13.8 C
Drøbak
শুক্রবার, আগস্ট ১২, ২০২২
প্রথম পাতাসাম্প্রতিকঢাকার দুই সিটিতে খেলার মাঠ ২৩৫টি, বেদখল ১৯৩টি!

ঢাকার দুই সিটিতে খেলার মাঠ ২৩৫টি, বেদখল ১৯৩টি!

ঢাকা শহরের খেলার মাঠ বা পার্কের তালিকাটা কাজীর গরুর মতো, যা কেতাবে আছে বাস্তবে নেই। আর যা আছে তার সর্বোচ্চ ১৮% মাঠে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার আছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের এক গবেষণায় এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ আছে ২৩৫টি। সিটি করপোরেশনের মালিকানার বাইরে আরও কিছু মাঠ আছে। এটা হিসাবের কথা। কিন্তু সেই মাঠগুলোর বাস্তব অবস্থা কী?

সিটি করপোরেশনের এই মাঠগুলোর মাত্র ৪২টি মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারে। বাকি মাঠগুলো নানাভাবে দখল হয়ে আছে। শতকরা হিসেবে মাত্র ১৮% মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারেন।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ৬০%। আর সরাসরি সরকারের দখলে আছে ৭%। তবে সিটি করপোরেশনের মালিকানার বাইরের মাঠগুলো ধরলে সর্বোচ্চ ৩০% মাঠ এখনো দখলমুক্ত আছে বলে জানান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক, নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান। কিন্তু সেই মাঠগুলোর সবগুলোতে সাধারণ মানুষ যেতে পারেন না।

মাঠ দখলের করুণ গল্প
দখল করা মাঠে নানা স্থাপনা, ক্লাব, মার্কেট এমনকি হাটবাজার পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। পুরাণ ঢাকায় সিটি করপোরেশনের ধূপখোলা মাঠটি এখন বন্ধ। সেখানে মার্কেট করছে সিটি করপোরেশন নিজেই। তবে খোলা কিছু জায়গা রাখা হয়েছে মাঠের নামে। কিন্তু মার্কেট উঠে গেলে মাঠের বাকি অংশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।

শ্যামলী ক্লাব মাঠটিতে বসানো হয়েছে কাঁচাবাজার, ইরাকি খেলার মাঠেও কাঁচাবাজার বসানো হয়েছে। মিরপুরে হারুন মোল্লা ঈদগাহ আগে ছিল খেলার মাঠ, এখন সেটা দখল করে পাইকারি পণ্যের আড়ত হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। লালমাটিয়া বি ব্লকের নিউ কলোনি মাঠে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। যেটুকু ফাঁকা জায়গা আছে তা শুক্রবারে আবার গাড়ি বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

জেনেভা ক্যাম্প এবং করাইল বস্তির কাছে নবীন সংঘ খেলার মাঠ এবং টি অ্যান্ড টি খেলার মাঠ উভয়ই মাদকাসক্ত ও মাদকদ্রব্য বিক্রেতাদের দখলে। শহীদ পার্ক খেলার মাঠে আসবাবপত্র বিক্রি হয়। রায়েরবাজার বৈশাখী খেলার মাঠ ঢাকা পড়েছে ময়লা আবর্জনায়।

ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড খেলাঘর মাঠ সরকার জমি অধিগ্রহণ করছে। বনানী খেলার মাঠ এবং বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি মাঠকে বাঁশের কাঠামো দিয়ে দোকান ও পার্টি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এরকম আরও অনেক মাঠ দখল এবং মাঠের করুণ মৃত্যুর গল্প আছে ঢাকা শহরে। কোথাও কোথাও মেলার নামে ব্যবসা কেন্দ্রও করা হয়েছে।

নতুন কৌশল
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, “মাঠ দখল করে সরাসরি মার্কেট বা স্থাপনা নির্মাণ ছাড়াও ক্লাবের নামে মাঠ দখলের নতুন কৌশল শুরু হয়েছে। মাঠ ঠিকই আছে, কিন্তু সেটা কোনো ক্লাবের নাম দিয়ে প্রকারান্তরে দখল করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ আর সেই মাঠে যেতে পারেন না।”

উদাহরণ হিসেবে ধানমন্ডি মাঠকে শেখ জামাল ক্লাব মাঠে রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই মাঠটিতে এখন আর সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। আমি উচ্চ আদালতে রিট করে পক্ষে রায় পেয়েও সেটা বন্ধ করতে পারিনি। আদালত অবমাননার অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলাম, বিচারকেরা বিব্রত হয়েছেন।”

তিনি জানান, এই সময়ের আলোচিত তেঁতুলতলা মাঠকে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে মাঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার একমাত্র মাঠ। ১৯৮০ সালে এখানে সরকার শিশু পার্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন এটা মাঠ নয়, পতিত জমি ছিল। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি একের পর এক মাঠ নিয়ে এরকম কাজ করেন, তাহলে মাঠ রক্ষা পাবে কীভাবে?

তার কথা, “যখন উচ্চ পর্যায় থেকে এই কাজ করা হয়, তখন আশপাশে যাদের পেশিশক্তি আছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে, তারাও দখল শুরু করে। তাই হচ্ছে।”

কারা দখল করে?
আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, “এই মাঠ দখল প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ক্ষমতাবান ব্যক্তি, পেশিশক্তির অধিকারীরা জড়িত। আছেন জনপ্রতিনিধিরাও।”

তিনি বলেন, “ধূপখোলা মাঠে সিটি করপোরেশন নিজেই মার্কেট বানাচ্ছে। ধানমন্ডিতে চারটি মাঠ, কিন্তু কোনো মাঠেই সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। আট নাম্বার মাঠে সাধারণের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। কলাবাগান মাঠে নিয়ন্ত্রণ আছে। আবাহনীসহ দুইটি মাঠে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। তাহলে সাধারণের জন্য কোনো মাঠ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “ধানমন্ডি পরিকল্পিত একটি আবাসিক এলাকা। সেখানকার চারটি মাঠই এখন দখল হয়ে গেছে। আমি ওই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে কাউন্সিলরের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি মাঠগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশের ব্যবস্থা করবেন বলেছিলেন, কিন্তু করতে পারেননি। আট নম্বর মাঠ আদালতের নির্দেশে কিছুদিনের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। পরে আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

তার কথা, “যদি খেয়াল করেন, দেখবেন, ধানমন্ডির চারটি মাঠের সঙ্গেই বড় বড় রাজনৈতিক নেতা জড়িত। সাধারণ মানুষ তাই অসহায়। তেঁতুলতলা মাঠের ঘটনা থেকেই বোঝা যায় মাঠ কারা দখল করে।”

তিনি বলেন, “দুই ধরনের লোক মাঠ দখল করছেন। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং আর্থিক ও পেশিশক্তির অধিকারী যারা, তারা। আর বড় দখল দেখে ছোট দখলদারেরা উৎসাহিত হয়। বিভিন্ন এলাকায় মাঠ দখল করে মার্কেট, বাজার, কাঁচাবাজার স্থাপনের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তি এবং তাদের পেছনে আরও বড় শক্তি আছে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র সভাপতি ড. মোহাম্মদ আবদুল মতিন বলেন, “ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উল্টো দিকের পার্কটি এখন বলতে গেলে বন্ধ। ওখানে উন্নয়ন করা হয়েছিল। লোকজনের বসার ও হাঁটার জায়গা করা হয়েছে। এখন নাকি সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং করা হবে। তার উপরে মাঠ হবে। সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের নাকি গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা নেই, তাই এসবের উদ্যোগ। আমি বুঝি না কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।”

তার কথা, “কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কারা মাঠ দখল করে। এটা একটা চক্র। এখানে ব্যক্তি আছে, প্রতিষ্ঠানও আছে। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাসহ নানা ধরনের ক্ষমতা আছে।”

তিনি বলেন, “ঢাকা শহরের চারপাশ হাউজিং কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জলাধার, নদী এসব ভরাট করে তারা ভবন নির্মাণ করছে। সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে তাদের হাতে ধরে ধনী বানানো হচ্ছে।”

শিশুরা কোথায় যাবে?

প্রধানমন্ত্রীর “অনুশাসন” আছে যে, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে দুইটি করে মাঠ থাকতে হবে। কিন্তু কাগজে-কলমেও ঢাকার ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো মাঠ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শহরে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা দরকার। কিন্তু ঢাকা শহরে আছে এক বর্গ মিটারেরও কম।

আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, “এই শহরের নাগরিকদের কথা না ভেবে খোলা জায়গাগুলো দখল করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না।”

মোবাশ্বের হোসেন মনে করেন, “এর ফলে আমরা ভবিষ্যতে একটি হৃদয়হীন ও অসামাজিক প্রজন্ম পাবো। যাদের দুনিয়া হবে টিভি ও মোবাইল ফোন। তারা বাস্তব দুনিয়া চিনবে না। খোলা মাঠ আর সবুজ না থাকলে এক সময় জীবনও থাকবে না।” (সূত্র ডয়চে ভেলে )

অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
editor@samoyiki.com

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
sahitya@samoyiki.com

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।