13.1 C
Drøbak
বুধবার, অক্টোবর ২০, ২০২১
প্রথম পাতাসাম্প্রতিকবিস্মৃতির অন্তরালে চিত্ত হালদার সুবাস জড়িয়ে আছে আজও

বিস্মৃতির অন্তরালে চিত্ত হালদার
সুবাস জড়িয়ে আছে আজও

মানুষের কাছে আজ বিস্মৃত তিনি; তিনি বাংলাদেশের তার সময়ের একজন প্রথিতযশা ভাস্কর্যশিল্পী ও চিত্রশিল্পী ছিলেন। প্রয়াত হয়েছেন তেতাল্লিশ বছর আগে। বরিশালের গোঁড়াচাঁদ দাস রোডে কাটে তার আজীবন। চিত্রকলায় ও ভাস্কর্যশিল্পে তাঁর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তবে তিনি প্রাচীন বাংলা ও ভারতে ভাস্কর্য নির্মাণের কিছু কিছু কৌশল প্রয়োগ করেই তৈরি করতেন ভাস্কর্য। রীতিমতো শিল্পশাস্ত্র অধ্যয়ন এবং সেই শিল্পশাস্ত্রের জ্ঞান আয়ত্ত করেছিলেন। ভারতবর্ষের শিল্পীদের জন্য শুক্রনীতি (শিল্প আইন) ও শিল্প সম্পর্কিত সমস্ত বই-পুস্তকে কলাশিল্প নিয়ন্ত্রণের যে সব সূক্ষ্ণ ও কঠোর নিয়ম আছে- তা তার শিল্পকর্মের মধ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান। তিনি শাস্ত্রীয় বিধান, মূতির্র ধ্যান, রূপতত্ত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন বলে ধারনা করা হয়। তাঁর শিল্পের বিষয়, মডেলিং, কার্ভিং ও মিশ্র পদ্ধতিতে প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্যের শ্রেণিবিন্যাসে দেহকাণ্ড, পূর্ণদেহ, মুখোশ, জন্তুসদৃশ। আর উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন প্লাস্টার অব প্যারিস, মাটি, কাঠ, পাথর ইত্যাদি। প্রকৃতি অনুসারে প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্য নীরব বা অচঞ্চল, গতিময় এই দুই প্রকৃতি তার শিল্প কর্মের মধ্যে দেখা যায়। এই শিল্পীই বোধহয় পূর্ব বাংলার প্রথম যিনি শিল্পকর্ম তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন প্লাস্টার অব প্যারিস।

ভাস্কর্য চিত্রশিল্পী চিত্ত হালদার গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক রূপ ও বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের জীবন তিনি তার ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পে তুলে ধরেছেন। তাঁর তৈরি মৌলিক ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে কৃষক, জেলে, শ্রমিক, কলসী কাঁখে বধূ, রাখাল ছেলে ও বাঁশী পালকী ও নববধূ, বেদে নারী ও সংস্কৃতি, সাঁওতালী নারী, স্নানরতা রমনী, প্রসাধনী বা সন্ধ্যায় সাজে রমনী, মিথুন, জোড়ামুখ, নারী, মাদার মেরী, যিশুখ্রিস্ট, পূজারিণী, মহামায়া, স্বরস্বতী, ভেনাস, লিডা ও রাঁজহাস, ওমর খৈয়াম ও সাকী, গান্ধীজীর অবয়ব, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথা ঠাকুর অন্যতম।

g বিস্মৃতির অন্তরালে চিত্ত হালদার <br>সুবাস জড়িয়ে আছে আজও
চিত্ত হালদারের শিল্পকর্ম ‘মহামায়া’

১৯৩৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বরিশাল শহরে অক্সফোর্ড মিশন রোডে ডগলাস বোর্ডিংয়ে মিশনারীদের ম্যারি এন হাসপতালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: বিশ্বনাথ হালদার। মাতা: তরী হালদার। পিতার আদিনিবাস ছিল বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার ধামসর গ্রামে। মায়ের বাড়ি ছিল বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি গ্রামে। তিনি শিশুকাল থেকেই ছবি আঁকতেন। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকের কথা, তার পোষা কুকুরের নাম ছিল হান্টার। হান্টার ছিল ভীষণ তেজস্বী। একদিন তিনি হান্টারের লেজ থেকে কিছু পশম কেটে গাছের ডাল কেটে তুলি বানান। বিভিন্ন গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে রঙ বের করে তখন ছবি আঁকার কৌশল নিজে থেকে আয়ত্ত করেছিলেন। এমনকি আঁকার কাজে তিনি তখন কাঠকয়লা, বোনেদের আলতা ব্যবহার করেছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি একটু একাকী নিজস্ব শিল্পের জগতে ডুবে থাকতে পছন্দ করতেন। কখনো নিজ হাতে রঙবেরঙের ঘুঁড়ি ও লাটাই বানাতেন ও ঘুঁড়ি ওড়াতেন। সে কারণে তিনি তার বন্ধুমহলে শিশুবেলায় বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর বিদ্যালয় জীবন শুরু হয়েছিল বগুড়া রোডে অক্সফোর্ড মিশন পাঠাশালায়, এরপরে বরিশাল জিলা স্কুল ও পরে বরিশাল বি.এ. স্কুল (ব্রজমোহন বিদ্যালয়) থেকে তখনকার মেট্রিকুলেশান পাস করেন। এরপরে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন সম্পর্কে আর জানা যায়নি। তিনি বরিশাল জিলা স্কুলে ক্লাশ ফাইভে পড়াকালীন সময়ে সরকারী শিক্ষা বৃত্তি পান।

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বরিশাল শহরের কালিবাড়ি রোডে ‘চিত্রালি’ নামে বাণিজ্যিক ছবি আঁকার একটি আট’ স্টুডিও খুলেছিলেন। প্রথম দিকে সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, শ্বেতপাথরের নামফলক, ব্যক্তির পোট্রেট প্রভৃতির কাজ অর্থের বিনিময়ে করতেন। পরে তিনি সে কাজ ছেড়ে দেন। বাঁশ, মাটি, পাথর, প্লাস্টার অব প্যারিস ইত্যাদি উপাদান থেকে ভাস্কর্য বানাতেন। তাঁর তৈরি এ সমস্ত হস্তশিল্পগুলো ঢাকার স্বনামধন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে যেমন ‘বাংলাদেশ এজেন্সী’, ‘মলজ’, ‘ভোগ’, ‘তৈজস’, ‘শীষমহল’ থেকে দেশী-বিদেশীদের কাছে বিক্রি হয়েছে এবং প্রশংসা পেয়েছে।

তিনি ১৯৫৯ সালে ঝনা’ হালদারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, বরিশালের ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডে ব্যাপ্টিস্ট চার্চে তার বিয়েতে দু’পরিবারের আত্মীয়স্বজনরা ছাড়াও তার কাছের বন্ধুরা যারা এসেছিলেন তাদের মাঝে অন্যতম ছিলেন ডা. রণজিৎ কুমার বড়াল ও পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্র পরিচালক পুলিন মিত্র। স্বাধীনতার পরে পুলিন মিত্র একজন সহকারী চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে ‘জিঞ্জির’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন। বিয়েতে দিলীপ বিশ্বাসও এসেছিলেন, দিলীপ বিশ্বাস (১৯৪৬-২০০৬) পরে বাংলাদেশের সিনেমার প্লেব্যাক গায়ক, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

শিল্প চর্চার পাশাপাশি তিনি প্রচুর বই পড়তেন এবং তাঁর একটি সংগ্রহশালাও ছিল। দেশি-বিদেশী লেখকদের অনেক দুষ্প্রাপ্য বই তার সংগ্রহে ছিল। দর্শন, চিত্র ও শিল্পকলা, ইতিহাস সহ প্রচুর বই তাঁর সংগ্রহশালাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেসময় তিনি চুরুট খেতেন, হাফপ্যান্ট-গ্যাঞ্জি পরতেন।

১৯৬৪ সালে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, শ্বেতপাথরের সে ভিত্তিপ্রস্তরটি তিনি ইংরেজিতে খোদাই করে দেন। এ সময় তিনি বরিশালের বেশিরভাগ লেখকের গ্রন্থের রুচিসম্পন্ন, নান্দনিক ও একাধিক রঙের প্রচ্ছদ তৈরি করে দিতেন। তিনি নিজেই ফোটো প্রিন্ট করতেন এবং অনেককেও শিখিয়েছেন। ১৯৬৫/৬৬ সালে তিনি একটি বক্স ক্যামেরা ও ফটো এনলারজার বানিয়েছিলেন, যা দিয়ে পুরনো দেয়ালসেট টিনের ঘরের অন্ধকার একটি রুমে ফটো তুলে প্রিন্ট করতেন। তিনি নিজ হাতে ব্লেজার, হাতের চুড়িও বানিয়েছিলেন। কিছু আসবাবপত্র খাবার টেবিল, স্যুটকেস নিজ হাতে বানিয়েছেন। তিনি নিজ প্রয়োজনে গিটার, বেহালা বানিয়েছেন। কিনেছিলেন তানপুরা। বাজাতে পারতেন বাঁশি, গিটার, বেহালা, তানপুরা।

১৯৭১ সালে সারা দেশ জুড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। যদিও তখনও বরিশাল শহরে পাকিস্তানী সেনারা এসে পৌছায়নি। গোঁড়াচাঁদ দাস রোডে চিত্ত হালদারের বাড়ির পাশে সাহেবদের কবরস্থানের ভেতরে একটি বহু পুরান কবর খোঁড়া হয়েছিল লুকিয়ে থাকার জন্য। কবরটির বয়স এখন হবে অন্তত দুশ বছরের বেশি। চিত্ত হালদার তাঁর কয়েকজন ছোটভাইসম বন্ধুদের নিয়ে বসলেন, কেমন করে পাকিস্তানী সেনাদের রুখে দেওয়া যায়। অস্ত্র সঙ্কটের কথা ভেবে তিনি হাত বোমা, মলোটভ ককটেল বানানোতে উদ্যোগী হন। কিন্তু তিনি কখন কবে এ বিদ্যা রপ্ত করেছিলেন তা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয় এক সময়ে বরিশালের বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল, হয়তো সেখান থেকে তিনি বোমা বানানো শিখেছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে চিত্ত হালদার তার সহযোগী হেলাল উদ্দিন, সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান কচি ও এনায়েত হোসেন মিলনকে নিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে বোমা তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করেন ও গোড়াচাঁদ দাস রোডের নিজ বাড়িতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ৪ এপ্রিল বাসায় বোমা বিস্ফোরণে আহত হলে দেখতে আসেন ৯নং সেক্টর কমাণ্ডার মেজর জলিল তিনি চিকিৎসার ব্যাবস্থা করেন। তারপর কালীবাড়ি রোডের ধর্মরক্ষিণী সভায় বরিশালের তরুণদের প্রগতিশীল সংগঠন ‘যুবসংঘ’ এর কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মলোটভ ককটেল, হ্যান্ডগ্রেনেড, ডিনামাইট, রকেট লাঞ্চার, ট্যাংক বিধ্বংসী বোমা প্রস্তুত করেন; সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন হেলালউদ্দিন, সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান কচি, এনায়েত হোসেন মিলন, মিন্টু বসু, মাহতাব, এস. এম. ইকবাল, ডা. এস সি রায়, হারেচ খান, নজরুল ইসলাম চুন্নু, ফরিদ খান প্রমুখ। বরিশাল জিলা স্কুলের পুরনো বিল্ডিংয়ের সিঁড়ির নিচে একটি বোমার সফল পরীক্ষা করেন। তাঁর তৈরি বোমা ব্যবহৃত হয়েছিল চাঁদপুর-খুলনার মুক্তিযুদ্ধে। ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কিন্তু ২৫ এপ্রিল সড়ক-নৌপথে আক্রমণ ও ছত্রীসেনা নামিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বরিশাল শহর দখলে করে নিলে দ্বিতীয় সংখ্যাটি প্রকাশিত হতে পারেনি।

এছাড়াও প্রগতিশীল তরুণদের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বরিশাল যুব সংঘ’ সেখানেই তাঁর সঙ্গে আরো কিছু যুবক একত্রিত হলেন, সেই কালিবাড়ি রোডে ‘ধর্মরক্ষিণী সভা’ নামক হিন্দুদের মিলনস্থানটি উন্মুক্ত হলো বরিশাল যুব সংঘের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। বাবার হাতে অন্যান্যদের সহযোগিতায় তৈরি হতে থাকলো একের পর এক বোমা। মেজর জলিল এলেন, চিত্ত বাবুকে তিনি স্থানীয় উপাদানে তৈরি স্বল্পমাত্রার রকেট লাঞ্চার, ডিনামাইট ও বোমা বানাতে বললেন। চিত্ত হালদারের তৈরি এসব বোমা পরবর্তীতে চাঁদপুর, খুলনার গল্লামারী যুদ্ধে সাফল্য এনে দেয় বলে জানা গেছে। বোমা তৈরির কাজে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন হেলাল উদ্দিন, ওয়াহিদুজ্জামান কচি, এনায়েত হোসেন মিলন (প্রয়াত), বাকীরা বোমা বহন কাজে নিযুক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল একজন পাক গুপ্তচর ধরা পড়ে। মেজর জলিল (পরবর্তীতে ৯নং সেক্টর কমাণ্ডার) তাকে বেলসপার্কে নিজে গুলি করে মেরে ফেলেন। এরপরে ২৫ এপ্রিল সড়ক ও নৌপথে আক্রমণ এবং জেটবিমান থেকে শেল নিক্ষেপ করার পরে ছত্রীসেনা নামিয়ে বরিশাল শহর দখল করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। চিত্ত বাবুর বানানো বোমা দিয়ে বরিশাল রহমতপুরের ব্রীজ উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তখন পাক সেনাদের কয়েকটি গাড়ি বিধ্বস্ত হয় ও কিছু পাক সেনা সেখানেই নিহত হয়। এরপরেই পাক আর্মির ব্লাক লিস্ট তালিকায় চিত্ত হালদারের নাম যুক্ত হলো। তাঁকে খুঁজতে স্থানীয় রাজাকাররা ও পাক সেনারা ঘন ঘন তাঁর খোঁজে বাড়িতে আসতে শুরু করে। তাঁকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয় পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষ থেকে। তাঁর বাবা-মা ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি না হওয়ায় পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। রাজাকাররা তাঁকে দিনরাত খুঁজতে থাকে। হিটলিস্টে তাঁর নাম অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কথা গোপনসূত্রে জানতে পেরে তিনি স্বপরিবারে বরিশাল ত্যাগ করে বরিশাল যুবসংঘের তৎকালীন সভাপতি এস.এম. ইকবালের বানারীপাড়ার বাড়িতে, উজিরপুরের ধামসরে চিত্তবাবুর বাবার পৈতৃক বাড়ি ও কালমাঘা গ্রামে এক নিকটাত্মীয়ের বাড়ি, আগৈলঝাড়া উপজেলার জোবারপাড় গ্রামে অন্য এক আত্মীয়ের বাড়ি পালিয়ে থাকেন; কিন্তু সেখানেও থাকা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সেখানে ডাকাতের কবলে পড়েন। তারপর সেখান থেকে নৌকাযোগে চলে যান গোপালগঞ্জ জেলায় বোন প্রেমলতা হালদারের বাড়িতে, খাকবাড়ি গ্রামে। কিন্তু সেখানেও তার খোঁজে লোক গেলে তিনি স্বপরিবারে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এক সময় বোন প্রেমলতার বাড়িতেও তাঁর খোঁজে রাজাকার আসে, তাঁর বোন ভয় পেয়ে তাকে সেখানে থেকে ভারতে চলে যাবার পরামর্শ দেন। সেসময়েও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল; বিভিন্ন পরিচিত-অপরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় তিনি সপরিবারে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেন।
চিত্তবাবুর পরিবার মূলত হেঁটে বনগাঁ হয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারত যায়। দিনের বেলা রাস্তার পাশে জঙ্গলে সকলে লুকিয়ে থাকত, আর রাতের বেলা পথ চলত। তবু পথে পাক সেনারা পথ আটকিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে,কিন্তু চিত্তবাবুর পরিচয় জানতে পারেনি। নৌকায় একবার নদী পার হওয়ার সময় আগের নৌকায় বরিশালের এক সুপরিচিত ব্যক্তির মেয়েকে রাজাকাররা ধর্ষণ করে। তাদের সঙ্গে দেশত্যাগীদের দলে চিত্রশিল্পী হাসি চক্রবর্তীর পরিবারও ছিল। কিশোর বয়সে তিনি চিত্ত হালদারের কাছেই ছবি আঁকার হাতেখড়ি নিয়েছিলেন। আগস্ট মাসে শরণার্থী হিসেবে পরিবারসহ ভারতে পৌঁছান। দমদমে জ্যাঠাতো ভাই নিরঞ্জন করের বাড়িতে ওঠেন, সেখানেও শিল্পকর্মের কাজ করেন।

এদিকে বরিশালের বাসায় তখন চিত্তবাবুর বাবা, মা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। চিত্তবাবুকে না পেয়ে তাঁর বাবা ও মাকে অন্তত দু’বার পাক সেনারা ধরে নিয়ে যায়, চিত্তবাবুর অবস্থান জানার চেষ্টা করে অল্পস্বল্প টর্চার করতো, দু’তিন দিন পরে ছেড়ে দিত। চিত্ত হালদারের বাবা উর্দু জানতেন ফলে পাক সেনাদের সঙ্গে তিনি উর্দুতে কথা বলতেন। চিত্ত হালদারকে খুঁজে না পেয়ে পাকিস্তানী সেনারা দু’বার তার বৃদ্ধ বাবাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় ওয়াপদা ক্যাম্পে; জিজ্ঞাসাবাদ ও নিপীড়নের পরে ছেড়ে দেয়।

বরিশাল মুক্ত হয় ৮ ডিসেম্বর। তিনি খবর পেয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ১৬ ডিসেম্বর বরিশাল এসে পৌঁছান। তিনি ফিরে এসে দেখেন তাঁর বানানো সব বাদ্যযন্ত্র, চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, মূল্যবান বইপত্র, পিতলের দাড়িপাল্লা, কাঁসার তৈজসপত্র, তিনটি ক্যামেরা, দূরবীন, ঘড়ি, ছবি ছাপার মেশিন দোকান ও বাসা থেকে লুট হয়ে গেছে।

১৯৭২সালের জানুয়ারিতে দেশে ফিরেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিহত শহীদদের স্মরণে কালিবাড়ি রোডে বর্তমান জগদীশ গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের সামনে তিনি নির্মাণ করেন শহীদ মিনার মিনার, যা এখনও অনাদরে-অবহেলায় হলেও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। বরিশালে এটিই স্থায়ীভাবে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার। হয়েছিল। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে তৎকালীন উদয়নী ক্লাবের সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাদ ও রানী ভট্টাচার্য সহ সে সময়কার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে এবং মুক্তিযোদ্ধা চিত্ত হালদারের নক্সা ও তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল এই শহীদ মিনার।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ, তিনি ঠিক করলেন যে তিনি আর বরিশালে কাজ করবেন না। যৎসামান্য অর্থ নিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি রাজধানী ঢাকায় চলে যান। সেখানে চিত্রশিল্পী পটুয়া কামরুল হাসানের সান্নিধ্য ও সহযোগিতা লাভ করেন। ঢাকার ফার্মগেটের কাছে রাজাবাজারে তিনি দুই রুমের একটি বাসা ভাড়া নেন এবং সেখানে ব্যক্তিগতভাবে তার শিল্পকর্মের কাজ চালিয়ে যান ও জীবন নির্বাহ করেন। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পটুয়া কামরুল হাসান তাকে পরিচয় করিয়ে দেন সেসময়ে নিমতলীতে অবস্থিত ঢাকা জাদুঘরের তৎকালীন পরিচালক ড. এনামুল হকের সঙ্গে, তিনি পরবর্তীতে শাহবাগে স্থানান্তর্তি জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। তৎকালীন ঢাকা জাদুঘরে সংরক্ষিত হিন্দুধর্মের দেবী ‘মহামায়া’র একশত রেপ্লিকা তৈরি করে দেন। পরে সেগুলো জাদুঘর থেকে দেশী ও বিদেশী সংরক্ষকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। পুরনো নথিপত্র ছাড়াও তাঁকে নিয়ে নির্মিতব্য তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে গিয়ে এ কথা ড. এনামুল হকের থেকে জানা যায় । তাঁর কথানুসারে, মুক্তিযুদ্ধের পরে জাদুঘরকে আকর্ষণীয় করার জন্য চিত্তবাবুর অবদান স্বীকার করে তাকে চাকুরী দিতে চেয়েছিলেন তৎকালীন পরিচালক ড. এনামুল হক। কিন্তু তিনি চাকুরীর নিয়ম-শৃঙ্খলের মধ্যে নিজেকে বন্দী করতে চাননি, তিনি সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। আমৃত্যু তিনি শিল্পীর স্বাধীন শিল্প জীবন কাটিয়েছেন। অঢেল অর্থ-বিত্ত রেখে যাননি; কিন্তু অফুরন্ত সুনাম রেখে গেছেন।

১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে জুন মাসে তাকে বরিশালে ফিরিয়ে আনা হয়। সে বছর ১৯ জুলাই লিভার সিরোসিস রোগে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাড়ির পাশের গোরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

তিনজন নাবালক সন্তান নিয়ে চিত্ত হালদারের স্ত্রীর বেঁচে থাকার জীবন সংগ্রাম । তিনি কখনওই অর্থ-প্রতিপত্তি-যশ-খ্যাতি কোনটা চাননি। চেয়েছিলেন নিজের শিল্পীসত্ত্বার প্রকাশ ঘটাতে ও মানুষের জন্য কিছু করতে। এমন একটি সময় ছিল যখন বরিশাল শহরে তাঁর খোঁজে কেউ এলে ঠিকানা বলার প্রয়োজন হত না, চিত্ত আর্টিস্টের বাসায় যাবো বললে যে কোন রিক্সাওয়ালা বাসায় পৌঁছে দিয়ে যেত। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার পাননি। মুক্তিবার্তায় তার নম্বর ০৬০১০১০৭৬৬।

তাঁর মৃত্যুর পরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানতে পেরেছি, সোনারগাঁয়ে একটি প্লট সরকার থেকে দেয়ার কথা হয়েছিল, অজ্ঞাত কারণে তিনি তা পাননি। ব্যক্তিগতভাবে তার কবর বাঁধিয়ে দেয়ার কথাও কেউ কেউ বলেছিলেন। তার কবর আজও তেমন থেকে গেছে। সংরক্ষণের অভাবে তাঁর অনেক কাজ আজ কালের অন্তরালে হারিয়ে গেছে। তাঁর অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা তিনি আজও পাননি।
বইমেলা, ফেব্রুয়ারি-২০২০ সালে চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও মুক্তিযোদ্ধা চিত্ত হালদারকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে স্মারকগ্রন্থ; ৩০৪ পৃষ্টা সম্মিলিত একটি আকর গ্রন্থটি চিত্ত হালদার প্রেমী মানুষজন,গবেষক, অনুসন্ধিৎসু পাঠক পাঠিকার কৌতূহল মেটাবে।

তিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই কিন্ত তাঁর সৃষ্টি অনন্তকাল বেঁচে থাকবে আর সুবাস ছড়াবে সর্বত্র।

লিটন রাকিব, কলকাতা
লিটন রাকিব, কলকাতা
লিটন রাকিব তরুন কবি, গবেষক ও সাংবাদিক।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।