10.6 C
Drøbak
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২১, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্য‘মহাশূন্যে জুরান’ সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

‘মহাশূন্যে জুরান’
সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

শুরু হল কথাসাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহের কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস মহাশূন্যে জুরান। শরিকি বিবাদে পূর্বপুরুষের কড়িবরগার প্রকাণ্ড পাঁচ মহলা বাড়িটা বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাটে উঠে এসেছিলেন জুরানের বাবা। আসার সময় ওই বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি ইট আর দুটো সেগুন কাঠের খড়খড়িওয়ালা জানালা লাগিয়ে নিয়েছিলেন এই ফ্ল্যাটে। সেই জানালা দিয়ে যখন ফুরফুর করে হাওয়া ঢোকে, তখন নাকি সেই হাওয়ার মধ্যে তিনি তাঁর পুরনো বাড়ির গন্ধ খুঁজে পান। সেই গন্ধই তাঁকে টানতে টানতে নিয়ে যায় ছোটবেলায়। তিনি খুঁজে পান তাঁর ছেলেবেলাকার সঙ্গী-সাথীদের। পাঁচ মহলা বাড়ির কানাঘুঁজি অলিন্দে তিনি তখন ছোটাছুটি করেন। চোর চোর খেলেন।একদিন রাত্রিবেলায় লোডশেডিং হয়ে যাওয়ায় সেই জানালা দিয়ে তাকাতেই জুরানের জীবনে এক ঘটল বিপত্তি। কী কী ঘটল? তা জানতে হলে আপনাকে পড়তেই হবে কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক এই উপন্যাস— মহাশূন্যে জুরান।

।।এগারো।।

জুরান যখন পৃথিবীর ওই ছোট্ট রেপ্লিকাটার এ দিকে, সে দিকে, উপরে, নীচে তাকাচ্ছিল আর ভাবছিল, এটা পৃথিবীর অবিকল একটা অণু সংস্করণ ঠিকই, কিন্তু সেটাকে পৃথিবীর মতো আরও হুবহু করে তোলার জন্য তার চারপাশ ঘিরে অন্তত বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে একটু আকাশ থাকলে ভাল হত। ক’টা তারা থাকলে ভাল হত। ছেঁড়া-ফাটা কিছু মেঘ আশপাশে ভেসে বেরালে ভাল হত। ঠিক তখনই স্তব্ধতা ভেঙে সময়-কণা বলল, কী খুঁজছ? মেঘ? তারা? আকাশ?
কথাটা শুনে চমকে উঠল জুরান। তার মনের কথা বন্ধুবান্ধব তো নয়ই, এমনকী তার বাবা-মাও অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারেন না। কিন্তু এই সময়-কণা যে কী করে একেবারে নির্ভুল ভাবে তার মনের কথা ঠিক টের পেয়ে যায়, সে জানে না। তাই সে হালকা চালে উপর-নীচে মাথা দুলিয়ে বোঝাতে চাইল, হ্যাঁ।
সময়-কণা বলল, শোনো, আকাশ বলে কিচ্ছু হয় না। তোমরা যাকে আকাশ মনে করো, সেটা আসলে নীচ থেকে উপর পর্যন্ত পর পর অনেকগুলো বায়ুর স্তর। যেটাকে মেঘ ভাবো, সেটা আসলে সূর্যের তাপে পৃথিবীর নদী-নালা থেকে উবে যাওয়া বাষ্পপিণ্ড। আর যেগুলোকে বালি-কণার চেয়েও ছোট ছোট তারা ভাবো, সেগুলো এক-একটা হয়-পৃথিবীর মতো বড় কিংবা তার কাছাকাছি অথবা তার চেয়েও অনেক অনেক বড় গ্রহ।
— আচ্ছা, ওখানেও কি আমাদের মতো মানুষ আছে?
সময়-কণা বলল, মানুষ বলতে তোমরা যা বোঝো, তা নেই ঠিকই, কিন্তু মানুষ যার জন্য বহাল তবিয়তে মানুষ হিসেবে বিশ্বে বাস করে, সেই ‘প্রাণ’ নামক অমূল্য ধনটাকে নিয়ে বহু প্রাণীই কিন্তু ওই সব গ্রহ-তারায় শুধু বসবাসই করছে না, প্রতিনিয়ত তাদের বংশও বাড়িয়ে চলেছে।
— সব গ্রহেই?
— না। সব গ্রহে কী করে হবে? বহু গ্রহই আছে যেগুলো বয়সের ভারে বা অন্যান্য নানান কারণে এখন মৃত…
জুরান অবাক। মৃত? তার মানে যে গ্রহগুলোর কথা বলছ, সেগুলো আগে জীবিত ছিল?
— না। সেই গ্রহগুলো জীবিত ছিল না। জীবিত বলছি মানে, ওই গ্রহগুলো এক সময় জীবন ধারণের উপযোগী ছিল।
— তা হলে ওগুলো নষ্ট হল কী করে?
সময়-কণা বলল, বললাম না, নানান কারণে। যেমন ধরো তোমাদের পৃথিবী। এখন ওটা জীবন ধারণের পক্ষে উপযোগী দেখে তোমরা আছ। যখন ধীরে ধীরে সূর্যের তেজ কমে আসবে। হিমালয় আরও দ্রুত বেগে গলতে শুরু করবে, যখন বড় ধরনের কোনও প্রলয় ঘটবে, প্রতিষেধক আবিষ্কারের আগেই মুহুর্মুহু একের পর এক কঠিন রোগ আছড়ে পড়বে, তখন ওই পৃথিবীও আর বাসযোগ্য থাকবে না। দেখতে দেখতে মৃত গ্রহে পরিণত হবে।
— আমরা তখন কোথায় যাব?
— তত দিনে যদি তেমন কোনও ব্যবস্থা করতে পারো, তা হলে আশপাশের কোনও গ্রহে গিয়ে ঠাঁই নেবে। আর তা না হলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
জুরান বিস্মিত হয়ে বলল, এত বড় একটা কথা তুমি এত অবলীলায় নির্বিকার ভাবে বলতে পারলে?
— ছোট কথা না-বড় কথা, সে সব ভেবে তো আমি কিছু বলি না। যা সত্যি তা-ই বলি। তবে হ্যাঁ, শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তোমাদের ওই গ্রহে টিকে থাকার জন্য তাদের কিন্তু জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই যথেষ্ট পরিমাণে সরঞ্জাম দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
— সরঞ্জাম?
— হ্যাঁ, সরঞ্জাম। শুধু একটা করেই নয়, যেগুলো অত্যন্ত জরুরি, একটা দিলে, সেটা খোয়াবার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে তারা বিপাকে না পড়ে, যাতে একদম কাবু হয়ে না যায়, যাতে লড়াই করে টিকে থাকাটা মুশকিল হয়ে না-দাঁড়ায়, সে জন্য সেই সব জিনিস একটা নয়, একসঙ্গে দুটো করে, কাউকে কাউকে তো চারটে, ছ’টা, এমনকী আটটা করেও দেওয়া হয়েছে।
— কী? কী দুটো, চারটে, ছ’টা, আটটা করে দেওয়া হয়েছে?
সময়-কণা বলল, কেন? পা। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার জন্য মানুষকে যেমন দুটো করে পা দেওয়া হয়েছে, আরশোলাকে দেওয়া হয়েছে ছ’টা করে, আবার দ্যাখো, মাকড়সারকে পা দেওয়া হয়েছে আটটা করে। একটা ফুটো অকেজো হয়ে গেলে নিশ্বাস নিতে অসুবিধে হতে পারে দেখে, মানুষের নাকে দু’-দু’খানা ফুটো করে দেওয়া হয়েছে। একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেলে কারও সামনে যাতে গোটা দুনিয়াটাই অন্ধকার হয়ে না-যায়, সে জন্য মানুষকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে দুটো করে চোখ। এমনকী, কিডনিও দেওয়া হয়েছে দুটো করে।
জুরান বলল, কিন্তু সবাই তো আর দুটো করে নিয়ে জন্মায় না। কারও কারও দুটো পা-ই থাকে না। কেউ কেউ জন্মের সময়ই খুইয়ে আসে দুটো চোখ। কেউ কেউ তো আবার এমন হতভাগ্য যে, নিজের সমস্যার কথা জানানোর মতো বুলি নিয়েও জন্মায় না। যারা বোবা, তাদের ক্ষেত্রে কী বলবেন? লড়াই করে টিকে থাকার জন্য তারা যথেষ্ট সরঞ্জাম পেয়েছে?
— সে ক্ষেত্রেও বলব, পেয়েছে। যার একটা পা নেই, সে যাতে লাঠি নিয়ে চলতে পারে, সে ক্ষমতা জন্ম থেকেই তাকে দিয়ে দেওয়া হয়।
— কিন্তু যার দুটো পা-ই নেই?
— তাকে এমন একটা মন দিয়ে দেওয়া হয় যে, দু’পা নিয়ে জন্মেও কেউ যেখানে সহজে যেতে পারে না, সেখানে ওরা অনায়াসেই মনে মনে পৌঁছে যেতে পারে।
— যাদের দুটো চোখ নেই?
সময়-কণা বলল, তাদের ভিতরের দৃষ্টি এত প্রখর করে দেওয়া হয় যে, মানুষ যা দু’চোখ দিয়েও দেখতে পায় না, ওরা সেটা বদ্ধঘরে বসেও খুব সহজেই দেখতে পায়।
— আর যারা কথা বলতে পারে না, বোবা?
— তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিটি রন্ধ এত সুন্দর করে তাদের মনের প্রত্যেকটা কথা, যাকে বলতে চায়, তার কাছে এমন ভাবে পৌঁছে দেয় যে, যে শোনে, তাকে একবারও বলতে হয় না, ‘অ্যাঁ?’
— কিন্তু অন্যের কথা তো সে শুনতে পায় না…
— হ্যাঁ, বোবারা অন্যের কথা শুনতে পায় না ঠিকই, কারণ, বোবাদের কান সাধারণত অকেজোই হয়। কিন্তু তাতে তাদের কোনও অসুবিধে হয় না। কান কাজ না-করলেও, ওদের শরীরের সব ক’টা রোমকূপ তুখোড় ভাবে কাজ করে। আসলে জন্মগত ভাবে কারও কোনও অঙ্গ অকর্মণ্য হলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই অন্য অঙ্গগুলি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, সেই অঙ্গের খামতিটা বাকি অঙ্গগুলো ঠিকই পুষিয়ে দেয়। ফলে আপাত দৃষ্টিতে সমস্যা মনে হলেও, আসলে কারওরই সে রকম কোনও সমস্যা হয় না।
জুরান বলল, সে নয় ঠিক আছে। কিন্তু যেখানে তারা থাকবে, সেই গ্রহটাই যদি বাসের অযোগ্য হয়ে যায়, একটা মৃত মাটির পিণ্ডে পরিণত হয়, তখন?
— তার অনেক আগেই একের পর এক কোনও না কোনও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটিয়ে ওখানকার প্রাণীদের ঠিক তুলে নেওয়া হবে।
— তুলে নেওয়া হবে মানে? কোথায় নেওয়া হবে?
— এর উত্তর আমি দিতে পারব না।
— তা হলে কে দেবে?
সময়-কণা বলল, অন্য আর এক সময়-কণা।
— তত দিনে যদি সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেওয়ার মতো কোনও কিছু আবিষ্কার করে ফেলে আমাদের গ্রহবাসীরা?
— তা হলে তার খেসারত স্বরূপ সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের থেকেও আরও আরও আরও অনেক বড় ধরনের কোনও সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে তাদের।
— কেন?
— কারণ, প্রকৃতির বিরুদ্ধে কিচ্ছু করা যাবে না। তার বিরুদ্ধে কিছু করতে যাওয়া মানেই নিজের পতন আরও দ্রুত ডেকে আনা।
জুরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?
— কারণ, কোর্টের জজ দেখেছ? মানে বিচারক?
— হ্যাঁ।
— আমরা, এই সময়-কণারা হচ্ছি সেই সর্বোচ্চ বিচারক। আমরা শুধু রায় দিই। আর সেই রায় কার্যকর করে প্রকৃতি। ফলে…
— তাই?
— তা না হলে আর বলছি কী? তোমাকে একটু বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরো, একটু বৃষ্টি কিংবা রোদ। এগুলো যখন যে ভাবে আসবে, মানুষের তো সেটা সে ভাবেই গায়ে মাখা উচিত, না কী? কিন্তু মানুষ কী করল? তারা চড়া রোদের সময় গাছের ছায়ায় গিয়ে লুকোতে লাগল। ঝড়বৃষ্টির সময় পাহাড়ের গুহায় ঢুকে গা বাঁচাতে লাগল। প্রকৃতি থেকে নিজেদের আলাদা করে নিল বলেই তো এখন একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই মানুষের ঠান্ডা লাগে। সর্দি-কাশি হয়। জ্বর হয়। সামান্য একটু রোদে থাকলেই তাদের চাঁদি ফেটে যায়। শরীর অস্থির-অস্থির করে। গা থেকে দরদর করে অনবরত ঘাম বেরিয়ে শরীরটাকে কাবু করে দেয়।
— কিন্তু ঝড়বৃষ্টিতে ভিজলে তো জামা-কাপড় ভিজে যাবে।
সময়-কণা একটু মুচকি হেসে বলল, কে তোমাদের জামা-কাপড় পরতে বলেছে? শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক না কেন, জেনে রাখো, জামা-কাপড় পরো দেখেই তোমরা ধীরে ধীরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটু একটু করে ক্রমশ খাটো থেকে আরও খাটো হয়ে যাচ্ছ।
— জামা-কাপড় পরি দেখে?
— হ্যাঁ। যত পাতলাই হোক, যত হালকাই হোক, পোশাক পরা মানেই তো শরীরটাকে বন্দি করে রাখা। আবদ্ধ করে রাখা। তার বাড়ার স্বাভাবিক গতিকে আটতে দেওয়া। তাই নয় কী? যেমন ধরো, বড় জাতের কোনও গাছ, যেমন বট কিংবা অশ্বত্থ— ও রকম কোনও চারাকেও যদি ছোট্ট একটা টবের মধ্যে বসিয়ে রাখো, দেখবে, সে তার বাবা-মা-দাদু-দিদার মতো তরতর করে আর বাড়তে পারবে না। কয়েক বিঘত বেড়েই তার বাড়ার গতি একেবারে শ্লথ হয়ে যাবে।
জুরানের মনে পড়ে গেল, সে একবার তার বাবার সঙ্গে পার্কে গিয়ে পুষ্প প্রদর্শনী দেখেছিল। সেখানে সে এই রকমই এক ধরনের বামন গাছ দেখেছিল। তাকে কী যেন বলে! কী যেন বলে! হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। মনে পড়েছে। বনসাই। সে বলল, বনসাই?
সময়-কণা বলল, হ্যাঁ, ঠিক তাই। অনন্তকাল ধরে বংশ পরম্পরায় পোশাক পরে পরে মানুষ ঠিক ওই রকম ভাবেই একটু একটু করে বনসাইয়ের মতো ছোট হয়ে যাচ্ছে।
— আগে কি মানুষ অনেক বড় হত?
— সেটা জানার জন্য খুব বেশি আগে যেতে হবে না। দেড়শো-দু’শো বছর আগে গিয়েই দেখো না…
— কী করে যাব?
— আরে, ধুর বোকা। দূরে কোথাও যেতে হবে না। তোমাদের গ্রহে তো পুরনো পোশাক, আসবাবপত্র, আগেকার বিখ্যাত রাজরাজাদের ব্যবহার করা জিনিস সংরক্ষণ করে রাখা হয়। হয় না?
— হ্যাঁ, হয় তো…
— তা হলে? তেমন কোনও মিউজিয়ামে গিয়ে দেখো, তাঁদের পোশাকগুলো কত বড় বড় ছিল। কোমরে ঝুলিয়ে রাখা যে তলোয়ার যুদ্ধের সময় ওঁরা বনবন করে ঘোরাতেন, তার একটা এখনকার সব চেয়ে লম্বা মানুষের পাশে রাখলেও, তাঁর মাথা ছাড়িয়ে যাবে। যে বর্ম বুকে পরে তাঁরা লড়তেন, তার একটার মধ্যে এখনকার তিন জন লোক অনায়াসে ঢুকে যাবেন। যে খাটে তাঁরা ঘুমোতেন, সেটা যেন খাট নয়, প্রশস্ত কোনও মঞ্চের পাটাতন। এখনকার কেউ সে খাটে শুলে তাকে একেবারে লিলিপুট বলে মনে হবে। ফলে বুঝতেই পারছ, মাত্র দু’-তিনশো বছরেই মানুষ কত ছোট হয়ে গেছে।
— এটা কি মানুষ বুঝতে পারছে না?
— না। পারছে না। পারলে মানুষ কখনও জুতো পায়ে দিত না।
জুরান অবাক। জুতো? জুতো না পরলে তো পায়ে ধুলো লাগবে। ময়লা লাগবে। অসুখ করবে।
— যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে কি তোমরা খুব বোকা মনে করো নাকি? ধুলো-ময়লা লাগলে যদি ক্ষতিই হত, তা হলে মানুষের পা-দুটো জুতোর মতো শক্ত কোনও কিছু দিয়ে মুড়ে অথবা গরু-ঘোড়ার মতো ক্ষুর-জাতীয় কিছু একটা লাগিয়ে, তবেই পৃথিবীতে পাঠাতেন। বুঝেছ? তা কি তিনি করেছেন?
— না।
সময়-কণা বেশ জোর দিয়েই বলল, তা হলে? জেনো রাখো, মানুষ জুতো পরছে দেখেই কিন্তু মানুষের সঙ্গে মাটির আর কোনও সরাসরি সম্পর্ক থাকছে না। সামান্য হলেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যদি এই দূরত্ব তৈরি না-হত, মানুষ যদি খালি পায়েই মাটিতে হেঁটে বেড়াত, তা হলে মাটির রস পায়ের পাতা দিয়ে শরীরে ঢুকে মানুষের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আরও অনেক বাড়িয়ে দিত। কথায় কথায় মানুষকে আর অত ভুগতে হত না। মুঠো মুঠো ওষুধও খেতে হত না।
— আমার মা তো মাঝে মাঝেই ঘুমের ওষুধ খায়।
সময়-কণা বলল, সে তো খাবেই। খেতেই হবে। মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না-রাখলে শুধু ঘুম কেন? বেশি দিন জেগে থাকাও যাবে না।
— মানে?
— মানে, মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না-রাখলে মাটিও তোমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখবে না। তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি পর করে দেবে। তার কাছ থেকে অনেক অনেক অনেক দূরে পাঠিয়ে দেবে।
ভয় পেয়ে গেল জুরান। তাই?
— হ্যাঁ, তাই।
— তা হলে তো মাকে গিয়ে এটা বলতে হবে।
— শুধু মাকে নয়, বাবাকে নয়, বন্ধুবান্ধবকেই নয়, সবাইকে। সবাইকে বলতে হবে এই কথা। তারা যদি তোমার কথা শোনে তো ভাল। না হলে…
— না হলে?
সময়-কণা বলল, সামনে সমূহ বিপদ। কেউ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না, কেউ না। অন্যান্য আরও অনেক গ্রহের মতো তোমাদের পৃথিবীটাও অচিরেই একটা মরা গ্রহে পরিণত হবে। হবেই। তোমরা কি সেটা চাও?
কথাটা শুনে ভয়াবহ এক আতঙ্কে জুরানের শরীরের রোমগুলো কাঁটা দিয়ে উঠল।

চলবে…

আরও পড়ুন:
মহাশূন্যে জুরান- দশ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- নয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- আট পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- সাত পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- ছয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- পঞ্চম পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- চতুর্থ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- তৃতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- দ্বিতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- প্রথম পর্ব

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।