13.1 C
Drøbak
শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্য‘মহাশূন্যে জুরান’ সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

‘মহাশূন্যে জুরান’
সিদ্ধার্থ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস

শুরু হল কথাসাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহের কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস মহাশূন্যে জুরান। শরিকি বিবাদে পূর্বপুরুষের কড়িবরগার প্রকাণ্ড পাঁচ মহলা বাড়িটা বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাটে উঠে এসেছিলেন জুরানের বাবা। আসার সময় ওই বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি ইট আর দুটো সেগুন কাঠের খড়খড়িওয়ালা জানালা লাগিয়ে নিয়েছিলেন এই ফ্ল্যাটে। সেই জানালা দিয়ে যখন ফুরফুর করে হাওয়া ঢোকে, তখন নাকি সেই হাওয়ার মধ্যে তিনি তাঁর পুরনো বাড়ির গন্ধ খুঁজে পান। সেই গন্ধই তাঁকে টানতে টানতে নিয়ে যায় ছোটবেলায়। তিনি খুঁজে পান তাঁর ছেলেবেলাকার সঙ্গী-সাথীদের। পাঁচ মহলা বাড়ির কানাঘুঁজি অলিন্দে তিনি তখন ছোটাছুটি করেন। চোর চোর খেলেন।একদিন রাত্রিবেলায় লোডশেডিং হয়ে যাওয়ায় সেই জানালা দিয়ে তাকাতেই জুরানের জীবনে এক ঘটল বিপত্তি। কী কী ঘটল? তা জানতে হলে আপনাকে পড়তেই হবে কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক এই উপন্যাস— মহাশূন্যে জুরান।

।।ছয়।।

সময় তো প্রকৃতিরই একটা অঙ্গ। তার মানে প্রকৃতি যখন কারও কোনও ক্ষতি করে না। সময়-কণাও করবে না। অর্থাৎ তার ভয়ের কোনও কারণ নেই। মনে মনে এটা ভেবে একটু আশ্বস্ত হল জুরান। আর সেই আশ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ খুশিও হল, মাঝখান থেকে একেবারে বিনে পয়সায় রকেটের চেয়েও দ্রুতগতিতে একদম নিরাপদে ভবিষ্যৎ সফর করার এমন সুবর্ণ সুযোগ পাওয়ার জন্য।
কিন্তু যে সময়-কণার সঙ্গে সে কথা বলছে, সে কোথায়! তার সামনে আসছে না কেন! তাকে দেখতে কেমন! তার পায়ের পাতা কি ইয়া বড় বড়!
বরফে ঢাকা হিমালয়ের গায়ে বিশাল বিশাল পায়ের ছাপ দেখে এক সময় কিছু লোক বলেছিলেন, এরা নিশ্চয়ই ভিন্‌গ্রহবাসী। পৃথিবীতে নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছিল। ওরা পৃথিবীর মানুষের থেকে হাজার হাজার গুণ বেশি বুদ্ধিমান। ওরা হয়তো এই দুনিয়ার বুকে থাবা বসাতে চায়। এই বিশ্বের মানুষকে দাস বানাতে চায়। তাই খোঁজখবর নিতে এসেছে এখানকার প্রাণীরা কেমন। এখানকার জীবদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কতটা। সহ্যশক্তিই বা কতখানি। আর যেই তারা বুঝতে পারবে, তাদের তুলনায় এই জগতের প্রাণীরা কিছুই নয়। না-বুদ্ধিতে। না-শক্তিতে। না-ক্ষমতায়। তখন তারা পুরোদমে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর মানুষের পক্ষে তখন এই পৃথিবীতে বাস করাই দায় হয়ে দাঁড়াবে।
‘কিন্তু এরা কারা?’ চার দিক থেকে প্রশ্ন উঠতেই অনেক ভেবেচিন্তে পায়ের ছাপ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সেই লোকগুলি বলেছিলেন, ওরা হল ইয়েতি।
তা হলে কি এরাই সেই ইয়েতি! হতে পারে! কিন্তু এদের দেখতে কেমন! যাদের পায়ের পাতা অত বড় বড়, তাদের চেহারাও নিশ্চয়ই দশাসই হবে। এখন লুপ্ত হয়ে গেলেও, এক সময় এই পৃথিবীতেই বাস করত ডাইনোসরের মতো বিশাল বিশাল প্রাণী। মানুষের চেহারাও এত ছোটখাটো ছিল না। তার প্রমাণ পাওয়া যায় জাদুঘর কিংবা মিউজিয়ামে গেলে। এক-একটা তলোয়ারই চার-পাঁচ ফুট লম্বা। ওই তলোয়ার কোমরে নিয়ে ঘুরতে গেলে তাঁদের কতটা লম্বা হওয়া দরকার, ভাবতে গেলেই অবাক হতে হয়। হতবাক হতে হয়, তাঁদের বর্ম দেখে। অত বড় ছাতি কারও হয়?
যাঁদের অত বড় ছাতি, না-জানি তাঁদের মনটাও কত বড়!
কোথায় যেন সে পড়েছিল, কে নাকি একবার বলেছিলেন, মানুষ একদিন ছোট হতে হতে এত ছোট হয়ে যাবে যে, যে-গাছ এক-দেড়, খুব বেশি হলে দু’বিঘত লম্বা, সেই গাছ থেকে লঙ্কা পাড়তে গেলেও মানুষকে লগি ব্যবহার করতে হবে।
তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি ইতিমধ্যে ফলতে শুরু করেনি! চার দিকে তাকালে ওই রকম দশাসই চেহারার কোনও মানুষ কি আর দেখতে পাওয়া যায়! সবাই কেমন যেন ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একেবারে লিলিপুট হয়ে যাচ্ছে। আর শরীর যত ছোট হচ্ছে, তাঁদের মনও যেন ততই ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে।
সেই দলে কি সেও পড়ে না! পড়ে। তবু সে প্রাণপণ চেষ্টা করবে শরীর যতই ছোট হোক না-কেন, তার মনটা যেন কিছুতেই ছোট না-হয়। তার মানবিকতায় যেন কোনও খামতি দেখা না-যায়।
ছোটবেলায় সে যখন ভিন্‌গ্রহবাসীদের নিয়ে কোনও সিনেমা দেখত, দেখত— ভিন্‌গ্রহবাসীদের সারা শরীর জুড়ে শুধু ইলেকট্রিকের তার আর তার। অত তার যে কেন ঝুলত, সে বুঝতে পারত না।
তারা এখন সবেমাত্র চাঁদে পা রেখেছে। মঙ্গলগ্রহে যান পাঠিয়েছে। তাদের গ্যালাক্সির অন্য গ্রহগুলিতে কবে যাবে, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কেউ জানে না, ক’শো বছর পরে কম করে ছ’হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট উত্তাপ প্রতিরোধকারী আপাদমস্তক ঢাকা পোশাক তৈরি করে সূর্যের সব চেয়ে কম উষ্ণ জায়গা ফোটোসফেয়ারের বুকে পা রাখবে মানুষ— তাতেই, সেখানে নয়, এই বিশ্বেই তাদের কানে তার উঠেছে। সেই তার কানে গুঁজে মোবাইলে কথা বলছে। গান শুনছে। এর পরে যদি আর দু’-একটা গ্রহে পা রাখে, আরও চমক সৃষ্টিকরী দৈনন্দিন ব্যবহারের অপরিহার্য সরঞ্জাম বাজারে আসে, তা হলে তো কথাই নেই। এই দুনিয়ায় থাকলেও তাদের হাবভাব ওই ভিন্‌গ্রহবাসীদের মতোই হয়ে যাবে। সারা শরীর তারে তারে ছেয়ে যাবে।
এদের শরীরও কি তেমনই তারে তারে ঢাকা! হতে পারে! সে হোক, তাতে তার কোনও অসুবিধে নেই। সে যখন জেনে গেছে এরা কখনও কারও কোনও ক্ষতি করে না। তখন আর ভাবনা কীসের? ভাবনা শুধু একটাই, এদের চেহারা, পোশাক-আশাক যাই হোক না-কেন, এদের মনটা কেমন? খুব বড় মাপের কী! নিশ্চয়ই বড় মাপের। তা না-হলে এতক্ষণ ধরে তার সঙ্গে এ ভাবে এরা কথা বলত না!
তা, এখনও তার সঙ্গে যখন এরা কথা বলছে, তা হলে তো আরও কিছু এদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যায়, নাকি! তাই জুরান জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, হিমালয়ের গায়ে ওই বিশাল বিশাল পায়ের ছাপ দেখে আমাদের পৃথিবীর অনেকেই তো বলেছিলেন, ওটা কোনও ভিন্‌গ্রহবাসীর পায়ের ছাপ। কেউ কেউ বলেছিলেন, ভিন্‌গ্রহবাসী নয়, ওই পায়ের ছাপ ওই পৃথিবীরই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া, এক বিশালাকায় মানব প্রজাতির শেষ বংশধরের। আবার কেউ কেউ বলেছিলেন, না। ও সব কিছুই নয়। হিমালয় তো আসলে স্বর্গ। ওখানে দেবাদিদেব মহাদেব থাকেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে অনেক দেবদেবীই সেখানে যান। আর দেবদেবীরা তো যখন তখন যে কোনও রূপ ধারণ করতে পারেন। কখনও ছোট হন তো কখনও বড়। বড় বড় ওই পায়ের ছাপ নির্ঘাৎ ওই দেবদেবীদেরই কারও হবে। এত লোক এত যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এখনও অনেকে ধন্দে আছেন, কোনটা ঠিক? সত্যিই কি ওগুলো দেবদেবীদের পায়ের ছাপ?
সময়-কণা বলল, দেবদেবী? না না। দেবদেবী বলে কিছু হয় না।
— তা হলে?
— আসলে মানুষ যার সঙ্গে পেরে ওঠে না। যার ক্ষমতা মানুষের থেকে সামান্য হলেও একটু বেশি। তার যদি ভাল করার ক্ষমতা থাকে, তা হলে মানুষ তাকে দেবতা বলে। আর খারাপ করার ক্ষমতা যার বেশি থাকে, তাকেই মানুষ দানব বলে।
— যেমন?
— যেমন মানুষ যখন ডারউইনের তত্ত্ব অনুযায়ী বনমানুষ থেকে ক্রমশ মানুষ হয়ে উঠছিল, তখন লোকজন অনেক কম ছিল। চার দিক আরও ফাঁকা-ফাঁকা ছিল। সে-সময় মাঝে মাঝেই ঝোড়ো হাওয়া আছড়ে পড়ে সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যেত, ধুপধাপ করে ফেলে দিত গাছপালা, তাতে চাপা পড়ে মারা যেত বহু লোক। তখন, সেই ঝড় যাতে আর তাণ্ডব না-চালায়, ক্ষতি না-করে, তাকে শান্ত করার জন্য মানুষ তাকে পুজো করে খুশি করার চেষ্টা করত। হাওয়ার আর এক নাম পবন। তাই তাকে পবন দেবতা হিসেবে গণ্য করত। গাছে গাছে ঘষা লেগে জঙ্গলে দাবানল ছড়িয়ে পড়লে আগুনের যতটা কাছে যাওয়া যায়, ততটা গিয়ে, আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ মাথা কুটত। যাতে আগুন নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নেয়। তার এই অসীম শক্তির জন্যই মানুষ তাকে অগ্নি দেবতা বলত।
জুরান বলল, দেবতা কেন? সে তো ক্ষতি করত। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিত। আগুনকে তো তা হলে দানব বলা উচিত।
— না। কারণ, আগুন যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে অনেক অনেক অনেক বেশি উপকার করে। মানুষ যে দিন আগুনকে কব্জা করতে শিখেছিল, সে দিনই সে এক ধাপে এক হাজার বছর এগিয়ে গিয়েছিল। মানুষের কাছে আগুন হল সব চেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাই সে দানব নয়, মানুষের কাছে সে দেবতা। যেমন জলে ডুবে অনেকে মারা গেলেও, বহু নৌকো মাঝপথে ডুবে গেলেও, জলকে কেউ দোষী সাব্যস্ত করে না। মানুষের কাছে, জলই জীবন। তাই সুনামি ঘটলেও, প্লাবন ঘটলেও, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর ভাসিয়ে দিলেও, সমুদ্র কিন্তু মানুষের কাছে দেবতাই। দেবতার থেকে আরও এককাঠি উপরে, আরও কাছের হল— নদী। গঙ্গা তো মানুষের কাছে শুধু দেবী নয়, মা-ও।
এই ভাবেই, মানুষ যখন যার সঙ্গে পেরে ওঠেনি কিংবা যে শক্তির অন্তত একটুখানি করুণা পেতে চেয়েছে, অথবা মনেপ্রাণে চেয়েছে সে যাতে আর কোনও ক্ষতি না-করে, তখনই তার শরণাপন্ন হয়েছে। তার মন জয় করার জন্য বাচ্চা ভোলানোর মতো লাল ফুল দিয়েছে। নীল ফুল দিয়েছে। নিজে পোকা ধরা ফল খেলেও কিংবা সন্তানকে দিলেও, তাকে কিন্তু বেছে বেছে নিখুঁত ফলই দিয়েছে। তার চার পাশে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। তাকে পুজো করেছে। দেব বা দেবী বলে আখ্যা দিয়েছে। আর এ ভাবেই, এক-এক করে কখনও শিক্ষার দেবী সরস্বতী, যন্ত্রপাতির দেবতা বিশ্বকর্মা, ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী, শক্তির দেবী কালীর মতো তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই দেবদেবীর সৃষ্টিকর্তা ‘মানুষের সৃষ্টিকর্তা মানুষ’-এর মতো কিন্তু কোনও দেবদেবী নয়। যে যতই বলুক, শিবের মেয়ে মনসা কিংবা দুর্গার ছেলে গণেশ অথবা এর মেয়ে ও, তার ছেলে সে— ওগুলো সব বাজে কথা। তাদের সৃষ্টিকর্তা কিন্তু কোনও দেবদেবী নয়, ওই মানুষই। তারা যেমন দেবদেবী সৃষ্টি করেছে, মনে মনে কল্পনা করে সেই দেবদেবীদের ছেলেমেয়েদেরও তারাই সৃষ্টি করেছে। নতুন নতুন আদল দিয়েছে।
দ্যাখো না, ওইটুকু একটা গ্রহ, তাতেই একই দেবতা এক এক জায়গায় এক এক রকম। শুধু চেহারাতেই নয়। চলন-বলন থেকে শুরু করে তাদের নামটাও আলাদা। তারা রক্ত-মাংসের কেউ হলে সেটা কী হত? তোমার নাম তো জুরান। তুমি যেখানে থাকো, সেখান থেকে তুমি যদি অন্য কোথাও যাও, সেখানকার লোকেরা কি তোমাকে অন্য নামে ডাকবে?
— না।
সময়-কণা বলল, তোমাকে যেমন দেখতে, তুমি যদি অন্য কোথাও যাও, তোমাকে কি অন্য রকম দেখতে হয়ে যাবে?
জুরান বলল, না।
— তা হলে? সত্যিই যদি দেবতা বলে কেউ থাকত, তা হলে অন্যদের কথা না-হয় বাদই দিলাম, শুধুমাত্র হিন্দুদেরই তেত্রিশ কোটি দেবতার অন্তত একজনের সঙ্গেও কি তোমার দেখা হত না? তোমার না-হোক তোমার বাবার? কিংবা তার বাবার? পারলে একবার জিজ্ঞেস করে দেখো তো, তাঁরা কেউ কোনও দিন কোনও ঈশ্বরকে দেখেছেন কি না…
জুরান বলল, বাবাকে জিজ্ঞেস করতে যাব কেন? আমিই তো দেখেছি।
— তুমি দেখছ?
— হ্যাঁ।
সময়-কণা বলল, কোথায়?
— কেন? ছবিতে।
— এ তো দেখছি মহাবিপদ। আরে বাবা, আমি কোনও ছবির কথা বলছি না। বলছি, স্বচক্ষে কোনও জ্যান্ত দেবতাকে দেখেছ কি?
জুরান বলল, না।
— তুমি যেমন দেখোনি, তোমাদের বিশ্বের কেউই দেখেনি।
— অনেকে যে বলে এ দেখেছে, ও দেখেছে, সে দেখেছে…
— ওগুলো সব বাজে কথা। ওটা ইলিউশন। যেমন প্রবল তেষ্টার সময় খাঁ খাঁ মরুভূমির এখানে সেখানে অনেকে জলাশয় দেখতে পায়, তেমনি ওরাও ওই জলাশয়ের মতোই দেবতা-দর্শন করে। আসলে দেবতা বা দানব বলে কিছু নেই। যা আছে, সেটা তোমাদের ওই গ্রহের জীবকুলের মধ্যেই আছে।
জুরান জিজ্ঞেস করল, সেটা কী?
— ওই দেবতা আর দানব।
— তাই নাকি? কার মধ্যে কোনটা আছে?
সময়-কণা বোঝাবার চেষ্টা করল, আলাদা করে কেউ কারও মধ্যে নয়। সবার মধ্যেই ওই দুটো আছে। যেমন ধরো, মানুষ যখন কাউকে থাপ্পড় মারে, তখন সে দানব। যখন অন্যকে বিপদে পড়তে দেখে মনে মনে হাসে, তখন সে দানব। আবার মানুষ যখন তার চেয়ে কমজোরি জীব— হাঁস, মুরগি, মাছ কিংবা পাঁঠার মাংস খাচ্ছে, তখন সে দানব। কারণ, সে তার এক প্রতিবেশীকে হত্যা করছে। একটা প্রাণকে ধ্বংস করছে।
— কিন্তু কেউ যদি নিরামিষাশি হয়? শুধু শাকসবজি বা ফলমূল খায়?
— সে তো আরও বড় দানব। শুধু দানবই নয়, নৃশংসও।
আঁতকে উঠল জুরান, অ্যাঁ! সে কী?
— অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। কারণ, দু’পেয়েই হোক আর চার পেয়েই হোক, তাদের ছুটে পালাবার ক্ষমতা আছে। জাল কিংবা ছিপ ফেললেও মাছও তার কবল থেকে ঠিক পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যাদের একচুল নড়ারই ক্ষমতা নেই, যারা সব সময় আমৃত্যু শুধু মানুষেরই সেবা করে, মানুষ যাতে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে, তার ব্যবস্থা করে, যে মাটির উপর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, বৃষ্টির জলে সে মাটি যাতে ধুয়ে ধুয়ে নদীতে চলে না যায়, শিকড়বাকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখে, কোথায় মানুষ তাদের সেবাযত্ন করবে, তা নয়, উল্টে তাদের খেয়ে সাবাড় করছে। তাদের ছানাপোনাদের পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে দিচ্ছে না। মাটিতে পড়ার আগেই ফল অবস্থাতেই খেয়ে নিচ্ছে। এটা তো আরও বড় গর্হিত কাজ। আর এটা যখন কোনও মানুষ করে, তখন সে আর মানুষ থাকে না। হয়ে ওঠে পুরোদস্তুর একটা দানব।
— তা হলে ঈশ্বর কখন হয়?
সময়-কণা বলল, যখন সে ভাল কাজ করে। বাসা থেকে পড়ে যাওয়া কোনও পাখির ছানাকে তুলে এনে কোনও মানুষ যখন সেবা করে কিংবা কোনও মা যখন কোনও বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায় অথবা শুকনো খটখটে জায়গায় দিশেহারা কোনও শামুককে তুলে মানুষ যখন স্যাঁতসেঁতে কোনও জায়গায় পৌঁছে দেয়, তখন সে আর মানুষ থাকে না। ভগবান হয়ে ওঠে।
জুরান জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, মানুষই যখন দানব, আবার ঈশ্বরও, এই দুটোই যখন মানুষের মধ্যে একসঙ্গে আছে, তা হলে কি ধরে নেব পৃথিবীর মধ্যে মানুষই সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীব?
— এটা আবার তোমাকে কে বলল?
— না। সবাই তো এটা বলে… তাই…
সময়-কণা বলল, একদমই নয়। ‘মানুষই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব’— এটা কিন্তু মানুষই বলছে। অন্য কোনও জীব বলছে কি?
— না।
— তা হলে?
— কোনও প্রতিপক্ষকে সঙ্গে না-নিয়ে তোমার ক্লাব যদি মাঠে গিয়ে খোলা বারপোস্ট লক্ষ করে একের পর এক গোল দিয়ে যায়, সেই গোলের সংখ্যা যতই হোক না-কেন, তোমাদের ক্লাবের সবাই মিলে চিৎকার করে যতই বলুক না কেন, আমরা জয়ী। আমরাই সেরা। তোমাদের কি সত্যিকারের শ্রেষ্ঠ বলা যাবে?
জুরান বলল, না।
— তবে? ঠিক তেমনি, তোমরা মানুষরাই মানুষকে শ্রেষ্ঠ বলছ। একবারও অন্য জীবের দিকে তাকিয়ে দেখেছ কি? তারা কী করে, ওই পৃথিবীতে তাদের অবদান কতখানি, একবারও তলিয়ে দেখেছ কি? তার থেকেও বড় কথা, পৃথিবীতে যত জীব আছে, তার ক’জনের হদিশ পেয়েছ তোমরা? যাদের পেয়েছ, তাদের সম্পর্কেই বা কতটুকু জানো তোমরা? জানলে বুঝতে পারতে। তখন আর এ রকম কথা উচ্চারণও করতে না। লজ্জায় তোমাদের মাথা মাটির সঙ্গে মিশে যেত। বুঝেছ?
জুরান কী বলবে বুঝতে পারল না। কিছু একটা বলতে গিয়েও কেমন যেন তোতলাতে লাগল।

চলবে…

আরও পড়ুন:
মহাশূন্যে জুরান- পঞ্চম পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- চতুর্থ পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- তৃতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- দ্বিতীয় পর্ব
মহাশূন্যে জুরান- প্রথম পর্ব

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।