সাময়িকী.কম

মুহাম্মাদ রাশিদুল হক : রুচিশীল মানুষ নিজে উন্নত পোশাক পরিধান করতে পছন্দ করে। প্রিয়জনকেও উত্তম পরিচ্ছদে দেখতে ভালোবাসে। প্রিয় বস্তুটিকেও ভালো মানের কাপড়ে আবৃত করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ছোট-বড় সব মুসলমানের হৃদয়ে বায়তুল্লাহর প্রতি মহব্বত স্বভাবগত। বায়তুল্লাহর ভালোবাসার কারণে এর গিলাফও সবার কাছে প্রিয় ও সম্মানের বস্তু। 


শুরুতে কাবার গায়ে কোনো গিলাফ পরানো হতো না। আংশিক হলেও সর্বপ্রথম কাবা শরিফের গিলাফ পরানোর সৌভাগ্য অর্জন করেন হজরত ইসমাঈল (আ.)। জাহেলি যুগেও বেশ গুরুত্ব সহকারে পবিত্র কাবায় গিলাফ পরানো হতো। হিজরতের আগে ২২০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম কাবা শরিফের পূর্ণাঙ্গ গিলাফ পরানো হয়। তুব্বা আবু কারাব মালিক সর্বপ্রথম কাবার গায়ে পূর্ণাঙ্গ গিলাফ পরান। 


রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ কুসাই বিন কিলাবের যুগে কোরাইশ গোত্রের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একবার পবিত্র কাবাগৃহের গিলাফ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কোরাইশ গোত্রের সব শাখাগোত্র আনুপাতিক হারে এর ব্যয়ভার বহন করত। কিন্তু কোরাইশ ধনকুবের আবু রবিয়া বিন মুগিরা মাকজুমি প্রচলিত এই নিয়মে বাদ সেধে বললেন, ‘এক বছর আমি একা কাবার গিলাফ পরাব, পরের বছর গোটা কোরাইশ মিলে।’ তার কথা মতো মৃত্যু পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। প্রাক-ইসলাম যুগে পবিত্র কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হতো আশুরার দিন। এরপর এ কাজের জন্য কোরবানির দিনটি ধার্য করা হয়।


নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম কাবা শরিফের গিলাফ পরানোর সৌভাগ্য অর্জন করেন আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের জননী নুতাইলা। হারিয়ে যাওয়া শিশুপুত্র আব্বাসকে ফিরে পেলে কাবাঘরে গিলাফ পরানোর মানত করেছিলেন তিনি। পুত্রকে খুঁজে পেয়ে কাবার গায়ে শুভ্র রেশমের গিলাফ পরিয়ে দেন তিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজে ইয়ামানি কাপড়ে তৈরি গিলাফ বায়তুল্লাহর গায়ে পরিয়ে দেন। ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে মিসরে তৈরি শুভ্র মসৃণ কাপড়ে কাবার গিলাফ পরানো হতো। মুয়াবিয়া (রা.) এর শাসনামলে আশুরা ও রমজানের শেষ দিন, বছরে এ দুইবার কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হতো।


উমাইয়া শাসকরা পবিত্র কাবার গিলাফের ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। মুয়াবিয়া (রা.) এর শাসনামলে শুরু হওয়া গিলাফ পরিবর্তনের ধারাটি তারা অব্যাহত রাখেন। তখন মূল্যবান কাপড়ে মনোরম কারুকাজ খচিত পবিত্র কাবার গিলাফ তৈরি হতো দামেস্কে। আব্বাসীয় শাসনামলে কোনো কোনো বছর তিনবার পর্যন্ত কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হতো। তখন শুভ্র ও রক্তিম বর্ণের মোটা-পাতলা নানা ধরনের রেশমি কাপড়ে তৈরি হতো কাবার গিলাফ। খলিফা মামুনের শাসনামলে তারবিয়ার দিন রক্তিম রেশমি কাপড়ে, রজব মাসের শুরুতে মিসরি রেশমি কাপড়ে এবং ঈদুল ফিতরের দিন শুভ্র রেশম কাপড়ে তৈরি গিলাফ পবিত্র কাবাগৃহে শোভা পেত।


বর্তমানে পবিত্র কাবার গিলাফ কালো রেশমি কাপড়ে তৈরি হয়। ১৪ মিটার দীর্ঘ এবং ৯৫ সেন্টিমিটার প্রস্থ ৪১টি বস্ত্রখ- জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয় গিলাফটি। চার কোনায় সূরা এখলাস স্বর্ণসূত্রে বৃত্তাকারে শোভা পায়। একটি গিলাফে ব্যবহৃত রেশমি কাপড় ও স্বর্ণের ওজন যথাক্রমে ৬৭০ কিলোগ্রাম এবং ১৫ কিলোগ্রাম। বর্তমানে এটি তৈরিতে ১৭ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল ব্যয় হয়।


বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সউদ ১৩৪৬ হিজরিতে কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির জন্য একটি বিশেষ কারখানা স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করেন। ১৩৫৭ হিজরি পর্যন্ত এ কারখানাটি গিলাফ তৈরি অব্যাহত রাখে। পরে ১৩৮১ হিজরিতে সৌদি হজ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দক্ষ সৌদি কারিগর দ্বারা রেশমি ও সোনালি সুতা দিয়ে গিলাফ তৈরি করে কাবার গায়ে পরিধানের ব্যবস্থা করা হয়। ১৩৮২ হিজরিতে বাদশাহ ফয়সাল ইবনে আবদুল আজিজ নতুন ডিক্রি জারির মাধ্যমে নতুন করে পবিত্র কাবার গিলাফ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। তখন থেকে খাঁটি প্রাকৃতিক রেশমি রঙের সঙ্গে কালো রঙের কাপড় দিয়ে পবিত্র কাবার গিলাফ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়। 


প্রতি বছর হাজিদের ইহরামের শ্বেতশুভ্রতার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হজের ঠিক আগে কাবা শরিফের গিলাফ সরিয়ে তা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। হজ শেষে ১০ জিলহজ নতুন গিলাফ পরানো হয়। পুরনো গিলাফটির বিভিন্ন অংশ মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপহার দেওয়া হয়। 


প্রতি বছর দুটি করে গিলাফ তৈরি করা হয়। একটি মূল এবং অপরটি সতর্কতার জন্য তৈরি করে রাখা হয়। একটি গিলাফ হাতে তৈরি করা হয়। এটি তৈরিতে সময় লাগে আট থেকে নয় মাস। অন্যটি মেশিনে মাত্র এক মাসে তৈরি করা হয়। গিলাফ তৈরি করার পর সেটি কাবা শরিফের চাবিরক্ষক বনি শাইবা গোত্রের মনোনীত খাদেমের কাছে হস্তাস্তর করা হয়। পরে সবার সহযোগিতায় গিলাফ কাবা শরিফের গায়ে চড়ানো হয়। 


(সূত্র : রুহুল মায়ানি, ফতহুল বারি, বাব কিসওয়াহ কাবা ইত্যাদি)।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.