সাময়িকী.কম
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউনেপ) কর্তৃক পরিবেশ উন্নয়নে সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দি আর্থ’ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। আগামী ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক জাতিসংঘের বৈশ্বিক সম্মেলনের শেষ দিন প্রধানমন্ত্রী এ পুরস্কার গ্রহণ করবেন বলে ইউনেপ জানায়। এ সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন বলে জানা গেছে।
শুধু প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের জন্যই নয়, বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে এ পুরস্কার গৌরবের। এ পুরস্কারপ্রাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাই। আশা করি, তাঁর নেতৃত্বে দেশের পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হবে।
মূলত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্ব (পলিসি লিডারশিপ) বিবেচনায় নিয়ে ইউনেপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই পুরস্কার প্রদান করে । বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসাবে ২০০৯ সালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বতন্ত্র জলবায়ু পরিবর্তন ফান্ড গঠন, একই বছর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ২০১১ সালে সংবিধানের সংশোধনীতে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করার বিষয় যুক্ত করা ইত্যাদি গুরুত্বসহ বিবেচনা করে ইউনেপ। এছাড়া জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সরকার গড়ে ১০০ কোটি ডলার বরাদ্দ করছে (মাত্র ২৫% দাতাসংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত), এটাও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীকে এই পুরস্কার দেয়ায় কোন কোন মহলের বিস্ময় প্রকাশও লক্ষ্য করা যায়। কারণ, অনেক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের পরিবেশ সত্যিকার অর্থেই মারাত্মকভাবে সঙ্কটাপন্ন। বিশেষ করে, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার আশেপাশের সব নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত, প্রায় সব শহরের নদী-নালা-খাল-বিলগুলো মারাত্মকভাবে দখল ও দূষণের শিকার, শহরে যানজট-বায়ুদূষণ-শব্দদূষণের মত বহুবিধ পরিবেশ সমস্যা বিদ্যমান এবং ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-গাজীপুর পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। এছাড়া মহামান্য হাইকোর্ট এর নির্দেশনা অনুযায়ী হাজারিবাগের চামড়া শিল্প এখনও সাভারে স্থানান্তরিত হয়নি। সুন্দরবন এর নিকটবর্তী রামপাল-এ কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে পৃথিবীর বৃহৎ নয়নাভিরাম বনাঞ্চল হুমকির মুখে পতিত। পরিবেশবান্ধব নৌ ও রেল পথের পরিবর্তে যেখানে অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণসহ সড়কনির্ভরতার প্রাধান্য সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এই পুরস্কার কারও কারও মনে প্রশ্নের উদ্রেক সৃষ্টি করেছে।
তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই পুরস্কারপ্রাপ্তি প্রধানমন্ত্রীকে ইউনেপ ও বিশ্ববাসী এবং একই সঙ্গে দেশবাসীর কাছে আরও দায়বদ্ধ করে তুলবে। আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীতে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদন করবেন না যা পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
অতীতে পরিবেশবিধ্বংসী কী কার্যকলাপ হয়েছে, সরকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি কি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সেটা বিচার্য হলেও সেখানে পড়ে থাকলে চলবে না। আমাদের এগুতে হবে, সামনের দিকে তাকাতে হবে। সেজন্যই মনে করি, আগামীতে বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী অতীতের চাইতে বেশি সচেষ্ট থাকবেন। যে কোন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বেই পরিবেশের উপর তার প্রভাবকে গুরুত্বসহ বিবেচনা করবেন। এক্ষেত্রে সরকার নিশ্চয়ই প্রতারণার আশ্রয় নেবে না। যে ধরনের প্রকল্পে পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকি সৃষ্টি হবে নিশ্চয়ই সে ধরণের প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার।
একইসঙ্গে এও প্রত্যাশা করি, পরিবেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার প্রাপ্তির পর প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই রামপাল-এ কয়লানির্ভর প্রকল্প বাতিল করবেন কিংবা এ প্রকল্প অন্য কোথাও স্থানান্তর করবেন। কারণ, রামপালে কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনকে হুমকিগ্রস্ত করে তুলবে। সুন্দরবন একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ দরকার কিন্তু সেই বিদ্যুৎ কোনভাবেই প্রকৃতি ও পরিবেশ, বন ও জলাশয়কে ধ্বংস করে নয়। শেখ হাসিনার বিগত মেয়াদের সরকারই সংবিধানে পরিবিশ ও প্রতিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন, যা চ্যাম্পিয়ন্স অব আর্থ পুরস্কারের জন্যও বিবেচনা করা হয়েছে।
আমি আশাবাদী, ভূমিদস্যু ও জলাধার দূষণ-দখলকারীদের বিরুদ্ধে আগামীতে কঠোর হবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার। তাঁর সরকার কর্তৃক সংশোধিত সংবিধান অনুসারে জলাধার, বন, পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় সর্বাত্মক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন। পরিবেশবিধ্বংসী কীটনাশক ও সার এবং জিমও (জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম) খাদ্য উৎপাদন বন্ধ করার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও কৃষি প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করবেন।
উন্নয়নের পূর্বশর্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। এজন্য পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কর রেয়াতের সুবিধা এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্পকে নিরুৎসাহিত করতে পরিবেশ কর আরোপ করবেন। জলবায়ু ফান্ড নিয়ে ইতোপূর্বে কতিপয় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। আগামীতে এই ফান্ড প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বচ্ছতা ও সতর্কতা নিশ্চিত করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার।
যারা নিরাশাবাদী, তাদের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বারাক ওবামার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির কথা। বারাক ওবামা ২০০৯ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেয়ার সাড়ে ৮ মাসের মাথায় নরওয়ের নোবেল কমিটি যখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য বারাক ওবামার নাম ঘোষণা করেছিলেন, তখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই অবাক হয়েছিলেন। বারাক ওবামা নিজেও দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে আট মাসের মধ্যেই পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়টি প্রত্যাশা করেননি এবং তার নাম ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় তিনি ‘বিস্মিত’ ও ‘পুরস্কারের জন্য যোগ্য নন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
সেই বিবেচনায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক এগিয়ে রয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তিনি গত ছয় বছরে উল্লেখযোগ্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অবশ্য আমরা পরিকল্পনা কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নে আমাদের যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামীতে সেই দুর্বলতাও দূর হবে।
বিশেষ করে, পরিবেশ (সংরক্ষণ) আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকাকে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। দূরবর্তী যাতায়াতে রেলপথ ও নৌ পথকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের রেলপথ শীঘ্রই ডাবল লেন করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সড়ক পথের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে ঢাকা-চট্টগ্রামের রেলপথ চার লেনে উন্নীত করা হবে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথ চার লেনে উন্নীত করা এটি দীর্ঘদিনের দাবী। পাশাপাশি আশা করি, নতুন করে আর কোন উড়াল সড়ক নির্মাণের দিকে যাবে না সরকার। কারণ, উড়াল সড়ক কখনও কখনও স্বল্প মেয়াদে সমাধান করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর ভূমিকা গৌণ, বরং ক্ষতিকর। থাইল্যান্ডের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ, ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ শহর। স্বল্পদূরত্বের এই যাতায়াতে মানুষকে হেঁটে যাতায়াত করতে উৎসাহী করতে হবে। এজন্য প্রশস্ত ও সমান্তরাল ফুটপাথ, রাস্তা পারাপারের জন্য সিগনাল বাতি ও জেব্রা ক্রসিং, পার্কিংমুক্ত ফুটপাত গড়ে তুলতে হবে।
বুড়িগঙ্গাসহ সব নদীকে দূষণমুক্ত করতে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। পাশাপাশি ইতোপূর্বে বুড়িগঙ্গা রক্ষায় যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, সেই অর্থ কারা, কিভাবে ব্যয় করেছে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন। লন্ডনের টেমস নদী কিংবা নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীও এক সময় মারাত্মক দূষিত ছিল। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু এ দুটি নদীর পানিই ভাল করেননি, এ নদীগুলোকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বুড়িগঙ্গাকে আমরা ইচ্ছা করলেই পূনরায় ভাল অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারি, কিন্তু এজন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। আশা করি, ইউনেপ এর পরিবেশ পুরস্কার প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে বুড়িগঙ্গাসহ দেশের সব বিপর্যস্ত, বেদখল ও দূষিত নদী-নালা খাল-বিল পুনরুদ্ধার করতে উদ্বুদ্ধ করবে। পাশাপাশি যারা জলাশয় দখল ও দূষণ করেছে, তাদের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ ও তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনার মাধ্যমে আগামীতে আমরা জলাশয় দখল ও দূষণ প্রতিহত করতেও সক্ষম হবো।
ইউনেপ কর্তৃক প্রদত্ত চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ পুরস্কার প্রাপ্তিতে আবারও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই।
আমিনুল সুজনলেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.