নভেম্বর ৩০, ২০২২

গল্প: গরু

প্রকাশিত:

তুই তো খাওয়া হয়ে গেলেই মাঠের দিকে দৌড় দিবি। গোবর খুঁজে বেড়াবি। স্কুলের ভাত খেতে হলে সারাদিন স্কুলে থাকতে হবে। ক্লাস করতে হবে। তা নাহলে খাবার সময় আসবি, গুঁতোগুঁতি করবি। খাওয়া হয়ে গেলেই হাওয়া দিবি, এটা চলবে না।

ইয়াসিন, কালু, টারজান, ভূতো আর কয়েকটা মেয়ে ঘাবড়ে যায়। একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। মন্ডল বাবুর চিৎকারে ভয় পেয়ে যায়।
একটু দূরে থেকে হেড মাস্টারমশাই বললেন,
মন্ডল বাবু, ওরা তো ছেলেমানুষ। ওইভাবে বলবেন না। আমি দেখছি, ওদের খিদে পেয়েছে, এখন ছেড়ে দিন।
-ছেড়ে দিলে হবে না, মাস্টারমশাই!
-আমি তো বলছি, এখন থামুন।

হেড মাস্টারমশাই মন্ডল বাবুকে থামিয়ে দিলেন। মন্ডল বাবু খুব অসন্তুষ্ট হলেন, দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

হেড মাস্টারমশাই বললেন, স্টাফরুমে আসুন। আরও সবাইকে ডেকে নিয়ে তিনি বললেন, ওরা তো ছোট। আমরা তো ব্যাগভর্তি মাইনে পায়। সব নিয়ে যাই। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে একটা টাকাও আমরা খরচ করি না।
প্রয়োজন হলেও দিই না।
মন্ডল বাবু বললেন, খাওয়ার সময় আসে, খাওয়া হলেই চলে যায়।
-আহা, যাক না। কিন্তু স্কুলে তো আসছে। স্কুলের ছায়া তো মাড়াচ্ছে। সবকিছু বাদ দিয়ে দু-চারটে ক্লাস ওরা করে। ওটাই অনেক। একমুঠো ভাত না পেলে ওটুকু তো হত না।‌ একেবারে স্কুলে না যাবার চেয়ে এটাই অনেক।
-তাতে লাভ কি? কিচ্ছু হবে না।
-একটু আলোতেই ওরা জ্বলে উঠতে পারে। কে বলেছে, কিচ্ছু হবে না। সোশ্যালাইজেশন তো হয়। স্কুলের পরিবেশে অটোমেটিক অনেক কিছুই শেখে। ওরা ওদের মতো করেই আসুক। চেষ্টা করতে হবে, যাতে আরও একটু নিয়মিত হয়।

অনেকেই নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটি করতে থাকে। সবাই সহমত হতে পারে না। হেডমাস্টার মশাইয়ের মুখের ওপর কোনও কথা বলতেও পারে না। ফিসফাস চলতে থাকে।

হেড মাস্টারমশাই বললেন, এটা আমার সিদ্ধান্ত। খেতে তো আমরা দিচ্ছি না। স্কুলের খাতায় ওদের নাম আছে। ওদের জীবন অনেকের জীবনের চেয়ে আলাদা। ওরা এখনও একমুঠো ভাত পেলে সব পেয়ে যায়।ওদের স্বপ্ন এখনও ভাত- কাপড়ের আটকে আছে। একটা বড় দেশের বড় কয়েকটা সমস্যার মধ্যে এটাও তো একটা।
চন্দ্রিল বাবু বললেন, হেড মাস্টারমশাই ঠিক কথা বলছেন।
একটু তলিয়ে ভাবতে হবে। ভাত খাওয়ার জায়গা থেকে লোক কমালে অন্ধকার দূর হবে না। তার জন্য আরও কিছুদিন লড়ে যেতে হবে, এই দেশকে।
হেড মাস্টারমশাই বললেন, আমরা ওদের এগিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখি। প্লিজ, সবাই সহযোগিতা করুন। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দেশের একটা বড়ো অংশ এখনও সেই এগিয়ে যাওয়ার আলপনা ছুঁতে পারেনি। কত মানুষ আজও খেতে পায় না, তার খবর আমরা রাখি না। এই দেশটা তো সবার। হাত দিয়ে অরণ্য গড়ে তোলা যায় না। কিন্তু বাগান তো তৈরি করা যায়।
মন্ডল বাবু বললেন, বাগান তো গরু খেয়ে যাচ্ছে, ফসল হবে কিভাবে?
হেড মাস্টারমশাই বললেন, গরু তো স্টাফরুমেও ঢুকে পড়েছে, এটাই বড় সমস্যা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
অবশেষ দাস
অবশেষ দাস
জন্ম: দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা। বাবা গৌরবরণ দাস এবং মা নমিতা দেবী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। দুটোতেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এছাড়া মাসকমিউনিকেশন নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিদ্যানগর কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক। প্রথম লেখা প্রকাশ 'দীপশিখা' পত্রিকার শারদ সংখ্যায়। তাঁর কয়েকটি কবিতার বই: মাটির ঘরের গল্প ( ২০০৪), কিশোরবেলা সোনার খাঁচায় (২০১৪), হাওয়ার নূপুর (২০২০) সহ অজস্র সংকলন ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিমান কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কবিতা চর্চার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের চর্চা সমানভাবে করে চলেছেন। কবি দুই দশকের বেশি কাল ধরে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সংকলনে। বেশকিছুদিন সম্পাদনা করেছেন ছোটদের 'একতারা' সাহিত্য পত্রিকা। এছাড়া আমন্ত্রণমূলক সম্পাদনা করেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক দুটি অন্যধারার প্রতিষ্ঠান 'বাংলার মুখ' ও মেনকাবালা দেবী স্মৃতি সংস্কৃতি আকাদেমি।' তাঁর গবেষণার বিষয় 'সুন্দরবনের জনজীবন ও বাংলা কথাসাহিত্য।' পাশাপাশি দলিত সমাজ ও সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। ফুলের সৌরভ নয়, জীবনের সৌরভ খুঁজে যাওয়া কবির সারা জীবনের সাধনা। সবুজ গাছপালাকে তিনি সন্তানের মতো ভালবাসেন। সুন্দরবন তাঁর কাছে আরাধ্য দেবী। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার ও সম্মান: সুধারানী রায় স্মৃতি পুরস্কার (২০০৪), বাসুদেব সরকার স্মৃতি পদক (২০০৬), রোটারি লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ১০০ ডায়মণ্ড গণসংবর্ধনা (২০০৮), পাঞ্চজন্য সাহিত্য পুরস্কার (২০১০), শতবার্ষিকী সাহিত্য সম্মাননা (২০১১), এশিয়ান কালচারাল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), ডঃ রাধাকৃষ্ণন সম্মাননা (২০১৫), ডি.পি.এস.সি. সাহিত্য সম্মাননা (২০১৮), আত্মজন সম্মাননা (২০১৯), বিবেকানন্দ পুরস্কার (২০১৯), দীপালিকা সম্মাননা (২০১৯), সংহতি সম্মাননা (২০২০), সুকুমার রায় পুরস্কার (২০২০)।

সর্বাধিক পঠিত

গল্প পড়ুন
সম্পর্কিত

কাঁটাতারে লাঠির সাঁকো

হেমতাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে টোটো চলছিল পকেট রুটের রাস্তা ধরে।...

তিমির অবগুণ্ঠনে/পৃথিবীর মাহসা আমিনিরা – ১ 

আমাদের স্কুলে মেয়েদেরকে উড়না এবং মাথায় ঘোমটা প’রে আসতে...

একবার কোরবানির ঈদে

দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন। সেবারের কোরবানির ঈদে...

পথের গল্প : ১

এবারের গ্রীষ্মের ছুটি চলাকালীন একদিন আমার পার্শ্ববর্তী শহরে একটি...
লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।