সাময়িকী.কম

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন 

আবু সালেহ আকন : শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাককে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি। রাজ্জাককে কিভাবে ফিরিয়ে আনা হবে ছয় দিনেও সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বিজিবি সদস্য আবদুর রাজ্জাককে ফেরত দিতে শর্ত হিসেবে মিয়ানমার দেশটিতে আটক পাঁচ শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে আনার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এটা কাম্য নয়। তিনি আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন। এ দিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক আইডিতেও আবদুর রাজ্জাককে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
গত ১৭ জুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য আবদুর রাজ্জাককে অপহরণ করে নিয়ে যায় প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। এরপর শুধু আশ্বাসের ওপরই রয়েছে আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি। এ দিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার আবদুর রাজ্জাকের বিষয়টি নিয়ে বিজিবি-বিজিপি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 
জানা গেছে বিজিপি রাজ্জাককে ফেরত দেয়ার বিষয়ে বৈঠকে বসতে বিজিবিকে চিঠি দিয়েছে। এতে পাঁচ সদস্যের বিজিবি দলের নাম চাওয়া হয়েছে। গতকাল ওই চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। 
গত ১৭ জুন নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর বিজিপিকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরদিন টেকনাফ স্থলবন্দর রেস্ট হাউজে এ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সম্মতি না পাওয়ার কথা বলে বিজিপি তা বাতিল করে দেয়। এর পর থেকে বারবার পতাকা বৈঠকের আহ্বান করা হলেও রাজ্জাকের বিষয়ে এখনো কোনো বৈঠকে বসেনি মিয়ানমার। গত শুক্রবার মিয়ানমারের ঢেকুবুনিয়ায় ৩৭ বাংলাদেশী ফেরত বিষয়ে পতাকা বৈঠকেও নায়েক আবদুর রাজ্জাকের বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় হয়। ওই বৈঠক শেষে ৩৭ জন বাংলাদেশী দেশে এলেও রাজ্জাকের বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি।
এ দিকে অপহৃত নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। এ জন্য অবশ্য বাংলাদেশকে জুড়ে দেয়া হয়েছে একটি শর্ত। এমন তথ্য পাওয়া যায় গত সোমবার। রাতে অবশ্য এক মোবাইল মেসেজে বিজিবি সদর দফতর থেকে বলা হয় মিয়ানমার বিনা শর্তে রাজ্জাককে ছেড়ে দিতে রাজি। ওই মেসেজে বর্তমানে চীন সফররত বিজিবি ডিজির বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘আমার সাথে সোমবার আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টায় মিয়ানমারে নিয়োজিত বাংলাদেশের ডিফেন্স অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবের কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে তার বৈঠক হয়েছে। তারা জানিয়েছে, বিজিবি নায়েক রাজ্জাককে তার ব্যক্তিগত অস্ত্রসহ নিঃশর্ত ও সম্মানজনকভাবে ফেরত দেয়া হবে।’
এর আগে সোমবার দুপুরে বিজিবির টেকনাফ ৪২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুজার আল জাহিদ বলেন, বিজিপির প থেকে রাজ্জাকসহ ৫৫৫ জন মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশী অভিবাসীকেও ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে এর পাল্টা বক্তব্যে বিজিবি বিজিপিকে জানায়, রাজ্জাক এবং অভিবাসী ইস্যুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৫৫৫ জন অভিবাসীর মধ্যে কয়জন বাংলাদেশী তা যাচাইবাছাই করা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আপাতত রাজ্জাককে ফেরত দিতে হবে।
এ দিকে, গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ফেরত দিতে মিয়ানমারের শর্ত জুড়ে দেয়াকে ‘অতিরিক্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মিয়ানমার বিজিবি সদস্য আবদুর রাজ্জাককে ফেরত দিতে শর্ত হিসেবে দেশটিতে আটক পাঁচ শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে আনার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এটা কাম্য নয়।
‘আমরা তাদের বলেছি, আটক লোকদের নাম-ঠিকানা সংবলিত তালিকা পাঠান, তারা বাংলাদেশী হলে আমরা অবশ্যই ফেরত নেবো।’
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের সীমান্ত রীবাহিনী নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং দেশটিতে আটক লোকদের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। ওই লোকজনের বিষয়টি তদারকি করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর রাজ্জাকের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখছে।
এ দিকে, দিন যত যাচ্ছে ততই মানুষের মধ্যে রাজ্জাকের বিষয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। রাজ্জাকের গ্রামের বাড়িতে এখনো কান্নার রোল বইছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যেভাবে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে, যেভাবে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে এ দৃশ্য দেখে পরিবারের সদস্যরা শুধু নন, গোটা দেশের মানুষ চিন্তিত। তাকে এখন কোথায় কিভাবে রাখা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। এতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরো বাড়ছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জুন বুধবার টেকনাফের নাফ নদীর জাদিমুরা পয়েন্টে সন্দেহভাজন দু’টি নৌকায় তল্লাশিকালে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিজিপি) একটি টহলদল রাজ্জাককে তাদের নৌকায় তুলে নিয়ে যায়। বিজিবি বাধা দিলে তাদের ওপর গুলি চালায় বিজিপি। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে বিজিবির আরো এক সদস্য গুরুতর আহত হন।
এ দিকে বিদেশ সফররত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি গতকাল এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন, ‘নায়েক আবদুর রাজ্জাককে শিগগিরই ফেরত আনা হবে। কাজ চলছে। দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশন রয়েছে যা সব দেশের মানা উচিত। না মানলে সেগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ারও ব্যবস্থা আছে। আমরা আমাদের নাগরিক, কর্মকর্তা ও বাহিনীর সদস্যদের মর্যাদার বিষয়ে সচেতন। এ ধরনের বিষয়গুলো নিরসনে প্রয়োজন হয় ধৈর্য, কৌশল এবং সঠিক সিদ্ধান্তের। আমি জানি একজন নাগরিক এগুলো বুঝতে নাও চাইতে পারেন। তাদের উদ্দেশে বলব, ভরসা রাখুন।’  
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.