গল্প: ভরদুপুরের সর্বনাশ

শরীফ আহমেদ
শরীফ আহমেদ
5 মিনিটে পড়ুন

মনটা কেমন যেন আতঙ্কে ভরে উঠে ওর।
মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে কতো বড় সর্বনাশটা হয়ে গেলো।
বাসার গলিতে ঢুকতে গিয়ে পকেটে হাত দেয় অন্তর। মোবাইলটা নাই পকেটে। বাস থেকে নামার সময় খেয়াল ছিলো না। মোবাইলটা বাসে রয়ে গেছে? নাকি চুরি হয়েছে?
সে গলিতে না ঢুকে বাসস্ট্যান্ডের দিকে দৌড় দেয়। আরেকটা বাসে উঠে বসে। এখানকার বাসগুলো সব ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছ থেকে ঘুরে আবার মিরপুর যাওয়ার জন্য যাত্রী তুলে।
একজনের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে কল দিতে হবে। পাশে বসা ছেলেটাকে বলে, ভাইয়া? মোবাইলটা একটু দিবেন?
ছেলেটা কিছু বলে না।
সে আবার বলে, আমার মোবাইলটা আগের বাসে রাইখা নাইমা গেছি। কল দিয়া দেখি রিং হয় কি না?
ছেলেটা এবার মোবাইল দেয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেয়।
সে কল দেয়। বাজে মোবাইলটা।
বাজতাছে ভাই। রিং হয়।
আর কল দিয়েন না। বেশি বাজলে কেউ নিয়া যাবে। আরেক যাত্রী বলে। বাসটা খুইজ্যা বাইর করেন তাড়াতাড়ি।
ঢাকেশ্বরীর সামনে গিয়ে নামে। সে ‘সেফটি’ বাসে মিরপুর অরিজিনাল ১০ থেকে আজিমপুরে এসেছে সে। একটু আগে ঘুরে দাঁড়ানো ‘সেফটি’ বাসে উঠে। বামপাশের মাঝামাঝি দুইটা সিটে মোবাইল খুঁজতে থাকে সে।
হেলপারকে জিজ্ঞেস করে, আমার মোবাইলটা রাইখা নাইমা গেছিলাম।
কোন জায়গায় নামছেন?
আজিমপুর।
কোন গাড়িতে আইছিলেন?
এই গাড়িতে।
আফনের মনে আছে এই গাড়ি?
হ্যাঁ।
কতোক্ষণ আগে?
দশ মিনিট আগে। বাস থেকে নাইমা দুই-তিন মিনিটের মধ্যে দেখি পকেটে মোবাইল নাই। পরের বাসে উইঠা আসছি।
হ হ বুঝছি। এই বাস না।
এই বাস না?
না, এই বাস না। আমরা আধাঘণ্টা আগে আইছি। সিরিয়াল না লইয়া খারায়া আছিলাম।
বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে। পড়ন্ত দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ্দুরে চোখ জ্বলতে থাকে।
অন্য কোনো বাস তো এই পাঁচ-দশ মিনিটে আসেনাই এইখানে।
এইখানে আহেনাই। কিন্তু রাস্তার মাথায় ঘুরাইয়া চইলা গেছে আজিমপুর। দেহেন আজিমপুর গিয়া ধরতে পারেন কি না।
একটা ধাঁ ধাঁর মধ্যে পড়ে যায় অন্তর। এই মহাশহরে হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। কী করবে এখন? তাছাড়া এই বাসে তো ওর মোবাইল নাই। সে পা বাড়ায় বড় রাস্তার দিকে। একটা বাসে উঠে পড়ে। আজিমপুরের দিকে যেতে যেতে সামনে দেখে, কোনো ‘সেফটি’ বাস আছে কি না। কিন্তু সেরকম কোনো বাস দেখা যায় না। আশায় বুক বাঁধে সে। সেই হেলপারের কথা মতো সে যে বাসে এসেছিলো সেটা যদি ঢাকেশ্বরী না গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে থাকে তাহলে আজিমপুর গিয়ে যাত্রী তুলবে।
বাসটা আজিমপুর গিয়ে থামে। আর অন্তর লাফ দিয়ে নেমে সামনে দৌড় দেয়। নাহ্। কোনো সেফটি বাস নাই। আজিমপুর সিগন্যাল পার হয়েও কোনো সেফটি বাস দেখা যায় না। আরেকটা বাসে উঠে যায় সে। নিউমার্কেটের সিগন্যালে গিয়ে নামে। নীলক্ষেত টিএনটি কলোনির গেইট পর্যন্ত ট্রাফিক জ্যাম। জ্যামের পেছন থেকে খোঁজা শুরু করে সেফটি বাস। কিন্তু পায় না। জ্যামের মাঝামাঝি একটা বাস পায়। সেটাতে উঠে হেলপারকে জিজ্ঞেস করে, ঢাকেশ্বরীর মোড় থেকে ইউটার্ন নিছিলেন?
কিসের ইউটার্ন?
একটু আগে মিরপুর থাইকা আইছেন না?
হ আইছি। ত আর কই থাইকা আমু?
ঢাকেশ্বরীর মোড় থেকে ইউটার্ন নিছিলেন?
ইউটার্ন নিমু ক্যা? ঢাকেশ্বরী গিয়া সিরিয়াল লইছি?
আমি আজিমপুরে নামছি। ভুলে মোবাইল রাইখা গেছি বাসে।
কোন বাসে?
এই বাসে?
কেমনে বুঝলেন এই বাসে? কতক্ষণ নামছেন?
২০ মিনিট আগে?
আমরা আজিমপুর পার হইয়া গেছি ৩৫ মিনিট আগে। ও উস্তাদ? ৩৫ মিনিট আগে না?
হ ৩৫ মিনিট আগে। ঢাকেশ্বরী থাইকা সিরিয়াল নিলাম তো ২৫ মিনিট হইলো।
অন্তর নেমে যায় বাস থেকে। এই বাস না। সেই আগের বাসেই সে মোবাইল রেখে নেমেছে। সেই হেলপার ভুল কথা বলে ওকে এতোদূর পাঠিয়ে দিয়েছে। রাস্তার পাশের আইল্যান্ডে বসে পরে সে। কী আর করবে? বাসায় তো যেতে হবে। বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে ওকে আজিমপুর রিপোর্টের কাছে সাইটে যাওয়ার কথা। সাইটে গিয়ে সাইটের ছবি পাঠাতে হবে। মোবাইলে ছবি তুলে ইমোতে পাঠাতে হবে। কিন্তু মোবাইল তো হারিয়ে গেছে। ছবি তুলবে কী দিয়ে? অন্তত ৬ হাজার টাকা না হলে এরকম আরেকটা মোবাইল কেনা যাবে না।
সর্বনাশের তাড়নায় দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যায়। সে বাসায় যায়। বউ দরজা খুলে দেয়। ভেতরে ঢুকে থম মেরে বিছানায় বসে থাকে। ১২ হাজার টাকা বেতনের চাকরি তার। হয়তো মোবাইল হারানোর জন্য চাকরিটা চলে যাবে। তবে তার চেয়ে এই মাসের বেতন থেকে মোবাইলের দাম হিসেবে ৫ হাজার কেটে রাখার সম্ভবনা বেশি। তাদের একরুমের সাবলেট বাসার ভাড়াই তো ৪ হাজার টাকা। ১ হাজার টাকা দিয়ে সারাটা মাস কীভাবে চলবে?

গুগল নিউজে সাময়িকীকে অনুসরণ করুন 👉 গুগল নিউজ গুগল নিউজ

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন
সাংবাদিক, কথা সাহিত্যিক ও কবি শরীফ আহমেদ-এর জন্ম ১৬ জানুয়ারি, ১৯৮৩, কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানায়। ১৯৯৬ সাল থেকে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধলেখা শুরু করেন। পেশাগত জীবনে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.এস.সি. ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অতিরিক্ত কোর্সসহ জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এম.এস.সি সম্পন্ন করে বর্তমানে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ডিপার্টমেন্টের জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনে গবেষণা (পিএইচডি) করছেন। বিভিন্ন পত্রিকা, সাহিত্য সাময়িকী ও লিটিল ম্যাগাজিনে তার প্রায় কয়েকশত কবিতা, বেশকিছু গল্প ও ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রকাশিত তেরোটি। তিনটি কবিতা সংকলন, নাম-‘শীতল আগুন আর প্রাণের বিদ্রোহ’, 'মনের ইস্টিশনে' ও 'স্বপ্নপোড়া আগুন', দুইটি উপন্যাস, নাম-‘বরফের সূর্য’ ও 'ভ্যানেন্টাইনের কৃষ্ণশিকল', চারটি গল্পগ্রন্থ, নাম-'প্রেম এবং', 'বিনাশকাল', 'লকডাউনের পাণ্ডুলিপি', ও 'এ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ভূত' এবং চারটি ভ্রমণকাহিনী। এছাড়াও তিনি জাতীয় সংবাদপত্র‘সাপ্তাহিক অগ্রযাত্রা’ ও অনলাইন সংস্করণ জাতীয় নিউজ পোর্টাল ‘অগ্রযাত্রা টুয়েন্টি ফোর ডট কম’-এর প্রকাশক এবং বাংলাদেশ প্রেস এ্যাসোসিয়েশন (প্যাব)এর সহ সভাপতি।
একটি মন্তব্য করুন

প্রবেশ করুন

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?

আপনার অ্যাকাউন্টের ইমেইল বা ইউজারনেম লিখুন, আমরা আপনাকে পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার জন্য একটি লিঙ্ক পাঠাব।

আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার লিঙ্কটি অবৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

প্রবেশ করুন

Privacy Policy

Add to Collection

No Collections

Here you'll find all collections you've created before.

লেখা কপি করার অনুমতি নাই, লিংক শেয়ার করুন ইচ্ছে মতো!