সাময়িকী.কম

দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন 
মো. আমিনুল ইসলাম, গাজীপুর থেকে : পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম রোজা। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার। সন্ধ্যায় ইফতারে দেয়া হল সামান্য ডাল, ৭-৮ গ্রামের মতো ছোলা বুট ও অল্প কিছু মুড়ি। সারা দিন রোজা রাখার পর এত অল্প খাবারে ইফতার হবে না। তাই হত্যা মামলার এক বন্দি এ বিষয়ে কারারক্ষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একই সঙ্গে তিনি আরও কিছু ছোলা ও মুড়ি চান। এতে তার ওপর নেমে আসে মধ্যযুগীয় নির্যাতন। পিসি টেবিলে (খাবার বিক্রির স্থান) নেয়া হল। এরপর দুই উরুর নিচ দিয়ে হাত দুটি নিয়ে পরানো হল হ্যান্ডকাপ। ফাঁক দিয়ে ঢোকানো হল বাঁশ। এরপর শুরু হয় পিটুনি। পিটিয়ে তার পিঠসহ বিভিন্ন স্থান ক্ষতবিক্ষত করা হয়।
৩ রমজান যুগান্তরের এই প্রতিনিধির সঙ্গে এই বন্দির ঢাকায় একটি আদালতে কথা হয়। এ সময় তিনি কাশিমপুর কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের আরও বিভিন্ন কাহিনী শোনান। বলেন, কথায় কথায় সেখানে নির্যাতন চলে। এর মাত্রা এতই ভয়াবহ যে, তা সইতে না পেরে প্রথম রোজায় ইফতারের পর ফয়েজ নামে আরেক বন্দি কেরোসিন ঢেলে নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই বন্দি থাকত চন্দ্রা সেলের ভিতরে। আগুনে ফয়েজের শরীর ৩০ ভাগ পুড়ে গেছে। বর্তমানে সে সেখানকার কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কারাগারের জেলার জান্নাতুল ফরহাদ নির্যাতনের ঘটনা অস্বীকার করেন। পাশাপাশি আর কোনো মন্তব্য না করে জেল সুপারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ মতো জেল সুপার মো. মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই কারাগারে কোনো বন্দি নির্যাতন করা হয় না। বরং অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় হাইসিকিউরিটি কারাগারের পরিবেশ বর্তমানে অত্যন্ত ভালো।
একদিকে সাধারণ বন্দিদের নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও বিপরীত দিকে জামাত-শিবিরের দণ্ডপ্রাপ্ত ও দুর্নীতির কারণে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের আদালতে আনা-নেয়ার কাজে বিশেষ সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে একই কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ১৬ জুন গাজীপুর সার্কিট হাউস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এ বিষয়ের অবতারণা করেন। সভায় তিনি বলেন, কাশিমপুরের কারা কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা সত্ত্বে কারাগারের কিছু বন্দিকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রিজন ভ্যানের পরিবর্তে মাইক্রোবাসে করে আদালতে আনা-নেয়া হয় যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত জামাতের শীর্ষ নেতাদের। এ সময় তিনি পথিমধ্যে যে কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকা করে বলেন, এর আগেও ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যান থেকে বন্দি ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ সুপারের বক্তব্যের পর খোঁজ নিয়ে জেলারের জামাত কানেকশনের অভিযোগও পাওয়া যায়। জামাতের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে নিজের স্ত্রীকে (জামাত নিয়ন্ত্রিত) একটি হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসা করানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ঢাকার আদালতে কথা বলার সময় নির্যাতিত ওই বন্দি অভিযোগ করেন, তাকে এর আগে আরও নির্যাতন করা হয়েছে। সেবারও কম খাবার দেয়ার বিষয়ে কথা বলায় জেলারের নির্দেশে কারারক্ষীরা তার ওপর নির্যাতন চালায়।
বন্দিটি জানালেন, ওই কারাগারে জেলারের নিজস্ব একটি বাহিনী রয়েছে। ওই বাহিনীই মূলত বন্দি নির্যাতনে অংশ নেয়। এদের হাতে কারাগারের ৯০ ভাগ বন্দিই নির্যাতিত। এরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই বন্দির দাবি, এর আগে তার ওপর একাধিকবার নির্যাতনের ঘটনা নিু আদালতের বিচারককে অবহিত করা হয়। আর এ ঘটনার পরে তাকে ২০ ঘণ্টা লকআপ করে রাখা হয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা জেলের বাইরে আসতে পারেন না। তাই নির্যাতনের বিষয়টি তারা কাউকে বলতে পারেন না। যাদের একাধিক মামলা রয়েছে এবং হাজিরার জন্য আদালতে আসেন তারা বিষয়টি স্বজনদের ও আইনজীবীদের কাছে বলতে পারছেন।
প্রসঙ্গত, কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি নির্যাতনের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালের মার্চে কাশিমপুর কারাগারে ৮ কয়েদিকে অন্ধকার কক্ষে অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তখন হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলনিশি জারি করেন। ওই ঘটনার পর তারা কিছুদিন শান্তিতে ছিলেন।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা, সময় ও নামের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে নির্যাতনকারীদের নামও। বন্দিদের দাবি অনুযায়ী তাদের ওপর যারা নির্যাতন চালান তাদের মধ্যে জেলার জান্নাতুল ফরহাদ শীর্ষে। এছাড়া সুবেদার খোরশেদ, সাবেক সুবেদার মুছতাইন হোসেন, জমাদার লুৎফর রহমান, বদরুল আলম, মোসেব খান, মিয়া সাহেব মোতালেব, তাজ, আল আমিন ও সুমন অন্যতম।
যেসব বন্দি তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা হলেন-১৭২১/১৩নং হাজতি মো. জাবেদ প্রিন্স, তাকে এ বছরের ৮ মার্চ ও ১ম রমজানে নির্যাতন করা হয়। ৬৫৩/এ-নং ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি মো. শুকুর আলীকে নির্যাতন করা হয় ৩০ মার্চ। একইভাবে ১৯২/এ-নং বন্দি রুবেল হোসেন, ১৬৩২নং কয়েদি আজগর আলী নির্যাতনের ফলে বেশ কিছু দিন ধরে কিডনিতে ব্যথা অনুভব করেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ কোনো উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি।
নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৩নং কয়েদি মো. মানিক হোসেন, ৮২নং কয়েদি সুজন সরকার, হাজতি ফয়সাল আরবেজ মন্টি, কয়েদি রাজু, কয়েদি শাহিন, বিদ্যুৎ, ফাঁসির কয়েদি মামুন, মো. সাইফুল ইসলাম, শামীম, আয়নাল, জিয়াউল আলম, দিদারুল আলম, মীর হোসেন, মাসুম, আল আমিন, আলা উদ্দিন, শাশিন এল্যাইড, মাহমুদ, তছির, জুয়েলসহ অনেকে।
নির্যাতনে কিডনিজনিত সমস্যায় ভোগা আজগর আলীর চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র এসেছে যুগান্তরের কাছে। নির্যাতিত আরেক বন্দি নাঈমের ভাই সিরাজের সঙ্গে এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার ভাইকে একাধিকবার নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে কারা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
কাশিমপুরের এই হাইসিকিউরিটি কারাগার আরও নানা কারণে আলোচনায় রয়েছে। গত বছর এ কারাগারে অস্ত্র খোয়া গিয়েছিল। কারা সূত্র জানিয়েছে, অস্ত্র খোয়া যাওয়ার নায়কও জেলার। কেননা, কারারক্ষীদের মাঝে অস্ত্র বিতরণকালে তার তালিকা হওয়ার কথা। কিন্তু তা না করেই অস্ত্র দেয়া হয়। ফলে যে অস্ত্রটি খোয়া যায়, সেটি কাকে দেয়া হয়েছিল, তা চিহ্নিত করা যায়নি। যে কারণে তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কারারক্ষীকে নজরবন্দি করা হয়েছিল। পরে ৭ জনকে আটক করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ৩ জন শাস্তি পেলেও অস্ত্রেও দৈনন্দিন তালিকা না করার দায়ে জেলারের কোনো কিছু হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে জেলার জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হল। ‘কারাগারে বন্দি নির্যাতন করা হয় না’- এই একটি কথাই বলেন তিনি। একই সঙ্গে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেল সুপারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এ ব্যাপারে জেল সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, সবচেয়ে দুর্ধর্ষ, মাদকসেবী এবং খুনের মামলার আসামিরা এ কারাগারে বন্দি থাকেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। নেশার জন্য এরা অনেকে নিজের পশ্রাব পর্যন্ত পান করে। মাদকসেবী বন্দিরা মাদক না পেয়ে হুলস্থূল বাধিয়ে দেন। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আদালতকে অবহিত করা হয়। বন্দিদের অভিভাবকদেরও ডাকা হয়। এছাড়া বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককেও জানানো হয়। জামাত-শিবির নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই ‘হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার’। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক কারাগার হিসেবে বিবেচিত। ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কারাগার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি ২০১২ সালের ১২ জুলাই উদ্বোধন করেন। এ কারাগারে রয়েছে ৬ তলাবিশিষ্ট ১০টি ভবন। প্রতিটি ভবনের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। নামগুলো হলো- ভাওয়াল, শতাব্দী, গাজী, চন্দ্রা, হিমেল, তমাল, মিলগিরি, তিতাস, সৈকত ও শৈবাল। ডবল ইউনিটের প্রতিটি ভবনের একটি রুমে ৩ জন করে বন্দি থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ভবনে আলাদা আলাদা করে মোট ৩০টি সিসিটিভি বসিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিñিদ্র করতে প্রতিটি ভবনে ১৮ ফুট উঁচু প্যারামিটার ওয়ালের ওপর ৫ ফুট ইলেকট্রিক ওয়ারিং (বৈদ্যুতিক তার) করা হয়েছে। কারাগারের পুরো নিরাপত্তা মনিটরিং করতে ১০টি ভবন ঘিরে রয়েছে ৩টি উঁচু ওয়াচ টাওয়ার। এতসব নিরাপত্তার বিশাল ব্যবস্থা থাকলেও বন্দি নির্যাতনের ফলে এ কারাগারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.