15.1 C
Drøbak
রবিবার, জুলাই ৩, ২০২২
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্য‘মহাশূন্যে জুরান’ সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

‘মহাশূন্যে জুরান’
সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

শুরু হল কথাসাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহের কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস মহাশূন্যে জুরান। শরিকি বিবাদে পূর্বপুরুষের কড়িবরগার প্রকাণ্ড পাঁচ মহলা বাড়িটা বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাটে উঠে এসেছিলেন জুরানের বাবা। আসার সময় ওই বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি ইট আর দুটো সেগুন কাঠের খড়খড়িওয়ালা জানালা লাগিয়ে নিয়েছিলেন এই ফ্ল্যাটে। সেই জানালা দিয়ে যখন ফুরফুর করে হাওয়া ঢোকে, তখন নাকি সেই হাওয়ার মধ্যে তিনি তাঁর পুরনো বাড়ির গন্ধ খুঁজে পান। সেই গন্ধই তাঁকে টানতে টানতে নিয়ে যায় ছোটবেলায়। তিনি খুঁজে পান তাঁর ছেলেবেলাকার সঙ্গী-সাথীদের। পাঁচ মহলা বাড়ির কানাঘুঁজি অলিন্দে তিনি তখন ছোটাছুটি করেন। চোর চোর খেলেন।একদিন রাত্রিবেলায় লোডশেডিং হয়ে যাওয়ায় সেই জানালা দিয়ে তাকাতেই জুরানের জীবনে এক ঘটল বিপত্তি। কী কী ঘটল? তা জানতে হলে আপনাকে পড়তেই হবে কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক এই উপন্যাস— মহাশূন্যে জুরান।

।।বারো।।

তিতার সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন। দেখলেন, তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। বুঝতে পারলেন, ছেলের খোঁজ নেওয়ার জন্য উনি যখন হুড়মুড় করে নীচে নামছিলেন, তখন তাঁর পিছু পিছু তাঁর বউও নীচে নেমে এসেছিলেন। তার মানে, তাঁর বউ তখন ছেলের জন্য এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, বেরোবার সময় দরজাটা যে টেনে দিতে হয়, সেটাও ভুলে গিয়েছিলেন। অবশ্য এখানে দরজা খোলা রেখে গেলেও কোনও ভয় নেই। কারণ, এ বাড়িতে হুটহাট করে কেউ ঢোকেন না। এমনকী, সেল্‌সগার্ল-বয়রাও না। মেন গেটের সামনে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া আছে। তার পরেও যদি কেউ ঢোকেন, তার জন্য তো সব সময় কেয়ারটেকার ছেলেটা নীচেই বসে থাকে। আর এ বাড়ির কেউই নক না-করে সচরাচর কারও ফ্ল্যাটে ঢোকেন না। সুতরাং ভাবনার কিছু নেই।
উনিও কিছু ভাবলেন না। হাট করে খোলা দরজা দিয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন ভিতরে। আর চৌকাঠ ডিঙোতে না-ডিঙোতেই তিতারের নাকে ভেসে এল কেমন একটা গন্ধ। গন্ধটা তাঁর খুব চেনা। যেন জন্ম-জন্মান্তর ধরে চেনেন। কিন্তু এটা যে কীসের গন্ধ সেটা ঠিক বুঝতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, এটা ছাতিম ফুলের গন্ধ! তার পরেই মনে হল, না না, এটা বকুল ফুলের গন্ধ! আবার পরমুহূর্তেই মনে হল, এটা আসলে অনেক দিন বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা টিনের মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসা খেজুর গুড়ের গন্ধ! তাই কী! নাকি ভরদুপুরে দমকা হওয়ার সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসা ছোটবেলার সেই মন কেমন করা গন্ধ!
তিতার ঠিক বুঝতে পারলেন না। তাই চোখ বন্ধ করে এই গন্ধটা তিনি কোথায় পেয়েছিলেন, সেটা মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল, তাঁদের গ্রামে একবার খুব মারাত্মক বর্ষা হয়েছিল। নদী উপচে জল ঢুকে পড়েছিল গ্রামে। ডুবিয়ে একাকার করে দিয়েছিল খাল-বিল-পুকুর। মাঠ-ঘাট, চাষের জমি। এমনকী রাস্তা-ঘাট, এ বাড়ি ও বাড়ির দাওয়াও।
সে জল কিছুতেই নামছিল না। তখন গ্রামের লোকেরা যে-যার বাড়ির সামনে দিয়ে নালা কেটে কেটে সেই জল বার করে দেওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন। সেই পথটাকে জুড়ে দিয়েছিলেন, তার চেয়েও চওড়া করে কাটা মেঠো রাস্তার বড় নালায়। আর সেই নালায় চার দিক থেকে আসা বৃষ্টির উপচে পড়া প্রবল জলের তোড় যাতে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে, সে জন্য গ্রামের ধার ঘেঁষে সবাই মিলে কেটেছিলেন আধ-মানুষ গভীর চার-পাঁচ হাত চওড়া নৌকোর খোলের মতো একটা নালা।
অমন প্রবল বর্ষা নাকি গত পাঁচ দশকের মধ্যে সেই একবারই হয়েছিল। কিন্তু আবার যদি কোনও দিন এ রকম বীভৎস বৃষ্টি হয়, তাই জল নেমে যাওয়ার পরেও সেই নালাগুলি কেউ আর বোজাননি। সেই নালা দিয়ে বর্ষাকালে যখন জলের ধারা বয়ে যেত, কচিকাঁচা ছেলেরা সেখানে হুটোপুটি করে স্নান করত। গামছা দিয়ে কুঁচোমাছ ধরত। কেউ কেউ আবার জালও ফেলত। সন্ধ্যার পরে পেতে রাখত আঁটু। সারা রাত ধরে পড়া মাছ, পর দিন খুব সকালে এসে নিয়ে যেত।
কিন্তু বর্ষাকাল চলে গেলেই সেই নালা শুকিয়ে যেত। তখন সেই নালার কোল জুড়ে সোনালি রঙের এক অদ্ভুত ধরনের ছোট ছোট লতানো গাছ হত। তাতে খুব ছোট্ট ছোট্ট জংলা ফুল ফুটত। বনকুলের চেয়েও ছোট ছোট এক রকমের ফল হত। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার আগেই দেখা যেত, সেই সাদা-সাপটা ফ্যাকাশে ফুলগুলি ময়ূরের পেখমের রং মেখে কচুরিপানার ফুলের মতো ক্রমশ রঙিন থেকে আরও রঙিন হয়ে উঠছে। দিনের আলো যত কমত, ওই ফুলগুলি থেকে যেন ততই আলো ঠিকড়ে ঠিকড়ে বেরোত। ইশারা করে পথচলতি লোকজনকে ডাকত। আর দিনের বেলায় যে ফলগুলি মুখে দিলেই কাঁচা-তিতকুটে-কষ্টি লাগত, সেই ফলগুলিও তখন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটু একটু করে সুগন্ধী আর সুস্বাদু হয়ে উঠত। এটা বোধহয় সেই গন্ধ!
তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। রাত্রিবেলায় ওই নালার দিকে তাকালে মনে হত, সেই নালায় বুঝি আকাশ থেকে নেমে এসেছে লক্ষ লক্ষ তারা। খুশিতে ডগমগ করছে। খুনসুটি করতে করতে এ ওর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছে। তাদের খুশিতে চারিদিক ঝিকমিক করত। সেই আলো নালার দু’দিকের রাস্তাকেও আলোকিত করে দিত। অথচ সকালের আলো ফুটতে না-ফুটতেই সব ভো ভা। আবার সব আগের মতো। ফুলগুলি হয়ে যেত ফ্যাকাশে আর মন-মরা। আর ফলগুলি হয়ে উঠত মুখে দেওয়া যায় না এমন তিতকুটে, কাঁচা-কষ্টি।
তাই দিনের বেলায় সেই ফলের দিকে কেউ ফিরে না তাকালেও, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফলের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। শুধু তাঁদের গ্রামের লোকেরাই নয়, আশপাশের গ্রামের লোকেরাও টর্চ নিয়ে, হ্যারিকেন নিয়ে দলে দলে এসে বিকেল থেকে ওত পেতে বসে থাকতেন। শুধু তো ফল খাওয়া নয়, এমন বিরল আলোর দৃশ্য চাক্ষুষ করাটাও ছিল তাঁদের কাছে বড় ভাগ্যের ব্যাপার।
কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর কেউই খুব বেশিক্ষণ ওখানে থাকতেন না। কারণ, ওই ফুলের অলৌকিক বাহার আর মন-মাতানো গন্ধই শুধু নয়, ওই ফলের অপূর্ব স্বাদ কেবল মানুষকেই নয়, মোহগ্রস্ত করে কাছে টানত পোকামাকড়, পিঁপড়ে, ঝিঁঝিপোকা থেকে শুরু করে বিষধর সাপ এবং নাম না-জানা নানান কীটপতঙ্গকেও।
ফলে যাঁরা আশপাশ বা দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে আসতেন, তাঁরা কেউই কোনও ঝুঁকি নিতে চাইতেন না। ওই তল্লাটে নালার আশপাশের সব কিছু ফুলের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেলেও, ওই নালার পাশ থেকে একটু সরলেই তো ঘুটঘুটে অন্ধকার। তখন সম্বল বলতে হঠাৎ হঠাৎ বিগড়ে যাওয়া টর্চের আলো, আর তা না হলে, চিমনির উপরে ঘনঘন আছড়ে পড়া দমকা বাতাসে দপ্‌দপ্‌করতে থাকা হ্যারিকেনের নিবু-নিবু আবছা আলো-আঁধার।
ওই নালায় এত ফল হত যে, যে-যতই নিক না কেন, কখনও ফুরোত না। তাই ওই সব লোকেরা চলে যাওয়ার পরেই স্থানীয় গ্রামবাসীরা ফল তুলতে যেতেন। কিন্তু সেই ফল বেশি করে এনে বাড়িতে রাখা যেত না। পর দিন খাবে বলে, প্রথম প্রথম অনেকেই গাদা গাদা করে তুলে আনতেন। কিন্তু সকাল হলেই দেখা যেত, ফল কোথায়! সর্ষের দানার মতো সেই ফলগুলোর শুধু গুঁড়ি গুঁড়ি দানা পড়ে আছে। তাই যাঁরা যেটুকু তুলতেন, সে রাতেই বাড়ির সবাই মিলে সেটুকু খেয়ে ফেলতেন।
অমাবস্যার ঘুটঘুটে রাতে আকাশের বুকে কোটি কোটি তারাকে জ্বলজ্বল করতে দেখেছেন তিতার। হ্যারিকেন নিভিয়ে দেওয়ার পর দেখেছেন, ঘর-বার জুড়ে শত শত জোনাকিকে উড়তে। কিন্তু ওই নালার লক্ষ লক্ষ বিন্দু বিন্দু রং-বেরঙের উজ্জ্বল ফুলগুলোকে দেখে তিনি আর চোখ ফেরাতে পারতেন না। মনে হত, তাঁকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছে, আয়, কাছে আয়। কাছে আয়।
ওদের সেই ডাক এমন অমোঘ যে, উনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারতেন না। বাবা-কাকারা শত ফল এনে দিলেও, নিজের হাতে একটা ফল তোলার জন্য যেন ছটফট করতেন।
টর্চ নিতে গেলে যদি কেউ দেখে ফেলে! সন্দেহ করে! জানাজানি হয়ে যায়! তাই এক রাতে আর থাকতে না-পেরে টর্চ-ফর্চ না-নিয়েই ঘরের খিল খুলে চুপিচুপি উনি বেরিয়ে পড়েছিলেন। হাঁটা দিয়েছিলেন সেই আধ-মানুষ গভীর, চার-পাঁচ হাত চওড়া নালাটার দিকে। তখন কত রাত হবে কে জানে! উপরে ঝকমক করছে তারা। চার দিকে উড়ে বেড়াচ্ছে বারবার জ্বলতে-নিভতে থাকা হাজার হাজার জোনাকি। আর সেই নালায়? মনে হচ্ছে, সারা নালা জুড়ে লক্ষ লক্ষ টুনি লাইট জ্বলছে। তার কোনওটার রং লাল। কোনওটার নীল। আবার কোনওটার রং সবুজ। এমনকী, যে রং তিনি কখনও দেখেননি, জানেনই না ও-রকম রং আদৌ পৃথিবীতে আছে কি না, সেই রংও। এবং অবাক কাণ্ড, আলোগুলো এত উজ্জ্বল, অথচ কত মায়াবী। কত মনোরম। মনে হত, এগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।
কতক্ষণ উনি মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ওঁর মনে নেই। চোখই ফেরাতে পারছিলেন না। যখন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথায় টনটন করছে, উনি তখন ধীরে ধীরে পা ফেলে অতি সন্তর্পণে নালাটার একদম ধারে গিয়ে আলতো করে বসে পড়লেন। তার পর একটু ঝুঁকে যে-ই একটা ফল তুলতে গেছেন, শুধু সেই ফলের ডালটাই নয়, আশপাশের সব ক’টা লতানো ডাল যেন মুহূর্তের মধ্যে তাঁর হাতটাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।
ভয়ে চিৎকার করতে গিয়ে উনি দেখলেন, তাঁর গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছে না। গায়ের সমস্ত শক্তিও যেন কোনও এক মন্ত্রবলে কেউ কেড়ে নিয়েছে। তবু উনি হাতটা ছাড়াবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। আর ছাড়াবার জন্য উনি যত টানাটানি করতে লাগলেন, ডালপালাগুলো ততই যেন তরতর করে বেড়ে তাঁর হাত, গলা, মুখ, বুক, পেট, কোমর, হাঁটু, এমনকী, পায়ের পাতাকেও ছেঁকে ধরল। দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হল তাঁর। তার মধ্যেই উনি টের পেলেন, ওই নালার মধ্যে দিয়ে তাঁকে কেউ হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ধপ্‌করে আছাড় খেয়ে পড়তেই পেঁচিয়ে থাকা ডালপালাগুলো তাঁকে ছেড়ে নিজেরাই গুটিয়ে সুড়সুড় করে ছোট হতে হতে একেবারে ছোট্ট এক-একটা চারাগাছ হয়ে গেল। তার পর দূরে সরে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন কারও নির্দেশেই তারা এই কাজ করেছে। আর সেই নির্দেশ যিনি দিয়েছেন, সেই কর্তা যেন তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তাই তাকে কুর্নিশ করে বলছে, এই যে, একে নিয়ে এসেছি হুজুর। এ বার যা করার, আপনি করুন।
কিন্তু কাকে বলছে এরা! কাকে? সামনে তাকাতেই তিতার দেখেছিলেন, লতানো নয়, ক’হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাঝারি মাপের শক্তপোক্ত, সুঠাম গাছ। নীচের দিকে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র শিকড়-বাকড়। সেগুলো কেঁচোর মতো শুধু কিলবিল কিলবিল করছে। তার উপরে খানিকটা কাণ্ড মতো। গাছেদের যেমন হয়। সেই কাণ্ডের উপর দিকের দুটো ডাল তেড়ছা ভাবে দু’দিকে উঠে গেছে। যেন চৈতন্যদেব দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। আর একদম উপরে কাণ্ডটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে সাঁইবাবার ঝাঁকড়া চুলের মতো এক মাথা ছোট ছোট অজস্র পাতা। পাতাগুলি থেকে বিন্দু বিন্দু আলোর রশ্মি তীক্ষ্ণ বেগে তার গায়ে আছড়ে পড়ছে।
এ রকম কোনও গাছ উনি জীবনে কখনও দেখেননি। তাই তিনি হতবাক হয়ে গাছটাকে দেখতে লাগলেন। বুঝতে পারলেন, গাছটার কোনও শিকড়ই মাটি ভেদ করে নীচে ঢোকেনি। ঢুকলে গাছটা তাঁর দিকে এ ভাবে গুটি গুটি করে এগিয়ে আসতে পারত না। গাছটাকে এগিয়ে আসতে দেখেই তিনি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন।
এর আগে ছোটবেলায় তিনি তাঁর স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়েছেন, পৃথিবীতে অনেক রকমের গাছ আছে। আছে কলস উদ্ভিদ। যারা দেখতে খানিকটা কলসির মতো। ঢাকনা খুলে অপেক্ষা করে। ওখান থেকে বেরোনো সুগন্ধের টানে যে-ই কোনও পোকামাকড় বা মাছি-টাছি এসে তার মধ্যে ঢোকে, অমনি ঝপ করে ঢাকনাটা বন্ধ করে দেয়। তার পর তার রক্ত-মাংস খেয়ে শুধু ছিবড়েগুলো বাইরে ফেলে দেয়।
আছে রাক্ষুসি গাছ। যারা তাদের ডালপালা মাটিতে বিছিয়ে রেখে নির্বিকার ভাবে বসে থাকে। কখন কোন শিকার পড়ে, তার জন্য। যে-ই কেউ সেটা ডিঙিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে ডালপালা দিয়ে তাকে নিমেষের মধ্যে জাপটে ধরে। যতক্ষণ না সে শেষ হয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ তাকে ছাড়ে না।
এ সব তিনি বইতে পড়েছেন। কিন্তু যা তিনি পড়েননি, যা তিনি জানেন না কিংবা এই পৃথিবীতে আছে কিন্তু এখনও কেউ তার হদিশ পাননি, এ রকম গাছও তো কম নেই, তবে? এটা সে রকম কোনও গাছ নয় তো! যে গাছ শুধু মারাত্মকই নয়, ভয়ঙ্করও।
হতে পারে! হতেই পারে। কিন্তু এখান থেকে তিনি পালাবেন কী করে! এখান থেকে কি বেরোনোর কোনও পথ আছে! চার দিকেই তো মাটির দেওয়াল। কোথাও কোনও দরজা দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না কোনও জানালাও। মনে হয়, এটা কোনও পাতাল ঘর! গুমঘর!
যেখানে আগেকার রাজা-বাদশারা বন্দি করে রাখতেন অন্য দেশের গুপ্তচরদের, এটা বোধহয় সে রকমই কোনও ঘর। তা হলে তো তাঁকে না খেয়েদেয়ে এখানে গুমরে গুমরে পচে মরতে হবে। বাঁচার কি সত্যিই আর কোনও উপায় নেই! তার বাবা-মা তো জানতেও পারবেন না, তাঁর ছেলের কী হয়েছে। তাঁরা তো কাঁদতে কাঁদতেই মরে যাবেন। হায় রে… এ কী হল! বুক ফেটে যখন তাঁর কান্না বেরিয়ে আসছে, তখন দেখলেন, সেই গাছটা তার একটা ডালের নরম কচিপাতা দিয়ে তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছে। আর অন্য একটা ডাল দিয়ে তাঁর মাথায়-পিঠে যেন স্নেহের হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
তবুও ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন তিতার। আতঙ্কে দু’হাতে গাছটাকে ধাক্কা মেরেই উল্টো দিকে দৌড়তে শুরু করলেন। কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি! সামনেই তো দেওয়াল। কিন্তু উনি তখন চোখে আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছেন না। মাথাও কোনও কাজ করছে না। এই ভয়াবহ জায়গা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উনি পালাতে চান। থাকুক সামনে দেওয়াল। তিনি থামবেন না। কোনও গাছের ডালপালার ফাঁসে তিলে তিলে দম বন্ধ হয়ে মরার চেয়ে কোনও দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে একেবারে মরে যাওয়া অনেক ভাল।
এই ভেবে দৌড়ে গিয়ে যে-ই তিনি দেওয়ালে আছড়ে ফেলেছেন নিজেকে, অমনি কোথায় দেওয়াল! আর কোথায় সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশ! এ তো তাঁর বাড়ির চাতাল।
তা হলে কি ওই দেওয়াল-টেওয়াল সবই তাঁর মনের ভুল! নাকি দেওয়ালটা ছিল অন্য কোনও জগতের একটা সীমারেখা! যে-ই তিনি লাফ দিয়ে সেই সীমারেখাটাকে টপকে গিয়েছেন, তৎক্ষণাৎ ওই সীমানা পেরিয়ে তিনি চলে এসেছেন তাঁর নিজের জগতে! আশপাশে তখন সকালের আলো ফুটব ফুটব করছে। বাড়ির সকলে তখনও অঘোর ঘুমে।
না। এ কথা কাউকে বলা যাবে না। বললে শুধু বকাঝকাই নয়, তাঁর পিঠে খুব ভাল রকমেরই উত্তম-মধ্যম পড়বে। সুতরাং আর কোনও কথা নয়। কেউ টের পাওয়ার আগেই, যে-ভাবে উনি চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে চুপটি করে খিল তুলে দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
শুয়ে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তখনও বুকের ঢিপঢিপ শব্দটা তাঁর কানের কাছে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছিল। আর জানালা দিয়ে আসা দমকা বাতাসের সঙ্গে বার বার তার নাকে ভেসে আসছিল ভারী অদ্ভুত একটা গন্ধ। কীসের গন্ধ এটা! কীসের!
তিতার সে দিন বুঝতে পারেননি। আজও বুঝতে পারলেন না। তবু তাঁর হঠাৎ মনে হল, ঘরের ভিতরে ঢোকার পর থেকেই তিনি যে গন্ধটা পাচ্ছেন, সেটা ওই গন্ধ। হঠাৎ হঠাৎ পাল্টে যাওয়া ওই গন্ধ। হ্যাঁ, এটা ওই গন্ধই।

চলবে…

আরও পড়ুন:
মহাশূন্যে জুরান- এগারো পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- দশ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- নয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- আট পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- সাত পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- ছয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- পঞ্চম পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- চতুর্থ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- তৃতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- দ্বিতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- প্রথম পর্ব

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।