সাময়িকী.কম

দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন 
মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। টাকা না পেয়ে নির্যাতন, বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া, সাধারণ মানুষকে হয়রানি এমনকি শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে এ আইনশৃংখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। ঘুষের জন্য হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নিরীহ মানুষ ধরে নিয়ে খুন, চোখ বেঁধে পায়ে গুলি ও থানা হাজতে নির্যাতনের বিষয় এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এছাড়া নিরীহ মানুষকে যখন তখন ধরে নিয়ে গুম ও গ্রেফতার এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এখন রীতিমতো ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে সবার আগে যেখানে পুলিশের কাছে ছুটে যায়, সেই পুলিশই এখন মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা দেয়ার নামে পুলিশই এখন সবচেয়ে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অসাধু কিছু পুলিশ সদস্যের সখ্য গড়ে ওঠায় আইনশৃংখলা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশে একের পর এক ঘটছে লোমহর্ষক খুনের ঘটনা। পুলিশের অনীহা ও দলবাজির কারণে লোমহর্ষক এসব খুনের ঘটনার তদন্তও চলছে ঢিমেতালে। দীর্ঘদিন পার হলেও চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি গ্রেফতার তো দূরের কথা, শনাক্তও করতে পারছে না পুলিশ। এর পেছনে পুলিশের গাফিলতিকেই দায়ী করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে মাত্রারিক্ত দলবাজি ও এলাকাবাজির প্রভাবে কিছু কিছু পুলিশ কর্মকর্তার প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা কাউকে পাত্তাই দিতে চান না। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতেই এখন ভয় পান। খুন, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ঢাকা মহানগরবাসীসহ দেশের সাধারণ মানুষ।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাবে গত ৪ মাসে সারা দেশে গুম হয়েছে ২৮ ও ক্রসফায়ারে প্রাণ হারিয়েছে ৫৯ জন। থানা ও জেলহাজতে মৃত্যু হয়েছে ২২ জনের। অতি সম্প্রতি পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকার শিকার হয়েছে ছাত্রইউনিয়নের এক নারী নেত্রী। এ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের মুখে একজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করতে বাধ্য হয় পুলিশ সদরদফতর। সাংবাদিকরাও পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। গত ৪ মাসে একজন সাংবাদিক নিহত, ৪৮ জন আহত, লাঞ্ছিত ১৮, হুমকিতে ৮ এবং ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত চার মাসে সারা দেশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও দেশে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি মারাত্মক অবনতির চিত্রই ফুটে উঠেছে। পুলিশ সদরদফতরের শত চেষ্টা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও পরিস্থিতির তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি।
অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, চলতি বছরের গত চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) পুলিশ সদরদফতরের সিকিউরিটি সেলে ৪ হাজার ৫৬৬ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ জমা পড়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে ঘটনাস্থলেই হাতেনাতে ধরা পড়ায় গ্রেফতার হয়েছেন ২৮ পুলিশ সদস্য। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে ৭৮৭ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৮ সদস্যকে গ্রেফতার ছাড়াও চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে ৫৭ জনকে। তবে যাদের চাকরিচ্যুত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে পুলিশের কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্য বেশি। এছাড়া লঘুদণ্ড দেয়া হয়েছে ২ হাজার ২ পুলিশ সদস্যকে। অভিযুক্ত এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বেতন স্কেলে দক্ষতাসীমা অতিক্রম বন্ধ, বেতন স্কেলের নিুধাপে অবনমিতকরণ এবং কর্তব্যে অবহেলার জন্য সরকারের অর্থিক ক্ষতির সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ বেতন হতে আদায় করা হচ্ছে। গত চার মাসে পুলিশ সদরদফতরে জমা পড়া অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৮৮১ জনের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে চুরি, ডাকাতি, খুন কিংবা ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর সব অপরাধ। ২ হাজার ৩১৫ জনের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ঘুষ গ্রহণ, সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও পেশায় নানা অনিয়ম-অনাচারসহ শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগ। বাকি ১ হাজার ৩৭০টি অভিযোগ এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার।
সূত্র জানিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের মধ্যে ৩ পুলিশ সুপার, ৭ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ১৮ সিনিয়র সহকারী সুপার, ৪৮ ইন্সপেক্টর, ৮১২ এসআই, ১ হাজার ২১৮ এএসআই, ১ হাজার ১১৫ সার্জেন্ট ও টিএসআই, ৪৩১ হাবিলদার এবং ৩ হাজার ১৩২ জন নায়েক ও কনস্টেবল।
সদরদফতর সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী অভিযুক্ত এসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া সদরদফতরে পুলিশের বিরুদ্ধে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসূত্র রয়েছে এমন অভিযোগের তদন্ত চলছে পুলিশের ১ হাজারেরও বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেশাদার বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেই অভিযোগের পাল্লা ভারি। এক পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, রাজনৈতিক উচ্চমহলে যোগাযোগ থাকায় পুলিশের এসব সদস্য সব সময় বেপরোয়া আচরণ করে থাকে। এসব সদস্যের চেইন অব কমান্ড ভাঙার প্রবণতাও বেশি। তাদের মতে, পুলিশকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে না পারলে এ বাহিনীকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত সেবক হিসেবে গড়ে তোলা যাবে না।
পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, এত বড় বাহিনীতে কিছু খারাপ লোক থাকতেই পারে। তবে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে পুলিশ সদরদফতর জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুলিশ বাহিনীর আমূল পরিবর্তন দরকার। এ বাহিনীর কিছু সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। শাস্তিও হচ্ছে কারও কারও। তবে এ সংখ্যা খুবই কম। বাহিনীতে কমিটমেন্ট এবং রিসোর্সের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খান যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় তদন্তকালে পুলিশ প্রকৃত তথ্য পায় না। আবার অনেক সময়ে প্রতক্ষদর্শীরা ভয়ে পুলিশকে তথ্য দিতে চায় না এমন অভিযোগও রয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবশ্যই এ ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নূরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, একটি সুশৃংখল বাহিনীর সদস্যদের অপরাধে জড়ানোর খবর দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুপারভিশনের অভাবেই অধস্তনরা সাধারণ কিংবা ফৌজদারি নানা অপরাধে জড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হলে অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে, যাতে অন্য কেউ নতুন করে অপরাধ করার সাহস না পায়।
পুলিশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : চলতি বছরের এপ্রিলের শেষদিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকার ১৭ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ওই কিশোরীকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শেখ রাজীবুল হাসানের বিরুদ্ধে। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় গোয়েন্দারা রাজীবের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলেও এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন সেই এসি।
এর আগে মুক্তিপণ না পাওয়ায় পল্লবী থানার এসআই তৌহিদুল আরেফিন ও এএসআই সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে মো. নাহিদ নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। বিভাগীয় তদন্তের নামে ওই অভিযোগের রিপোর্ট এখনও জমা দেয়া হয়নি। এদিকে বহাল তবিয়তে রয়েছেন ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। নাহিদের স্বজনরা বলছেন, দুই পুলিশ জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই সত্যতা বেরিয়ে আসবে। সর্বশেষ ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এ ঘটনায় সিআর মামলা নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা এরই মধ্যে দুই দফা সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মোহাম্মদপুর থানার এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন আটক করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে। সকালে বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ওই ছাত্রের রিকশার গতিরোধ করে তার কাছে ইয়াবা আছে বলে আটকের হুমকি দেয়। ছাত্রটি প্রথমে এর তীব্র প্রতিবাদ করলে পুলিশ ২০ হাজার টাকা দিলে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ছাত্রটি তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় নেয়ার পর পুলিশের ওই কর্মকর্তা অভিভাবককে ফোন করে ওই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের কাছে ইয়াবা পাওয়ার কথা জানান এবং দেখা করার কথা বলেন। এ দুঃসংবাদ পাওয়ার পর অভিভাকদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। যোগাযোগ করা হলে পুলিশের এ কর্মকর্তা ছাত্রের অভিভাবকের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় পরে তাকে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডে নিয়ে মানসিক নির্যাতন করে। শুধু তাই নয়, এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে খুশি না করায় এ মামলাটিতে দ্রুত চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর পুরো পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা।
পহেলা বৈশাখে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কয়েকজন নারী শ্লীলতাহানির শিকার হন। ঢাকা মহানগর পুলিশের তদন্ত কমিটি ওই ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি খুঁজে পায়নি বলে রিপোর্ট দেয়। এর কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের সামনেই লেখক বিজ্ঞানমনস্ক ব্লগার অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। ওই ঘটনায়ও পুলিশের কোনো অবহেলা খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি।
গত বছরের অক্টোবর মাসে রাজধানীর ভাটারা থানার দুই এএসআই ও এক কনস্টেবল মিলে এক নারীকে দিয়ে ফাঁদ পেতে বেসরকারি এক চাকরিজীবীকে আটকে রাখে। পরে তারা ওই চাকরিজীবীর পরিবারের কাছে ফোন করে ২ লাখ টাকা দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি র‌্যাব সদস্যদের জানালে টাকা নেয়ার সময় র‌্যাব পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে হাতেনাতে আটক করে।
৭ মে বৃহস্পতিবার রাতে দোকান বন্ধ করে ডেমরার কোনাপাড়া শাহজালাল রোডে নিজের বাসায় ফেরার পথে ফল ব্যবসায়ী মো. অপুকে তল্লাশির নামে ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় সংশ্লিষ্ট থানার এসআই ফরিজ উদ্দিন। এর দুদিন পর ১০ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরার কোনাপাড়া আইডিয়াল রোডের ১০ তলা ভবনের সামনে পুলিশের একটি চেকপোস্টে কোনাপাড়া ফাঁড়ির এএসআই সোহেল পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির সময় মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠে। এর আগে ডেমরা থানার এসআই ইয়াসিন তার এক সোর্সের মাধ্যমে বক্সনগর এলাকা থেকে ২৭৫ পিস ইয়াবাসহ হানিফ নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের পর ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। একই রাতে ডেমরার বামৈল এলাকা থেকে সন্ধ্যায় এক মাদক ব্যবসায়ীকে ৪০ পিস ইয়াবাসহ আটক করলে কিছুক্ষণ পরই ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয় ডেমরা থানার এসআই ফরিজ উদ্দিন। তবে এসব অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা।
আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র : গত চার মাসে রাজধানীসহ সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৮১৮টি। এর মধ্যে রাজধানীতে খুন হয়েছেন ৩৪০ জন বিভিন্ন পেশার নারী ও পুরুয়। এর আগে গত চার মাসে সারা দেশে খুনের সংখ্যা ছিল ৭১টি। অন্যদিকে গত চার মাসে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো ঘটনাও বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। গত চার মাসে ডাকাতির সংখ্যা ১ হাজার ৮১৫টি। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৩১২টি। আর অপহরণের ঘটনা ছিল ৩৪৬টি। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৪৫টি ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১০২ নারী ও শিশু। এছাড়া এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছে ২১ নারী, গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৫৭ এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১১৯ জন।
যেসব চাঞ্চল্যকর ঘটনার এখনও কূলকিনারা হয়নি : তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুর খুনের ঘটনায় স্থানীয়রা দুজনকে হাতেনাতে আটক করে। এছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ৩/১২ নম্বর বাড়িতে হামলায় বিআরটিয়ের উপপরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের স্ত্রী কলেজ শিক্ষিকা কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস নিহত হন। এ ঘটনায় শীতাংশু শেখর ও তাদের দুই মেয়ে গুরুতর আহত হন। পল্লবীতে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় গৃহবধূ সুইটি আক্তার ও তার মামা আমিনুল ইসলামকে। ১৩ মে পল্লবীতে জমি নিয়ে বিরোধে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন নিরীহ কলেজছাত্র আবদুর রহমান চঞ্চল। একই দিন নরসিংদীতে পুত্র হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে খুন করে বাবাকে। ১৬ মে বাড্ডায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবলীগ কর্মী দুলাল হোসেনকে। ১৮ মে হাজারীবাগে স্ত্রী উম্মে মীরা ইফাতকে গলাটিপে হত্যার পর সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আÍহত্যা করেন স্বামী রাসেল। ২৫ মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে খুন হন সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল কুদ্দুসের স্ত্রী রওশন আরা ও তার গৃহকর্মী কল্পনা আক্তার। এসব ঘটনায় পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার কিংবা আটক করতে পারেনি। এমন কি কিছু কিছু ঘটনায় ঘাতকদের শনাক্তও করতে পারেনি। আলোচিত এসব হত্যা মামলা তদন্তে পুলিশের ব্যর্থতা কেবল এটি নয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত বারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলানোর পরও যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়ে গেছে । তদন্তকাজে পুলিশের কৌশল সেকেলে বলেই এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
চাঞ্চল্যকর কিছু মামলার তদেন্ত পুলিশের ব্যর্থতা : ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ওয়ারীর গোপীবাগে জবাই করে হত্যা করা হয় লুৎফর রহমান ফারুক, তার ছেলে মনির হোসেন, কথিত মুরিদ মঞ্জু, মহিবুল, শাহিন ও রাসেলকে। এরপর তদন্তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে পুলিশ। শুরুতেই খুনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারার দাবি করলেও দীর্ঘদিনেও ঘাতকদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তেজগাঁওয়ে নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের তদন্তেরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। রামপুরায় সিআইডির অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সুপার ফজলুল করিম খুনের ঘটনা পেরিয়ে গেছে দীর্ঘদিন। এই খুন কারা করেছে তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঢাকা কলেজের ছাত্র আসাদুজ্জামান আল ফারুক খুনের দীর্ঘদিন পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি এখনও। যাত্রাবাড়ীতে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি দীর্ঘদিনেও। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার হয় কয়েকটি কঙ্কাল। কঙ্কালগুলো এখনও ডিএনএ ল্যাবে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.