সাময়িকী.কম
সাবের হোসেন চৌধুরী এই খানেক আগে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন-জজ্ঞুদাদা আর নেই!
হ্যা, জগমোহন ডালমিয়া প্রয়ানের খবর।
সারা দুনিয়ার কাছে তিনি জগমোহন ডালমিয়া। ক্রিকেট পৃথিবী চেনে তাকে আইসিসির সাবেক সভাপতি, ক্রিকেট গ্লোবালাইজেশনের রূপকার হিসেবে। ভারত তাকে চেনে সে দেশের বোর্ডকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সভাপতি হিসেবে।
আর বাংলাদেশের কাছে তার পরিচয় একটাই-জজ্ঞুদাদা।
সাবের হোসেন চৌধুরী, সৈয়দ আশরাফুল হক, আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি, জালাল আহমেদ চৌধুরী থেকে শুরু করে বোর্ডের সাধারণ অনেক পরিচালকেরও বড় ঘনিষ্ঠ জন এই জজ্ঞুদাদা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের বন্ধু, বড় সব দুঃসময়ের বন্ধু, সুসময়ের রূপকার।
বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তিতে ডালমিয়ার অবদান আজ আর বলে বোঝানোর কিছু নেই। বাংলাদেশের সম্বল বলতে তখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম এবং কয়েক কোটি উন্মাদ দর্শক। না আছে ক্রিকেট কাঠামো, প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট কিংবা বলার মতো পারফরম্যান্স। ওই দর্শকের উন্মাদনাকে সম্বল করেই সাবের হোসেন চৌধুরী আর সৈয়দ আশরাফুল হক পাকড়াও করেছিলেন ডালমিয়াকে।
কোলকাতার মানুষ ডালমিয়াও খেপে গেলেন। দু দু বার করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও লড়াই চালিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস এনে দিয়ে তবে ক্ষান্ত হয়েছেন।
সে পর্ব অতীত হয়েছে। ডালমিয়ার জীবনে তারপর অনেক ট্রাজেডি ঘটে গেছে।
তামিলনাড়ু ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিনিধি এন শ্রীনিবাসনকে ধরে এনে বিসিসিআইয়ে এসে কোষাধ্যক্ষ বানিয়েছিলেন জজ্ঞুদাদা।
শ্রীনিবাসন শুরুর সেই দিনগুলোতে ডালমিয়ার এতোটাই ‘ভক্ত’ ছিলেন যে, তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সভাপতিত্ব শেষ হওয়ার পর ডালমিয়া যেন ‘আজীবন প্রধাণ পৃষ্ঠপোষক’ পদে থাকেন।
ডালমিয়া সে প্রস্তাব নেননি।
এতো বড় পদ প্রাপ্তির ‘পুরষ্কার’ দিয়েছিলেন শ্রীনিবাসন। তিনি আক্ষরিক অর্থে ঘাড় ধাক্কা দিয়েছিলেন ডালমিয়াকে। শরদ পাওয়ার, শ্রীনিবাসন ও তরুন লোলিত মোদী মিলে এক জোট তৈরী করে ডালমিয়া পদ ছাড়ার পর ‘প্রমাণ’ করেন ১৯৯৬ বিশ্বকাপের তহবিল নিয়ে নয়-ছয় করেছেন সাবেক এই আইসিসি সভাপতি।
তখনই দাঁতে দাঁত চেপে এই প্রবীন সংগঠক প্রতীজ্ঞা করেছিলেন, এক দিনের জন্য হলেও আবার সিংহাসনে বসবেন।
এবার হঠাৎ করে সুযোগটা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
আদালতের আদেশে বিসিসিআইয়ে নির্বাচন করতে পারেননি শ্রীনিবাসন। তার দরকার ছিল, বিশ্বস্ত কাউকে বিসিআইয়ের সভাপতি বানানো; যাতে ক্ষমতায় এসে সভাপতি আবার আইসিসি থেকে তার নাম প্রত্যাহার করে না নেয়। আবার শ্রীনিবাসনের বিরোধী শিবিরও যোগ্য প্রতিদ্বন্ধী খুজে পাচ্ছিল না।
তখন ডালমিয়াকে শ্রীনিবাসনবিরোধীরা, মানে শরদ পাওয়াররা প্রথম প্রস্তাব দেন। কিন্তু পাওয়ারদের হাতে যথেষ্ঠ ভোট ছিলো না। তখন শ্রীনিবাসন এক ভেলকি দেখান। তিনি ডালমিয়াকে এক সমঝোতা প্রস্তাব দেন-ডালমিয়াকে ভোট জোগাড় করে দেবেন তিনি; মর্ত হলো সভাপতি হয়ে তার ক্ষতি করা যাবে না।
ডালমিয়া এই শর্ত মেনে সভাপতি হন।
পাশাপাশি বিসিআইয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে এক ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়ে আসেন শরদ পাওয়ার গোষ্ঠীর নেতা অনুরাগ ঠাকুর। কিন্তু মুশকিলটা থেকে যায়, বিশাল বোর্ডের বাকী সব পদে শ্রীনিবাসনের লোক বসে পড়ে।
এ অবস্থায় ডালমিয়া চুপচাপই ছিলেন। কিন্তু শ্রীনিবাসন চুপ থাকতে দিলেন না।
শ্রীনিবাসন ডালমিয়াকে প্রথম ছুরিটা মারেন এসিসি বা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করে। এই এসিসি হলো ডালমিয়ার ব্রেইন চাইল্ড। আর এসিসির দায়িত্বে আছেন ডালমিয়ার ঘনিষ্ঠতম বাংলাদেশী সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হক। এসিসির ওপর এই আঘাত ডালমিয়া মুখবুজে সহ্য করার লোক নন।
এর মধ্যেই এলো কামাল-পর্ব।
বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নদের ট্রফি দিতে না দেওয়া ও আইসিসির অন্যায় নিয়ে মন্তব্য করায় শ্রীনিবাসনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয় আমাদের আ হ ম মোস্তফা কামালের। সেই জেরে তিনি পদত্যাগও করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতে তখন জোর গুঞ্জন, কামালের কারণে দু দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হতে চলেছে।
কিন্তু লোকে ভুলে গিয়েছিলো, ভারতের, নামে বিসিসিআইয়ের দায়িত্বে আছেন আমাদেরই বন্ধু ডালমিয়া। তিনি এক খেলা দেখালেন।
কামালকে আমন্ত্রণ জানালেন আইপিএল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।
শুধু কামাল নয়, ডালমিয়া এখানে আমন্ত্রণ করলেণ শ্রীনিবাসনের চিরশত্রু, দক্ষিণ আফ্রিকান সংগঠক হারুন লরগাতকেও। শুরু হলো এক গোপন আর্ন্তজাতিক বৈঠক।
কামাল আর লরগাতকে আমন্ত্রন জানিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন ডালমিয়া?
সোজা কথা, ‘তোমাকে যে ভারতে বসে গালিগালাজ করতে পারে, যে তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু; সে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।’
এরপর মূলত ভারতীয় বোর্ডের সবগুলো ওয়ার্কিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শ্রীনিবাসনের পছন্দের লোকেদের বের করে দিয়ে ডালমিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ডালমিয়া এ ক্ষেত্রে দু জনকে পাশে পেলেন। পুরোনো ওস্তাদ এ সি মুত্থিয়া ও তরুণ বিসিসিআই সচিব, বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুরকে।
মূলত ঠাকুরই আসর গরম করে দিলেন।
আসলে শ্রীনিবাসনই অতি দর্পে জ্ঞানশূন্য হয়ে অনুরাগ ঠাকুরকে বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দিলেন। ঠাকুরকে আক্রমণ করে একটা চিঠি লিখেছিলেন শ্রীনিবাসন। অতি সম্প্রতি লেখা এই চিঠিকে আমার মনে হয়েছে শ্রীনিবাসনের নিজের তৈরী করা নিজের আত্মঘাতি অস্ত্র।
সর্বশেষ অনুরাগ ঠাকুর ও ডালমিয়া বিসিসিআইয়ের ওয়ার্কিং কমিটিতে যোগ দিতে উড়ে আসা শ্রীনিবাসনকে আক্ষরিক অর্থে মিটিংয়ে ঢুকতে দেননি। আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তারা এই আইসিসি সভাপতির প্রবেশাধিকারের ব্যাখ্যা পেতে।
সবমিলিয়ে ভারতে ও ক্রিকেট দুনিয়ায় একটা আবহ পরিষ্কার ছিলো-শ্রীনিবাসনের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার সুর শোনা যাচ্ছিলো। সবাই বড় আশায় বুক বেধে ছিলো, জজ্ঞু দাদা গ্লোবালাইজেশনের নামে যা কিছু করেছেন, সে ক্ষতিপূরণও এবার হয়ে যাবে। ক্রিকেট তার হাত ধরেই রাহুমুক্ত হবে।
আইসিসির সাবেক সভাপতি এহসান মানি একটা পত্রিকায় আশার কথা শুনিয়েছেন। বলেছেন, তার পুরোনো বন্ধুটি নিজের স্বপ্নের বিশ্বায়ন বন্ধ হতে দেবেন না। আসছে মিটিংয়ে তিনি অন্তত রুখে দাড়িয়ে বলবেন, এসিসি বন্ধ হতে পারে না।
এহসান মানির সেই বন্ধুটি হলেন আমাদের সেই পুরোনো বুড়ো-জগমোহন ডালমিয়া।
সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো।
এহসান মানি, হারুন লরগাত থেকে শুরু করে আশরাফুল হকরা যেসব স্বপ্ন দেখছিলেন তা একটা প্রয়ানে শেষ হয়ে গেলো।
ডালমিয়ার শরীর ভালো নয়, এটা সবাই জানতেন। আর এটাই শঙ্কা ছিলো। শেষ পর্যন্ত শঙ্কাটাই সত্যি হলো, যুদ্ধের প্রথম পর্বেই মৃত্যুতে ময়দান ছাড়লেন জজ্ঞুদাদা।
যুদ্ধ কী তাহলে এখানেই শেষ? তরুন অনুরাগ ঠাকুর কী পারবেন ডালমিয়ার আবার জ্বালানো মশাল দিয়ে কিছু আলো জ্বালাতে?
নাকি এক মৃত্যুতে সব শেষ হয়ে যাবে!

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.