17.5 C
Drøbak
বৃহস্পতিবার, মে ২৬, ২০২২
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যপ্রবন্ধরবীন্দ্রনাথই পালটে দিয়েছিলেন রাখী বাঁধার সংজ্ঞা

রবীন্দ্রনাথই পালটে দিয়েছিলেন রাখী বাঁধার সংজ্ঞা

মহাভারতে কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ যখন সুদর্শনচক্র দিয়ে শিশুপালকে বধ করেছিলেন তখন তাঁর তর্জনীতে চোট লেগে রক্তপাত হয়েছিল। সেই সময় দ্রৌপদী নিজের শাড়ির পাড় ছিঁড়ে প্রিয় সখার আঙুলে বেঁধে দিয়েছিলেন।

এতে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও, তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদীকে এর প্রতিদান দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। বহু বছর পরে, পাশাখেলায় কৌরবরা দ্রৌপদীকে অপমান করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন। দ্রৌপদী যে দিন নিজের শাড়ির পাড় ছিঁড়ে শ্রীকৃষ্ণের তর্জনীতে বেঁধে দিয়েছিলেন, সেই দিনটি ছিল শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন। তাই এই দিনটিকেও পুরাণে রাখীবন্ধন হিসেবে দেখা হয়।

রাখীপূর্ণিমা ভারতের একটি উৎসব হিন্দু, জৈন ও শিখরা এই উৎসব পালন করে। এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এই রাখীই ভাই বা দাদার প্রতি দিদি বা বোনের ভালবাসা এবং অবশ্যই নিরাপত্তার ঢাল। এই রাখী পরাবার সময় বোনেরা তাদের ভাইদের দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও সমৃদ্ধির কামনা করেন। মঙ্গলকামনা তো বটেই। এই একই সঙ্গে এটা দিদি বা বোনকে আজীবন রক্ষা করার ভাই বা দাদার শপথের প্রতীকও।

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের শুক্ল পক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়।

রাখী বন্ধন শুরু হওয়ার পিছনে শ্রীকৃষ্ণ এবং দ্রৌপদীর কাহিনির পাশাপাশি আরও অনেক গল্প প্রচলিত আছে। ভগবত পুরাণের একটি গল্পে রয়েছে, স্বর্গে তখন দাপটের সঙ্গে রাজত্ব চালাচ্ছে অসুররাজ বলি। অসুরদের দাপটে ভীত ইন্দ্র একদিন ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। তখন বিষ্ণু বামন অবতার সেজে রাজা বলির কাছে ভিক্ষে চান তিন পা জমি। রাজা বলি সেই জমি দিতে রাজি হলে বামন অবতার বিশাল চেহারা ধারণ করে এক পায়ে স্বর্গ আর এক পায়ে মর্ত্য অধিকার করে নেন। তৃতীয় পা রাখার আর জায়গা নেই। অথচ বলি কথা দিয়েছেন, তিনি তিন পা জমি দেবেন। তাই তিনি তৃতীয় পা রাখার জন্য নিজের মাথা পেতে দেন। বলির এই কাজে খুশি হয়ে বিষ্ণু তাঁকে বর দিতে চান। অসুররাজ বলি তখন ভগবান বিষ্ণুর কাছে বর চান, তাঁর সঙ্গে পাতালে গিয়ে বসবাস করার। যেহেতু বিষ্ণু বর দিতে চেয়েছেন এবং বালি ওই বর চেয়েছেন তাই ভগবান বিষ্ণু পাতালে গিয়ে থাকতে শুরু করেন।

বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী তাঁর স্বামীকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক অতি সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বলিরাজের কাছে আসেন। তিনি বলিকে বলেন, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। যত দিন না তাঁর স্বামী ফিরে আসছেন, তত দিন যেন বলি তাঁকে আশ্রয় দেন। বলিরাজা ছদ্মবেশী লক্ষ্মীকে আশ্রয় দিতে রাজি হন। ওখানে থাকার সময় এক শ্রাবণ পূর্ণিমার উৎসবে বলিরাজার হাতে একটি রাখী বেঁধে দেন লক্ষ্মী। বলিরাজা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষ্মী আত্মপরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। এতে বলিরাজা মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর জন্য বলিরাজা সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকেই শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিতে ভাইদের হাতে রাখী বাঁধতে শুরু করে বোনেরা।

সংস্কৃত শব্দ ‘রক্ষা বন্ধন’ থেকেই প্রচলিত হয়েছিল রাখী কথাটি। শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে এর তাৎপর্য। রক্ষার বাঁধন। হিন্দু এবং শিখদের মধ্যে এই উৎসব ভাই-বোনেরা পালন করলেও জৈন ধর্মাবলম্বিরা আবার একটু অন্য ভাবে এই উৎসবে শামিল হন। তাদের মধ্যে আবার জৈন পুরোহিত ভক্তদের হাতে ধাগা বেঁধে দেন এই দিনে।

রাখী‌ প্রচলনের নেপথ্য কাহিনি নিয়ে অন্য আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। সেখানে রয়েছে— রাখী বন্ধনের দিন গণেশের বোন গণেশের হাতে একটি রাখী বেঁধে দেন। এতে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের হিংসে হয়। তাদের কোনও বোন ছিল না। তারা বাবার কাছে একটা বোনের জন্য বায়না ধরে। গণেশ তখন তাঁর দুই ছেলের নাছোড়বান্দা বায়নার জন্য দিব্য আগুন থেকে একটি কন্যার জন্ম দেন। এই কন্যাই হলেন গণেশের মেয়ে সন্তোষী মা। সন্তোষী মা শুভ ও লাভের হাতে রাখী বেঁধে দেন।

তবে রাখী বন্ধন উৎসবের আগে শুক্লযজুর্বেদ মন্ত্র অনুসারে, শ্রাবণ পূর্ণিমার দগিন ব্রহ্মঋষিদের উদ্দেশে তর্পণ করার পরম্পরা চলে আসছে বহু দিন ধরে৷ আর গুরু পরম্পরার এই প্রথা অনুযায়ী ওই দিন সনাতন ধর্মী মানুষজন এবং বৈদিক গুরুরা নিজের শিষ্যদের সঙ্গে সমুদ্র, নদী কিংবা সরোবরের পাশে বসে তাঁর আত্মশুদ্ধি করেন৷ আর সেই সময় তাঁদের হাতে পরিয়ে দেন একটি পবিত্র সুতো৷ সেই সুতোই পরবর্তিকালে সাধারণ লোকের কাছে রাখী হয়ে ওঠে।

শোনা যায়, গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করলে চিতোরের বিধবা রানি কর্ণবতী অসহায় বোধ করেন এবং তিনি ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে নিজের ওড়নার একটু অংশ ছিঁড়ে রাখী হিসেবে পাঠিয়ে তাঁর কাছে সাহায্য চান। কর্ণবতীর পাঠানো রাখী পেয়ে অভিভূত হয়ে যান হুমায়ুন এবং চিতোর রক্ষা করার জন্য তিনি বিপুল সৈন্য পাঠান।
রাখী পাঠানোর এই মাহাত্ম্য দেখে এর পর থেকেই এই উৎসবের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

কিংবদন্তী আছে, আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলেন, আলেকজান্ডারের যাতে কোনও ক্ষতি না করে। আলেকজান্ডারের স্ত্রীর সেই অনুরোধ পুরু রেখেছিলেন।

মহাভারতের কাহিনি অনুযায়ী, নিজের নাতি অভিমন্যুর রক্ষা কামনা করে রাখী বাঁধেন পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তী।

কথিত আছে, ভাইফোঁটার মতোই এই রাখী উৎসবেও যম ও যমুনার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যমুনাও রাখী পরিয়েছিলেন যমের হাতে।

বাংলা ক্যালেন্ডার এবং পাঁজি অনুযায়ী প্রতি বছর শ্রাবণ পূর্ণিমার দিনেই এই উৎসব মহাধুমধাম করে পালিত হয়। শুধু ভারতেই নয়, রাখী বন্ধন উৎসব পালিত হয় নেপাল, পাকিস্তান এবং মরিশাসেও। এ দিন ভাইয়ের কপালে কুমকুমের ফোঁটা দিয়ে হাতে রাখী বেঁধে দেন বোনেরা। রাখী পরানোর পর প্রদীপ ঘুরিয়ে ভাইয়ের আরতি করেন। তার পরে চলে মিষ্টিমুখের পালা। ভাইয়েরাও তার সাধ্য মতো বোনেদের হাতে তুলে দেয় উপহার।

এ ভাবেই রক্তের সম্পর্ক ও ভালবাসা নিবিড় হয়। দীর্ঘকাল থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এই প্রথা। তবে বাঙালিদের কাছে রাখী কেবলই ভাই বোনের মধ্যে আবদ্ধ নয়। এখন তো বন্ধুরাও বন্ধুদের রাখী পড়ায়। সে ছেলেই হোক কিংবা মেয়ে। আর এই রাখি বন্ধনের কথায় খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে রাখীকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তিনি। ওই বছরের ২০ জুলাই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের কথা ঘোষণা করে। জানানো হয়, এই আইন কার্যকরী হবে ১৯০৫-এরই ১৬ অক্টোবর, বাংলায় ৩০ আশ্বিন।

সেই সময়ে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় মানুষ সামিল হয়। ঠিক হয়, ওই দিন বাংলার মানুষ পরস্পরের হাতে বেঁধে দেবেন হলুদ সুতো।

রবীন্দ্রনাথই পালটে দিয়েছিলেন রাখী বাঁধার সংজ্ঞা। তিনিই এই দিনটিকে রাখী পরিয়ে মিলন দিবস হিসেবে পালন করার জন্য কলকাতা, ঢাকা ও সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম ভাইবোনেদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাংলায় হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বকে ফুটিয়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেন তিনি।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে রাখী বন্ধন উৎসবের সঙ্গে কিন্তু চিরাচরিত শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার রাখী উৎসবের কিন্তু কোনও সম্পর্ক নেই। ওই রাখী বন্ধন উৎসব শ্রাবণ মাসে বা পূর্ণিমা, কোনওটাতেই হয়নি। ওই রাখীর মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানবিকতা, সম্প্রীতি এবং প্রত্যেক মানুষের মধ্য একতা। এই রাখী বন্ধন উৎসব নিয়েই রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছিলেন— বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল। পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, হে ভগবান।

কাজী নজরুলও থেমে থাকেননি। রাখী বন্ধন নিয়ে তিনিও লিখেছিলেন একটি অসামান্য কবিতা— রাখী বন্ধন। সেই রাখী বন্ধন উৎসব পড়েছে আজ, ২২ অগস্ট। রবিবার। কিন্তু জানেন কি কোন সময়টা রাখী বাঁধার জন্য শুভ সময়?

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী ২১ অগস্ট বেলা ৩টে ৪৫ মিনিট থেকে শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা শুরু হবে। ২২ অগস্ট ৫টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত পূর্ণিমা থাকবে। উদয়া তিথিতে রাখী বন্ধন উৎসব পালিত হয়। ২২ অগস্ট উদয়া তিথি হওয়ায় এ দিনই রাখী বন্ধন হবে। এ ছাড়া এ বছর রাখী পূর্ণিমায় ঘনিষ্ঠা ও শোভন যোগ পড়ছে। এই যোগের ফলে এই উৎসব ঘিরে শুভফল পাওয়া যাবে। রাখী বাঁধার সব চেয়ে ভাল সময় হল বেলা ১টা ৪৪ মিনিট থেকে ৪টে ২৩ মিনিট পর্যন্ত। অন্তত পঞ্জিকা মতে, ভাল মুহূর্ত হল ভোর ৬টা ১৫ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

সিদ্ধার্থ সিংহ
সিদ্ধার্থ সিংহ
২০২০ সালে 'সাহিত্য সম্রাট' উপাধিতে সম্মানিত এবং ২০১২ সালে 'বঙ্গ শিরোমণি' সম্মানে ভূষিত সিদ্ধার্থ সিংহের জন্ম কলকাতায়। আনন্দবাজার পত্রিকার পশ্চিমবঙ্গ শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, স্বর্ণকলম পুরস্কার, সময়ের শব্দ আন্তরিক কলম, শান্তিরত্ন পুরস্কার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার, কাঞ্চন সাহিত্য পুরস্কার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা লোক সাহিত্য পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, সামসুল হক পুরস্কার, সুচিত্রা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অণু সাহিত্য পুরস্কার, কাস্তেকবি দিনেশ দাস স্মৃতি পুরস্কার, শিলালিপি সাহিত্য পুরস্কার, চেখ সাহিত্য পুরস্কার, মায়া সেন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও ছোট-বড় অজস্র পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন ১৪০৬ সালের 'শ্রেষ্ঠ কবি' এবং ১৪১৮ সালের 'শ্রেষ্ঠ গল্পকার'-এর শিরোপা সহ অসংখ্য পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'পঞ্চাশটি গল্প' গ্রন্থটির জন্য তাঁর নাম সম্প্রতি 'সৃজনী ভারত সাহিত্য পুরস্কার' প্রাপক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।