মোঃ জাহিদুল ইসলাম
সাময়িকী.কম

খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম, আজ একটু বাইরে বেড়োবো। সকাল থেকেই আকাশটা কেমন যেন মেঘলাচ্ছন্ন..! চারপাশের পরিবেশটা ঠান্ডা বাতাসে ছেয়ে আছে..! এ অবস্থায় চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের বি.টি কোচিং সেন্টারের সামনে থেকে সেন্ট্রাল প্লাজার মোড় পর্যন্ত বিশাল জ্যামে রিক্সায় বসে আছি। বাতাসে ভ্যাপসা গরমের উপস্থিতি।
অনেকক্ষণ ধরে পাশে বসা মহারাণী মিস অধরা বিরক্তিভরা মুখ করে তার পার্সে কি যেন খুঁজে ফিরছে। মনে হয় "টিস্যু"। তার কপাল, নাক ঠোঁটে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমি আমার হাতের রুমাল এগিয়ে দিলাম।
"লাগবেনা তোমার এমন পঁচা ঘন্ধযুক্ত ময়লা রুমাল।"- বিরক্তিভরা কণ্ঠসুরে রুমাল নেওয়ার প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিল অধরা।
'মুছে দিচ্ছি দেখি'- একটু দায়িত্ববান ভাব নিয়ে আমি এগিয়ে গেলাম।
"আজিব ব্যাপার! অন্যের রুমাল ইউজ করব
কেনো আমি?"- প্রশ্নমূলক কণ্ঠস্বরে জানালো অধরা।
'কিহ,আমি অন্য?'- অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে জানালাম।
"তাই বলে কি তোমার রুমাল শেয়ার করতে হবে নাকি?"- জানালো অধরা।
আমি কিছু বললাম না ওর নিষ্ঠুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, মেয়েরা এমন নিষ্ঠুর হয় কি করে?
হঠাৎ রাস্তার পাশে টং এর দোকানগুলোর দিকে চোখ পড়তেই রিক্সা থেকে নেমে গেলাম। ফুটপাথের উপর চাকা লাগানো দোকান। বসুন্ধরা পকেট টিস্যুও দেখা যাচ্ছে। দুইটা গোল্ড-লীফও নিলাম (স্মোকিং কজেজ ক্যানসার)। একটা ছোট পানির বোতলও। বিল পে করার সময় দোকানদার ছেলেটা কেমন যেন করে দেখছে আমাকে, মনে হচ্ছে গিলে খেয়ে ফেলতে চাচ্ছে। পাত্তা দিলাম না। আমি রিক্সার উঠে মনের সুখে সিগারেট টানছি আর ধোঁয়া উড়োচ্ছি।
অধরার দিকে টিস্যুটা এগিয়ে দিলাম। যত্ন করে মুখের ঘাম পরিষ্কার করছে। আমার হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়তেই মনে হলো, টিস্যুগুলো না কিনে দিলেই মনে হয় ভাল হতো। তার ফর্সা চিবুকে আর নাকের উপর ঘামের বিন্দু গুলো মুক্তোর মত লাগছিলো, যার সৌন্দর্য আমাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করছিলো।
আকাশের দিকে তাকালাম সেন্ট্রাল প্লাজার ছাদের কোণার দিকটার ওয়েল-ফুডের উপরের প্রান্তঘেঁষে; আকাশের কোনায় ঘন-কালো মেঘ জমেছে। আমি শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দিতে বললাম,
"মে বি, আজ বৃষ্টি আসবে"
"তোমার মাথা আসবে। ঘেমে টেমে শেষ আর উনি বলছে বৃষ্টি আসবে...হুহ্ঔ"- রাস্তার অপরিচ্ছন্ন কাগজের মত আমার কথাটাও হেলায় উড়িয়ে দিলো অধরা।
"মিলিয়ে নিও"- আমি অল্প করে মুচকি হাসলাম। রাস্তার জ্যাম ছেড়ে দিচ্ছে মনে হয়। ইউনোস্কের সামনের রাস্তাটা প্রায় খালি। ঝুম ঝুমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। অধরা ইতোমধ্যে চেচাঁমেচি শুরু করে দিয়েছে, রিক্সা ওয়ালার কাছে পলিথিনও নেই। রিক্সার হুড উঠিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। বৃষ্টির অদ্ভুত ছাঁটে দুইজনেই ভিজে যাচ্ছি। নাহ, হুড উঠিয়ে লাভ তো হয়েছে। অধরাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরেছি। তার গায়ের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ আর বৃষ্টির ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তার ঠোঁট চুঁইয়ে ফোটা ফোটা পানি পড়ছে। বর্ণনাতীত ভাললাগার একটা দৃশ্য।
অধরা হঠাৎ যেন বিরক্ত হয়ে হুড টেনে নামিয়ে দিলো। আমি মুচকি হেসে ফেললাম। মেয়েটা সত্যিই  অন্যরকম !
"এমনিতেই তো ভিজছি,আর কি হবে;"- তার মুখে কৃত্রিম বিরক্তি।
'হুম,সেটাই।' তোমার চোখের কাজল ধুয়ে গেছে। অধরার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললাম।
"যাক।"- বলে সে দুহাত বাড়িয়ে আজলা ভরে পানি নিয়ে মুখে দিল। মনে হয় প্রাকৃতিক বৃষ্টির স্বাদ আস্বাদন করছে।
রিক্সাওয়ালা একবার পিছনে ফিরে তাকালো
মনে হয়, সেও হয়তো এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাগিদার হতে চাচ্ছিলো। তার চোখে নিখাঁদ বিস্ময়। নোংরা, ধোঁয়া ধূসর শহরটাকে বৃষ্টি এসে মাঝে মাঝে ধুয়ে দিয়ে যায়। কারেন্টের তারের উপর বসে থাকা ভেজা পাঁতিকাক গুলোকেও কেন জানি তখন খুব আপন মনে হয়। রাস্তার পাশের গাছগুলোও মনে হয় শুষ্ক মরুময়তা কাটিয়ে একটু জীবন ফিরে পায়, সজীব আর প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে বৃষ্টি ভেজা শহরে আমি এক স্নিগ্ধ নীলাবতীকে পাশে নিয়ে রিক্সায় ঘুরে বেড়ানোর কি যে অপার আনন্দ সেটা বলে বোঝানো যাবেনা। হুমায়নের বৃষ্টি-বিলাসী !
আকাশের বুক থেকে ঝরে পড়া অশ্রুফোঁটা গুলো অদ্ভুত কারণে আমাদের স্পর্শ করতে পারেনা কারণ ভালোবাসা নামক জিনিসটাকে কোনোদিনও বেঁধে রাখতে নেই, খোলা আকাশে উড়িয়ে দিতে হয়, যাতে সে অনেকটা জায়গা নিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারে...!!

(সমাপ্ত)

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.