13.1 C
Drøbak
বুধবার, অক্টোবর ২০, ২০২১
প্রথম পাতামুক্ত সাহিত্যআলো অন্ধকারে যাই (পর্ব ৩)

আলো অন্ধকারে যাই (পর্ব ৩)

মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে আমার মাধ্যমিক স্কুল জীবন শুরু হয়।

মাধ্যমিকের এই পর্ব শুরু হয় অনেক ভয় আর রোমাঞ্চ ভরা বিস্ময় নিয়ে। প্রাইমারির পাঁচকক্ষ বিশিষ্ট দোচালা টিনের ঘরের স্কুলের পরিবর্তে পাকা দালান। সব মিলিয়ে চারটে পুরোনো বিল্ডিং। অপেক্ষাকৃত নতুন বিল্ডিংটি সায়েন্স ল্যাব। সেখানে নবম-দশম শ্রেণির ক্লাস হয়। বিল্ডিংগুলি একটু সেকেলে ও সমীহ জাগানো। সামনে পিছনে দুটি মাঠ। পিছনের মাঠ পেরিয়ে ছেলেদের হোস্টেল। মাঝখানে একটি ছোট টিনের ঘর – হিন্দু ধর্মের ক্লাস ও গরু ছাগলের বিশ্রামের জন্য। স্কুলের সামনে টলটলে জলের বড় দীঘি। সেখানে শাপলা ফোঁটে, মানুষ স্নান করে। দুপুরে নিস্তরঙ্গ পুকুরে মাছেরা খেলা করে। কেউ কেউ ছিপ দিয়ে মাছ ধরে।

স্কুলের গেটের ঠিক সামনে সে সময়ের মাগুরা পোস্ট অফিস, অতি পুরাতন, জরাজীর্ণ তবে ব্যস্ত। পোস্ট অফিসের সামনে ছিল একটি কাঁঠাল গাছ। সেটিতে ঝুলানো ছিল লাল রং এর গোলাকৃতি পোস্ট বক্স। আর সেই গাছতলাতেই বসতো বারোভাজা, কটকটি, বাদাম, ঝুরি ভাজার দোকান। পাশেই কাঠের বাক্সভর্তি গোপালের আইসক্রিম। একটা গোল বড় ফ্লাস্কে থাকতো চার আনা দামের দুধ মালাই কদাচিত যেটির স্বাদ নেবার সামর্থ্য হতো আমাদের। আরেকজন আইসক্রিম বিক্রেতাও ছিলেন। তাঁর নাম মনে নেই। গোপাল দার চেয়ে দ্বিগুন বয়সী, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অমায়িক হাসির কৃষ্ণবর্ণ লোকটির ব্যবহারটাও খুব ভালো ছিল। গোপাল দার সাথে তার কম্পিটিশন ছিল ব্যবসায়।

পোস্ট অফিস পেরিয়ে সামনের দিকে একটু এগোলে একখন্ড পরিত্যক্ত জমি আর সেটির সাথে লাগোয়া ছিল তৎকালীন এসডিপিও সাহেবের বাসা, তার উত্তরে মহকুমা মুন্সেফ সাহেবের বাংলো, আর সেটির পরেই এসডিও সাহেবের বাংলো ছিল তখন। সেই অর্থে আমাদের স্কুলটি ছিল মাগুরার অভিজাত এলাকাতে। সেটিই স্বাভাবিক কারণ ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিও তো অভিজাত – মাগুরার সে সময়ের গর্ব – একসময় যার নাম ছিল মাগুরা মডেল স্কুল।

হেডস্যার, সামাদ স্যার, মর্তুজা স্যার, আর পরেশ স্যার ব্যতীত সব স্যারই পাজামা-পাঞ্জাবি পড়তেন। হক স্যারও মাঝে মাঝে শার্ট-প্যান্ট পড়তেন। নজরুল গবেষক সুধীর স্যার (নজরুল প্রতিভা পুস্তকের লেখক) সব সময়ই ধুতি পাঞ্জাবি। সব স্যারই রাশভারী। সচরাচর ছাত্রদের সাথে একটি সচেতন দূরত্ব রেখে চলেছেন সবাই। স্যারদের আমি খুব একটা হাসতে দেখিনি প্রকাশ্যে – কোলের মাঝে নিয়ে আদর করা তো দূর অস্ত। ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু বারী স্যার, আলী আহমেদ স্যার আর পরেশ স্যার।

আমাদের ক্লাস হতো মাঝখানের খান্দানি বিল্ডিং এর উত্তর কোনায়। প্রাইমারি থেকে আসা বন্ধুদের বাইরে নতুন অনেক সহপাঠী হয় নতুন স্কুলে। অনেকের মাঝে এখন যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলো লিটু, ছোট দিলীপ, বড় দিলীপ, দেবাশীষ, জয়ন্ত, মনিরুজ্জামান, মনিরুল। আমার সাথে ছোট দিলীপ, দেবাশীষ, মনিরুজ্জামান এর বেশ দোস্তি হয়ে যায়।

দিলীপ আর আমি পাশাপাশি বসতাম ক্লাসে ঢুকেই ডান দিকে দুই সারি বেঞ্চের প্রথমটিতে। পঞ্চম শ্রেণিতে আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন রউফ স্যার। আমার সমস্ত শিক্ষা জীবনে এই একজন শিক্ষককে আমি একদিনের জন্যেও হাসতে দেখিনি। স্কুলের শুরুতেই সম্ভবত অলক একদিন জানালো, রউফ স্যারের একটি স্পেশাল বেত আছে তাঁর লকারে। সেটি দেড় হাত লম্বা। পেকে হলুদ হয়ে যাওয়া একটি বেত, চকচকে – যেভাবে সেই সময় দারোগা সাহেবদের মোটা বেত চকচক করতো, তেমনি। কথিত ছিল সে সময় দারোগা সাহেবেরা তাঁদের বেতের লাঠিতে নিয়মিত ঘৃত মর্দন করতেন। তবে রউফ স্যার সেটি করতেন কিনা জানিনা। স্যার আমাদের অঙ্ক পড়াতেন। মাঝে মাঝে ইংরেজিও। যথারীতি আমি ক্লাসে একটু জটিল অংকের ছাই-মাথা কিছুই বুঝতাম না। তবে টেনেটুনে পাশ-পুশ করে যেতাম; আবার মাঝে মাঝে করতামও না।

বাসায় আমাকে অংকের তালিম দিতেন আমার মেজদি। অঙ্ক করতে বসে দু’চারটি চটকানি এবং একগাদা বকাঝকা খাইনি এমন দিনের কথা মনে করা আমার জন্য কষ্টসাধ্য। আমি অংক বোঝার থেকে মনে রাখার চেষ্টা করতাম বেশী। ঘরে বা বাইরে কেউই আমাকে আমার মতো করে বোঝানোর চেষ্টা করতো না, বোঝার চেষ্টা করতো না আমার ব্লকটি কোথায়। বরং আমি অংকে খুব দুর্বল, কাঁচা এসব শুনতে শুনতে আসলেই আমি অংকে কাঁচা হয়ে গেলাম।

আমার জন্যে বড় আতংক ছিলো প্রতিবেশী রুমা (কাকলী কুণ্ড, এখন শরীয়তপুর সরকারি কলেজে ইংরেজির সহকারি অধ্যাপক)। সে তখন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে আমার শ্রেণিতেই পড়ে এবং ক্লাসে নিয়মিত প্রথম/দ্বিতীয় হয়, অংকে একশোর মাঝে নব্বই/পচানব্বই/একশ পায়, আর তার মা, আমাদের কাকিমা, বড় মুখ করে সেটি বলে বেড়ান। বেড়ানো শেষে ওরা চলে গেলে, রুমা একশোতে একশো পায় কিনতু আমি কেন টেনেটুনে নাম্বার পাই সে অপরাধে আরো দুইটা চটকানি অথবা নিদেনপক্ষে মৌখিক ধোলাই ছিলো অবধারিত। তাই মনে মনে চাইতাম না ওরা আমাদের বাসায় আসুক।

যাহোক, রউফ স্যারের ক্লাস মানেই ছিল পিনপতন নীরবতা। সেই রউফ স্যারের ক্লাসেই একদিন ঘটে গেলো এক ভয়ানক ঘটনা যা আজও আমাকে পোড়ায়।

অনেকক্ষন ধরেই ক্লাসে একটু দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিলো। রউফ স্যার ক্লাসে আসার সময় হতে হতে গন্ধটি তীব্র হয়। কোনোভাবেই গন্ধের উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। এক পর্যায়ে স্যার সবাইকে আসন ছেড়ে দাঁড়াতে বললেন। ক্লাসে সবাই দাঁড়ালো শুধুমাত্র বন্ধু ফজলু ছাড়া। ফজুলর টাইফয়েড হয়েছিল তাই অনেকদিন সে স্কুলে আসেনি। সেদিনই সে স্কুলে এসেছে দুর্বল শরীর নিয়ে। স্যার ফজলুকে দাঁড়াতে বললে ফজলু বসে থাকে। লজ্জায়, ভয়ে ফজলু অসহায়। স্যার একাধিকবার ফজলুকে উঠে দাঁড়াতে বললেও সে ওঠেনি। স্যার ক্যাপ্টেনকে আদেশ দেন তাঁর লকার থেকে সেই ঐতিহাসিক বেতটি নিয়ে আসতে। বেত এলো। ফজলু কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ায় এবার। উদঘাটিত হয় গন্ধের উৎস। স্যার বিজয়ী। ফজলু মল ত্যাগ করে সেভাবেই এতক্ষণ বসে ছিলো। ছেলেরা কেউ কেউ নাক ধরে দৌড়, কেউ কেউ কটু মন্তব্যসহ দাঁত বের করে মজা দেখার জন্যে উদগ্রীব। বাঁশ থেকে তো এমনিতেই কঞ্চি বেশী শক্ত হয়।

স্যার ফজলুকে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দেন। বেঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসে ফজলু। একেতো দুর্বল শরীর, তার উপর তার পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে মল। সেই অবস্থায় অসুস্থ ফজলুকে দিয়ে বেঞ্চ ও মেঝে পরিষ্কার করার বৃথা চেষ্টার পর শুরু হলো বেতের ব্যবহার। কেনো ফজলু এতক্ষণ ওভাবে বসে ছিল, কেনো সে স্বীকার করেনি যে গন্ধের উৎস সে নিজেই। মারতে মারতে ফজুলকে ক্লাস থেকে বের করে দেয়া হলো। সেই ফজলু যার অবস্থান ছিল ক্লাসে প্রথম দশজন ছাত্রের মাঝেই। সেই যে কাঁদতে কাঁদতে ফজলু বেরিয়ে গেলো ক্লাস থেকে, আর কোনোদিন সে ফিরে এলোনা স্কুলে। যে লজ্জা ও নির্মমতা সে তার স্কুল সহপাঠী এবং সর্বোপরি তার শিক্ষকের কাছ থেকে পেয়েছিলো, সেটি ফজলু ভুলতে পারলো না কোনোদিনই। নিভে গেলো উজ্জ্বল সম্ভনাময় একটি ছাত্রের স্কুল জীবন। বন্ধুরাও সেদিন ফজলুর অসহায়ত্ব দাঁত বের করে উপভোগ করেছে। হেসেছে।

সেদিন ফজলু ছিল একজন বিজ্ঞ মানুষের নেতৃত্বে একদল ছোট-ছোট নিপীড়কের সামনে এক বলির পাঠা। যে বিদ্যালয় তাকে মানবিকতা, সত্যবাদিতা, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা, ধর্ম ও নৈতিকতা শেখানোর মহান দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো – সেই বিদ্যালয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেদিন ফজলুর অসুস্থতা, বয়স, শারীরিক-মানসিক শক্তি কোনো কিছুকেই বিচারে নেয়নি বা নেবার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে এই চেতনা আসার তো প্রশ্নই আসেনা। না জেনে তারাও সেদিন যা করেছে সেটি এক ধরনের ragging আর সেটি তারা মনের অজান্তেই রপ্ত করেছে তাদেরই বিদ্যালয় থেকে। আমি জানিনা পরবর্তীতে দিনের পর দিন যখন ফজলু বিদ্যালয়ে আসেনি তখন বিদ্যালয় বা শিক্ষক এটি জানার প্রয়োজন বোধ করেছেন কিনা যে এই শিক্ষার্থী কেন স্কুলে আসছে না। জানিনা পরবর্তীতে রউফ স্যারের কোনোদিন অনুতাপ হয়েছে কিনা। স্যারের ছেলেটিও সে সময় আমাদের দু ক্লাস উপরে পড়তো। এমন তো হতেই পারতো, তার নিজের সন্তানটিও একদিন ফজলুর মতো অসহায় হয়ে পড়লো!

মনের মাঝে প্রায়ই প্রশ্ন ভিড় করে। ফজলুর শিক্ষার্থী জীবন থেমে যাবার দায় বিদ্যালয় কি এড়াতে পারে? অথবা রউফ স্যার? রউফ স্যার এখন প্রয়াত। ঈশ্বর স্যারকে বেহেশত নসিব করুন। স্যারের সুনাম ছিল অংকের ভালো শিক্ষক হিসেবে। এরকম একজন সুনামের অধিকারী স্যার কেনো এরকম একটি কাজ করেছিলেন সেটি আর কখনই জানা যাবে না। এর জন্যে স্কুল বা স্যারকে হয়তো কোথাও কোন জবাবদিহি করতে হয়নি। আজও কি হয়? আমাদের চারপাশের ’ফেমাস’ মানুষেরা, ’ফেমাস’ শিক্ষকেরা কখনো কি জানার চেষ্টা করেন তিনি আসলেই কতটা ফেমাস, কিসের জন্যে ফেমাস নাকি ফেমাস হবার বা ভাবার বিষয়টি একটি মিথ যা অপ্রমাণিতভাবে আমরা নিজেরাই তৈরী করি কখনো কখনো নিজেরই মনের ভিতরে? ফেমাস হবার জন্যে তো দায়িত্বশীলতা বেড়ে যাবার কথা। বুঝিনা ‘ফেম’ কীভাবে একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানকে এরকম একটি জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। তাহলে ‘ফেম’ কি কখনো কখনো আমাদেরকে অন্ধও করে তোলে ক্ষণীকের জন্য হলেও?!

গৌতম রায়
গৌতম রায়
গৌতম রায় ইংরেজির অধ্যাপক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেবার পর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেশ তরুণ বয়সেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পড়িয়েছেন দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই পরবর্তীতে ছাত্র হয়েছেন ইংল্যান্ডের এক্সিটার ইউনিভার্সিটির।‌ যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি ও ওয়ার্ল্ড লার্নিং থেকে নিয়েছেন পেশাগত প্রশিক্ষণ। এখন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের জাতীয় ‌শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে। শিক্ষা বিষয়ক বর্ণিল কাজে নিজেকে ‌সম্পৃক্ত রাখার জন্যই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থাকে তিনি দেখেছেন খুব কাছে থেকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে গৌতম রায়ের পছন্দের আঙ্গিনা শিক্ষকের অনিঃশেষ পেশাগত দক্ষতা, ইন্টারেক্টিভ মেটিরিয়ালস ডিভ্যালপমেন্ট, ও লার্নিং এসেসমেন্ট।
অন্যান্য নিবন্ধসমূহ

সংবাদদাতা এবং লেখা আবশ্যক

নরওয়ে থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘সাময়িকী’ পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সংবাদদাতা আবশ্যক।
ভায়োলেট হালদার
প্রধান সম্পাদক
[email protected]

গল্প-কবিতা সহ বিবিধ সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে ইমেইল করুন।
লিটন রাকিব
সাহিত্য সম্পাদক
[email protected]

- বিজ্ঞাপন -

সর্বাধিক পঠিত

সদ্য প্রকাশিত

লেখা কপি করার অনুমতি নেই, লিংক শেয়ার করুন।